বুধবার ১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ১ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

জলেশ্বরীর সৈয়দ হক যেভাবে আমাদের হলেন

সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৯ | ৪:৫৪ অপরাহ্ণ

মাজহারুল ইসলাম

ইমপ্রেসের সিনে ম্যাগাজিন ‘আনন্দ আলো’র বারো বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশিষ্ট বারোজনকে সম্মাননা জানানোর আয়োজন করা হয়েছে চ্যানেল আই চত্বরে। সৈয়দ শামসুল হক তাঁদের অন্যতম। কীভাবে যেন আমার মতো অভাজনের নামও সে তালিকায় ঢুকে গেছে। আমি মঞ্চের ডান দিকে ফরিদুর রেজা সাগরের পাশে বসে আছি। তারিখটা ছিল ১৪ এপ্রিল ২০১৬। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠান শুরুর প্রস্তুতি চলছে। সৈয়দ হক সামনের সারিতে বসা। হঠাৎ তিনি উঠে এসে হাতের ইশারায় আমাকে ডেকে মঞ্চের পেছনে নিয়ে বললেন, আমার শরীরটা খুব খারাপ। এরমধ্যে কয়েকদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। আগামীকাল সকালে লন্ডন যাচ্ছি চিকিৎসার জন্য।
আমি বললাম, আমি তো কিছুই জানি না। কী হয়েছে আপনার ? তিনি বললেন, পরে বলব। আমার জন্য দোয়া কোরো। কথাগুলো বলে কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে এসে শক্ত করে আমার ডান হাতটা ধরলেন। নিচুস্বরে বললেন, বারডেমের ডাক্তাররা ধারণা করছে ফুসফুসে ক্যানসার। কথাটা তোমাকে বললাম, আর কাউকে এখন বলবে না। এরপর আর কোনো কথা না বলে তিনি ধীর পায়ে হেঁটে নিজের বসার জায়গায় চলে গেলেন।
আমি স্তম্ভিত হয়ে তাঁর হেঁটে যাওয়া দেখলাম। এই প্রথম মনে হলো, তাঁর ওজন অনেকটা কমে গেছে। কিছুক্ষণ একা দাঁড়িয়ে থাকলাম। এই তো মাত্র কদিন আগে ২৩ মার্চ নাসের, কমল ও আমাকে দুপুরে ঢাকা ক্লাবে খাওয়ালেন। আনোয়ারা ভাবিও ছিলেন। কত কথা হলো, গল্প হলো সেদিন। এপ্রিলের এক তারিখ থেকে ‘অন্যদিন’ ঈদসংখ্যার উপন্যাস লেখা শুরু করবেন। গেল বছর ঈদসংখ্যায় লিখতে না পারার কারণ ব্যাখ্যা করলেন, যদিও তার কোনো প্রয়োজন ছিল না। সেদিন দেখে একবারও মনে হয়নি তিনি অসুস্থ। এর মধ্যে এত কিছু ঘটে গেছে, অথচ আমি কিছুই জানি না!

২০১১ থেকে ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছি। ২০১২-তে চলে গেলেন হুমায়ূন আহমেদ, পরের বছর সহোদর। যদিও খবরটা শোনার পর হক ভাইকে বলেছিলাম, চিন্তা করবেন না। দেখবেন বিলেতের ডাক্তাররা হয়তো বলবে কিছুই হয়নি। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছিল, যদি তেমনটা না বলেন ? যদি এখানকার ডাক্তারদের কথাই সত্যি হয় ?
এরমধ্যে কখন মঞ্চে যাওয়ার জন্য আমার নাম ঘোষণা করা হয়েছে খেয়াল করিনি। কেউ একজন এসে বলায় দৌড়ে গিয়ে মঞ্চে উঠলাম। বারোজন একসঙ্গে দাঁড়ানো। হক ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। প্রথমেই মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তিনি কথা বলে মঞ্চ থেকে নেমে গেলেন। দীর্ঘদিনের পরিচিত সেই ভারী কণ্ঠস্বর আজ যেন কিছুটা ম্লান মনে হলো। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার খানিকটা আগেই সৈয়দ হক চলে গেলেন। দূর থেকে তাঁর চলে যাওয়া দেখলাম।


নীল জিন্সের প্যান্ট, কালো কর্ডের শার্ট, গলায় ও হাতে মোটা সোনার চেইন পরা ৬৭ বছরের তরুণ সৈয়দ শামসুল হক। বাংলা একাডেমি বইমেলায় অন্যপ্রকাশের স্টলে চেয়ারের উপর দু’পা তুলে বসে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন। চোখে কালো সানগ্লাস। ১৯৯৮ সালের কথা বলছি। অন্যপ্রকাশ থেকে প্রথম উপন্যাস ‘একমুঠো জন্মভূমি’ প্রকাশিত হয়েছে। এই দৃশ্য বইমেলায় সবার নজর কাড়ে। কোনো কোনো দৈনিকে পরদিন সে ছবি ছাপাও হয়। সেই থেকে অন্যপ্রকাশের সঙ্গে সৈয়দ হকের পথচলা শুরু। এরপর একটার পর একটা নতুন বই প্রকাশ হতে থাকে। বাস্তবতার দাঁত ও করাত, দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, গল্প কোলকাতার, বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে, শ্রেষ্ঠ কবিতা, মার্জিনে মন্তব্যসহ ৩৮টি বই অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়।
কিংবদন্তি এই লেখক ১৯৬৪ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। তারপর একে একে সব রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।
যখন কম্পিউটার আবিষ্কার হয়নি তখন সৈয়দ হক টাইপরাইটার মেশিনে লেখালেখি করতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কম্পিউটারে লেখা শুরু করেন। আধুনিক এবং ফ্যাশন সচেতন মানুষ ছিলেন তিনি। নতুন বই প্রকাশিত হলে লেখক কপি নিতেন মাত্র দুটি।
একজীবনে বহুকিছু করেছেন সৈয়দ হক। বহুমাত্রিক প্রতিভার লেখক বলেই বাংলা সাহিত্যে তাঁর পরিচয় ‘সব্যসাচী লেখক’ হিসেবে। তিনি গত শতকের পঞ্চাশের দশকের প্রথমার্ধে লেখালেখি শুরু করেছিলেন, ষাট বছরের বেশি সময় ধরে অসাধারণ মেধা, প্রজ্ঞা ও প্রতিভায় নিজেকে রেখেছেন বিপুলভাবে সক্রিয়।... শুরুতে তিনি গল্পের দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত বইটি গল্পসংকলন। নাম ‘তাস’, প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালে। পরবর্তী বাষট্টি বছর ধরে লেখা তাঁর নানা গল্পে নানা নিরীক্ষার ছাপ রয়েছে। বাংলাদেশের উপন্যাস সাহিত্যের তিনি অন্যতম প্রধান শিল্পী। ‘দেয়ালের দেশ’ তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস (১৯৫৯)। এই মাধ্যমেও নানা ধরনের নিরীক্ষা করেছেন তিনি। ‘খেলারাম খেলে যা’, ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘মহাশূন্যে পরান মাস্টার’, শঙ্খলাগা যুবতী ও চাঁদ’, ‘জনক ও কালো কফি’ তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস।... ১৯৫১ সালে মুম্বাইতে গিয়ে কিছুদিন একটি চলচ্চিত্র প্রয়োজনা সংস্থায় কাজ করেন। সিনেমার জন্য চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন, এমনকি অসংখ্য গান লিখেছেন তিনি চলচ্চিত্রের জন্য। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও। বিবিসি বাংলায় কাজ করেছেন সাত বছর। ১৯৭১ সালে লন্ডন বিবিসি বাংলা থেকে তিনি সংবাদ পাঠ করেছেন। ছবি আঁকতেন। বাংলা মঞ্চনাটকে তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ (১৯৭৬) ও ‘নূরলদীনের সারা জীবন’ (১৯৮২)।

বিজ্ঞাপন

১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় সৈয়দ হক রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা’। আধুনিক সময়ে কোনো কবির এত দীর্ঘ কবিতা বেশ বিরল। এরও দশ বছর আগে ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একদা এক রাজ্যে’। তাঁর আরেক বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘পরানের গহীন ভিতর’ (১৯৮১) দিয়ে তিনি আঞ্চলিক ভাষাকে উপস্থাপন করেছেন তাঁর কবিতায়।
কবিতায় তাঁর ধারাবাহিকভাবে যে অবদান তা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
অনুবাদ সাহিত্যেও অসামান্য অবদান রেখেছেন তিনি, বিশেষত শেক্সপিয়রের নাটকে। তাঁর তুল্য শেক্সপিয়রের নাটকের অনুবাদ সমগ্র বিশ্বসাহিত্যেই বিরল।


লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রায়ই ফোনে কথা হতো। অধিকাংশ সময় আমিই ফোন করতাম। কখনো কখনো হক ভাইও ফোন করতেন। তবে তিনি ম্যাসেজ পাঠাতেন বেশি। ম্যাসেজগুলো লিখতেন ইংরেজিতে আর আমি উত্তর দিতাম বাংলায়। ফোনে তাঁর চিকিৎসা-সংক্রান্ত নানা তথ্য জানতাম কখন তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, কটা কেমো নিয়েছেন, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন, সেইসব পরীক্ষার রেজাল্টই বা কী ইত্যাদি। কোনো কারণে হক ভাই ফোন ধরতে না পারলে ভাবি ধরতেন। কথা হতো তাঁর সঙ্গেও। একদিন হক ভাইয়ের ফোন এল। তিনি জানালেন, শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এর অনুবাদ শেষ হয়েছে। শিল্পকলা একাডেমি নাটকটি প্রযোজনা করবে এবং আতাউর রহমান নির্দেশনা দেবেন। আরও বললেন, বইটা তোমরা প্রকাশ করবে। কিন্তু এখন না, প্রথম মঞ্চায়নের দিন বইটি প্রকাশ হবে। আমি শুনে খুবই খুশি হলাম।
ক’দিন পর আমাকে বললেন, বইয়ের শুরুতে ‘সবিনয় নিবেদন’ শিরোনামে একটা লেখা যাবে। সেটা আমি লিখে ফেলেছি। এটা তোমাদের ‘অন্যদিন’-এ ছাপতে পারো। আমি বললাম, অবশ্যই ছাপব। আপনার এবং নাটকের নির্দেশকের দুটো সাক্ষাৎকারও ছাপতে চাই। ভাইবারে আপনার সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। সেইসঙ্গে ‘হ্যামলেট’ নিয়ে একটা বড় স্টোরি থাকবে।
ইমেইলে তিনি কিছু ছবি পাঠালেন সাক্ষাৎকারের সঙ্গে ছাপানোর জন্য। প্রচ্ছদে ছবি কী যাবে ? সিদ্ধান্ত হলো হক ভাইয়ের ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ হবে এবং এই সংখ্যাটি হবে অন্যদিন ঈদুল আজহা সংখ্যা।
এরমধ্যে হক ভাই ফোন করে জানালেন, সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ দেশে আসবেন কিছুদিনের জন্য। আগের দিন আমি চলে গেলাম কলকাতায় বাংলাদেশ বইমেলায় অংশ নিতে। কলকাতা থেকে খবর পেলাম দেশে এসে তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মনটা খারাপ হয়ে গেল। তাহলে কি শরীরটা আরও খারাপ করেছে ? নাকি দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের ধকল নাজুক শরীরটাকে আরও নাজুক করে দিয়েছে ?


কলকাতা থেকে ফিরে এসে ফোন করলাম ভাবিকে। তিনি এই মুহূর্তে হাসপাতালে যেতে বারণ করলেন। ডাক্তার বলেছেন দর্শনার্থী যত কম আসবে ততই ভালো। ভাবি বললেন, দু-একটা দিন যাক, আমি তোমাকে জানাব। এর মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হক ভাইকে দেখতে যান ইউনাইটেড হাসপাতালে। পরদিন সব জাতীয় দৈনিকে ছবিসহ সংবাদ ছাপা হয়। সেদিনই সকাল এগারোটার দিকে হক ভাইয়ের ফোন। বললেন, আজ বিকেলে তোমরা চলে আসো।
বিকেলে আমি ও স্বর্ণা হক ভাইয়ের কেবিনে পৌঁছে যাই। মুখে মাস্ক লাগিয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করে হক ভাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ধবধবে সাদা বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন। তাঁর মুখেও মাস্ক লাগানো। হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন। হাড্ডিসার একজন মানুষ শুয়ে আছেন। মনে হলো শরীরের ওজন কমে অর্ধেক হয়ে গেছে। কুশল বিনিময় এবং টুকটাক কিছু কথা হলো। বললেন, ‘হ্যামলেট’ প্রকাশ করে ফেলো। কাভার করতে দাও। নাটক মঞ্চায়ন হতে দেরি আছে। আমি বই আকারে দেখতে চাই।
এরমধ্যে ভাবিকে বললেন, তোমার ক্যামেরা দিয়ে একটা ছবি তোলো।
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ‘হ্যামলেট’ প্রকাশ করব বলে বিদায় নিয়ে চলে এলাম।


সৈয়দ হককে নিয়ে অন্যদিন ঈদুল আজহা সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। দশ কপি অন্যদিন নিয়ে হাসপাতালে হক ভাইকে দেখতে গেলাম। তিনি পত্রিকাটি হাতে নিয়ে পাতা উল্টিয়ে দেখলেন। খুবই খুশি হলেন। ভাবিকে বললেন, দেখো কী করেছে ওরা! এর দু-একদিন পর ভাবি ফোন করে বললেন, আরও কয়েকটা ‘অন্যদিন’ নিয়ে এসো। তোমাদের হক ভাই যে-ই আসছে তাকে একটা করে ‘অন্যদিন’ দিয়ে দিচ্ছে। এখন একটা কপিও নাই। সঙ্গে সঙ্গে আরও কয়েকটি কপি হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলাম।


ঈদের কয়েকদিন পর হক ভাই বললেন, তোমাদের অন্যমেলা থেকে আমাকে তিন রঙের তিনটা পাঞ্জাবি বানিয়ে দেবে। একটা সাদা, একটা কালো এবং একটা লাল। হাসপাতাল থেকে বাসায় গেলে অনেকেই আমাকে দেখতে আসবে। তখন একেকদিন একেক কালারের পাঞ্জাবি পরে তাদের সামনে যাব। হাতার উপরের দিকে অনেকগুলো কুচি দেবে যেন সেগুলো ফুলে থাকে। ‘হ্যামলেট’ নাটকে ক্লডিয়াসের রাজপোশাকের মতো। আমি বললাম, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি বানিয়ে দেবো।
২৫ সেপ্টেম্বর পাঞ্জাবি তিনটা নিয়ে গেলাম। ডিজাইন এবং রং দুটোই তিনি পছন্দ করলেন। আমাকে বললেন, লাল রঙের পাঞ্জাবিটা ধরো তো। আমি ধরলাম। ভাবি পাশে দাঁড়ানো। ক্যামেরাবন্দি করা হলো মুহূর্তটি। ভাবিকে বললেন, দেখেছ লাল রঙটা কী সুন্দর!
পরদিন সকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে আইসিউই-তে নিয়ে যাওয়া হলো হক ভাইকে। তারপরের ঘটনা আমাদের সবার জানা। ২৭ সেপ্টেম্বর বিকেল চারটায় বাংলা ভাষার শক্তিমান এই লেখক চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।

২৮ সেপ্টেম্বর শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন হক ভাই। বিকেল তিনটায় শেষযাত্রায় আমিও ছিলাম তাঁর সঙ্গে। হেলিকপ্টারে দুই সারিতে বসে আছি আমরা। আমার পাশে বসেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, এম.পি। অন্যদিকে আসাদুজ্জামান নূর, আনোয়ারা সৈয়দ হক, সস্ত্রীক দ্বিতীয় সৈয়দ হক এবং তাদের পুত্র, কবি তারিক সুজাত, মিমি ভাবি, কবি পিয়াস মজিদসহ আরও কয়েকজন। কারও মুখে কোনো কথা নেই। চোখের ভাষাও যেন হারিয়ে গেছে। অন্তহীন স্তব্ধতা হেলিকপ্টার চলার বিকট আওয়াজকেও হার মানিয়েছে। কফিনে গভীর ঘুমে নিস্তব্ধ সৈয়দ শামসুল হক। কতবার তাঁর জন্মস্থান কুড়িগ্রামে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। তাঁর মনোজগতের সেই জলেশ্বরীতে। সময় হয়ে ওঠে নি। আজ তাঁকে নিয়ে আমরা কুড়িগ্রাম যাচ্ছি। এক ঘণ্টার যাত্রাপথ যেন শেষ হচ্ছে না। এধরনের যাত্রাগুলো সবসময় এরকমই হয়।
১৯৯৬ সালে কলকাতা থেকে বাবাকে নিয়ে এসেছিলাম, ২০১২-তে হুমায়ূন আহমেদকে এনেছিলাম নিউইয়র্ক থেকে। ২০১৪-তে অগ্রজের এরকম যাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলাম আমি। চেন্নাই থেকে কলকাতা হয়ে ঢাকা। আজ আমার চতুর্থ শবযাত্রা। আগের যাত্রাগুলোর সঙ্গে পার্থক্য হলো এবার প্রিয়জনের কফিন ঠিক সামনে নিয়ে বসে আছি।

কফিনের ওপর রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধাঞ্জলি রাখা। বারবার সেদিকে দৃষ্টি চলে যাচ্ছে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি অনেকক্ষণ। একসময় মনে হলো আমরা পৌঁছে গেছি। উপর থেকে কুড়িগ্রাম কলেজের মাঠ দেখা যাচ্ছে। এ মাঠের একপ্রান্তে তাঁকে সমাহিত করা হবে। মাঠের চারদিক ঘিরে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। যত নিচের দিকে নামছি মনে হচ্ছে মানুষের সংখ্যা ততই বাড়ছে। এখন মনে হচ্ছে লাখ ছাড়িয়ে যাবে। হেলিকপ্টার কুড়িগ্রামের মাটি স্পর্শ করেছে। আমি বিস্মিত হয়ে দীর্ঘক্ষণ প্রচণ্ড রোদে দাঁড়িয়ে থাকা জনসমুদ্র দেখছি। কুড়িগ্রাম ছাড়াও বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকেও মানুষরা এসেছে তাদের প্রিয় লেখককে শেষবারের মতো দেখতে, শ্রদ্ধা জানাতে। ঢাকার শহীদ মিনারের জনসমুদ্রকে ছাড়িয়ে গেছে কুড়িগ্রামের জনস্রোত।

লাখো মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন আমাদের প্রিয় হক ভাই। জলেশ্বরীর সৈয়দ হক। বাংলাদেশের, বাংলা ভাষার সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। ঘড়িতে তখন বিকেল ৪টা ২৮ মিনিট।

মাজহারুল ইসলাম : সম্পাদক, অন্যদিন। প্রধান নির্বাহী- অন্যপ্রকাশ।

[সৈয়দ শামসুল হক-এর প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত]

সারাবাংলা/পিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন