মঙ্গলবার ১২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৮ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৪ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

এরশাদের মৃত্যুর পর নিষ্ক্রিয় জাপার হাইকমান্ড, নজর কাউন্সিলে

অক্টোবর ১৭, ২০১৯ | ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

আজমল হক হেলাল, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: জোটের ও ভোটের রাজনীতিতে বরাবরই ফ্যাক্টর ছিলেন সাবেক সেনাশাসক ও জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। বিভিন্ন আমলে সরকার গঠনে তার প্রতিষ্ঠিত দলকে রাজনীতির বাজারে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন নিয়ামক হিসেবে। কিন্তু এরশাদের প্রয়াণে সেই জাতীয় পার্টি রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকটাই ‘প্রভাবহীন’। এরশাদের প্রয়াণের পর দলটি ভাঙনের মুখেও পড়েছিল। সেই ভাঙন শেষ পর্যন্ত ঠেকানো গেলেও গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি জাতীয় পার্টি। বরং নানা সমীকরণে দলের হাইকমান্ড বা শীর্ষ নেতৃত্ব এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। ‘এরশাদের আসন’ হিসেবে পরিচিত রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে স্থানীয়ভাবে কিছু রাজনৈতিক কার্যক্রম দেখা গেলেও সার্বিকভাবে বলতে গেলে ঝিমিয়ে পড়েছে জাপা। তবে কেউ কেউ বলছেন, আসছে কাউন্সিলকে ঘিরেই কৌশলে ব্যস্ত শীর্ষ নেতৃত্ব। কাউন্সিলের পর বোঝা যাবে দলের প্রকৃত অবস্থা কী।

বিজ্ঞাপন

পার্টির নেতাকর্মীদের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, এরশাদবিহীন জাপার গন্তব্য কোথায়? এই দল কি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে? নাকি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে লেজুড়বৃত্তিক কর্মকাণ্ডই চালিয়ে যাবে? দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার পর জি এম কাদের চেষ্টা করছেন দলকে চাঙ্গা করতে। তার আশা, জাতীয় পার্টি নিজের পায়ে দাঁড় করাবেন নিজের নেতৃত্বে, ভোটের মাঠে ও জনস্বার্থ নিয়ে তারা রাজপথে লড়বেন এককভাবে। কিন্তু তার সেই আশা বাস্তবায়নে কাউকে পাশে পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা।

জানতে চাইলে জাপা’র সাংগঠনিক সম্পাদক মোবারক হোসেন আজাদ বলেন, আমাদের দলটি এরশাদকেন্দ্রিক দল ছিল, এটা বলাই যায়। তার প্রয়াণের প্রভাব তো রয়েছেই। তার অনুপস্থিতিতে দলের সবাই অ্যাকটিভ নয়। তবে চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে চেষ্টা চলছে দলকে সুসংগঠিত করে এগিয়ে নেওয়ার।

এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে দেখা দিয়েছিল চরম অনিশ্চয়তা। এরশাদ নিজে জীবিত অবস্থায় তার অবর্তমানে ছোট ভাই জি এম কাদেরকে পার্টিতে তার জায়গায় বসিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী এরশাদ মারা গেলে জি এম কাদের নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। তবে তার বিরোধিতা করেন এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ। পরে জি এম কাদের নিজেকে সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা করতে স্পিকারকে চিঠিও দেন। একপর্যায়ে রওশন নিজেকে জাতীয় পার্টির সভাপতিই ঘোষণা করে বসেন। পরে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বসে সিদ্ধান্ত নেন, জি এম কাদের থাকবেন দলের চেয়ারম্যান, সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা থাকবেন রওশন এরশাদ। তাতে ভাঙন থেকে রক্ষা পায় জাতীয় পার্টি।

তবে এরপর থেকে জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতাদের তেমন কোনো কর্মকাণ্ড চোখে পড়ে না। সর্বশেষ রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন ঘিরে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সাদ এরশাদকেই প্রার্থী মেনে নিয়েছিলেন সবাই। তবে নির্বাচনি প্রচারণায় তার পেছনে দলকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা যায়নি।

এদিকে, জি এম কাদেরকে মাঝেমধ্যে এখানে-ওখানে কিছু অনুষ্ঠানে দেখা গেলেও রওশন এরশাদ বা পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাঁর দেখা মিলছে না। বলতে গেলে তাদের প্রকাশ্য কোনো কার্যক্রমই নেই। শুধু তাই নয়, জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ফিরোজ রশিদসহ কারও কোনো তৎপরতাই চোখে পড়ার মতো নয়।

এ সর্ম্পকে সিনিয়র একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য তার নাম গোপন রাখার শর্তে জানান, সবার নেতৃত্বে রাজনীতিতে তৎপর থাকা যায় না। জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে আমুল পরিবর্তন আসবে। কাউন্সিলের পরে জাতীয় পার্টির কোন্দল আরও চরম আকার ধারণ করবে।

এদিকে, জাপার ভাইস প্রেসিডেন্ট জহিরুল ইসলাম জহির বলেন, ‘সবাইকে সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। এখন বিএনপি মাঠে নেই, আওয়ামী লীগে দুর্নীতি। সবকিছু মিলিয়ে জাতীয় পার্টির দিকে জনগণ ভিড়বে বলে আশা করি।’

দলে শীর্ষ নেতাদের অনেকেরেই নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দলের ভেতর গ্রুপিং এরশাদ আমলেও ছিল, এখনো আছে। সুযোগসন্ধানী কেউ এসবের মধ্যে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সামনে জাতীয় পার্টির কাউন্সিল। আশা করি কাউন্সিলের পর এই অবস্থার অনেক উন্নতি হবে।’

অন্যদিকে, বসে নেই জি এম কাদের কেন্দ্রিক জাপার একটি অংশ। জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান রেখেই পার্টিতে রওশন এরশাদ বলয়কে দুর্বল করতে চান এই অংশের নেতারা। পার্টির চেয়ারম্যানের চেয়ার, সংসদের উপনেতা, সদ্য অনুষ্ঠিত রংপুরের উপনির্বাচনসহ গুচ্ছ ইস্যুতে কাদের ও রওশানের মধ্যে যে বিরোধ চলছিল, তার দৃশ্যত সুরাহা হয়েছে। সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য থেকে একে অন্যকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে ছাড় দিয়েছেন। কিন্তু নিজ নিজ টার্গেট থেকে সরেনি কেউই। দুই পক্ষই সীমা রেখা টেনেছেন কাউন্সিল ঘিরে। দলের নেতারা বলছেন, কাউন্সিলের পরই হয়তো দুই পক্ষের আসল রূপ বেরিয়ে আসবে।

জাতীয় পার্টির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এখন তৃণমূল নেতাকর্মী, এমনকি সাধারণ মানুষের কাছেও জাতীয় পার্টি আর আগের মর্যদায় নেই। এই পার্টির প্রধান অলঙ্কার ছিলেন এরশাদ। পার্টির পুঁজি ছিলেন এরশাদ। তার বিদায়ে দলের নেতারা, পরিবারের সদস্যরা যেমন বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন, তেমনি কর্মীরাও পার্টিবিমুখ হয়েছেন।’

এরশাদকে চৌকস রাজনীতিবিদ আখ্যা দিয়ে ওই নেতা বলেন, ‘ক্ষমতাসীন বলেন আর বিরোধী পক্ষ বলেন, কারও কাছেই এই পার্টির বর্তমান শীর্ষ নেতার রাজনৈতিক দাম এরশাদের মতো নেই। এরশাদ যে চাপ দিতেন, তার ধারেকাছে যাওয়ার মতো সক্ষমতা জি এম কাদের বা রওশন এরশাদের মধ্যে নেই।’

ভোটের রাজনীতিতে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের মিত্র হিসেবে ছিলেন জেনারেল এরশাদ ও তার দল জাতীয় পার্টি। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে সরাসরি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকেই অংশ নিয়েছিল দলটি। এর পর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এবং সর্বশেষ গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে জাতীয় পার্টি ২২টি আসন নিয়ে বিরোধী দলের আসনে বসেছে।

এর আগে জেনারেল এরশাদ ১৯৯৮ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে যোগ দিয়ে কিছুকাল পরেই আবার জোট ত্যাগ করেন। ২০১৭ মহাজোট থেকে বেরিয়ে এরশাদ নিজেই সম্মিলিত জাতীয় জোট (সংক্ষেপে ইউএনএ) তাতে ডানপন্থি ও মধ্য ডানপন্থি ৫৮টি দল শরিক হয়। ২০১৮ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি সমাবেশও করেন। কিন্তু সে জোটের হদিস নেই।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এএইচএইচ/একে/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন