শুক্রবার ২২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৪ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

স্তন ক্যানসার রোধে ভীতি নয়, প্রয়োজন সচেতনতা

অক্টোবর ১৫, ২০১৯ | ১১:৩০ অপরাহ্ণ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: স্তন ক্যানসার রোধে দরকার সচেতনতা। আর সে সচেতনতার শুরু করতে হবে নিজের স্বাস্থ্য সচেতনতা থেকেই। পাশাপাশি পারিবারিক সচেতনতাও জরুরি। ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি হয় কুসংস্কার থেকে। এর জন্য অনেকেই সঠিক চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা নিতে যান। এতে করেই আরও জীবনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েন রোগীরা। প্রতিবছর ১২ হাজার ৭৬৪ নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (১৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউন কার্যালয়ে নারী সাংবাদিকদের জন্য ‘স্তন ক্যানসার সেলফ স্ক্রিনিং’ কর্মশালায় এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়। বাংলা ট্রিবিউন ও রোটারি ক্লাব অব ঢাকা ম্যাভারিকস যৌথভাবে কর্মশালাটির আয়োজন করে।

রোটারি ক্লাব অব ঢাকা ম্যাভারিকস আয়োজিত তৃতীয় আন্তর্জাতিক ক্যানসার মেডিক্যাল মিশন ২০১৯-এর অংশ হিসেবে এই কর্মশালা আয়োজন করা হয়। ওয়ার্ল্ড হেলথ, পোর্টল্যান্ড মেইনের সৌজন্যে এই কর্মশালাটি পরিচালনা করেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগত তিন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ। ২০১৭ সাল থেকে রোটারি ক্লাব অব ঢাকা মাভেরিকস এই মিশন আয়োজন করে আসছে। এ বছর ১২ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্যানসার বিশেষজ্ঞ দলটি কর্মশালা পরিচালনা করবে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

কর্মশালায় বক্তব্য রাখেন বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেল, ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট অব পার্টনার্স ওয়ার্ল্ড হেলথের ক্যানসার বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ ম্যাকক্যালান, ক্যানসার সার্জন ডাক্তার সুজানে হোয়েক্সট্রা ও ফিজিও থেরাপিস্ট মেরি বার্গ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রোটারিয়ান ও পুষ্টিবিদ সুষ্মিতা খান। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন রোটারি মাভেরিকসের ক্যানসার সচেতনতা বিষয়ক প্রকল্প পরিচালক শামস রাশেদ জয়।

কর্মশালা শুরুতেই বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেল রোটারি ম্যাভেরিকসের সদস্য ও আগত চিকিৎসকদের বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, আমরা সবাই জানি, প্রতিবছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব স্তন ক্যানসার সচেতনতা দিবস উদযাপন করা হয়। মাসজুড়েই চলে সচেতনতা বিষয়ক কার্যক্রম। দুঃখজনক হলেও সত্যি, সারাবিশ্বে স্তন ক্যানসারে নারী মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।

ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসারের (আইএআরসি) হিসাব তুলে ধরে জুলফিকার রাসেল বলেন, ওই হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর ১২ হাজার ৭৬৪ নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৮৪৪ জন মারা যান। তাই আমাদের প্রয়োজন সচেতনতা। সে কারণেই রোটারি ক্লাব অব ঢাকা ম্যাভেরিকসের সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউন যৌথভাবে নারী সাংবাদিকদের জন্য এই কর্মশালার আয়োজন করেছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা ট্রিবিউন সর্বস্তরে ক্যানসার বিষয়ক সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করবে বলে তিনি জানান।

ক্যানসার বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ ম্যাকক্যালান বলেন, ক্যানসারের সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে, স্তনের সমস্যা হচ্ছে জেনেও অনেকেই চিকিৎসকের কাছে যান না। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যান না মায়েরা। বিশেষ করে যাদের বিয়ের যোগ্য মেয়ে আছেন। গ্রামের নারীরা মনে করেন, তাদের যদি স্তনে কোনো সমস্যা হয়, তাহলে তাদের মেয়েদের বিয়েই হবে না। অনেকে আবার মনে করেন, এ ধরনের অসুখের কারণে তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। এসব আশঙ্কার কারণে অনেকেই একেবারে শেষ মুহূর্তে চিকিংৎসকের কাছে যান। তখন আর কিছুই করার থাকে না।

এলিজাবেথ বলেন, স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জরুরি সচেতনতা। এ বিষয়ে জানা, শিক্ষিত হওয়া। নিজের জানার পাশাপাশি জানাতে হবে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও। তাই নিজেদের স্তন নিজেদেরই পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষা করার একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। সেই পদ্ধতে যে কেউ ঘরে বসেই নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষা করতে পারবেন। এই পরীক্ষাটি স্তন পরীক্ষার একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো ধরনের লাম্প বা গোটার মতো কিছু যদি হাতে লাগে, তাহলেই যেতে হবে চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসক ছাড়া অন্য কারও কাছে গিয়ে এর সঠিক রোগ নির্ধারণ করা যাবে না। তাই চিকিৎসকের কাছেই যেতে হবে।

ডা. সুজানে হোয়েক্সট্রা বলেন, সাধারণত ৩০ বছরের পর পর্যন্ত কোনো মেয়ে যদি তার প্রথম বাচ্চা না নেয়, অথবা কারও যদি ৩০ বছরের পরও বাচ্চা না হয়, সেই মেয়েটি স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এছাড়া বাচ্চা হওয়ার পর বাচ্চাকে বুকের দুধ না খাওয়ানো, হরমোনের সমস্যা থাকলে হরমোনাল কোনো ওষুধ নিয়মিত খেলে, মানসিক চাপ, ‍ধুমপান করা, অতিরিক্ত ওজন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে বসে কাজ করা, সুষম খাদ্য গ্রহণ না করা এবং এলকোহল গ্রহণের কারণে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হয়।

সুজানে বলেন, স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি থেকে দূরে থাকতে হলে ওজন অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। প্রতি সপ্তাহে ১৫০ মিনিট ব্যায়াম করতে হবে, খেতে হবে সুষম খাদ্য। তিনি আরও বলেন, সুষম খাদ্য বলতে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ফল, সবজি, শস্য, আমিষ ও দুধজাতীয় খাবার থাকতেই হবে। এই কাজগুলো নিয়মিত করা হলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যায় বলে জানান তিনি।

কর্মশালায় জানানো হয়, পারিবারিক ইতিহাস থাকলেও যেমন স্তন ক্যানসার হতে পারে, তেমনি ইতিহাস না থাকলেও হতে পারে। ক্যানসার নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বেশকিছু ভীতি আছে, যা ঠিক নয়। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে স্তন ক্যানসার ভালো হয়। এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। প্রতিমাসে নিজেদের স্তন নিজেদের পরীক্ষা করে দেখা, কোনো সন্দেহ তৈরি হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, মেমোগ্রাফি করা, বিশেষ করে ৪০ বছরের চেয়ে বেশি বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এটি বেশি জরুরি।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন