রবিবার ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ৪ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

অনলাইনে থেমে নেই জুয়ার আসর!

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৯ | ১১:৫৫ অপরাহ্ণ

এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানীতে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালিয়ে গেলেও দেশের অনলাইনে জুয়া খেলার আসর থেমে নেই। সরকার দুই হাজারের বেশি বেটিং সাইট বন্ধ করলেও নিত্য তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ওয়েবসাইট। নতুন করে জুয়া খেলার বাংলা ওয়েবসাইটের খোঁজও পাওয়া গেছে। ওয়ানএক্সবেট নামের একটি সাইটে বাংলায় বাজি ধরার নিয়মও বাতলে দেওয়া হয়েছে। গুগলে ‘টপ টেন বেটিং সাইট ইন বাংলাদেশ’ লিখে সার্চ দিলে ‘জালাগাম.নেট/এজেড’ (www.zalagam.net/az) ঠিকানায় পাওয়া প্রায় সবগুলো সাইটই বাংলাদেশ থেকে কার্যকর পাওয়া গেছে। এছাড়া বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া বেশকিছু বেটিং সাইটও কার্যকর পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে এখনও এসব সাইটে জুয়ার আসর বসছে।

বিজ্ঞাপন

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা কোনো বেটিং সাইটের সন্ধান পেলেই তা বন্ধ করে দেই। আমার জানামতে দুই হাজারেরও বেশি বেটিং সাইট বন্ধ করে দিয়েছি। যেগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিচ্ছি। আরও সাইট পেলে সেগুলোও বন্ধ করে দেবো।’

আরও পড়ুন- ধীরে ধীরে বন্ধ হচ্ছে সব জুয়ার সব সাইট

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘এটি এতে বড় একটি প্ল্যাটফর্ম যে অনেক সময় অনেক সাইট চোখে পড়ে না। চোখে পড়লে, আপনারা রিপোর্ট করলে, সেই সাইটগুলো আমরা বন্ধ করে দেবো। অর্থাৎ যখন যে বেটিং সাইট পাওয়া যাবে, তাই বন্ধ করে দেওয়া হবে।’

বিজ্ঞাপন

ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবি’র সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘অনলাইনে এখন বেটিং সাইট খুবই কম। যেগুলো আছে, সেগুলো চোখে পড়ে না। বেশিরভাগ সাইটই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তারপরও অনেকেই ভিপিএন দিয়ে হয়তো খেলে। আবার কিছু কিছু নতুন সাইটও তৈরি হয়। সেগুলো বিটিআরসির নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বন্ধ করে দিতে বলা হয়। আমরাও সেগুলো বন্ধ করে দিই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিআরসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) জাকির হোসেন খান সারবাংলাকে বলেন, ‘বেটিং সাইট বন্ধ করতে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। কোনো মাধ্যমে যদি আমরা জানতে পারি কোনো সাইট চালু রয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে তা বন্ধ করে দেওয়া হবে।’

এদিকে, চলতি বছর প্রায় দুই হাজার বেটিং সাইট বন্ধ করা হয়েছে বলে সরকারের দাবি। ভারত থেকে পরিচালিত জুয়া খেলার জনপ্রিয় ওয়েবসাইট তীরকাউন্টার ডটকমের ডেস্কটপ ভার্সন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বন্ধ করে দেয় সরকার। তবে এরই মধ্যে তীর ডটকম নামের নতুন একটি সাইট চালু হয়েছে, যেখানে এখনো জুয়ার আসর বসছে।  আর গুগলে তীর কাউন্টার লিখে সার্চ দিলে প্রথমে এই সাইটটিই আসছে। এছাড়া তীরকাউন্টার ডটকমের বেশকিছু ফেসবুক পেজও চালু রয়েছে। তবে, আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় বেট৩৬৫ ডটকমের বেশকিছু সাইট বন্ধ করে দেওয়ার পর তা নতুন করে আর চালু হয়নি। এর বাইরেও চালু রয়েছে বেটএশিয়া৩৬৫ ডটকম, বেট৩৬৫-এর মোবাইল ভার্সন, বেটউইন৩৬৫ ডটএক্সওয়াইজেডসহ আরও বেশকিছু সাইট।

সম্প্রতি গুগল সার্চ করে দেখা গেছে, বেটসসন, মাইবেটিংসসাইট ডটইউকে, বেটইন৭৭ ডটকম, ওয়ানএক্সবেট (বাংলায় পুরো দিক নির্দেশনা দেওয়া আছে), বেটসেইফ, পিনাকেল, বেটউইন৬৯, বেট২৪জেডএন, বেটইন৭৭ সহ আরও বহু সাইট এখনো কার্যকর রয়েছে। আবার বন্ধ পাওয়া গেছে বেশকিছু সাইটও। ক্রিকেট বেটিং সাইট, বেস্ট অনলাইন গ্যাম্বলিং সাইট, নেটবেট, এসবিওবেট লিংক, ১৮৮বেটসহ আরও বেশকিছু সাইট বন্ধ পাওয়া যায়। গুগল সার্চে বন্ধ থাকার চেয়ে চালু থাকা সাইটের সংখ্যাই বেশি পাওয়া গেছে।

সোমবার সন্ধ্যায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সঙ্গে সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের কথা হওয়ার পর নিজের ফেসবুকে তিনি একটি স্ট্যাটস দিয়েছন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘এখনো নাকি জুয়ার সাইট রয়েছে। যদি কেউ তেমন সাইটের সন্ধান পান, জানান। তালা মারার কাজটা আমরা করব।’

মন্ত্রীর ওই স্ট্যাটাসে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন বেটিং সাইটের লিংক দিতেও দেখা গেছে। প্রক্সি ও ভিপিএন বন্ধ করা যায় কি না, সে বিষয়েও জানতে চেয়েছেন অনেকেই।

এর আগে, চলতি বছরের প্রথম দিকে ডাক  ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে অনলাইনে জুয়া খেলার বিষয়টি সবার নজরে আনেন এবং জানান, ধীরে ধীরে এসব সাইট বন্ধ হবে। ১৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রী তার ফেসবুকের এক স্ট্যাটাসে দুই হাজার ২৩৫টি জুয়ার সাইটের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার তথ্য জানান। পরে ধীরে ধীরে এসব সাইট বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানায় সরকার।

বেটিং সাইট কী

অনলাইনের যেসব ওয়েবসাইটে খেলা বা অন্য কিছুর নামে বাজি ধরা (জুয়া খেলা) হয়, সেগুলোই বেটিং সাইট নামে পরিচিত। সাইটগুলো মূলত খেলা বিষয়ক। এসব সাইটে খেলা সম্পর্কে প্রতি মুহূর্তেই আপডেট পাওয়া যায়। থাকে লাইভ স্ট্রিমিংয়ের ব্যবস্থাও। আর ম্যাচ চলাকালীন খেলায় কোন দল জিতবে, কত রানে দল জিতবে, কোন প্লেয়ার কত রান করবে, কে টস জিতবে, ফুটবলে কে গোল দেবে কিংবা কোন দল জিতবে— এমন বিষয়ে নানা ধরনের বেটিং পুল নির্ধারণ হয়। আর ওইসব সাইট ব্রাউজ করা খেলাপ্রিয় জুয়ারিরা মেতে ওঠে বাজি ধরায়। এছাড়াও বেটিং সাইটগুলোতে ক্যাসিনো বা পোকারের মতো জুয়ার আসরেও বাজি ধরে থাকেন জুয়ারিরা।

অন্য একটি তথ্য থেকে জানা গেছে, অনলাইনে জুয়ার এমন কিছু সাইট রয়েছে, যেগুলোতে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে অনেকটা লটারির মতো ফল প্রকাশ করা হয়। দেশের কয়েকটি অঞ্চলে তীর কাউন্টার ডটকম নামক এমন একটি জুয়ার আসর জনপ্রিয়।

অনলাইন বেটিংয়ে জড়িত ছিলেন— এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে সারাবাংলাকে জানান, বাংলাদেশ থেকে বেট৩৬৫ নামক আন্তর্জাতিক সাইটটিতে সবচেয়ে বেশি বেটিং করা হয়। সাইটটিতে আইডি খুলতে এনআইডি, পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স লাগে। তবে সবসময় এনআইডি দিয়ে আইডি খোলা যায় না। সেসব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের তথ্য ব্যবহার করতে হয়।

তিনি আরও জানান, বেটিংয়ে অর্থের ক্ষেত্রে দু’টি মুদ্রা ব্যবহৃত হয়— ইউএসডি (মার্কিন ডলার) ও ইউরো। অ্যাকাউন্ট ভেরিফায়েড হওয়ার পর এবং নিজের অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা করার পর বাজি ধরা যায়। যেকোনো খেলার লাইভ স্ট্রিমিং চলাকালে বাজি ধরা যায়। ক্রিকেটের ক্ষেত্রে ম্যাচ, বল, ওভার, ম্যানভিত্তিক বিট করা যায়। কোন দল জিতবে, কে কত রান করবে, কোন ওভারে কত রান হবে— বাজিগুলো সাধারণ এমন হয়ে থাকে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্যাসিনো বা পোকারের লাইভ স্ট্রিমিংয়ের সময়েও বাজি ধরা যায়।

জানা গেছে, দেশে পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে বেটিং সাইটের প্রসার ঘটতে শুরু করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ সমাজের কাছে এ সাইটগুলো বহুল প্রচলিত হয়ে উঠতে থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি এখনো তেমনভাবে মহামারীর আকার ধারণ করেনি। তার আগেই মূলোৎপাটন করা হয়েছে। তবে ভিপিএনের যুগে সাইট বন্ধ করে কতটা সুফল পাওয়া যাবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে আইটি বিশেষজ্ঞদের।

সারাবাংলা/ইএইচটি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন