মঙ্গলবার ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১২ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ভাগীরথী তীরে আমার পুজো

অক্টোবর ৪, ২০১৯ | ৫:০৭ অপরাহ্ণ

পুজোর কথা বললেই মনে পড়ে গ্রামের বাড়ির পুজো। আমাদের গ্রামের নাম নশীপুর। একসময় মুর্শিদাবাদের এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম। কথিত আছে এখানে এসেই মুর্শিদকুলি খাঁর নসীব ফিরে গেছিল। সেই থেকে নসীবপুর, ক্রমে সেটা লোকমুখে নশীপুর হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

এই নশীপুরেই আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরেই নবাব বাড়ি, জগৎশেঠের বাড়ি, আর দেবী সিংহের রাজবাড়ি। ভাগীরথী তীরের এক ছোট্ট সুন্দর জনপদ ছিল এই নশীপুর। এখানেই আমাদের ভদ্রাসন।

পুজোর অনেক আগে থেকেই নাটমন্দিরে প্রতিমা তৈরীর কাজ শুরু হয়ে যেত। প্রতিবার একই কাঠামো, এই কাঠামোটি ভাগীরথীতে ভেসে এসেছিল। আমাদের এক পূর্বপুরুষ স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে এই কাঠামোটি ভাগীরথী থেকে তুলে আনেন, সেই থেকে ওই কাঠামোতেই পুজো হয়ে আসছে।

রথের দিন থেকে প্রতিমা তৈরী শুরু হত। তারপর ধাপে ধাপে মাটির প্রতিমায় রং লাগত, তারপর পঞ্চমীর দিন চক্ষুদান। ততদিনে আমাদের ঠাকুরঘরের নিচে পুরোদমে নাটকের রিহার্সাল শুরু হয়ে গেছে। বেশীরভাগই হত ঐতিহাসিক নাটক।
নাটমন্দিরের সামনে অনেকটা প্রশস্ত জায়গা পেরিয়ে সিমেন্টের বাঁধানো মঞ্চ। পুজোর চারদিনই সন্ধেবেলা ওখানে নাটক অভিনীত হত, গানের আসর বসত। আমি তখন ছোট। মাঝেমাঝেই নাটকের সময় স্টেজে গিয়ে বসতাম, প্রম্পটারকে বিরক্ত করতাম।
সপ্তমী থেকে প্রতি সন্ধ‍্যায় হত ধুনুচি নাচ, বুলবুলদার আশ্চর্য ধুনুচি নাচ এখনও চোখে ভাসে। ঢাকের তালে তালে দুই হাতে দুটো, আর মাথায় একটা ধুনুচি নিয়ে বুলবুলদার সেই নাচ ধীর লয়ে শুরু হয়ে ক্রমশঃ উদ্দাম হয়ে উঠত, কিন্তু কোনদিনও একটা ধুনুচিও পড়ে যেতে দেখিনি।

বিজ্ঞাপন

চারদিনই বালক ভোজন আর দরিদ্র নারায়ণ সেবা হত। নাটমন্দিরের পাশেই একটা ছোট্ট মাঠ, ওখানে সারিবদ্ধভাবে বালক ভোজন শেষ হলে দরিদ্রনারায়ণ সেবার ব‍্যবস্হা। ওই খিচুড়ি মাঝেমাঝে আমরাও খেতাম। যদিও আমাদের আলাদা ভোগ আসত। তবুও এখন মনে হয়, সবই প্রসাদ।

পুজোর দিনগুলো নতুন জামা পরে সারাদিন নাটমন্দিরে পড়ে থাকতাম। মাঝেমাঝে মা জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে চান করিয়ে খাইয়ে দিত। দুপুরে বকাঝকা করে ঘুমাতে পাঠাত।

মা দুর্গার মুখের দিকে তাকালে আর চোখ ফেরাতে পারতাম না। ওই অপরূপ মাতৃমূর্তি এখনও নয়নাভিরাম হয়ে চোখে ভেসে ওঠে। এখনও প্রতিমার দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে।

মাঝেমাঝে চারণ কবির দল আগমনী বিজয়ার গান গাইতে গাইতে গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াত। সেই সুর এখনও শ্রবণে সদাজাগ্রত হয়ে আছে, "যাও যাও গিরী আনিতে গৌরি, উমা আমার বড় কেঁদেছে।"
বাঙালীই জগন্মাতাকে কন‍্যারূপে বরণ করে নিয়েছে। সেই অঘটনঘটন পটিয়সী মহাশক্তি, হিমালয়রাজনন্দিনী পার্বতী বছরে চার দিনের জন‍্য পিতৃগৃহে আসেন। বাঙালীর সে ঘরের মেয়ে উমা।

পুজোর মধ‍্যে বাড়িতে দূর দূর থেকে আত্মীয় অনাত্মীয়র ভীড়ে ভরে যেত। সারাদিন হইচই করে কেটে যেত। সকাল থেকেই বারবার ঢাকের আওয়াজে ছুটে যেতাম। বছরের অন‍্যান‍্য দিন আমি দেরী করে ঘুম থেকে উঠলেও, পুজোর দিনগুলোয় সকাল সকাল উঠে পড়তাম। ভাগীরথীর ধারে গেলে চোখে পড়ত কাশফুলে ছেয়ে আছে। ভোরের উঠোনে ঝরে পড়েছে শিউলী ফুল।

দাদু মাঝেমাঝে ওই নাটক দেখতে আসত, ধবধবে ইস্ত্রি করা সাদা ধুতি আর পাঞ্জাবী, টানটান বলিষ্ঠ চেহারার দীর্ঘদেহী বৃদ্ধ। দাদুকে দেখলেই সসম্ভ্রমে চেয়ার এগিয়ে দেওয়া হত। আমি খেলতে খেলতে মাঝেমাঝে দাদুর কোলে উঠে বসতাম। নাম ছিল রামনাথ রায় চৌধুরী।

দেখতে দেখতে বিসর্জনের দিন এগিয়ে আসত। দশমীর সকালে আমাদের বাড়িতে খুব সুন্দর একটা প্রথা ছিল। সকাল থেকেই আমি আর কোন এক দাদাকে একটা মুড়ি আর জিলিপি দিয়ে বসিয়ে দেওয়া হত। ওইদিন যাঁরা ভিক্ষা করতে আসতেন, তাঁদেরকে ওই মুড়ি আর জিলিপি দেওয়া হত।

একবার বিসর্জনের দিন হাতি বেরোল, হাতি প্রতিমা টেনে নিয়ে যাবে। কাঠের পাটাতনের নীচে চাকা লাগিয়ে তার ওপর প্রতিমা বসানো। হল, লোকে লোকারণ‍্য। আমরাও জ‍্যাঠার সঙ্গে বিসর্জনে যাব বলে রেডি, ঢাকের বাদ‍্যি বেজে উঠল, দুর্গা নামের জয়ধ্বনীর সাথে সাথে হাতির দড়িতে টান পড়ল। গ্রাম পরিক্রমা করে হাতি প্রতিমা নিয়ে ভাগীরথীর জলে নেমে পড়বে। চারিদিকে হ‍্যাজাক জ্বলছে। ভালো ভাবেই বিসর্জণের শোভাযাত্রা বেরোল, এমন সময় মাঝপথে মুষলধারে বৃষ্টি। শোভাযাত্রা ভন্ডুল, হাতি দড়ি ছিঁড়ে কোথায় গা ঢাকা দিল, মাহুতকেও খুঁজে পাওয়া গেল না। চারিদিক অন্ধকার। তার মধ‍্যে জ‍্যাঠার হাত ছেড়ে আমরা হারিয়ে গেলাম। পরে অবশ‍্য জ‍্যাঠাই এসে উদ্ধার করেছিল, নাম ছিল অপূর্ব রায় চৌধুরী। দারুণ সেতার বাজাত। আমি আর দাদা একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ভয় পাচ্ছিলাম। তখন আমার বয়স নয়, আর দাদার এগারো।

অবশেষে হাতিকেও খুঁজে পাওয়া গেল। হাতি ওই বৃষ্টিতে একটা কলাবাগানে ঢুকে কলাগাছ উপড়ে খাচ্ছিল। মাহুত বেচারা দৌড়ে এসে সবাইকে খবর দেয়।

এসব ঘটনা মনে পড়লে সেই বর্ণাঢ‍্য, বৈচিত্র‍্যময় পুজো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমাদের দুটো বাড়িতেই পুজো হয়, দেবগ্রাম পলাশীতে, আর মুর্শিদাবাদের নশীপুরে। দেবগ্রামের পুজো বা নশীপুরের পুজো, দুটো পুজোরই সেই জাঁকজমক আর নেই। এখন শুধু অতীত স্মৃতিচারণের পালা।

এখন শহরের এইসব পুজোয় থিমের ছড়াছড়ি দেখলে মনে হয়, ছোট্ট একটা ছিমছাম প‍্যান্ডেল হোক, মা দুর্গার সেই অপূর্ব মাতৃমুখ।বাহুল‍্যবর্জিত, স্নিগ্ধ। কিন্তু অধিকাংশ পুজোতেই প‍্যান্ডেল আর প্রতিমার বিচিত্র সাজে পুজোর সেই রূপটা আর ধরা পরে না।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/আরএফ/

KSRM Bangabandhu Tunnel
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন