বুধবার ১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ১ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

শিক্ষকরা কী জবাব দেবেন?

অক্টোবর ৫, ২০১৯ | ২:৫৬ অপরাহ্ণ

নাদিম হোসেন

পেশা হিসেবে কিছু কিছু কাজ চ্যালেঞ্জিং ও ঝুঁকিপূর্ণ। কিছু পেশা সাধারণ। আর কিছু পেশা একটু ব্যতিক্রমী। আর কিছু কিছু কিংবা বলা চলে কয়েকটি পেশা রয়েছে যার আগে মহান শব্দটি ব্যবহার করা চলে। শিক্ষকতা তেমনই একটি পেশা। তবে লেখার শুরুতেই এই পেশার গুণগান গাইতে চাচ্ছি না। কারণ বর্তমান প্রেক্ষাপট। দেশে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত কারো কারো আচার-আচরণ এতটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে যে, ঢালাওভাবে ওই মহান শব্দটির আর ব্যবহার চলে না। নাজুক বাস্তবতা হলো এই সমাজে শিক্ষকরা তাদের সিংহভাগ দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন। একইসঙ্গে দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে কালিমা লেপন করছেন তাদের পবিত্র পেশায়। সে ঘটনা ঘটছে একেবারে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন

কিছু নমুনা দেখুন নিচের শিরোনামগুলো থেকে-

* বেত ছুড়ে মারলেন শিক্ষক, চোখের আলো হারাচ্ছে শিশু হাবিবা! *তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের মামলায় শিক্ষক গ্রেফতার *সাত শিক্ষার্থীকে বলাৎকার-নির্যাতনের অভিযোগ, মাদ্রাসা বন্ধ *অরিত্রির আত্মহত্যা: পা ধরে কান্না করলেও মন গলেনি অধ্যক্ষের’ *জেল থেকেই নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেন অধ্যক্ষ সিরাজ *শাবিপ্রবিছাত্রের আত্মহত্যা, শিক্ষকদের দোষারোপ পরিবারের *ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের বাংলোতে অস্বাভাবিক দামি আসবাবপত্র’ *ভিসির (জাবি) ভাগবাঁটোয়ারা টেন্ডারবাজির প্রমাণ আছে! *পুলিশ পাহারায় ক্যাম্পাস ছাড়লেন গোপালগঞ্জের ভিসি....

এসব হলো গত একবছরে গণমাধ্যমে পাওয়া আমাদের ‘শিক্ষক’দের সংক্ষিপ্ত আমলনামা। কাজের অযোগ্যতা, অবহেলা এসব ছাড়িয়ে এখন পেশার নৈতিকতা প্রশ্নেই বড় নড়বড়ে হয়ে গেছে শিক্ষকদের মহত্বের খুঁটি। যদি বলি জ্ঞানের অন্বেষণ ও সমাজে আলো বিতরণ শিক্ষকের কাজ- সে নিয়ে আলোচনার সুযোগটাই এখন কম। আর সে তো আরও অনেক গভীরেরই বিষয়।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষকদের বলা হয়ে থাকে মানুষ গড়ার কারিগর। এর কারণ ১০টা-৪টা রুটিন মাফিক কাজের বাইরেও তারা কর্মক্ষেত্রে বিচরণ করেন। শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের ঘরের দরজা থাকে সব সময় খোলা। ধর্ম-বর্ণ বা শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে যেকোনো ঘর থেকে আসা ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে ক্লাসে বসে তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেয়। একজন শিক্ষক খেলেন কাদামাটির মন নিয়ে, খেলেন তার শিষ্যদের চিন্তা নিয়ে। তিনি চাইলেই কোনো শিক্ষার্থীর জীবনে এমন নাটকীয় পরিবর্তন এনে দিতে পারেন তা অন্যদের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। এবং এটাই তার কাজ।

এত বড় গুরুভার যাদের ওপর বর্তায় তাদের হওয়া উচিৎ এই সমাজে সবচেয়ে মেধাবী, সবচেয়ে সহনশীল, সবচেয়ে উজ্জ্বল। কিন্তু সে কথা কী আমরা আমাদের শিক্ষকদের নিয়ে এখন বলতে পারছি? পারছি না। তার কারণও অনেক।

আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে তাতে বেশিরভাগ শিক্ষকের পাতে একবেলা গুঁড়ো মাছও ভালো করে জুটে না। তাই অনেকে শিক্ষকতা করতে চান না। ফলে মেধাবীরা বাদ পড়ে যাচ্ছেন এই পেশা থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাদ দিলে অন্য প্রায় সকল ক্ষেত্রেই মেধার তালিকায় পিছিয়ে থাকারাই আজকাল শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিচেছন। কিংবা বলা চলে তাদের পক্ষেই এই পেশাটি বেছে নেওয়া সহজ হচ্ছে।

কিন্তু সেখানেও থাকছে না স্বাভাবিক শিক্ষাদান প্রক্রিয়া। যতটুকু জানেন, ততটুকুই যে শেখানো হবে তা নয়। বরং অনেক ধরনের অব্যবস্থাই আমরা দেখি শিক্ষকদের কাজে-কর্মে। ক্লাসে না পড়িয়ে ‘টিউশনি ব্যবসা’ খুলে অর্থ কামাচ্ছেন অনেকেই।

একটা সময় ছিলো, প্রত্যন্ত গ্রামে রাতে হারিকেন জ্বালিয়ে শিক্ষকরা বাড়ি বাড়ি যেতেন। ছাত্র-ছাত্রীর খোঁজ খবর নিতেন। এখন ইমেইল চালাচালি আর ভিডিও কনফারেন্সের যুগ। আয়মান সাদিকের মতো এক পা এগিয়ে থাকা তরুণদের শিক্ষাপদ্ধতির চাহিদা বাড়ছে। তাই ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা জটিল হয়ে যাচ্ছে ‘সনাতন’ পদ্ধতির শিক্ষকদের জন্য। নতুন যুগের চ্যালেঞ্জ নিতে তারা কতটা প্রস্তুত, তা কি বিশদ আলোচনার প্রয়োজন আছে?

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তরে পর্যাপ্ত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব দৃশ্যমান। মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকে চলছে লাগামহীন শিক্ষাবাণিজ্য। কারিগরি শিক্ষা গুছিয়ে উঠতে পারেনি এখনো। উচ্চশিক্ষায় চলছে সার্টিফিকেট বিতরণ, নয়ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের খামখেয়ালি আচরণ। আর শিক্ষকদের মূল কাজ গবেষণার প্রসঙ্গ তুললে তাতে মুখ রক্ষার  মতো অবস্থাও নেই।

এরমধ্যে আছে অপরিচ্ছন্ন ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম-ক্ষমতাসীনদের প্রভাব-প্রতিপত্তি। বলা যায়, গোটা শিক্ষাব্যবস্থা বাধা পড়ে আছে জবাবদিহিতা হীনতার দুষ্টচক্রে। শিক্ষকরাও এই সুযোগে দুর্নীতি করাটা শিখে নিয়েছেন। আমাদের মাদরাসাগুলোতে যৌন নিপীড়নের ঘটনা হরহামেশা ঘটলেও এর প্রতিকার নিয়ে কেউ ভাবছে না।

শিক্ষকরা আমাদের যা শেখান তার প্রয়োজন সারাজীবনের জন্য। সুতরাং তাদের কথার ব্যত্যয় করা ঠিক নয়। বিপরীতে শিক্ষকরা ভুল শিক্ষা বা মতাদর্শ বুনন করলে সে অভিশাপ ছড়ায় সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে; তাও আমাদের ভাবনায় থাকা জরুরি। একজন শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় শ্রেণিকক্ষ থেকে যেমন প্রতিভাবান রকেট সায়েন্টিস্ট ‍ওঠে আসতে পারে। তেমনি গড়ে উঠতে পারে একদল জঙ্গিও! সম্প্রতি সেসবের ইঙ্গিত কেনো, উদাহরণই আমরা দেখেছি। জঙ্গি হামলায় শিক্ষার্থীদের সাথে তাদের শিক্ষকদেরও দেখা যাচ্ছে।

পালাবদলের এমন জটিল সময়ে শিক্ষকদের হওয়া উচিত সবচেয়ে অগ্রণী ও প্রতিবাদী। কারণ সকল শিক্ষকতো এমন নন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারাও কেন যেন অন্যদের মতো ভীত-সন্ত্রস্তই থাকছেন।

ধরুন, নুসরাত জাহান রাফির হত্যার কথা! সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা যে একজন যৌন নিপীড়ক, সেটা তার সহকর্মীরা নিশ্চয়ই জানতেন। আদালতে এ বিষয়ে স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন। শিক্ষকরা দাবি করছেন, তারা প্রতিবাদ করেছেন। তবে তা সমাজের কানে পৌঁছায়নি। যার পরিণাম হলো একজন শিক্ষার্থীর জীবনহানি।

তাই প্রশ্ন, সমাজকে পড়িয়ে-শিখিয়ে শাসন করার মতো যোগ্যতা কবে হবে আমাদের শিক্ষকদের? তারা কী জবাব দেবেন?

লেখক: নিউজরুম এডিটর, সারাবাংলা ডটনেট ও দৈনিক সারাবাংলা

Advertisement
বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন