মঙ্গলবার ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

রোমিওপ্যাথি

অক্টোবর ১৬, ২০১৯ | ৬:২৯ অপরাহ্ণ

পলাশ মাহবুব

রুমমেট ছোটভাই ইতিমধ্যে রোমিও হিসেবে বেশ নাম কামিয়েছে। বসন্তের পাতা ঝরার মতো বছরান্তে তার প্রেমিকা ঝরে যায়। পরপর দুটি বসন্ত এক প্রেমিকা নিয়ে এখন পর্যন্ত তাকে দেখা যায়নি। প্রেমে পড়ার এবং প্রেমিকা ধরার পদ্ধতি সে ভালোই রপ্ত করেছে সে।
সেই রোমিও ছোট ভাই একদিন আসলো এক আবদার নিয়ে।
ভাই . . .
হু।
জামাটা কইত্থিকা কিনছেন? জামাটার মইধ্যে একটা ঝিলিক দেওয়া সৌন্দর্য আছে। আপনারে মানাইছেও খুব। আপনার ব্যক্তিত্ব আর জামার ঝিলিক মিল্লা একটা ব্যাপার তৈরি হইছে কিন্তু। খেয়াল করছেন?
হু, বুঝলাম। এবার আসল কথা বল।
যেইটা বললাম সেইটা কি নকল কথা! ছোটভাই চেহারার মধ্যে কৃত্রিম হতাশার ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে।
নকল কথা না হলেও কথার কথা। আসল কথা এখনো তোর পেটের মধ্যে। সেজন্য ডিনার করার আগেই তোর পেট ফোলা ফোলা লাগছে।
কি যে কন না ভাই আপনি।
ঠিকই বলছি। কারণ এই জামার প্রশংসা তুই সপ্তাহ খানেক আগেও একবার করেছিস। তখন অবশ্য অন্য কথা বলেছিলি- আপনার জামাটার মইধ্যে একটা গাম্ভীর্য আছে। এক সপ্তাহের মধ্যে গাম্ভীর্য ঝিলিকে রূপান্তরিত হয়েছে। অথচ নতুন জামা এরমধ্যে দুইবার ধোয়াও হয়ে গেছে।
বুঝছি। আপনারে প্রশংসা কইরাও লাভ নাই।
লাভ আছে। একলাইন প্রশংসা করে কত কিছু করিয়ে নিচ্ছিস আমাকে দিয়ে। কি ভাবিস? আমি বুঝি না। সব বুঝি।
ছোট ভাই ধরা খাওয়া হাসি হাসে।
তা অবশ্য ঠিক। তবে এইটাও কিন্তু ঠিক আমি টুকটাক সুবিধা নেই বলেই আপনার মেধার চর্চাটা ঠিকঠাক হচ্ছে। মেধা হইলো লোহার মতো। ঘঁষার ওপরে না রাখলে প্রতিভা কষা হইয়া যায়। তখন আর বাইর হইতে চায় না। একে বলে ‘প্রতিভাকাঠিন্য’। অনেকটা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো ব্যাপার।
শুধু চর্চায় হয়না। খরচাও লাগে। বল এবার। কি ধান্দা নিয়ে এসেছিস। আমি ছোট ভাইকে তাড়া দেই।
ছোট ভাই আশপাশে তাকিয়ে বার দুয়েক মাথা চুলকায়।
ভাই, আপনেতো ওরে চিনেন।
কারে?
আরে, ওই যে আমার ইয়া রে...
ইয়া রে! সে তো প্রতি ইয়ারে ইয়ারে চেঞ্জ হয়।
ছোটভাই ধরা খাওয়া হাসি হাসে।
জানেনইতো আমি নিউজের লোক। সবসময় নতুনের মধ্যে থাকতে হয়। সামথিং নিউ। সেইজন্য আরকি মাঝে মধ্যে বদলাইতে হয়।
ওহ। কিন্তু নতুনটারে তো চিনি না। আমি জবাব দেই।
আচ্ছা আপনার লগে পরিচয় করামু নে। সময় চইলা আসছে।
সময় চলে আসছে? কিসের? মেয়াদ শেষের?
আরে না। কালকা আমার গার্লফ্রেন্ডের জন্মদিন। আপনেরে নিয়া যামু লগে।
আমাকে!
হ।
তা বিনিময়ে কি করতে হবে বলে ফেল। স্বার্থ ছাড়া যে তুই এই কাজ করবি না সে আমার ভালো জানা আছে।
বিনিময় কইতেছেন ক্যান ভাই। বলেন ভালোবেসে কি করতে হবে।
গার্লফ্রেন্ড তোর আর ভালোবাসা দেবো আমি!
আপনে নাহ একটা ‘যাহ দুষ্টু’ টাইপ লোক। আলগা অভিমান মিশিয়ে আবদারের হাসি হাসে ছোট ভাই।
ভাই, ওর জন্মদিন উপলক্ষে অল্পের মইধ্যে সুন্দর দেইখা একটা কিছু লেইখা দেন। আমি শুধু ইতিটা বসাইয়া লমু। ইতি, তোমার আমি।
সেটাতো আমিও বসায়া দিতে পারি।
না ভাই। পুরাটা ভেজাল দেওয়া ঠিক হবেনা। আপনি সাহিত্য মিশাইয়া প্রেম ভালোবাসা নিয়া কয়েকটা লাইন লেইখা দেন। বোঝেনইতো, মেয়েরা শিল্প-সংস্কৃতি লাইক করে। মেয়েদের মন সংস্কৃতিবান্ধব।
তাই নাকি! তা আগেরজন তো সংস্কৃতি লাইক করতো না।
ওর কথা আর কইয়েন না ভাই। বাপ ইটের ভাটার মালিক তাই মাইয়ার মন-দিল আছিলো ইটের মতো শক্ত।
হা হা হা। রোমিও ছোট ভাইয়ের কথা শুনে আমি না হেসে পারিনা।
তা বর্তমানে যিনি আছেন তার মন-দিলের কি অবস্থা?
নরম, নরম। বাংলার ছাত্রী। জীবনানন্দ দাশরে চেনে। শঙ্খ ঘোষ-জয় গোস্বামীর কবিতা পড়ে। আজিজ মার্কেটে ঢু মারে। আগেরটার মতো টান দিয়া শাড়ির দোকানে নিয়া যায় না।
তাই?
হ ভাই। দেননা কিছু লেইখা। আপনার মইধ্যে তো একটা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আছে। এখন যৌবন যার... ড্যাস, ড্যাস, ড্যাস।
আচ্ছা ঠিক আছে। একটা কাগজ দে।
ছোটভাই পুরো খাতা বাড়িয়ে দেয়।
আমি খাতার একটা পাতায় লিখলাম- শুভ জন্মদিন...
আচ্ছা তোর গার্লফ্রেন্ডের নাম যেন কি?
ধুর ভাই, ফাইজলামি না। দুই-চার লাইনে কবিতা-টবিতা কিছু একটা লেইখা দেন। এমন কিছু লেখেন যাতে সেইটা পড়ে ওর মধ্যে প্রেমের আগ্রাসন তৈরি হয়। ওর নাম তুষ্টি। তুষ্টি কর।
বললাম, ভালো কিছু চাইলে একটু অপেক্ষা কর। অপেক্ষার ফল মধুর হয়রে পাগলা।
ওকে ভাই। আমি মধু দিয়া র’চা বানাইয়া আনি আপনার জন্য।
সেটাতো আরও ভালো হয়।
আচ্ছা ভাই... ছোট ভাই হাত কচলায়।
আবার কি?
মধুর সাথে একটু মমতা মিশায়া দিয়েন। বুঝেনইতো প্রেমের প্রথম দিকে শুধু মধুতে কাজ হয় না। মমতারও দরকার আছে।
হুম। ঠিক। তো দেশি মমতা মিশাবো নাকি ইন্ডিয়ান? আই মিন...
ভাই পেচাইয়েন না তো। দ্যান না।
কিছুক্ষন ভেবে মধুর সাথে খানিকটা মমতা মিশিয়ে লিখলাম-
'ওগো আমার তুষ্টি কর-
প্রেম দিয়েছো পুষ্টিকর।'
তারপর ছোটভাইকে দিয়ে বললাম, এইবার তুই সেন্ড কর।
ছোটভাই গার্লফ্রেন্ডকে এসএমএস করলো। সাথে আমাকেও। পরদিন গার্লফ্রেন্ডকে সে ট্রিট দেবে। আমিও আমন্ত্রিত।

বিজ্ঞাপন

পরদিন সন্ধ্যা হওয়ার আগে আগে ছোট ভাইসহ বের হলাম।
কিছু একটা নিয়ে যাওয়া উচিত তাই ফুল কিনতে গেলাম।
ছোট ভাই অনেকটা সময় নিয়ে যাচাই-বাছাই করে এমন এক তোড়া নিয়ে আসলো যাতে ফুটফুটে ফুল বলতে কিছু নেই। সব কলি।
এইটা কি আনলি? জাটকা ফুল মনে হচ্ছে।
ক্যান, ঠিকই তো আছে ভাই। আমার কথাকে গুরুত্ব দেয়না ছোট ভাই।
ঠিক আছে মানে! বুঝলাম কলিকাল চলছে। তাই বলে ফুলের বদলে কলি দেওয়ার সিস্টেম চালু হইছে নাকি?
না ভাই। আমার গার্লফ্রেন্ড তাজা ফুল পছন্দ করে।
তাহলে তাজা ফুল নে। আছে তো।
লাভ নাই ভাই। ঢাকা শহরে জ্যামের যে অবস্থা জায়গা মতো যাইতে যাইতে তাজা ফুল বাসি হইয়া যাইবো।
সেজন্য তুই কলি নিচ্ছিস!
হুম। ছোটভাই বুদ্ধিমানের হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকায়।
পৌঁছতে পৌঁছতে দেখবেন সব কলি ফুল হইয়া গেছে।

পলাশ মাহবুব : সাহিত্যিক ও নাট্যকার। উপ সম্পাদক, সারাবাংলা।

অলংকরণ : আবু হাসান

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন