বৃহস্পতিবার ১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ২ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৭ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

রায়ে সন্তুষ্ট, হাইকোর্টে যেন বহাল থাকে: রিশার মা-বাবা

অক্টোবর ১০, ২০১৯ | ৬:৫০ অপরাহ্ণ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: রিশা হত্যার রায়ে সন্তুষ্টি জানিয়েছেন তার বাবা মো. রমজান হোসেন ও মা তানিয়া হোসেন। তবে হাইকোর্টে আপিল হলেও যেন এই রায় বহাল থাকে এবং দ্রুত কার্যকর হয়, সে আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

২০১৬ সালে বখাটের ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছিল রাজধানীর কাকরাইলে বখাটের ছুরিকাঘাতে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুরাইয়া আক্তার রিশা (১৫)। তিন বছর পর আজ বৃহস্পতিবার (১০ অক্টেবার) সেই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেছেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ। রায়ে মামলার একমাত্র আসামি ওবায়দুল হককে মৃত্যুদণ্ড, পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ দেন বিচারক।

রায় ঘোষণার পর রিশার বাবা মো. রমজান হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার মেয়ে তো চলে গেছে, আমি তো আর মেয়ে পাব না। আদালতের রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। আপিল হলে এ রায় যেন হাইকোর্টে বহাল থাকে। এটুকুই আমাদের চাওয়া, আর কিছুই চাওয়া নেই। আর যেন রায়টা দ্রুত কার্যকর করা হয়।’

পাশেই ছিলেন রিশার মা তানিয়া হোসেন। তিনি বলেন, তিন তিনটি বছর মেয়ে হত্যার বিচারের জন্য আদালতে দৌড়াদৌড়ি করলাম। আজ যে রায় পেয়েছি, তাতে আমরা সন্তুষ্ট। আর আমাদের চাওয়া, এই রায় যেন দ্রুত কার্যকর হয়।

বিজ্ঞাপন

তানিয়া হোসেন বলেন, সন্তান হারানোর যে কী কষ্ট, তা কেউ জানে না। আমার মেয়েটা তো গেছেই, আর কোনো বাচ্চাকে যেন এভাবে অকালে চলে যেতে না হয়।

ভালোবাসা যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়

রায় ঘোষণার সময় বিচারক কে এম ইমরুল কায়েশ বলেন, মামলাটিতে ২২ জন সাক্ষীকে পর্যালোচনা করেছেন আদালত। আসামির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ইটের গাঁদা থেকে রিশাকে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। সাক্ষীদের মধ্যে কয়েকজন প্রত্যক্ষভাবে ঘটনাস্থলে ওবায়দুলকে দেখেছেন। তাদের দেওয়া সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ওবায়দুলের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আনীত অভিযোগ সত্য প্রতীয়মান হয়।

বিচারক আরও বলেন, আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় সাফাই সাক্ষী দেননি। তবে ঘটনার সময় আসামি ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন না বলে স্মারকলিপি আকারে একটি লেখা দেন। তাছাড়া আসামি পক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদ যেসব যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন, সেগুলোও সত্য বলে প্রমাণ হয় না। এসব কারণেই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বিচারক ইমরুল কায়েশ বলেন, রিশাকে পছন্দ করতেন আসামি ওবায়দুল। এটা ঠিক, ভালোবাসার অধিকার সবার রয়েছে। তবে সেই ভালোবাসা যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়, সেদিকে খেলায় রাখতে হবে।

আবেগঘন পরিবেশ আদালতে

রিশা হত্যা মামলার রায় ঘোষণা সামনে রেখে সকালেই আদালত প্রাঙ্গণে হাজির হন রিশার মা, বাবা ও ছোট ভাই-বোন। এছাড়া উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও রিশার সহপাঠীসহ স্কুলের শিক্ষার্থীরাও উপস্থিত হন আদালতে।

এদিন দুপুর ২টা ৫১ মিনিটে ওবায়দুলকে আদালতে হাজির করা হয়। বিকেল ৩টায় রায় পড়তে শুরু করেন বিচারক। ৩টা ২৬ মিনিটে আদালত ওবায়দুলের মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণা করেন।

বিচারক যখন রিশা হত্যা মামলায় রায় পড়ছিলেন, তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন রিশার মা তানিয়া হোসেন। বারবার চোখ মুছছিলেন তিনি।

রায় ঘোষণার পর রিশার সহপাঠীরা বলেন, অপরাধ করে কেউ পার পায় না— আদালতের রায়ে সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। আমরা এ রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানাচ্ছি। রায় দ্রুত কার্যকর হলে অপরাধীরা বার্তা পাবে, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে, হয়রানি করে কেউ পার পাবে না।

রিশাকে হত্যা

কাকরাইলের উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল রিশা। ওই বছরের শুরুর দিকে ইস্টার্ন মল্লিকা শপিং কমপ্লেক্সের বৈশাখী টেইলার্সে একটি পোশাক বানাতে দিয়েছিল রিশা। ওই টেইলার্সের রশিদে রিশার বাসার ঠিকানা ও মায়ের মোবাইল নম্বর উল্লেখ করা ছিল। সেখান থেকে মোবাইল নম্বর নিয়ে টেইলার্সের কাটিং মাস্টার ওবায়দুল খান (২৯) রিশাকে ফোনে উত্ত্যক্ত করতে শুরু করে।

রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেন, এক পর্যায়ে আসামি ওবায়দুল বুঝতে পারেন, রিশা তাকে অপছন্দ করে। এরপর রিশাকে হত্যা করার উদ্দেশে সবজি কেনার কথা বলে ১২০ টাকা দিয়ে ছুরি কেনেন ওবায়দুল। সেই ছুরি দিয়েই পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সময় বুঝে রিশার পেটে আঘাত করা হয়। কয়েকটি আঘাত করার পর আশপাশের লোকজন ওবায়দুলকে দেখে ফেললে তিনি ছুরি ফেলে পালিয়ে যান। পরে দিনাজপুরে গা ঢাকা দেন তিনি।

২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রিশাকে ছুরিকাঘাত করেন ওবায়দুল হক। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৮ আগস্ট মৃত্যু হয় রিশার।

২০১৬ সালের ১৪ নভেম্বর মামলাটি তদন্ত করে ওবায়দুল হককে একমাত্র আসামি করে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রমনা থানার পুলিশ পরিদর্শক আলী হোসেন। পরের বছর ১৭ এপ্রিল মামলার একমাত্র আসামি ওবায়দুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। মামলাটিতে ২৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ২১ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে এই মামলার রায়ের জন্য গত ৬ অক্টোবর দিন নির্ধারণ করেছিলেন বিচারক। তবে ওই দিন আসামি ওবায়দুলকে কারাগার থেকে কারা কর্তৃপক্ষ আদালতে হাজির করেননি। এ জন্য ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ রায় ঘোষণার তারিখ পিছিয়ে ১০ অক্টোবর দিন ঠিক করে দেন।

আরও পড়ুন-

রিশা হত্যা মামলার রায় আজ

রিশা হত্যা মামলার রায় পেছাল

রিশা হত্যা মামলার রায় ৬ অক্টোবর

‘২ বছর আদালতের বারান্দায়, তবু মেয়ে হত্যার বিচার পেলাম না’

রিশা হত্যার ৩ বছর: বিচারের আশায় আদালতের বারান্দায় বাবা-মা

সারাবাংলা/এআই/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন