সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৯ জমাদিউস-সানি ১৪৪১

বিজ্ঞাপন

‘নুসরাত হত্যা মামলা বিচার বিভাগের জন্য প্রেস্টিজ’

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৯ | ৯:০৯ অপরাহ্ণ

মুহাম্মদ আরিফুর রহমান, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট

ফেনী: ফেনীর আলোচিত মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় দেওয়া হবে ২৪ অক্টোবর। সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিখণ্ডন শেষে রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন নারী ও শিশু নির্যাতন নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশীদ। যুক্তিখণ্ডন শেষে দুই পক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশে বিচারক বলেন, নুসরাত হত্যা মামলা বাংলাদেশের জন্য প্রেস্টিজ, বিচার বিভাগের জন্য প্রেস্টিজ।

বিজ্ঞাপন

রায়ের তারিখ ঘোষণার পর এক ব্রিফিংয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী শাহজাহান সাজু সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘গত ২৭ জুন মামলার বাদী নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। নুসরাতের মা শিরিন আখতার ও বাবা মাওলানা এ কে এম মুসা ও নুসরাতের ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হানসহ ৮৭ জনের সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হয়েছে।’

শাহজাহান সাজু জানান, সোমবার বিচারক যুক্তিখণ্ডন শেষে সকলের উদ্দেশে বলেন, ‘আদালতের এজলাসের বাইরে মামলা নিয়ে কোনো ধরনের কথা হবে না। কারণ নুসরাত হত্যা মামলাটি শুধু ফেনীর নয়, বাংলাদেশের প্রেস্টিজ, বিচার বিভাগের প্রেস্টিজ। আমার সাথে (বিচারক) কোনোভাবে একান্তে ব্যক্তিগত যোগোযোগ করার দরকার নেই।’

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) হাফেজ আহমেদ জানান, আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পেছনে যতসব যুক্তি উপস্থাপন করা দরকার সব করা হয়েছে। এতসব প্রমাণের মাধ্যমে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা হবে বলে আশা করেন তিনি।

সোমবার আদালতে ১৬ জন আসামির মধ্যে ১৫ জনকে হাজির করা হয়। এদিকে আসামি কামরুন নাহার মনি বন্দি থাকা অবস্থায় কন্যা সন্তানের মা হওয়ায় তাকে আদালতে হাজির করা হয়নি।

উল্লেখ্য, এ বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের দায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৬ এপ্রিল ওই মাদরাসা কেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে অধ্যক্ষের সহযোগীরা নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ১০ এপ্রিল মারা যায় নুসরাত জাহান রাফি। এ মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা, মাদরাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আবসার উদ্দিন, ওই মাদরাসার ছাত্রলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম, নূর উদ্দিন, সোনাগাজী উপেজলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন, পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে গত ২৯ মে ফেনীর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্টে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহ আলম। এছাড়া প্রায় ৮০৮ পৃষ্ঠার সামগ্রিক নথিটি গত ২৮ মে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম জাকির হোসাইনের আদালতে দাখিল করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

ফেনীর আদালতে রেকর্ড

এত অল্প সময়ে চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণ ফেনীর আদালতে এটি রেকর্ড বলে জানালেন আইনজীবীরা। আসামিপক্ষের আইনজীবী ফরিদ উদ্দিন নয়ন বলেন, ‘ফেনীর আদালতে এটি রেকর্ড সৃষ্টি হবে। প্রায় দুই হাজার পৃষ্ঠার ওপরে মামলা সংক্রান্ত নথি কিভাবে পড়া সম্ভব হবে। রায়ে আসামিদের বিরুদ্ধে পর্যালোচনা লিখতেও সময় লাগবে।’

আসামিপক্ষের স্বজনদের অসন্তোষ ও কান্না

নুসরাত হত্যা মামলা চলাকালীন সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরায় প্রতিদিন আসামিপক্ষের স্বজনদের উপস্থিতি থাকতো লক্ষ্যণীয়। তবে সোমবার রায়ের তারিখ নির্ধারণের পর স্বজনারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকে সাংবাদিক, পিবিআই, পুলিশ ও সরকারকে দোষারোপ করে বলেন, বিচারের নামে আসামিদের প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে। ২৪ অক্টোবর তারা ন্যায় বিচার পাবে।

আসামিপক্ষের আইনজীবী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘নুসরাত ডায়িং ডিক্লারেশন (মৃত্যুকালীন জবানবন্দি) কোনো আসামির নাম উল্লেখ করেননি। নুসরাতের চিঠিতে প্রমাণ হয়েছে নুসরাত আত্মহত্যা করেছে। আগামী ২৪ অক্টোবর আসামিরা ন্যায় বিচার পাবে।’

নুসরাতের স্বজনদের সন্তোষ

রায়ের তারিখ নির্ধারণ হওয়ায় নুসরাতের স্বজনরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, মামলায় আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হবে। নুসরাতের ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান বলেন, ‘আসামিদের অপরাধ অনুপাতে সর্বোচ্চ শাস্তি চাই আমরা। এটি যেন বাংলাদেশের ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। যাতে করে অন্য অপরাধীরা শিক্ষা পায়।’

এক নজরে নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার তথ্য

মামলার বাদী নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। নুসরাতকে যৌন হয়রানি ২৭ মার্চ। অধ্যক্ষ সিরাজ গ্রেফতার ২৭ মার্চ। জেল থেকে হত্যার নির্দেশ দেয় সিরাজ-উদ-দৌলা। নুসরাতকে হত্যাচেষ্টা ৬ এপ্রিল। ছাদে কিলিং মিশনে অংশ নেয় ৫ জন। মামলা ৮ এপ্রিল। পিবিআইকে হস্তান্তর ১০ এপ্রিল। প্রথম গ্রেফতার ১২ এপ্রিল। নুসরাত মারা যায় ১০ এপ্রিল রাতে। দাফন ১১ এপ্রিল। সোনাগাজী থানার ওসি প্রত্যাহার ১০ এপ্রিল। নুসরাত হত্যার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলায় ওসি মোয়াজ্জেম ও দুই এসআই ইউসুফ এবং ইকবাল সাময়িক বহিষ্কার। বর্তমানে ওসি মোয়াজ্জেম জেলহাজতে। মোট গ্রেফতার ২১। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন ১২ জন। চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ১৬ জনকে। ২৮ মে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। ১০ জুন অভিযোগপত্র গ্রহণ করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুানাল। ২০ জুন চার্জ গঠন। ২৭ জুন থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ১১ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তিতর্ক শুরু। দায়িত্বে অবহেলায় এসপি প্রত্যাহার ১৩ মে।

কিলিং মিশনে যে পাঁচজন অংশ নেয়

শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের আহম্মদ, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি।

মামলায় অভিযুক্তরা হলেন

সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ-উদ-দৌলা (৫৭), নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা ওরফে পপি (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামলীগের সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহসভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীম (২০)।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন