রবিবার ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ৪ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

কী এই বিপ টেস্ট, কেন এত আতঙ্কে ক্রিকেটাররা?

অক্টোবর ২, ২০১৯ | ৭:২৮ অপরাহ্ণ

নিউজরুম এডিটর, সাহাবার সাগর

ক্রিকেট পাড়ায় নতুন আতঙ্কের নাম বিপ টেস্ট। অর্থাৎ ক্রিকেটারদের ফিটনেস টেস্ট। ভারত সফরকে সামনে রেখে জাতীয় ক্রিকেট লিগে খেলা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটারসহ বাকি ক্রিকেটারদেরও। আর এই এনসিএলে সুযোগ পেতে হলে পাশ করতে হবে বিপ টেস্টে। ইতোমধ্যে প্রথম ধাপের টেস্ট সম্পন্ন হয়েছে এবং ৯৬ শতাংশ ক্রিকেটার পাশ করেছেন এই ফিটনেস টেস্টে। তবে যারা এই পরীক্ষায় ফেল করেছেন তাদের মধ্যে আছেন মোহাম্মদ আশরাফুল, আব্দুর রাজ্জাক এবং নাসির হোসেনের মতো ক্রিকেটাররাও। আর কোনো রকমে পাশ করে গেছেন এমনও আছেন বেশ কিছু ক্রিকেটার।

বিজ্ঞাপন

তবে কেন এই বিপ টেস্ট নিয়ে এত বেশি ভয়ে ক্রিকেটাররা? কি এই বিপ টেস্ট?

বিপ টেস্ট হচ্ছে খেলোয়াড়দের ফিটনেস পরীক্ষা করার একটি কৌশল। ব্যাট-প্যাডসহ একজন ক্রিকেটার আসলে কতটুকু দম ধরে রাখতে পারে সেই ক্ষমতা নির্ণয়ের জন্যই ক্রিকেটারদের বিপ টেস্ট নেওয়া হয়। আর বিপ টেস্ট হচ্ছে ২০ মিটার শ্যাটল রানিং। ২০ মিটার দূরত্বে দুইটি পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়। এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ক্রিকেটারদের দৌড়ে যেতে হবে ‘বিপ সাউন্ড’ বেজে ওঠার আগেই। আর ক্রিকেটাররা ততক্ষণ পর্যন্ত দৌড়াবে যতক্ষণ পর্যন্ত না আর দৌড়ানোর শক্তি থাকে। আর এই টেস্টের মাধ্যমেই নির্ণয় করা হয় ক্রিকেটারদের শরীরে কতটুকু অক্সিজেন সঞ্চালন হচ্ছে, যা খেলোয়াড়দের শরীরে শক্তির সঞ্চার করে।

বিজ্ঞাপন

এনসিএল শুরুর আগে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি ক্রিকেটারদের বিপ টেস্টের আয়োজন করে। আর এ বছর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য বিপ টেস্টের পাশ মার্ক ধরা হয়েছিল ১১, অবশ্য যা গত বছরের তুলনায় ২ বেশি। গেল বছর ক্রিকেটারদের বিপ টেস্টে পাশের সর্বনিম্ন মার্ক ছিল ৯। তবে বিসিবি যে ক্রিকেটারদের ফিটনেস নিয়ে বেশ উঠে পড়েই লেগেছে তা বোঝা যায় তাদের কঠোরতায়।

গত কয়েকদিন নির্বাচক, প্রধান নির্বাহীর কথাতেই খেলোয়াড়দের ফিটনেস বিষয়ে তারা যে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। বিপ টেস্ট পরিচালনাকারী ট্রেইনারও জানিয়েছেন সে বিষয়েই। হাই পারফরম্যান্স দলের ট্রেইনার তুষার কান্তি হাওলাদার এ প্রসঙ্গে বলছেন, ‘আমরা সন্তুষ্ট, বেশিরভাগই আমাদের প্রত্যাশার চাইতে ভালো করেছে। কয়েকজন হয়তো খারাপ করেছে, এটা স্বাভাবিক কারণ জন্মগতভাবেই সবার দৌড়ের ধরন এক হয়না।‘

তবে যারা ফেল করেছেন তাদের সামনে দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না, থাকছে যেকোনো সময় পরীক্ষা দিয়ে পাশ করার সুযোগ, ‘যারা ১১ পায়নি তাদের এটা পার করেই খেলতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত পাশ করবেনা ততক্ষণ পর্যন্ত খেলতে পারবে না। তাদের সুযোগ দিতে কয়েকদিন গ্যাপ দিয়ে দিয়ে আমরা আবার টেস্ট নিবো, কেউ ব্যক্তিগতভাবে এসে দিতে চাইলেও আমরা নিবো।‘

শারীরিকভাবে যদি ফিট থাকা যায় তাহলে অবশ্যই ভালো পারফরম্যান্স করা যায়। এমন কথাটি বলেছেন খোদ জাতীয় দলের ক্রিকেটার আবু হায়দার রনি। এনসিএল খেলার জন্য দেওয়া বিপ টেস্টে কোনো রকমে উৎরে গেছেন এই পেসার। টেস্টের ফলাফলে দেখা গেছে রনি পেয়েছেন ১১.১ আর পাশের সর্বোনিম্ন মার্ক ছিল ১১। অর্থাৎ বলা চলে এক প্রকার কানের পাশে দিয়েই গুলিটা চলে গেছে রনির। ফিটনেস কেবল খেলার জন্যই প্রস্তুত করে না। মাঠের খেলার সাথে সাথে আত্মবিশ্বাস বাড়াতেও সাহায্য করে। আর এই ব্যাপারে রনি বলেন, ‘ফিটনেস ভাল থাকলে ক্যারিয়ারে অবশ্যই আত্মবিশ্বাস দেবে। কারণ আপনার ফিটনেস যদি ভালো থাকে ক্যারিয়ার ভালো হবেই। ফিটনেস ভালো থাকলে খারাপ সময়েই ভালো করার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। ফিটনেস খারাপ থাকলে কী হয়…যখন একটু ডিপ্রেশন আসবে তখন ফিটনেসের কারণে হয়ত সার্ভাইভ করতে পারবেন না। আর তাই তো ভালো খেলার জন্য ফিটনেস অবশ্যই ভাল হতে হবে।‘

ক্রিকেটারদের ফিটনেস নিয়ে কথা উঠলে সবার প্রথমে নজরে আসে ভারতীয় ক্রিকেটারদের ফিটনেস। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঘরের মাঠে সিরিজ খেলছে ভারতীয় জাতীয় দল। তবে এই দলে ডাক পাওয়ার আগে প্রত্যেক ক্রিকেটারকেই দিতে হয়েছে ইয়ো-ইয়ো টেস্ট। এই ইয়ো-ইয়ো টেস্ট অবশ্য বিপ টেস্টেরই একটি অংশ। একই ধরনের ফলাফল আসে এই টেস্ট থেকেও।

গেল বছর ভারতীয় ক্রিকেটারদের এই পরীক্ষায় সর্বনিম্ন পাশ মার্ক ছিল ১৬.১। অর্থাৎ গেল বছর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের তুলনায় যা ৭.১ বেশি। আর এবছর বাংলাদেশের সর্বোনিম পাশ মার্কের থেকে যা ৫.১ বেশি। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, এটা তো গেল বছর ভারতীয় জাতীয় দলের ফিটনেস পরীক্ষার সর্বনিম্ন পাশ মার্ক। এবছর ১৬.১ ছিল না ভারতীয় ক্রিকেটারদের পাশ মার্ক। ভারতীয় দলের কোচ রবি শাস্ত্রী এই পাশ মার্ক বাড়িয়ে করেছেন ১৭। ফিটনেস টেস্টের পাশ মার্ক বাড়লেও ভারতীয় ক্রিকেটাররা ঠিকই পাশ করে গেছেন।

ফিটনেস কীভাবে একজন ক্রিকেটারকে ভালো পারফরম্যান্স করতে সাহায্য করে? এর উত্তরও মিলবে ভারতীয় ক্রিকেটারদের খেলা দেখলে। ওয়ানডে ম্যাচ কিংবা টি-টোয়েন্টি কিংবা রাজকীয় টেস্ট তিন ফরম্যাটেই ভারতীয় ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স ঈর্ষণীয়। তবে পারফরম্যান্স যেমনই হোক না কেন পুরো ম্যাচ জুড়ে সব থেকে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হচ্ছে ম্যাচের মধ্যে ভারতীয় ক্রিকেটারদের কখনোই ক্লান্ত দেখায় না। একটানা ৩০ ওভার ব্যাটিং করার পরেও দেখে মনে হবে এই তো সবে মাত্র উইকেটে আসলেন। ইনিংসের প্রথম বল থেকে ইনিংসের শেষ বল পর্যন্তও তাদের শারীরিক শক্তির এতটুকুও হেরফের হতে দেখা যায় না।

এখানেই যদি বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের তুলনা করা হয় দেখা মিলবে বিস্তর ফারাকের। একই জায়গায় শট খেলে যেখানে ভারতীয় ক্রিকেটারদের দৌড়ে দুই রান নিতে দেখা যায় সেখানে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের দেখা যায় এক রানেই সন্তুষ্ট থাকতে। আবার ফিল্ডিংয়ের সময় দেখা মেলে ভারতীয় ক্রিকেটারদের দুর্দান্ত ফিল্ডিং, সে তুলনায় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ফিল্ডিংটা একটু বেশিই সাদামাটা মনে হতেই পারে।

ফিটনেস সম্পর্কে ভারতীয় অধিনায়ক এবং তর্কসাপেক্ষে বর্তমান ক্রিকেটের সেরা ব্যাটসম্যান বিরাট কোহলি বলেন, ‘ফিটনেসের জন্য আমি আসলে সব সময় ফুটবলারদের দিকে তাকিয়ে থাকি। ওরা কীভাবে ট্রেনিং করে, কি খায় এবং কীভাবে সব কিছু আয়ত্তে আনে। আসলে সবার উচিৎ ফিটনেসের জন্য ফুটবলারদের দিকেই তাকানো।’

বিরাট কোহলির কথা ধরে যদি বাংলাদশের ফুটবলারদের দিকে তাকানো হয় দেখা মিলবে ক্রিকেটারদের থেকে ১৮০ ডিগ্রি ভিন্ন চিত্র। ফুটবলাররাই যেন এখন বাংলাদেশের ফিটনেসের আইকন। মাস খানেক আগে বিকেএসপিতে ফিটনেস ও মানসিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন জামাল-রবিউল-বিপলুরা। তাদেরকে ‘এ প্লাস’ মার্ক দিয়েছেন খোদ বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের কোচ জেমি ডেই। বর্তমানে জিপিএস প্রযুক্তি সেই পরিমাপ করার সুযোগটা করে দিচ্ছে। জিপিএসের মাধ্যমে ফুটবলারদের গতিসহ ফিটনেস ও স্ট্যামিনার বিভিন্ন দিক বিবেচনায় রেখে কোচ এ তথ্য দিয়েছিলেন সারাবাংলাডটনেটের কাছে।

আরও পড়ুন: ‘ভাত ছেড়ে’ ইংলিশ খাবার খাচ্ছেন বাংলাদেশের ফুটবলাররা!

বেশিদূর যেতে হবে না। এক বছর আগে যখন ভুটান বিপর্যয়ের পর লাওস ম্যাচ দিয়ে নির্বাসন থেকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিরেছে দেশের ফুটবল। সেই দলের ফিটনেস কোচ বা ট্রেইনার ছিলেন মারিও লেমস (এখন ঢাকা আবাহনীর কোচ)। তার হাত ধরেই খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও স্ট্যামিনা বদলে যায়। পরে লাওস ম্যাচেও তার প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। যেখানে তথাকথিত বলা হতো ‘দ্বিতীয়ার্ধে গিয়ে ঝিমিয়ে পড়ে দেশের ফুটবলাররা’ সেখানে দেশের বেশিরভাগ জয় এখন ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের গোলেই।

পরে লাওস, কম্বোডিয়া বা এশিয়ান গেমসে কাতার। সব ম্যাচেই দ্বিতীয়ার্ধের গোলে জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে বাংলাদেশ। এবং ফুটবলারদের শরীরী ভাষা, ফিটনেস ও স্ট্যামিনা ছিল চোখে পড়ার মতো।

পড়ুন: মেসি-রোনালদোদের ফিটনেস নিয়ে বিশ্বকাপ মিশনে জামাল ভূঁইয়ারা!

আর এখানেই অনুপ্রেরণা নিতে পারে বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা। নিজ দেশের ফুটবলাররা যেখানে ফিটনেসে উন্নতি করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, সেখানে ক্রিকেটারদের সামনেও থাকছে নিজেদের ফিটনেসকে বিশ্বমানের করে পারফরম্যান্সেও বিশ্বমানের ছোঁয়া আনতে।

তবে ক্রিকেটারদের ফিটনেসের ব্যাপারে যেমন বিসিবির গুরুত্ব দিতে হবে তার থেকেও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে ক্রিকেটারদের নিজেদেরই। ঠিক যেমনটা উদাহরণ হিসেবে আনা যায় বিরাট কোহলিকে। নিজের ফিটনেস লেভেলটা এত উঁচুতে নিয়ে গেছেন যে বনে গেছেন একটি বেঞ্চমার্ক। বিসিবি যতই ক্রিকেটারদের চাপ প্রয়োগ করুক না কেন নিজেদের মানসিক শক্তি সঞ্চয় করতে না পারলে ফিটনেস কখনোই বিশ্বমানের হবে না। আর তাই তো আবু হায়দার রনি বলেছেন ফিটনেস ভালো হলে ভালো পারফরম্যান্সও করা যায়।

সারাবাংলা/এসএস/জেএইচ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন