বৃহস্পতিবার ৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ৭ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

পেঁয়াজ কাব্য

অক্টোবর ৪, ২০১৯ | ১:৫৭ অপরাহ্ণ

জিমি আমির

চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের খবর নিয়ে গণমাধ্যম যখন ব্যস্ত, তখন হঠাৎ করেই ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হিসেবে জায়গা করে নিল পেঁয়াজ। ঈদুল আজহার পর থেকেই ধীরে ধীরে বাড়ছিল পেঁয়াজের দাম, ভারতের পক্ষ থেকে পেঁয়াজ রফতানির খবরে রাতারাতি সেই দাম যেন আকাশছোঁয়া। চিরায়ত ‘অভ্যাসমতো’ আমদানিকারকরা পাইকারদের ফোন দিয়ে দ্রুত দাম বাড়াতে বললেন, মজুতদাররাও তাদের পেঁয়াজ শক্ত করে সিন্দুকে এঁটে দিলেন। ফল— ৬০ টাকার পেঁয়াজ কয়েক দিনের ব্যবধানে ১২০ টাকায় উঠে গেল লাফিয়ে লাফিয়ে। পেঁয়াজের ঝাঁজে যেন সারাদেশে নাকানিচুবানি অবস্থা।

বিজ্ঞাপন

ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বাড়ার খবর পাওয়া গেছে আগস্টে ঈদুল আজহার পর থেকেই। বন্যায় পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ায় তখন থেকেই ভারতসহ এ দেশের স্থলবন্দরেও পেঁয়াজের দাম বাড়ছিল। এভাবে চলতে থাকে সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত। এই পরিস্থিতিতে সরকার ঘোষণা দেয়, ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে টিসিবির (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) মাধ্যমে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করবে। কিন্তু টিসিবির যথেষ্ট প্রস্তুতি না থাকায় ঘোষণা দু’দিন পর ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচটি স্থানে ৪৫ টাকা কেজি দরে খোলা ট্রাকে করে পেঁয়াজ বিক্রির কার্যক্রম শুরু হয়।

অন্যদিকে, খোলা বাজারেও চড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। প্রতিদিনেই ৫ টাকা করে বাড়তে বাড়তে সপ্তাহের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের দাম হয়ে যায় প্রতি কেজি ৮৫ থেকে ৯০ টাকা, ভারতীয় পেঁয়াজের দামও তখন ৮০’র ঘরে। এরপর ২১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কোনো কোনো বাজারে পেঁয়াজের কেজি ছুঁয়ে যায় শতকের ঘর। ২৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীনের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে পেঁয়াজ আমদানিকারক এবং পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে জানানো হয়, মিয়ানমার, তুরস্ক ও মিশর থেকে পেঁয়াজ আমদানি করছে সরকার।

২৯ সেপ্টেম্বর নিজের দেশের চাহিদা মেটাতে ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়। এই খবরে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পায় আমদানিকারক ও মজুতদাররা। ফোন করে পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাম বাড়াতে বলে দেন তারা। আর মজুতদাররা সুযোগ বুঝে পেঁয়াজের বস্তা লুকিয়ে ফেলেন ‘গোপন কুঠুরি’তে। আর সে কারণেই একদিনের ব্যবধানেই পেঁয়াজের দাম বেড়ে হয়ে যায় প্রতি কেজি ১২০ টাকা পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন

গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা গেল, ভারত ছাড়া মিয়ানমার, চীন, তুরস্ক থেকে আমদানি করা হলেও মানুষ মূলত খায় ভারতের পেঁয়াজ। কারণ হিসেবে জানা যায়, আকারে বড় হওয়ায় শুধু হোটেলেই চলে মিশরের পেঁয়াজ। মিয়ানমারের পেঁয়াজ চট্টগ্রাম ছাড়া দেশের অন্য কোথাও তেমন চাহিদা নেই। তাই ভারত ছাড়া অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করলে তা বিক্রি হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ ব্যবসায়ীদের। আবার বিক্রি না হলেও অস্থিরতা চলার আশঙ্কা থেকেই যায়।

এর মধ্যে ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে রাজধানীর ৩৫টি স্থানে খোলা ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু হয়। একইসঙ্গে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয় অভিযান ও তদারকি। মিশর, মিয়ানমারের পেঁয়াজ দেশের বাজারে ঢুকতে শুরু করে। সরকারি এসব পদক্ষেপে ২ অক্টোবরেই হিলি স্থলবন্দরে পাইকারি বাজারে কেজিতে দাম কমে ৩৫ টাকা পর্যন্ত। একইদিন সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পেঁয়াজ আমদানির সুদের হার ৯ শতাংশ বেধে দেওয়া হয়।

বুধবার (৩ অক্টোবর) বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ ৮০ থেকে ৯০ আর দেশি বা উন্নতমানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে প্রায় ৩ সপ্তাহের হুলুস্থুল পরিবেশে যেন হালকা বাতাসের দোল খায়।

একদিকের চিত্র যখন এমন, তখন সাধারণ মানুষও বলিহারি। বাজারে কোনো পণ্যের সরবরাহ কম হলে সাধারণ মানুষের তখন যেন সেই পণ্য ছাড়া চলেই না। যেন পেঁয়াজের সরবরাহ কম বা দাম বেশি, তো রান্নাঘরে চুলা জ্বালানোই বন্ধ। বাজারে একসঙ্গে সবাই হামলে পড়েন। বরাবরের মতো ঠিক এই অবস্থারই সুযোগ নেন ব্যবসায়ীরা। যার জলজ্যান্ত উদাহরণ দেখা যায় ২ অক্টোবর চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় রড-সিমেন্টের গুদামে অভিযানে। ভ্রাম্যমাণ আদালত সেখান থেকে পাঁচ মেট্রিক টন ভারতীয় পেঁয়াজ জব্দ করেন।

তবে এবার কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে চিরায়ত এই চিত্রের। ফেসবুকে অনেকেই স্ট্যাটাস দিয়ে জানিয়েছেন, তারা পেঁয়াজ কিনবেন না। কেউ কেউ তো পেঁয়াজ ছাড়া কিভাবে রান্না করা যায়, তার বিভিন্ন ধরনের রেসিপিও শেয়ার করছেন। আর এর বাইরে পেঁয়াজ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ট্রল তো রয়েছেই। আলাদাভাবেও অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা পেঁয়াজ কিনছেন না।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বছরে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা গড়ে প্রায় ২৪ লাখ মেট্রিক টন। গত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ২৩ দশমিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন। পচনশীল ও সঠিক মজুত পদ্ধতির অভাবে এর ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে বছরে ঘাটতি থাকে ৮ থেকে ৯ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজের। এর সিংহভাগ আসে ভারত থেকে।

তো এবারের পেঁয়াজের মজুতের চিত্রটা কেমন? ২ অক্টোবর সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও তা এড়িয়ে যান তিনি। তবে মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে পেঁয়াজের কোনো সংকট নেই। সারাদেশের হাট-বাজারগুলোতে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ পর্যাপ্ত। আর বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে মজুত পেঁয়াজের পরিমাণ ৪ লাখ টনের মতো। যা দিয়ে ৫০ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব।

এদিকে, নভেম্বরেই বাজারে উঠতে শুরু করবে দেশি পেঁয়াজ। মাঝখানের এক থেকে দেড়মাস সময়ে মজুত পেঁয়াজ ছেড়ে দিলেই বাজারে কোনো সংকট থাকে না। তাছাড়া ভারত ছাড়া অন্য দেশের পেঁয়াজও থাকছে বাজারে। ফলে ব্যবসায়ীরাও মানুষকে জিম্মি করে বাজারে অস্থিরতা তৈরির সুযোগ কম পায়।

সরকার চাইলে সব সম্ভব। গত কয়েকদিন ধরে সরকারি নানা পদক্ষেপে পেঁয়াজের দামে লাগাম টানা গেছে। আশা করা যাচ্ছে, অল্প সময়ের মধ্যেই দাম আরও কমে আসবে। তবে সাংবাদিক হিসেবে অনেকের মতো আমারও মনে হয়েছে, ব্যবসায়ীরা যতই কারসাজি বা সিন্ডিকেট করুক না কেন, তা ভাঙতে পারেন কেবল সাধারণ মানুষই। বাজারে কোনো পণ্যের সরবরাহ কমে গেলে তাতে অস্থির না হয়ে ধৈর্য ধরা উচিত। তাছাড়া পাতে কোনো একটি জিনিস না থাকলে তাতে তো আকাশ ভেঙে পড়ে না। মানুষ অভ্যাসের দাস। পেঁয়াজ কম দিয়েও তরকারি খাওয়া যায় বা না দিয়েও অনেক খাবার তৈরি সম্ভব।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে রান্নায় পেঁয়াজ কম হবে বলে মানুষ যদি অস্থির হয়ে পড়ে, তাহলে ধরে নেওয়াই যায়— এ দেশের মানুষ সময়ের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে এখনো শেখেনি। মানুষ সচেতন নয় বলেই ব্যবসায়ীরা সবসময় সুযোগ খুঁজে তার সদ্ব্যবহার করে। সাধারণ মানুষ আর কতদিন ব্যবসায়ীদের এমন ‘সুযোগ’ করে দেবে, সেটিই প্রশ্ন।

লেখক: জয়েন্ট নিউজ এডিটর, সারাবাংলা ডট নেট

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/জেএএম/টিআর

Advertisement
বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন