সোমবার ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

সিএমপিকে ‘চট্টগ্রামমুক্ত’ করার টার্গেট, ক্ষোভ ও অস্বস্তি

অক্টোবর ১২, ২০১৯ | ৮:৫০ অপরাহ্ণ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে (সিএমপি) বিভিন্ন পদে কর্মরত চট্টগ্রাম জেলার স্থায়ী বাসিন্দাদের ‘তালিকা’ করা হচ্ছে। এ নিয়ে সিএমপিতে অস্বস্তি, বদলি আতঙ্ক ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে সিএমপির ১৩ জন কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি করা হয়েছে, যাদের সবাই চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। এরপর সিএমপিতে কর্মরত জন্মসূত্রে চট্টগ্রামের বাসিন্দা, এমন সদস্যদের মধ্যে বদলি আতঙ্কের পাশাপাশি নানামুখী আলোচনাও শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রামের বাসিন্দারা সিএমপিতে চাকরি করতে পারবেন না, পুলিশ সদর দপ্তর অলিখিতভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই আলোচনা পৌঁছেছে চট্টগ্রামের মন্ত্রী-এমপিসহ জনপ্রতিনিধিদের কাছেও। সব মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে সিএমপির জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দারা সিএমপিতে চাকরি করতে পারবেন না, এমন কোনো বিধান পুলিশ প্রবিধান ও সিএমপি অধ্যাদেশে নেই। শুধুমাত্র একটি জেলার বাসিন্দাদের নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এমন সিদ্ধান্ত সুশঙ্খল এই বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে।

গত ১০ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সিএমপির ১৩ কর্মকর্তাকে একযোগে বদলির আদেশ এসেছে। এর মধ্যে বন্দর ও চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ৭ জন পুলিশ পরিদর্শক এবং বাকি ৬ জন বিভিন্ন থানায় কর্মরত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) ও পেট্রোল ইন্সপেক্টর (পিআই) পদমর্যাদার কর্মকর্তা।

বিজ্ঞাপন

বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকান্ত চক্রবর্তীকে সিলেট রেঞ্জে বদলি করা হয়েছে। তিনি দুইমাস আগে বন্দর থানায় দায়িত্ব পেয়েছিলেন। পাহাড়তলী থানার টিআই সুভাষ চন্দ্র দে-কে বদলি করা হয়েছে খুলনা রেঞ্জে। পাঁচলাইশ থানার টিআই কানু দাশকে সিলেট রেঞ্জে বদলি করা হয়েছে। নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আতিক আহমেদ চৌধুরীকে বদলি করা হয়েছে ঢাকায় সিআইডিতে। সিএমপির বিশেষ শাখার ফজলুল করিম সেলিমকে সিলেট রেঞ্জে বদলি করা হয়েছে। অন্যদের কেউ ঢাকায় সিআইডিতে, কেউ চট্টগ্রাম রেঞ্জে, কেউ ঢাকায় পুলিশের বিশেষ শাখায় বদলির আদেশ পেয়েছেন।

এর আগে গত মে মাসে সিএমপির ডবলমুরিং থানার ওসি একেএম মহিউদ্দিন সেলিম এবং আকবর শাহ থানার ওসি জসীম উদ্দিনকে আকস্মিকভাবে বদলির আদেশ দেয় পুলিশ সদর দপ্তর। জসীম উদ্দিন চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা এবং মহিউদ্দিন সেলিম বৃহত্তর চট্টগ্রামের নোয়াখালীর অধিবাসী।

সিএমপির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আকস্মিকভাবে যাদের বিরুদ্ধে বদলির আদেশ দিয়েছে সদর দপ্তর, তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো অনিয়ম কিংবা অদক্ষতার অভিযোগ নেই। তাদের সবার বাড়ি চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায়। শুধুমাত্র চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ায় তাদের এমন আকস্মিক বদলির সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যা অনেকটাই শাস্তিমূলক বদলির মতো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে আকস্মিক বদলিতে অস্বস্ত্বি, অস্থিরতা কিংবা ক্ষোভ দেখছেন না সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরকারি চাকরি বদলির চাকরি। বদলিটা পুলিশ সদর দপ্তর করছে। আমার বাড়ি জামালপুর, আমি চট্টগ্রামে এসে চাকরি করছি। তেমনিভাবে চট্টগ্রামের অফিসাররা বাইরে গিয়ে চাকরি করবে। এতে অস্বস্তি-অস্থিরতা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি অন্তত সেটা দেখছি না। আমি আশা করছি, এটা নিয়ে বড় কোনো সমস্যা হবে না।’

এদিকে গত সিএমপির উপ-কমিশনার (সদর) শ্যামল কুমার নাথ চট্টগ্রাম নগর পুলিশে কনস্টেবল থেকে উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদে কর্মরত চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের তথ্য চেয়ে চিঠি দেন। পুলিশ সদর দপ্তরের মৌখিক নির্দেশের কথা বলে এ চিঠি দেওয়া হয়েছে নগর পুলিশের সকল বিভাগের উপ-কমিশনার, অতিরিক্ত উপ-কমিশনার, সহকারী কমিশনার ও রিজার্ভ শাখার পরিদর্শককে। এ চিঠির পর সিএমপিকে ‘চট্টগ্রামের বাসিন্দামুক্ত’ করার বিষয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, ‘সিএমপি থেকে বদলির টার্গেট নিয়ে শুধুমাত্র চট্টগ্রামের বাসিন্দা এমন সদস্যদের তালিকা করা হচ্ছে। এটা বৈষম্যমূলক। সিএমপিতে দেশের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দারা আছেন। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি জেলার বাসিন্দাদের কেন তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে? চট্টগ্রামের বাসিন্দা তো অন্যান্য জেলার তুলনায় খুবই নগণ্য। পরিকল্পিতভাবে এই কাজটি করা হচ্ছে।’

জানতে চাইলে উপ-পুলিশ কমিশনার শ্যামল কুমার নাথ সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রশাসনিক কারণে এই চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এখন আর সেটা কার্যকর নেই।’

সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান দাবি করেছেন, চট্টগ্রামের বাসিন্দা পুলিশ সদস্যদের তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়ার সঙ্গে সদর দপ্তরের বদলি আদেশের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি সিএমপির অভ্যন্তরীণ বিষয়।

১৩ জনকে একযোগে বদলির পর গত তিনদিন ধরে চলা সিএমপির এই অস্থিরতার খবর পেয়েছেন চট্টগ্রামের কয়েকজন জনপ্রতিনিধিও। পুলিশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হওয়ায় কেউ এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে রাজি হননি। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের এই সিদ্ধান্ত উর্দ্ধতন পর্যায়ে অবহিত করার কথা জানিয়েছেন কয়েকজন জনপ্রতিনিধি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জনপ্রতিনিধি সারাবাংলাকে বলেন, শুধুমাত্র চট্টগ্রামকে টার্গেট করে বদলি আদেশ দেওয়া হয়রানিমূলক। যদি বদলি করতে হয়, তবে সকল ইউনিটে একইভাবে করা উচিৎ। অন্যান্য জেলার বাসিন্দারা যদি তাদের স্ব স্ব জেলায় চাকরি করতে পারেন, চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে ভিন্ন নিয়ম কেন?’

সিএমপি থেকে শুধুমাত্র চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনের ব্যত্যয় দেখছেন চট্টগ্রাম মহানগর পিপি ফখরুদ্দিন চৌধুরী। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘পুলিশ বাহিনীতে বদলি হয় পুলিশ প্রবিধান অনুযায়ী। সেই প্রবিধান কিংবা সিএমপি অধ্যাদেশ কোথাও সুনির্দিষ্টভাবে এ ধরনের কোনো আইন নেই। তবে প্রথা আছে যে, নিজ জেলায় চাকরি করা যাবে না। কিন্তু চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ এবং সিএমপি তো আলাদা ইউনিট। এভাবে বদলির ক্ষেত্রে আমি মনে করি, সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে কেউ রিট করলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হবে। এরপরও প্রশাসনিক প্রয়োজনে অবশ্যই বদলি করা যায়। কিন্তু একটি জেলার ক্ষেত্রে যদি এমন নিয়ম করা হয়, তাহলে পুলিশ প্রবিধান এবং সিএমপি অধ্যাদেশ- দুটোর বিধিবিধানে পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে।’

সচেতন নাগরিক কমিটি- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের লোক চট্টগ্রামে চাকরি করলে যে বাড়তি সুবিধা পাবেন সেটা নয়। অনেকক্ষেত্রে হয়রানি বেশি হয়। তবে এটা ঠিক যে, ভাষা ও সংস্কৃতিগত বৈচিত্র্যের কারণে চট্টগ্রামের অপরাধের ধরণও কিছুটা আলাদা। সেক্ষত্রে চট্টগ্রামের লোক হলে সেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যায়। এরপরও প্রশাসনিক প্রয়োজনে অবশ্যই বদলি করা যাবে। তবে সেক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করতে হবে। চট্টগ্রামের বাসিন্দা কর্মকর্তারা তাদের চাকরিবিধি লঙ্ঘন করেছেন কি না, শপথ ভঙ্গ করেছেন কি না কিংবা তাদের বদলি করলে কি সুবিধা হবে- সেসব উল্লেখ করে বদলি করতে হবে। না হলে, অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা থেকে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এক যাত্রায় দুই ফল হওয়া যাবে না। এই আইন যদি হয়, দেশের সকল জেলার জন্য হতে হবে। পুলিশের সকল ইউনিটের জন্য হতে হবে। চট্টগ্রামের জন্য এক নিয়ম, অন্যান্য জেলার জন্য আরেক নিয়ম হলে বাহিনীর শৃঙ্খল, চেইন অব কমান্ড প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আমরা চাই দেশের প্রতিটি বাহিনী সুশৃঙ্খল থাক। এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, যাতে কোনো একটি জেলা বা অঞ্চলের মানুষ নিজেদের বঞ্চিত মনে করে।’

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/আরডি/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন