শুক্রবার ২২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৪ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

প্রফেসর জন বি গুডএনাফ: সুপারহিরোরাও যার কাছে নস্যি!

অক্টোবর ১৯, ২০১৯ | ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ

রহমান রা’আদ

জীবনের শুরুর সময়টায় অনেক স্বপ্ন থাকে আমাদের— দেশকে পাল্টে দেওয়া, মানুষের কল্যাণে অবদান রাখা, মহাকালের পাতায় নতুন কোনো ইতিহাস গড়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকা— এমন কত শত স্বপ্ন। কিন্তু জরা মানুষকে থামিয়ে দেয়, চলতে চলতে জীবনের পথটা একসময় শ্লথ হয়ে আসে, আস্তে আস্তে বার্ধক্য গ্রাস করে আমাদের কার্যক্ষমতা, ইচ্ছা আর গতিকে! একটা পর্যায়ে মৃত্যু এসে থামিয়ে দেয় আমাদের পথচলা, আমরা পরিণত হই স্মৃতিতে! তবুও মাঝে মাঝে এমন কিছু অতিমানবের দেখা পাই আমরা, যারা জরা আর বার্ধক্যের এই চিরন্তন অমোঘ নিয়মকে ব্যর্থ করে দিয়ে অদম্য প্রাণশক্তি আর সৃষ্টিশীলতার আনন্দে মানবকল্যাণে ছুটতে থাকেন, নিরলস সাধনা আর পরিশ্রমে জন্ম দেন কিংবদন্তীর! এ বছর লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির ধারণা ও উন্নয়নে নিরলস অবদান রেখে রসায়নে নোবেল পুরষ্কারজয়ী ব্রিটিশ আমেরিকান রসায়নবিদ এম. স্ট্যানলি হুইটিংহ্যাম, জাপানি রসায়নবিদ আকিরা ইয়োশিনোর সাথে উচ্চারিত প্রায় শতবর্ষী পদার্থবিদ জন বি গুডএনাফ ঠিক তেমনই একজন। ৯৭ বছর বয়সেও তিনি অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন বিজ্ঞানের জন্য, মানুষের কল্যাণে, আমাদের চিরচেনা পৃথিবীকে আরেকটু ভালো রাখতে!

বিজ্ঞাপন

এই তিন গবেষক ও বিজ্ঞানী রসায়নের যে গবেষণায় নোবেল পেলেন, সেটা একেবারেই আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের অত্যাবশ্যকীয় অংশ। ব্যাটারি। আরেকটু সহজ করে বলতে গেলে আপনার হাতের মোবাইল ফোন, স্মার্টফোন, ট্যাব, ক্যামেরা, ল্যাপটপ, হৃদযন্ত্রে বসানো পেসমেকারসহ অজস্র প্রযুক্তি পণ্য, যেগুলো এক অসামান্য শক্তির বিপ্লব ঘটিয়েছে পৃথিবীজুড়ে, সেই লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি। নবায়নযোগ্য শক্তি হিসেবে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির উদ্ভাবন, নিরলস পরিশ্রমে প্রতিমুহূর্তে এর উন্নয়ন সাধন এবং একে সাধারণ মানুষের কল্যাণে সহজলভ্য প্রযুক্তি হিসেবে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনের তিন কীর্তিমান পুরুষ হচ্ছেন হুইটিংহ্যাম, ইয়োশিনো ও গুডএনাফ। এদের নিরন্তুর সাধনায় রসায়নের মতো একটি খটমটে বিষয় পরিণত হয়েছে আমাদের প্রাত্যাহিক অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনে, রীতিমতো এক অভাবিত বিপ্লব এনেছে নানা ধরনের প্রযুক্তিপণ্যকে মানুষের ব্যবহার্য জীবনে সহজলভ্য করার মাধ্যমে।

লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি আসলে ঠিক কতটা প্রভাববিস্তারকারী আবিষ্কার ছিল, সেটা বোঝা যায় গত শতকের সত্তরের দশকে আমেরিকায় জ্বালানি তেলের সংকটের সময়। তেল-গ্যাসের মতো অনবায়নযোগ্য শক্তির উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস খোঁজার সেই সময়টায় এগিয়ে আসেন এম স্ট্যানলি হুইটিংগাম। ১৯৭০ সালে তৈরি করেন নতুন এক ধরনের ব্যাটারি, যার অ্যানোড তৈরি হয়েছিল লিথিয়াম দিয়ে। বেশিক্ষণ ব্যবহারে বিস্ফোরিত হওয়ার কারিগরি সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অ্যাসিডনির্ভর ব্যাটারির চেয়ে কার্যকর ছিল এই লিথিয়াম ব্যাটারি। এরপরেই ১৯৮০ সালে দৃশ্যপটে আগমন প্রফেসর গুডএনাফের। হুইটিংগামের সেই লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির কনসেপ্ট নিয়ে বছরের পর বছর নিরলস গবেষণায় প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়নের মাধ্যমে খোলনলচে বদলে দেন গুডএনাফ, আরো অনেকগুণ কার্যক্ষম করে তোলেন এই ব্যাটারিকে। এরপর জাপানের আকিরা ইয়োশিনো আরও গবেষণার মাধ্যমে ১৯৮৫ সালে এই ব্যাটারিকে আরও ঝুঁকিমুক্ত করে তোলেন, যেন অতি ব্যবহারে বিস্ফোরণের সম্ভবনা একেবারেই কমে যায়।

বিজ্ঞাপন

১৯৯১ সালে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ম্যাসিভ কনজাম্পশনের জন্য পুরোপুরি ব্যবহার উপযোগী হয়ে ওঠে। জাপানের সনি প্রথম এই ব্যাটারি বাজারজাত করা শুরু করে। ২০০১ সালে রিচার্জেবল ব্যাটারি আবিষ্কার করে লিথিয়াম আয়নের বিপ্লবকে আরও বিস্তৃত করা মানুষটিও গুডএনাফ! এই আবিষ্কারের জন্য তিনি জাপান পুরষ্কারে ভূষিত হন।

কিন্তু এই লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি যে রীতিমত বিপ্লব আনবে প্রযুক্তিপণ্যের বাজারে, সেটা কল্পনাতেও ছিল না এর উদ্ভাবকদের। গুডএনাফ ভেবেছিলেন, সাধারণ কাজেই ব্যবহার হবে এই ব্যাটারি। কিন্তু এই ব্যাটারি যে একসময় মোবাইল, ক্যামেরা থেকে শুরু করে চিকিৎসাসেবাতেও ব্যবহার হবে, সেটা তার ভাবনায় ছিল না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, লিথিয়াম আয়ন যে ভবিষ্যতে আরও কত বহুমাত্রিক কাজে ব্যবহার হবে, সেটা শুধু গুডএনাফ নন, এমনকি আমাদেরও কল্পনার বাইরে। কারণ দিন দিন তেল-গ্যাস-কয়লার মতো অনবায়নযোগ্য শক্তির উৎস ও মজুদ কমে আসতে থাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে লিথিয়াম আয়নের মতো শক্তিগুলোর চাহিদা বাড়ছে, বাড়ছে এর ব্যবহারের ক্ষেত্র। কিন্তু এই চাহিদা আবার তৈরি করেছে নতুন সংকটেরও। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারী পুনঃব্যবহার বা ধ্বংস করা একাধারে ক্ষতিকর ও বিপদজনক। কারণ লিথিয়াম পাওয়া যায় দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চলে মাটির তলদেশে, যা তুলতে লাখ লাখ গ্যালন পানিও খরচ হয়। ওদিকে লিথিয়াম আয়নের ব্যাটারি তৈরিতে প্রয়োজনীয় কোবাল্টের মজুদও কমছে। কঙ্গোতে এই কোবাল্টের আহরণে কাজে লাগানো হচ্ছে শিশুদেরও, যা তৈরি করছে বিতর্কের।

এই সংকট সমধানে ফের এগিয়ে এসেছেন সেই গুডএনাফ। লিথিয়াম আয়নের সমস্যা সমাধানে এর চেয়েও তিন গুণ বেশি শক্তিশালী এক ব্যাটারির ধারণা দিয়েছেন তিনি— কোনো তরল উপাদান প্রয়োজন হবে না এই ব্যাটারি তৈরিতে। দামে সস্তা এই ব্যাটারিগুলো দাহ্য নয়, অর্থাৎ আগুনে পোড়ার ঝামেলা নেই। এই ব্যাটারি চার্জ হবে লিথিয়ামের চেয়েও দ্রুত, টিকবেও অনেকদিন। মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে এই অন্তহীন অবদান রেখে চলার কারণে অবশেষে ৯৭ বছর বয়সে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন অধ্যবসায়ী গুডএনাফ, তার সাথে নোবেল পেয়েছেন বিজ্ঞান জগতের আরও দুই সুপারহিরো হুইটিংগাম ও ইয়োশিনো। তবে তাদের দুজনের চেয়ে যে জায়গাটায় গুডএনাফ অনবদ্য, সেটা হচ্ছে বয়সের করাল গ্রাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অচিন্ত্যনীয় সাধনা করে যাওয়া। একইসঙ্গে সবচেয়ে বেশি বয়সে নোবেল জয়ের রেকর্ড গড়েছেন ৯৭ বছর বয়সী গুডএনাফ, পেছনে ফেলেছেন স্বদেশি পদার্থবিদ আর্থার আশকিনকে, যিনি গত বছর ৯৬ বয়সে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠতম ব্যক্তি হিসেবে নোবেল জয়ের রেকর্ড গড়েছিলেন।

১৯২২ সালের ২৫ জুলাই জার্মানিতে জন্ম নেওয়া জন. বি গুডএনাফ ১৯৪৪ সালে ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে থেকে গণিতে বিএস ডিগ্রি অর্জনের পর মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেনাবাহিনীতে আবহাওয়াবিদ হিসেবে কাজ করেন। এরপর ১৯৫২ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে পিএইচডি করবার জন্য ফিরে আসেন। পিএইচডি শেষ হওয়ার পর তিনি গবেষক হিসেবে যোগ দেন এমআইটির লিংকন ল্যাবরেটরিতে! সেখানে পরবর্তী ২৪ বছর র‍্যানডম অ্যাকসেস ম্যাগনেট মেমোরি নিয়ে গবেষণা ও গবেষকদলের নেতৃত্ব দেন। Jahn–Teller distortion ও অক্সাইড ম্যাটেরিয়াল ও চৌম্বক সাইন নিয়ে কাজ সুপারএক্সচেঞ্জ Goodenough–Kanamori rules— দু’টোরই অন্যতম প্রবক্তা গুডএনাফ।

এমআইটি থেকে গুডএনাফ সরাসরি চলে যান ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে। জীবনের সেরা সময়টা তিনি কাটিয়েছেন এখানেই। একজন পদার্থবিদ হয়েও অক্সফোর্ডে গুডএনাফ ইনঅর্গানিক কেমিস্ট্রি ল্যাবের প্রধান হিসেবে কাজ শুরু করেন লিথিয়াম আয়ন নিয়ে। হুইটিংহ্যামের তৈরি লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির ধারণাটাকে কার্যকর রূপ দেন গুডএনাফ, তার তৈরি ব্যাটারিকেই ইয়োশিনো ঝুঁকিমুক্ত করার কাজ করেন। গুডএনাফ প্রমাণ করেন, লিথিয়াম ব্যাটারির ক্যাথোডটিতে ধাতব সালফাইডের বদলে ধাতব অক্সাইডের ব্যবহার করা গেলে আরও বেশি শক্তি পাওয়া সম্ভব। লিথিয়ামের সঙ্গে কোবাল্ট অক্সাইড ক্রিয়া করে চার ভোল্ট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারে। তার এ আবিষ্কার ছোট্ট, অথচ অনেক শক্তিশালী ব্যাটারি তৈরি করতে বিরাট ভূমিকা রাখে। ১৯৯১ সালে সনি এই ব্যাটারি বাজারজাত করে।

কিন্তু ততদিনে তার অক্সফোর্ডে থাকার মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে। নশ্বর পৃথিবীর নিয়ম অনুযায়ী একটা সময় না একটা সময়ে মানুষকে থামতেই হয়। তার কাজে সে যতটা দক্ষ আর অসামান্যই হোক না কেন, নিতে হয় অবসর। কিন্তু গুডএনাফ তো আর দশ জন সাধারণ মানুষ নন, অন্য ধাতুতে গড়া এক অসামান্য সুপারহিরো। তাই যখন তিনি নিশ্চিত করে জানতে পারেন অক্সফোর্ড তাকে অবসরে পাঠিয়ে দেবে ৬৫ বছর হলে এবং এই নীতির কোনো পরিবর্তন তারা করবে না, তখন তিনি স্রেফ কাজ করে যাওয়ার প্রয়োজনে অক্সফোর্ড ত্যাগ করে  ইউনিভার্সিটি অভ টেক্সাস অস্টিনে প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘মাত্র’ ৬৫ বছর বয়সে অবসরে যাওয়াকে এই বিজ্ঞানী চাকরি হারানো হিসেবেই মনে করেন আজও। নোবেল জয়ের পরে এক প্রতিক্রিয়ায় উচ্ছ্বাস প্রকাশের সময় গুডএনাফ এমআইটি নিউজকে বলেছেন, আমি চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমি অবসর নিতে চাইনি। কেউ আপনাকে একটা নির্দিষ্ট বয়সে অবসরে যেতে বাধ্য করতে পারে না। এটা একধরনের বোকামি। অথচ তারপর দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছি। এখনো প্রতিদিনই সবকিছু করছি।

অথচ আমরা কত দ্রুত জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি, কাজের স্পৃহা আর আনন্দ হারিয়ে ফেলি। আর গুডএনাফ ৬৫ বছর বয়সে আবারও নতুন করে শুরু করেছিলেন এবং গত ৩৩ বছর ধরে অস্টিনে অবস্থিত টেক্সাস ইউনিভার্সিটির ককরেল স্কুল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যান্ত্রিক প্রকৌশল ও তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সবচেয়ে অদ্ভুত হচ্ছে, যুক্তরাজ্যের রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি ম্যাটেরিয়াল সায়েন্সের ওপর যে পুরষ্কারটি দেয়, সেটি গুডএনাফের নামে প্রচলিত— John B. Goodenough Award। রয়্যাল সোসাইটি হয়তো ভেবেছিল, গুডএনাফ তার সোনালি সময় পেছনে পেরিয়ে এসেছেন এবং এখন তার নামে পুরষ্কার দিয়ে তাকে সম্মানিত করার সময় এসেছে।

কিন্তু এই ধীরস্থির অসামান্য উদ্যমী কীর্তিমান সবাইকে ভুল প্রমাণ করে আজও নিরলস উৎসাহে গবেষণা করে যাচ্ছেন নিয়মিত, প্রমাণ করে যাচ্ছেন— পর্দার কাল্পনিক সুপারহিরোদের চেয়ে মানুষ অকল্পনীয় শক্তিমান এক প্রাণী, মানুষ আসলে তার স্বপ্নের চেয়েও বড়!

বিশেষ কৃতজ্ঞতা: নিয়াজ চৌধুরী

তথ্যসূত্র

লেখক: কপিরাইটার ও অ্যাকটিভিস্ট

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন