বুধবার ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৯ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে উদযাপিত হোক ‘নো ব্রা ডে’

অক্টোবর ১২, ২০১৯ | ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ

প্রতি বছরের মতো এবারও অক্টোবরের ১৩ তারিখে স্তন ক্যানসার ক্যান্সার অ্যাওয়ারনেস এর অংশ হিসেবে  ‘No Bra Day’ বা 'নো ব্রা ডে' দিবসটি পশ্চিমা বিশ্বে সাড়ম্বরে পালিত হবে। এই দিনের ইতিহাস ঘাটাঘাটি করে জানা গেল, ২০১১ সাল থেকে এই দিবসটি পালন করা হচ্ছে। প্রথমে ৯ জুলাই পালন করা হলেও ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছর ১৩ অক্টোবর দিবসটি পালিত হয়। এর সূচনা মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক হলেও বর্তমানে দিবসটি সারাবিশ্বে গুরুত্ব সহকারে পালিত হয়। ২০১৭ সালে সারা বিশ্বের তিরিশটি দেশের বহু জনপ্রিয় তারকাসহ লক্ষ লক্ষ নারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিবসটি #nobraday বা #NoBraDay হ্যাশট্যাগ দিয়ে পালন করেছিল। (১)

বিজ্ঞাপন

ঠিক কীভাবে ‘নো ব্রা ডে’ পালন করা শুরু হয়েছিল তার স্পষ্ট কারণ না জানা গেলেও দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য মোটামুটি পরিষ্কার। স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, নারীদের নিয়মিত নিজেকে নিজে পরীক্ষা করতে উৎসাহ দেয়া, স্ক্রিনিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরা এবং স্তন ক্যানসার নিয়ে গবেষণার জন্য অর্থ সংগ্রহ করাই দিনটি পালনের উদ্দেশ্য।

এই দিনে স্তন ক্যানসার আক্রান্ত রোগী, সারভাইভারসহ সকল নারীকে আহ্বান করা হয় সারা দিন ব্রা বা অন্তর্বাস না পরেই স্বাভাবিক কাজকর্মে অংশ নিতে।  আর কেউ যদি সেটা করতে না চায় তাহলে অন্তত পার্পল রঙের পোশাক পরে একাত্মতা ঘোষণা করতে পারেন। পুরুষরাও একই রঙের পোশাক পরে এই দিবসটি পালন করতে পারেন। (২)

বিশ্বে প্রতি ৮ জন নারীর মধ্যে ১ জন নারী তার জীবদ্দশায় স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। আর ক্যান্সারের শেষ পরিনতি মৃত্যু, তা আমাদের সবারই জানা। তবে, স্তন ক্যানসারে মৃত্যু হার আধুনিক যুগে অনেকটাই কমে এসেছে। কিন্তু এ রোগটা মূলত নারীদের এমন একটি অঙ্গে হয় যা যুগে যুগে দেশে দেশে নারীত্বের বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্যের পরিচায়ক হিসেবে বিবেচিত। তার চেয়েও বেশি এটি নারীর মাতৃত্বের পূর্ণতা এনে দেয়ার একটি মাধ্যম।

ফলে ক্যানসারযুদ্ধে এই অঙ্গটি হারিয়ে নারীরা প্রায় সময়ই নিজের প্রতি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সংকটের সম্মুখীন হন, হতাশায় ভোগেন। তাদের অনেকেই এই ব্যাপারটা লুকাতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম অঙ্গ  বা বিশেষ ব্রা ব্যবহার করেন, আর সেটা তাদের সারাদিন পরিধান করতে হয়। নো ব্রা ডে তে আপনি বিনা ব্রা তে সারাদিন কাটিয়ে স্তন ক্যানসার রোগীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের পাশাপাশি স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারেন, যেন আপনাকে এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি না হতে হয়। এদিনে আপনি স্তন ক্যানসারের স্ক্রিনিং এ অংশ নিতে পারেন, এমনকি স্তন ক্যানসার রোগীদের জন্য বা গবেষণার জন্য কোন সহায়তা প্রদান করতে পারেন (৩-৪)। অবশ্য, ব্রা না পরেই কেন ক্যানসার সচেতনতা, স্ক্রিনিং, ফান্ড রেইজিং করতে হবে, এ নিয়ে দিবসটির উদযাপনকারীরাও মনে হলো কিছুটা কনফিউজড!

অনেকেই আবার নো ব্রা ডে পালনের পেছনে স্তন ক্যানসার নিয়ে বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় কিন্তু ভ্রান্ত একটি ধারনাকে দায়ী মনে করেন। সেটি হচ্ছে, “দীর্ঘক্ষণ ব্রা পরলে, টাইট ব্রা পরলে, বা রাতের বেলায় ব্রা পরে ঘুমালে স্তন ক্যানসার হতে পারে”। চলুন এবার ব্রা সম্পর্কিত এই প্রচলিত ভুল ধারনা নিয়ে কিছু তথ্য জানা যাক।

ব্রা বা অন্তর্বাস পরলে স্তন ক্যানসার হতে পারে এই মিথ ছড়ানোর জন্য দায়ী ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত একটি বই। ‘ড্রেসড টু কিল’ (Dressed to Kill) নামক বইটির লেখক Sydney Ross Singer এবং Soma Grismaijer । বইটিতে দাবী করা হয়েছে, মেয়েদের মধ্যে যারা দিনে ১২ ঘন্টার বেশি সময় বা ২৪ ঘন্টাই ব্রা বা অন্তর্বাস পরে থাকেন, তাদের স্তন ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা যারা ব্রা পরেন না তাদের চেয়ে অনেক বেশি। অনেকেই বলেন, এই অভ্যাসের কারণেই পশ্চিমা বিশ্বের নারীদের স্তন ক্যানসার বেশি হয়। তাদের ধারণা, ব্রা পরলে স্তনের লিম্ফেটিক ড্রেইনেজ বাধাগ্রস্থ হয়, ফলে স্তনের ভেতর টক্সিন জমা হতে থাকে, যা স্তন ক্যানসারের কারণ! (৬)

নো ব্রা ডে

তাদের এই আবিষ্কার কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফসল নয়, বরং তাদের তথাকথিত দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষনের (!) ফলাফল, যা রীতিমতো বই আকারে প্রকাশ করে সকলকে জানানো হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণার নির্ভরযোগ্যতার বিচারে (লেভেল অফ এভিডেন্স এ) তাদের এই পর্যবেক্ষন এমনিতেই বাতিল হয়ে যায়। তারপরেও বিজ্ঞানীরা তাদের এই দাবীকে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে ভুল প্রমাণিত করেন।

প্রকৃত তথ্য হচ্ছে, স্তনের লিম্ফেটিক সিস্টেম স্তনের ভেতর লিম্ফ ড্রেইন করেনা, তারা স্তনের বাইরে বগলের লিম্ফনোডে লিম্ফ বা লসিকা রস নিষ্কাশন করে। যেকোন ধরনের ব্রা বা অন্য কোন আঁটসাঁট পোষাকের জন্য স্তনের ভেতর লসিকা রস ও টক্সিন জমা হয় না। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত এমন কোন নির্ভরযোগ্য গবেষণা পাওয়া যায়নি যাতে তাদের এই দাবী সঠিক প্রমাণ হয়।

১৯৯১ সালের একটি গবেষণায় প্রাথমিকভাবে ব্রাকে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির জন্য কিছুটা দায়ী বলে মনে করা হলেও পরবর্তীতে সেটার গুরুত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। বরং শীর্ণাকায় নারীরা কম ব্রা পরিধান করেন এবং স্থূলকায় নারীদের ব্রা পরিধানের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায়, ঘুরে ফিরে সেই দৈহিক স্থূলতাকেই মূল দোষী হিসেবে সাবাস্ত্য করা হয়। (৭) তারপর থেকে এই পর্যন্ত এমন কোন গবেষণা প্রকাশিত হয়নি যা তাদের এই দাবীকে সমর্থন করে।

২০১৪ সালে আরেকটি গবেষণা প্রকাশিত হয়, যেখানে গবেষকরা ১৫০০ জন পোস্টমেনোপজাল (পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়া) নারীদের সাক্ষাৎকার নেন। তাদের কাছে তাদের সারাজীবনের ব্রা পরিধানের ধরন সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। এদের মধ্যে এক হাজার জন ছিলেন স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত। বাকি পাঁচশ জন ছিলেন সুস্থ। এটা ছিল একধরণের কেস-কন্ট্রোল স্টাডি। গবেষকরা এই গবেষণায় অন্তর্বাস পরার সঙ্গে বা অন্তর্বাস পরার সময়কালের সঙ্গে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ার মত কোন সম্পর্কই খুঁজে পাননি।(৮)

বিশিষ্ট সার্জন ডঃ সুসান লাভ তার বিখ্যাত ‘ব্রেস্ট বুক’ নামক বইয়ে এই বিতর্কের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে। তার মতে, এইসব মিথের গোঁড়া হচ্ছে জীবনের অনিশ্চিত ও ভীতিকর অধ্যায়ের উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের মনের সুপ্ত বাসনা। মানুষ এমন একটা কিছু চায়, যার উপর সব দোষ চাপানো যায়। আবার তারা এই আশাতে বুক বাঁধে যে, অন্তর্বাস পরা বাদ দিলে বুঝি স্তন ক্যানসারকে রোখা যাবে! (৯)  কিন্তু, ধন্য আশা কহুকিনী...

মার্কিন গাইনী অনকোলজিস্ট ডাঃ জেনিফার গুন্টার এই বহুল প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাকে 'নিষ্ঠুর' বলে অভিহিত করে বলেন, এই অপপ্রচার নারীদের ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে। শুধু তাই নয়, এতে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত নারীরা অন্তর্বাস পরার জন্য চরম অপরাধবোধে আক্রান্ত হয়, যা একেবারেই অনুচিত।

মোদ্দা কথা, সারাদিন অন্তর্বাস পরে থাকা, বা রাতে অন্তর্বাস পরে ঘুমানো, আঁটসাঁট অন্তর্বাস, বা স্পোর্টস ব্রা পরার সঙ্গে আর যাই হোক স্তন ক্যানসারের কোন যোগসাজশ এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। অন্তর্বাসের চেয়েও আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আছে যেগুলো স্তন ক্যানসারের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ! তাদের মধ্যে কিছু ঝুঁকির উপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রন নেই, যেমন নারী হয়ে জন্ম নেয়া, বয়স বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি। আবার কিছু ঝুঁকি আমরা চাইলেই এড়াতে পারি, যেমন স্থূলতা, জন্মনিয়ন্ত্রনের বড়ি খাওয়া ইত্যাদি।

‘নো ব্রা ডে” নিয়ে অনেক কথা বললাম। এবার শুনুন ‘ব্রা ডে'র কথা! এই দিবসেরও প্রচলন হয় ২০১১ সালে। প্রচলন করেন কানাডার প্লাস্টিক সার্জন ডঃ মিশেল ব্রাউন। এই ব্রা মানে হলো, BRA অর্থাৎ “Breast Reconstruction Awareness”। এই দিবস পালনের উদ্দেশ্য হলো যাদের স্তনে সার্জারি প্রয়োজন হয় তাদের জন্য ব্রেস্ট রিকন্সট্রাকশনের (প্লাস্টিক সার্জারি) সুযোগ সৃষ্টি করা ও ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে এ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। অক্টোবর মাসের তৃতীয় বুধবার এ দিবসটি পালিত হয়। প্রতি বছর বিশ্বের বহু দেশ এই ইভেন্টে অংশ নেয় এবং অর্থ সংগ্রহ করে। অনেকেই আবার মনে করেন, এই “ব্রা (BRA) ডে'র উপজাত হিসেবেই 'নো ব্রা ডে'র উৎপত্তি।

এখন ‘ব্রা ডে’ অথবা ‘নো ব্রা ডে’ যেটাই পালন করি না কেন, (না করলেও ক্ষতি নেই), আসুন, স্তন ক্যানসার নিয়ে সবাই সচেতন হই। ভুল ধারনাগুলো থেকে বেরিয়ে আসি। চলুন, পরিবারের নারী সদস্যটিকে স্তনের চাকা নিয়ে হীনমন্যতায় না রেখে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে প্রকাশে উৎসাহ দেই। তাদের নিয়মিত নিজেকে নিজে পরীক্ষা করার পাশাপাশি বছরে একবার চিকিৎসককে দিয়ে পরীক্ষা করাতে এবং স্ক্রিনিং করাতে উদ্বুদ্ধ করি। এভাবেই সম্ভব স্তন ক্যানসারে মৃত্যুহার কমানো।

রেফারেন্স:

১। https://en.wikipedia.org/wiki/No_Bra_Day

২। https://www.awarenessdays.com/awareness-days-calendar/national-no-bra-day-
2019/

৩। https://www.daysoftheyear.com/days/no-bra-day/
৪। http://www.holidayscalendar.com/event/national-no-bra-day/

৫। https://nationaldaycalendar.com/national-no-bra-day/
৬। Grismaijer, S., & Singer, S.R. (1995), Dressed to Kill: The Link Between Breast
Cancer and Bras.Garden City Park, New York:Avery Publishing Group.
৭। Hsieh CC, Trichopoulos D. Breast size, handedness and breast cancer risk. Eur J
Cancer. 27:131-5, 1991
৮। Lu Chen, Kathleen E. Malone, and Christopher I. Li. Bra Wearing Not
Associated with Breast Cancer Risk: A Population-Based Case–Control
Study. Cancer Epidemiology, Biomarkers & Prevention, September 2014
৯। Love, Susan, and Karen Lindsey (2005), Dr. Susan Love’s Breast
Book.Cambridge Massachusetts: De Capo Press

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/আরএফ/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন