রবিবার ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ৪ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

দুর্গাপূজা: পূরাণ ও প্রচলনের ইতিহাস

অক্টোবর ৭, ২০১৯ | ৩:৩২ অপরাহ্ণ

নটো কিশোর আদিত্য

শারদীয়া দুর্গাপূজাকে ‘অকালবোধন’ বলা হয়। কালিকা পুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণ অনুসারে, রাম ও রাবণের যুদ্ধের সময় শরৎকালে দুর্গাকে পূজা করা হয়েছিল। হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই এই সময়টি তাঁদের পূজা যথাযথ সময় নয়। অকালের পূজা বলে তাই এই পূজার নাম হয় ‘অকালবোধন’। এই দুই পুরাণ অনুসারে, রামকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। কৃত্তিবাস ওঝা তাঁর রামায়ণে লিখেছেন, রাম স্বয়ং দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। তবে রামায়ণের প্রকৃত রচয়িতা বাল্মিকী মুনি রামায়ণে রামচন্দ্রকৃত দুর্গাপূজার কোনো কিছু উল্লেখ করেননি। উপরন্তু রামায়ণের অন্যান্য অনুবাদেও এর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে এই প্রচলিত তথ্য অনুসারে স্মৃতিশাস্ত্রসমূহে শরৎকালে দুর্গাপূজার বিধান দেওয়া হয়েছে। হংস নারায়ণ ভট্টাচার্যের মতে, ‘অকালবোধন শরতে বৈদিক যজ্ঞের আধুনিক রূপায়ণ ছাড়া আর কিছুই না।’সনাতম ধর্মের যেকোনো পূজার ক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সংস্কৃত মন্ত্রগুলো। দুর্গাপূজার মন্ত্রগুলো সাধারণত শ্রী শ্রী চণ্ডি থেকে পাঠ করা হয়। ঢাক-ঢোল, খোল করতাল, সুগন্ধি আগরবাতি আর এগুলোর সাথে সংস্কৃতমন্ত্র পবিত্র এক পরিবেশের জন্ম দেয়।

বিজ্ঞাপন

বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দেবী দুর্গা পরম ভক্তিময়। তাঁর এক রূপ অসুরবিনাশী, আরেক রূপ মমতাময়ী মাতার। তিনি অশুভর প্রতীক অসুরদের দলপতি মহিষাসুরকে বধ করে দেবকুলকে রক্ষা করেছিলেন। আমাদের বিশ্বাস, এর মধ্য দিয়ে অন্যায়-অশুভর বিপরীতে ন্যায় ও শুভশক্তির জয় হয়েছিল। তিনি কেবল সৌন্দর্য-মমতা-সৃজনের আধারই নন, অসহায় ও নিপীড়িতের আশ্রয় দানকারী বলেও গণ্য হন।

মাতৃ আরাধনা তখনই স্বার্থক হয়ে উঠবে, যখন ঘরে ঘরে দূর্গার মত মেয়েদের প্রকাশ ঘটবে। সেটা কি হয়েছে? বছর বছর ঢাক-ঢোল বাজিয়ে দূর্গতিনাশিনীর আরাধনা করেও কেন আমাদের দূর্গতি দূর হচ্ছে না। শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন,
‘পূঁজা পার্বন তুই যতই করিস,
ফুল, তুলসী, গঙ্গা জলে
অনুশীলনী কৌশল ছাড়া,
ফল পাবে না কোন কালে।’
তাই, দূর্গা পূজা কেবল মাত্র পুস্পবিল্বপত্রের এবং ঢাক-ঢোলের পূজা নয়। এ পূজা মানবতার এক বিরাট মিলন উৎসব। মাতৃ আরাধনায় রত যারা তাদের উদ্দেশ্যে করে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন-
‘মা সবারই মা,
কাউকে ছেড়ে দিয়ে নয়,
কাউকে বাদ দিয়ে নয়,
কাউকে পরিত্যাগ করে নয়।’
এই হলো মায়ের স্বভাব প্রকৃতি। তিনি যেন জীবজগতের একত্ববিধানের এক স্বরূপ। সব সন্তান যেমন মায়ের নাড়িছেঁড়া ধন, তেমনি সেই সন্তানরা যদি আবার মায়ে তৃপ্তি ও স্বস্তি বিধান করতে আগ্রহান্বিত হয়, তাকে ভালোবেসে, তার সেবা করে, তখন সেই সন্তানরাও আবার পারস্পরিক সম্প্রীতি নিয়ে মিলেমিশে থাকতে পারে। তাদের মধ্যে বিক্ষোভ বা বিচ্ছেদ মাথা চাড়া দিতে পারে না। এমন ভাবে থাকলেই পূজার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়। সবাইকে নিয়ে উদ্বর্দ্ধনার পথে এগিয়ে চলা। প্রতিমাকে পুতুল মনে করে পূজা করলে পূজার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না। দেবতাকে মাটি বা পাথরের পুতুল ভাবতে ভাবতে আমাদের অন্তরটাও ওই রকম মাটি বা পাথর হয়ে ওঠে।

ভগবতী দূর্গা। ভগ মানে ঐশ্বর্য্য। তাই, ভগবতী মানে ঐশ্বর্য্যশালিনী। ঐশ্বর্য্য, বীর্য্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান ও বৈরাগ্য এই ছয়টি ঐশ্বর্য্যরে নাম ‘ভগ’। এই ছয়টিই মা-দূর্গার মধ্যে পূর্ণ মহিমায় বিরাজিত। আবার তিনি ‘মহামায়া’। মায়া কথাটি এসেছে মা-ধাতু থেকে, অর্থ পরিমাপ করা। মহামায়া মানে মহাপরিমাপনকর্ত্রী। পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ বললেন, ‘এই যে মায়া দেখছ, মায়ার যা সব খেলা, এ মায়া কিন্তু আমারই (গীতা ৭/১৪)। অর্থাৎ মায়াও তাঁরই সৃষ্টি। ঈশ্বর স্বীয় মহাশক্তি দ্বারা জগৎ পরিমাপিত করেন। মায়া আবার প্রকৃতি নামেও আখ্যায়িত হয়। দেবীপূজার প্রক্কালে বিল্লবৃক্ষে বোধন হয়। বোধন মানে জাগরণ, চেতন করে তোলা।’

বিজ্ঞাপন

বিবেক জাগ্রত না হলে বিশ্ব মানবতার সন্তান হয়ে ওঠার যোগ্যতা লাভ করা যায় না। শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন, ‘বোধন মানে বোধসূত্র, যাকে আশ্রয় করে অন্তরে বাহিরের যা কিছুকে বুঝে সুঝে চলতে পারা যায়। ’পূজা মানেই তো সংবর্ধনা অর্থাৎ যার পূজা করি তাঁর মহনীয় গুণাবলীকে সুনিষ্ট অনুশীলনের দ্বারা নিজেকে চরিত্রগত করে তোলা এবং ধীরে ধীরে তা বাড়িয়ে তোলা।
বলি হলো উৎসর্গ। আমাদের নিজেদের হিংস্রতা ও লালসাকে পোষণ করতে যেয়ে এরকম নিষ্ঠুরভাবে পশুহত্যা আমরা ক্রমাগত করে চলছি। তাতে পূজার উদ্দেশ্য কতখানি সিদ্ধ হচ্ছে? মন কতটা ভাগবৎমুখী হয়ে উঠছে? পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকের ওপর দরদী হয়ে ওঠার এই ক্রিয়া কতটা সহায়তা করছে? ইন্দ্রিয়গুলো আমাদের কতটা তীক্ষ্ণ ও তরতরে হয়ে উঠছে? কোনোটিই হচ্ছে না। কারণ, আমরা বলি শব্দের প্রকৃত অর্থ জানি না। তাই বলিদানও হয় না। বলি শব্দ এসেছে বল্ ধাতু থেকে, মানে বর্দ্ধন। মায়ের পূজা যে বলি হয় তার মানে বেড়ে ওঠা বা বলীয়ান করে তোলা। মায়ের পূজা করে মানুষ সংবধিক হয়ে ওঠে।

বিসর্জন শব্দটি বি-সৃজ ধাতু থেকে উৎপন্ন, বিশেষ প্রকারে সৃষ্টি করা। যে মাতৃপূজা করলাম, সেই মায়ের সর্ব মঙ্গলকারিণী স্নেহসুন্দরভাবে ও চরিত্রকে নিজের অন্তরে বিশেষভাবে সৃষ্ট, অর্থাৎ দৃঢ়নিবন্ধ করে তোলা চাই। মায়ের সেবায় আমাদের বৃত্তিগুলোকে নিয়োজিত করি, তখনই হয় বিসর্জনের স্বার্থকতা।

মা দুর্গা সাধারণের কাছে দেবী দুর্গা, মহাময়া, মহাকালী, মহালক্ষ্মী, মহাসরস্বতী, শ্রী চন্ডী প্রভৃতি নামে পরিচিত। সর্বশক্তি স্বরূপিনী আদ্যাশক্তি হলেন এই মা দুর্গা। তাঁর দুর্গা নামটির মধ্যেই অসুর শক্তি নাশের পরিচয়। তিনি দুর্গ নামের এক দৈত্যকে বধ করে দুর্গা নামে খ্যাত হন। যুগে যুগে দেবতাদের কল্যাণের জন্য দেবী দুর্গা অত্যাচারী ভোগলোলুপ অসুরদের নিধন করেছিলেন। মা দুর্গা শত্রু বিনাশে যেমন ভয়ঙ্করী আবার ভক্ত বা সন্তানের কাছে তিনি তেমনি স্নেহময়ী জননী, কল্যাণ প্রদায়িনী। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- ‘ডান হাতে তোর খড়গ জ্বলে বাঁ হাত করে শঙ্কা হরণ। দুই নয়নে স্নেহের হাসি ললাট নেত্র আগুণবরণ।'

বাংলাদেশ প্রেম ধর্মের দেশ। মাকে সৌন্দর্যময়ী, প্রেমময়ী, করুণাময়ীরূপে প্রত্যক্ষ করতে। তাই তো মার্কন্ডুয়ে পুরাণের কাহিনীর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দেবী দুর্গার অসুর-নাশিনীরূপে প্রতিমা গড়ে পূজার আয়োজন করা হলেও বাঙালি ভক্ত জানেন, আসলে ওই পূজা আর কিছু নয়, এক বছর বর উমা স্বামীগৃহ কৈলাস ছেড়ে কন্যারূপে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে মা-বাবার বাড়িতে এসেছেন। তারপর আবার ফিরে যাবেন কৈলাসে স্বামী শিবের কাছে। এখানে একটি বিষয় অবশ্যই লক্ষণীয়। ভক্ত ভগবানকে তাঁর আপনজন হিসেবে পেতে চান। তাই তো দেখা যায়, ভক্তিমার্গের সাধক কেউ ভগবানকে প্রভুরূপে, সন্তানরূপে, সখারূপে, প্রেমিকরূপে ভজনা করে থাকেন।

দুর্গাপূজা কবে, কখন, কোথায় প্রথম শুরু হয়েছিল- তা নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। ভারতের দ্রাবিড় সভ্যতায় মাতৃতান্ত্রিক দ্রাবিড় জাতির মধ্যে মাতৃদেবীর পূজার প্রচলন। আর্য সভ্যতায় প্রাধান্য ছিল দেবতাদের। অনার্য সভ্যতায় প্রাধান্য ছিল দেবীদের, তারা পূজিত হতেন আদ্যাশক্তির প্রতীক রূপে। মাতৃতান্ত্রিক পরিবারের গঠন, দায়িত্ববোধ ও উর্বরতা শক্তির সমন্বয়ের কথা বিবেচনা করে অনার্য সমাজে গড়ে উঠে মাতৃপ্রধান দেবী সংস্কৃতির ধারণা। ভারতে অবশ্য মাতৃরূপে দেবী সংস্কৃতির ধারণা অতি প্রাচীন। প্রায় ২২ হাজার বছর পূর্বে ভারতের প্যালিওলিথিক জনগোষ্ঠী থেকেই দেবী পূজা প্রচলিত। হরপ্পা ও মহেন্জোদারো সভ্যতা তথা সিন্ধু সভ্যতায় এসে তা আরও গ্রহণযোগ্য, আধুনিক ও বিস্তৃত হয়। মাতৃপ্রধান পরিবারের মা-ই প্রধান, তার নেতৃত্বে সংসার পরিচালিত হয়। এই মত অনুসারে দেবী হলেন শক্তির রূপ, তিনি পরব্রহ্ম। শাক্ত মতে, কালী বিশ্ব সৃষ্টির আদি কারণ। অন্যান্য দেব-দেবী মানুষের মঙ্গলার্থে তাঁর বিভিন্ন রূপে প্রকাশ মাত্র। মহাভারত অনুসারে, দুর্গা বিবেচিত হন কালী শক্তির আরেক রূপে।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আছে, দুর্গাপূজার প্রথম প্রবর্তক কৃষ্ণ, দ্বিতীয় বার দুর্গাপূজা করেন স্বয়ং ব্রহ্মা আর তৃতীয়বার দুর্গাপূজার আয়োজন করেন মহাদেব। আবার দেবী ভাগবত পুরাণ অনুসারে জানতে পারি, ব্রহ্মার মানস পুত্র মনু ক্ষীরোধ সাগরের তীরে দুর্গার আরাধনা করে বর লাভে সফল হন। মূল বাল্মীকির রামায়ণে, দুর্গাপূজার কোনো অস্থিত্ব নাই। কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়নে দুর্গাপূজার অস্থিত্ব আছে।

বাংলাভাষী হিন্দু সমাজে দুর্গাপূজা বেশ জনপ্রিয়তা পায়। সেখানে তিনি কালিকা পুরাণের ঘটনা অনুসরণে ব্রহ্মার পরামর্শে রামের দুর্গাপূজা করার কথা উল্লেখ করেছেন। শক্তিশালী রাবনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিজয় নিশ্চিত করতে শরৎকালে শ্রী রাম চন্দ্র কালিদহ সাগর থেকে ১০১টি নীল পদ্ম সংগ্রহ করে দুর্গাপূজা করে তার কৃপা লাভ করেন। তবে দুর্গাপূজার সবচেয়ে বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায় মার্কন্ডুয়ে পুরাণে। এই পুরাণের মধ্যে তেরটি অধ্যায় দেবীমহাত্ম্যম নামে পরিচিত। বাংলায় শ্রীশ্রী চণ্ডি নামে সাতশত শ্লোক বিশিষ্ট দেবী মহাত্ম্যম পাঠ আছে- যা দুর্গাপূজার প্রধান ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পূজার আসরে স্থায়ী হয়ে গেছে।

সনাতন ধর্মের আর্য ঋষিরা সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রতীক হিসাবে দেবী দূর্গার আশীর্বাদ লাভের জন্য আরাধনা করতেন। মার্কন্ডুয়ে পুরাণ (Markandeya Purana) মতে, চেদী রাজবংশের রাজা সুরাথা খ্রিষ্টের জন্মের ৩০০ বছর আগে কলিঙ্গে (বর্তমানে ওড়িষ্যা) Duseehera নামে দুর্গাপূজা প্রচলন করেছিল। নেপালে Duseehera বা Dashain নামেই পূজা হয়। যদিও প্রাচীন ওরিষ্যার সাথে নেপালের পূজার যোগসূত্র আছে কিনা সে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। পুরাণ মতে, দুর্গাপূজার ইতিহাস আছে কিন্ত ভক্তদের কাছে সেই ইতিহাস বিশ্বাসের।

পরিব্রাজক, বৌদ্ধ পন্ডিত হিউয়েন সাংকে নিয়ে দুর্গাপূজার একটি কাহিনী প্রচলিত আছে। চীনা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাখায় বিভ্রান্ত হয়ে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের মূল পাণ্ডুলিপি সংগ্রহে ৬৩০ সালে ভারত সফরে আসেন। ভারত বর্ষের নানা বিহারে বিদ্যা অর্জন করেন। ৬৩৫-৬৪৩ পর্যন্ত দীর্ঘ আট বছর তিনি হর্ষবর্ধনের রাজসভায় ছিলেন। তবে তার কাহিনী দূর্গা, কালী, কালীর আরেক রূপ চণ্ডি নাকি বনদেবীকে নিয়ে- তা বিষয়ে মতভেদ আছে। তবে তার রচনায় উল্লেখ করেছেন, হর্ষবর্ধনের সময়ে দস্যূ তস্করের উপদ্রব খুব বেশি ছিল এবং তিনি নিজেও একাধিক বার দস্যূর হাতে নিগৃহীত হয়েছিলেন।

মধ্য যুগে বাংলা সাহিত্যে দুর্গাপূজার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ঢাকেশ্বরী মন্দির চত্বরে আছে দুই ধরনের স্থাপত্যরীতি মন্দির। ১১শ বা ১২শ শতক থেকে এখানে কালীপূজার সাথে দুর্গাপূজাও হত। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে নানা কাহিনী প্রচলিত আছে।

যতটুকু জানা যায়, কারও মতে ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে দিনাজপুরের জমিদার প্রথম দুর্গাপূজা করেন। আবার কারও মতে, ষোড়শ শতকে রাজশাহী তাহেরপুর এলাকার রাজা কংশ নারায়ণ প্রথম দুর্গাপূজা করেন। ১৫১০ সালে কুচ বংশের রাজা বিশ্ব সিংহ কুচবিহারে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। অনেকে মনে করেন, ১৬০৬ সালে নদীয়ার ভবনানন্দ মজুমদার দুর্গাপূজার প্রবর্তক। ১৬১০ সালে কলকাতার সুবর্ণ রায় চৌধুরী সপরিবারে দুর্গাপূজা চালু করেন। ১৭১১ সালে অহম রাজ্যের রাজধানী রংপুরের শারদীয় পূজার নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের দূত রামেশ্বর নয়ালঙ্কার। নবাব সিরাজ-উদ-দ্দৌল্লার আক্রমণে কলকাতার একমাত্র চার্চ ধ্বংস হবার পর সেখানে কোনো উৎসব আয়োজনের অবস্থা ছিল না। পলাশীর যুদ্ধে বিজয় লাভের জন্য ১৭৫৭ সালে কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নব কৃঞ্চদেব লর্ড ক্লাইভের সম্মানে দুর্গাপূজার মাধ্যমে বিজয় উৎসবের আয়োজন করেছিলেন।

আধুনিক দুর্গাপূজার প্রাথমিক ধাপ ১৮ শতকে নানা বাদ্যযন্ত্র প্রয়োগে ব্যক্তিগত, বিশেষ করে জমিদার, বড় ব্যবসাযী, রাজদরবারের রাজ কর্মচারী পর্যায়ে প্রচলন ছিল। বাংলাদেশের সাতক্ষীরার কলারোয়ার ১৮ শতকের মঠবাড়িয়ার নবরত্ন মন্দিরে দুর্গাপূজা হতো। পাটনাতে ১৮০৯ সালের দুর্গাপূজার ওয়াটার কালার ছবির ডকুমেন্ট পাওয়া গেছে। ওরিষ্যার রামেশ্বরপুরে একই স্থানে ৪০০ শত বছর ধরে সম্রাট আকবরের আমল থেকে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। বর্তমানে দুর্গাপূজা দুইভাবে হয়ে থাকে- ব্যক্তিভাবে, পারিবারিক স্তরে ও সমষ্টিগতভাবে; পাড়াস্তরে বারোয়ারি বা সর্বজনীন পূজা নামে পরিচিত।

সাধারণত আশ্বিন শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী অবদি পাঁচদিন দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে দুর্গাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। আবার সমগ্র পক্ষটি দেবীপক্ষ নামে আখ্যাত হয়। দেবীপক্ষের সূচনা হয় পূর্ববর্তী অমাবস্যার দিন; এই দিনটি মহালয়া নামে পরিচিত। অন্যদিকে দেবীপক্ষের সমাপ্তি পঞ্চদশ দিন অর্থাৎ পূর্ণিমায়; এই দিনটি কোজাগরী পূর্ণিমা নামে পরিচিত ও বাৎসরিক লক্ষ্মীপূজার দিন হিসাবে গণ্য হয়। দুর্গাপূজা মূলত পাঁচদিনের অনুষ্ঠান হলেও মহালয়া থেকেই প্রকৃত উৎসবের সূচনা ও কোজাগরী লক্ষ্মীপূজায় তার সমাপ্তি।

দুর্গাপূজার অন্যতম বৈশিষ্ট্য কুমারী পূজা। দেবী পুরাণে কুমারী পূজার সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। শাস্ত্র অনুসারে সাধারণত ১ বছর থেকে ১৬ বছরের অজাতপুষ্প সুলক্ষণা কুমারীকে পূজার উল্লেখ রয়েছে। ব্রাহ্মণ অবিবাহিত কন্যা অথবা অন্য গোত্রের অবিবাহিত কন্যাকেও পূজা করার বিধান রয়েছে। এদিন নির্বাচিত কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। দেবীর মত সাজিয়ে হাতে দেওয়া হয় ফুল, কপালে সিঁদুরের তিলক এবং পায়ে আলতা। সঠিক সময়ে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে ষোড়শোপচারে পূজা করা হয়। চারদিক শঙ্খ, উলুধ্বনি আর মায়ের স্তব-স্তুতিতে পূজাঙ্গণ মুখরিত থাকে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, ‘শুদ্ধাত্মা কুমারীতে দেবী বেশি প্রকাশ পায়। কুমারী পূজার মাধ্যমে নারী জাতি হয়ে উঠবে পূত-পবিত্র ও মাতৃভাবাপন্ন, শ্রদ্ধাশীল।’

১৯০১ সালে ভারতীয় দার্শনিক ও ধর্মপ্রচারক স্বামী বিবেকানন্দ সর্বপ্রথম কলকাতার বেলুড় মঠে ৯ জন কুমারী পূজার মাধ্যমে এর পুনঃপ্রচলন করেন। হিন্দু সমাজে বাল্যবিবাহ, সতীদাহ, চিরবিধবাসহ নানা অবিচারে নারীরা ছিল নিপীড়িত। চিরকুমার বিবেকানন্দ নারীকে দেবীর আসনে সম্মানিত করার জন্যেই হয়তো পুনঃপ্রচলন করেন। ১৯০১ সালের পর প্রতিবছর দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে এ পূজা চলে আসছে। আধ্যাত্মিক ও জাগতিক কল্যাণ সাধনই কুমারী পূজার মূল লক্ষ্য।

দুর্গাপূজার আরও একটি অংশ সন্ধিপূজা। অষ্টমী দিনের শেষে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই সময় দেবী দুর্গাকে চামুণ্ডা রূপে পূজা করা হয়ে থাকে। তান্ত্রিক মতে এই পূজা সম্পন্ন হয়। এই পূজায় দেবীকে ষোলটি উপাচার নিবেদন করা হয়। দেবীর উদ্দেশে হয় পশুবলি; সেই বলিকৃত পশুর মাংস ও রক্ত এবং মদ দেবীকে দেওয়া হয়। এককভাবে চামুণ্ডা, চণ্ডি বা কালী পূজায় পশুবলি দেখা গেলেও বাংলাদেশের কোথাও দুর্গাপূজায় পশুবলি হয় না।

সরকারি বা জাতীয়ভাবে এই উৎসবকে দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হিসাবে অভিহিত করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এটাকে শরৎকালের বার্ষিক মহোৎসব হিসাবে ধরা হয় বলে এই পূজাকে শারদীয় উৎসবও বলা হয়। রামায়ন অনুসারে, অকালে বা অসময়ে দেবীর আগমন বা জাগরণ বলে শরৎকালের দুর্গা উৎসবকে অকালবোধনও বলা হয়। বসন্তকালের দুর্গাপূজাকে বাসন্তী পূজা বলা হয়।

দুর্গা পুষ্পাঞ্জলি দেয়ার মন্ত্র: ঔঁ জয়ন্তি মঙ্গলা কালী, ভদ্র কালী কপালিনী, দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী, স্বাহা স্বধা নমস্তুতে। এস স্ব চন্দন পুষ্প বিল্ব পত্রাঞ্জলী নম ভগবতী দুর্গা দেবী নমহ্।

দুর্গা প্রণাম মন্ত্র: সর্ব মঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে শরণ্যে ত্রম্বকে গৌরি নারায়নী নমস্তুতে
অর্থ: হে দেবী সর্বমঙ্গলা, শিবা, সকল কার্য সাধিকা, শরণযোগ্য, গৌরি ত্রিনয়ণী, নারায়ণী তোমাকে নমস্কার।

তথ্যসূত্র

১. বাংলাদেশ ও পাক ভারতের ইতিহাস, জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার, আনোয়ারুল হক মজুমদার, আবদুল আউয়াল
২. ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী, মুনতাসীর মামুন
৩. রামায়ণ কৃত্তিবাস বিরচিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ও ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখিত ভূমিকা সম্বলিত, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ১৯৫৭ সংস্করণ
৪. ঢাকেশ্বরী মন্দির, উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ
৫. উইকিপিডিয়া

সারাবাংলা/পিটিএম

বিজ্ঞাপন

Tags: , ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন