বুধবার ১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ১ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ছাত্র রাজনীতির ‘মনস্টারা’য়ন

অক্টোবর ৮, ২০১৯ | ১২:০৬ অপরাহ্ণ

প্রভাষ আমিন

সোমবার দিনভর নানা কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তাই লিখতে বসতে পারিনি। আসলে ব্যস্ততার চেয়ে বেশি ছিল বেদনা, শোক। দিনভর গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন ছিলাম। ব্যাপারটা আসলে অধিক শোকে পাথর হওয়ার মতো। আমি এতটাই ক্ষুব্ধ, হতাশ, বিস্মিত, ক্রুদ্ধ ছিলাম যে কী বলব, কী লিখব— ভাবতে পারছিলাম না।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরাই এখানে পড়ার সুযোগ পান। আবরার ফাহাদও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল। মেডিক্যালে কয়েকদিন ক্লাসও করেছিল। কিন্তু পরে ভর্তি হয় বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। এই মেধাবী ছাত্রটি আর নেই। মানুষের মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু মৃত্যুর ধরন অনেকসময় পাল্টে দেয় অনেককিছু। আবরার ডেঙ্গুতে মারা গেলে, ছিনতাইকারীর ছুরিতে বা দুর্বৃত্তের গুলিতে মারা গেলে আমাদের শোক এতটা তীব্র হতো না। কিন্তু আবরারকে মেরে ফেলেছে তার সহপাঠীরাই। নিছক মেরে ফেলা হলেও আমরা এতটা বেদনাহত হতাম না। অনেক সময় একটা বেমক্কা ঘুষিতেও একজন মানুষ মারা যেতে পারে। কিন্তু আমার শোক, আমার ক্রোধ, আমার বেদনা বুনো কল্পনাকেও হার মানায়, যখন শুনি আবরারকে তার সহপাঠীরা টানা সাত ঘণ্টা ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে।

এটা বিশ্বাস হতে চায় না। যারা পিটিয়েছে, তারাও বুয়েটেরই ছাত্র। তার মানে একাডেমিক বিবেচনায় তারাও মেধাবী। কিন্তু মেধাবী তো দূরের কথা, তারা মানুষই নয় আসলে। সহপাঠী তো দূরের কথা, যেকোনো মানুষকে, মানুষ তো দূরের কথা, এমনকি রাস্তার কুকুরকেও কোনো মানুষ টানা সাত ঘণ্টা ধরে পেটাতে পারে না। এরা মানুষ তো নয়ই, পশুও নয়। কারণ পশু সমাজেও কিছু সিস্টেম আছে। কোনো পশু কখনো বিনা কারণে কাউকে আক্রমণ করে না। বুয়েট ছাত্রলীগের এই ছেলেগুলো মানুষ তো নয়ই, পশুও নয়; এরা দানব, এরা মনস্টার।

সাত ঘণ্টা পেটানোর পরও আবরারকে তারা হাসপাতালে নেয়নি, অ্যাম্বুলেন্স ডাকেনি, আবরারের লাশ ফেলে রেখে সেই দানবগুলো স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে খেতে গেছে। সিসিটিভিতে সবার চেহারা শনাক্ত করা গেছে, ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমি এদের প্রত্যেকের ফাঁসি চাই। এই দানবদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। এরা শুধু আবরারকে নয়; মানুষের ওপর আমাদের আস্থাকেও খুন করেছে। মানুষের সম্ভাব্য নিষ্ঠুরতার সীমাও অতিক্রম করেছে এরা। তবে আমি জানি, আমার চাওয়া পূরণ হবে না। আগে যদি বিচার হতো, তাহলে আজ আবরারকে প্রাণ দিতে হতো না। প্রকাশ্যে সবার সামনে বিশ্বজিতকে যারা কুপিয়ে মেরেছে, তাদেরও ফাঁসি হয়নি।

বিজ্ঞাপন

গত ১১ বছরে ছাত্রলীগের পাপের বোঝা পূর্ণ হয়ে গেছে। হত্যা, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি— হেন কোনো অপরাধ নেই, তারা করেনি। ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগ আজ দানবদের সংগঠনে পরিণত হয়েছে। এরা নিজেরা তো ডুবেছেই, আওয়ামী অর্জন, উন্নয়ন— সব নিয়ে ডুবছে। শেখ হাসিনা বারবার ছাত্রলীগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, সাংগঠনিক নেত্রীর পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। ছাত্রলীগ আরও বেপরোয়া হয়েছে।

শেখ হাসিনার চলমান শুদ্ধি অভিযানও শুরু হয়েছে ছাত্রলীগকে দিয়েই। চাঁদাবাজির অভিযোগে বহিষ্কার করেছেন ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি। আমরা রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের কথা বলি। কিন্তু আমরা সেই স্টেজ পেরিয়ে এসেছি। রাজনীতির এখন দানবায়ন চলছে। শোভন-রাব্বানীকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কারের সময় শেখ হাসিনা নাকি বলেছিলেন, এরা ‘মনস্টার’ হয়ে গেছে। আসলেই ছাত্রলীগ এখন মনস্টার হয়ে গেছে। দেশ, জাতি, উন্নয়ন, অগ্রগতি, মানবতার স্বার্থেই এদের দমন করা জরুরি। আর সেটা পারবেন কেবল শেখ হাসিনাই।

লেখক: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন