শুক্রবার ২২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৪ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘রাসেল দরদী মনের ছিল, দেশকে অনেক কিছু দিতে পারতো’

অক্টোবর ১৯, ২০১৯ | ১:০৩ পূর্বাহ্ণ

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: শেখ রাসেলের ভিতরে একটা দরদী মন ছিল। সে বেঁচে থাকলে এ দেশের জন্য হয়তো অনেক কিছু করতে পারত বলে মন্তব্য করেছেন তার বড় বোন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদ আয়োজিত এক আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শহীদ শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষে আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যের আগে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কারপ্রাপ্ত শিশু-কিশোরদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। এরপর দ্বিতীয় পর্বে মঞ্চের সামনের আসনে বসে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দেখেন।

অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের বাসায় পরিবারের সব থেকে ছোট রাসেল। রাসেলের জন্ম হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। ঠিক যে মুহূর্তে রাসেলের জন্ম হয়, সে সময় আব্বা খুব ব্যস্ত। তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফাতেমা জিন্নাহ প্রার্থী। তিনি সেই নির্বাচনে প্রচারণার কাজে চট্টগ্রামে ছিলেন। অত্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন। রাসেলের জন্ম হওয়ার পর আমরা তাকে খবর দেই।’

বিজ্ঞাপন

২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও বঙ্গুবন্ধুর সঙ্গে রাসেল।

শেখ রাসেলের বড় বোন হাসিনা আরও বলেন, ‘আমরা কামাল-জামাল এবং রেহানা, চার ভাই বোন উদ্বিগ্ন হয়ে বসে ছিলাম। ওই ছোট্ট শিশুটির জন্ম মুহূর্তটা এবং তারপর তাকে কোলে নেওয়া। তাকে লালন পালন করা। তারপর আশপাশে থাকা। ১৯৬৪ সালে ১৮ অক্টোবর রাসেলের জন্ম হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৬৬ সালে ছয় দফা ঘোষণা করলেন। যে ছয় দফা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ।’

ছয় দফা দাবির কারণে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে কারা অন্তরীণ করা হয়। সেই সময় ছোট্ট রাসেল তার পিতাকে খুঁজে ফিরতেন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সে বাবাকে ছাড়া আসবে না। বাবাকে নিয়েই ঘরে ফিরবে। সেই সময় আমার বাবা বলতে বাধ্য হলেন, এটা আমার বাড়ি আমি থাকি, তুমি তোমাদের বাড়িতে যাও, মায়ের বাড়িতে যাও।’

ছোট্ট রাসেলের সুখস্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে একসময় আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা।

নিজেকে সামলিয়ে তিনি বলেন, ‘তখনো সে ভালো করে কথাও বলতে পারে না। তারপরও সে প্রচণ্ড কান্নাকাটি করত। তারপর অনেক ভুলিয়ে বালিয়ে আমাদের নিয়ে আসতে হতো। যেদিন আমরা জেলখানায় দেখা করতে যেতাম, সেই দিন সে খুব অস্থির থাকত। ভাল করে ঘুমাতে চাইত না, খেতে চাইত না। অনেক সময় মধ্য রাতে ঘুম থেকে উঠে বসত আমাদের সবাইকে ডাকত। আমরা সব ভাইবোন তখন তার কাছে যেয়ে বসতাম।’

‘সে কিছু বলতে পারছে না। সে তার মনের ব্যাথাটা জানাতে পারছে না। কিন্তু তার সেই অব্যক্ত ব্যথা বেদনাটা আমরা বুঝতে পারতাম। এভাবেই সে বড় হয়ে ওঠে। বাবাকে বাবা বলে ডাকাও শুরু করে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটা ছোট্ট শিশু পিতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত, আমরা তো বঞ্চিত ছিলামই। কিন্তু এই ছোট্ট বাচ্চাটা। এরপর ৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা আমাদের দেশের ছাত্রসমাজ দেশের জনতা, আমাদের সংগঠনের সকলে মিলে আন্দোলন সংগ্রাম করে গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে সেই মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে মুক্ত করে নিয়ে আসল। তখন রাসেল বাবাকে বাড়িতে পেল। তখন একটা জিনিস আমরা লক্ষ্য করতাম। সে খেলার ছলে কিছুক্ষণ পরপর আব্বা কোথায় আছেন দেখতে আসত।’

‘আমাদের ৩২ নম্বরের যে ছোট্ট বাড়িটি সেখানে যে লাইব্রেরি ঘরটা আছে, ওখানেই তিনি (বাবা) বসতেন। পার্টির নেতাদের সাথে কথা বলতেন এবং তখন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়াসহ অনেক কাজ। সেখানেই সে কিছুক্ষণ পর পর ছুটে আসত’- বলে জানান শেখ হাসিনা।

ছোটভাই শেখ রাসেলকে কোলে নিয়ে বড় বোন শেখ হাসিনা।

‘২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তখনই তাকে গ্রেফতার করা হয় আবার রাসেল পিতৃস্নেহ বঞ্চিত। এরই একটি পর্যায়ে আমাদের সকলকেই গ্রেফতার করা হল। ১৮ নভেম্বর ধানমন্ডির একটি বাড়িতে নিয়ে রাখা হল। খুব চাপা স্বভাবের ছিল। সহসা নিজে কিছু বলত না। তার চোখে সবসময় পানি। যদি বলতাম পানি কেন? বলত চোখে যেন কি পড়েছে। ওইটুকু ছোট্ট বাচ্চা, সে তার নিজের মনের ব্যাথাটা পর্যন্ত কিভাবে লুকিয়ে রাখত, আমার ভাবতে অবাক লাগে। কারণ আমার ছোট ভাই কামাল, সে মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছে। জামাল বন্দিখানা থেকে গেরিলা কায়দা বের হয়ে সেও মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছে।’

শেখ হাসিনা শেখ রাসলের সাথে একই বাসায় বন্দী জীবনের স্মৃতি হাতড়িয়ে আরও বলেন, ‘আমি তখন অন্তঃস্বত্তা ছিলাম। আমার কোলে জয় এল। ....যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সেই যুদ্ধের সময় যখন আক্রমণ হত, বিশেষ করে যখন এয়ার রেড হতো, রাসেল পকেটে সবসময় একটি তুলা রাখত এবং নিজের কানে দিত এবং ছোট্ট জয়ের কানে দিয়ে দিত। যেন ওই আওয়াজে জয়ের কোনো ক্ষতি না হয়। কারণ একতলা বাসা। সেখানে মেশিনগান ফিট করা ছিল। অনবরত গোলা গুলির আওয়াজ হত। জয়কে বিছানায় শুয়ে রাখা যেত না। অত্যন্ত ছোট্ট বাচ্চা, সব সময় কোলে রাখতে হতো। কিন্তু রাসেল খুব খেয়াল রাখত জয়ের প্রতি। সবসময় তার দিকে বিশেষ নজর সে দিত।’

স্বাধীনতার পর যখন বিজয়ের পরে আব্বা যখন ফিরে এলেন এ কারণে রাসেল সবসময় বাবার সাথে থাকত বলেও জানান তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট একই সাথে ওই বাড়িতে একটি প্রাণীও বেঁচে থাকতে পারিনি। কিন্তু আমি আর আমার ছোট বোন রেহানা আমরা তখন জার্মানিতে ছিলাম। জার্মানিতে যেহেতু ছিলাম, তখন একটু খবর পেয়েছিলাম হয়তো রাসেল বেঁচে আছে, কিন্তু না রাসেল বেঁচে নেই।’

‘ছোট্ট শিশুদের যেমন একটা স্বপ্ন থাকে, জীবনে সে কি হবে। রাসেলের খুব শখ ছিল সে বড় হলে আর্মি অফিসার হবে, সে আর্মি হবে। সেই সময় সেইভাবে সে নিজেকেও তৈরি করত। সে চাইত। আর ছোট ছোট গরীব শিশুদের প্রতি তার দরদ ছিল। যখন গ্রামে যেত গ্রামের অনেক শিশুদের যে জোগাড় করে আর্মি আর্মি খেলা খেলত’ বলেও স্মৃতি চারণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

‘১৫ আগস্টের পর ছয় বছর আমরা দেশে আসতে পারিনি। ছয় বছর পরে যখন দেশে আসি, যখন টুঙ্গিপাড়া যাই সেখানে একটা আলমারি ছিল। সেই আলমারির ভিতরে দেখি অনেক গুলি ছোট ছোট শিশুদের জামা তখন পড়ে আছে। আমি জানতাম যে এগুলো রাসেল ওই গ্রামের গরীব শিশুদের মাঝে সব সময় বিতরণ করত। সেগুলো তখনো পড়ে ছিল। যতবারেই বাড়ি যেত তখনই দিত, তাই মা সবসময় বেশি করে কিনে রেখে দিতেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তার ভিতরে এই যে একটা দরদী মন ছিল। হয়ত বেঁচে থাকলে এদেশের জন্য অনেক কিছু করতে পারত। আজকে মাঝে মাঝে মনে হয়, ৫৪ বছর বয়স পূর্ণ করেছে। এই ৫৪বছর বয়সে রাসেল কেমন হতে দেখতে! আমি তার বড় বোন। আমি কোলে পিঠে করেই তাকে আসলে মানুষ করেছি সবসময়। আমাদের অতি আদরের ছিল সে। কিন্তু ঘাতকের নির্মম বুলেট তাকেও বাঁচতে দেয়নি।’

শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান মো. রকিবুল রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন মহাসচিব মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী ও সাংগঠনিক সচিব কে এম শহীদুল্লাহ।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এনআর/এমআই

Advertisement
বিজ্ঞাপন

Tags: , ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন