বুধবার ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৯ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

মোংলার দিগরাজ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনে চলছে হরিলুট!

অক্টোবর ২০, ২০১৯ | ১২:৫৪ অপরাহ্ণ

মনিরুল ইসলাম দুলু, লোকাল করেসপন্ডেন্ট

মোংলা (বাগেরহাট): নানা সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে মোংলার দিগরাজে অবস্থিত মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দুর্নীতি-অনিয়ম আর নানা অব্যবস্থাপনায় সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। বছরের পর বছর ধরে অকেজো হয়ে থাকা কয়েক কোটি টাকার যন্ত্র মরিচা পড়ে নষ্ট হওয়াসহ লাখ লাখ টাকা মূল্যের মেশিনারিজ লোপাট হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থাকা তিনটি পুকুরের পানি বিক্রি, ফলজ, কৃষিজমি বহিরাগতদের লিজ ও ঘর ভাড়া দিয়ে এখন কাগজে-কলমে আর নামেই টিকে আছে প্রতিষ্ঠানটি!

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ১৯৭৪ সালে মোংলার দিগরাজ এলাকায় ৩০ একর জমির ওপর বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন নামের এই প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। সে সময়ে এর পেছনে সরকারি কোষাগারের প্রায় ২০ কোটি ব্যয় হয়। স্থাপিত হওয়ার পর এটি বেশ খ্যাতি অর্জন করে। তখন এ প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ চুক্তিভিত্তিক জনবলের সংখ্যা ছিল ২৫০ জন। প্রকল্প থেকে বরফ, ফিস মিল, নেট জাল, কীটনাশক উৎপাদনসহ বিদেশে হিমায়িত মাছ রফতানি করা হতো। কিন্তু সরকারি নানা অবহেলায় লাভজনক এ প্রতিষ্ঠানটি এখন ভগ্নদশায় দিন পার করছে।

বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক, উপ-সহকারী প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষকসহ ৩৯টি পদ রয়েছে। কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা মাত্র ১৪ জন। আর বাকি পদগুলো বছরের পর বছর শূন্যই রয়েছে। একমাত্র বরফ কলটিও দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ। এছাড়া মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, ফিস মিল ফ্যাক্টরি ও ফিস নেট ফ্যাক্টরি অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ৭০ দশকে এ প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ৬টি নৌযান এখনও কাগজে কলমে রয়েছে। তবে সেসব নৌযানের খোঁজ এখন জানে না কেউই!

কর্তৃপক্ষ জানায়, কয়েক দশক আগেই ওই নৌযানগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য ২০ কক্ষ বিশিষ্ট ৫ তলা একটি ভবন, আধাপাকা ১৫-১৬ কক্ষ বিশিষ্ট ৭টি ভবন রয়েছে। লোকবল না থাকায় আবাসিক ভবনগুলোও জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। অধিকাংশ কল-কারখানার লাখ লাখ টাকার মেশিন লোপাট হয়ে গেছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কর্তৃপক্ষের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরিচ্যুতও হয়েছেন, জেলও খেটেছেন কয়েকজন।

তবে ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে করপোরেশনের ৫ তলা ভবনের ২০টি রুম বিদ্যুৎ-পানিসহ মাসিক ৩ হাজার টাকা এবং আধাপাকা টিন সেডের ১৭টি কক্ষ ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় বহিরাগতদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের ৩টি পুকুরের পানি ওয়াটার প্ল্যান্টের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হয়ে থাকে। প্রতিমাসে গড়ে ১ লাখ টাকা ঘর ভাড়া আর ৫ থেকে ৭ লাখ টাকার পানি বিক্রি, ফলজ গাছের ইজারায় ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা আয় হয়। এছাড়া ৩টি পুকুরে মাছ শিকারীদের বড়শি দিয়ে মাছ ধরার জনপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা ধরে টোকেন দেওয়া হয়। এসব থেকে এখনও বড় অংকের আয় হয় প্রতিষ্ঠানটির। গত ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে গড় আয় ৩৩ লাখ টাকা, আর ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ৪৬ লাখ টাকা। কিন্তু প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে আয়ের এ নগদ অর্থ কর্মকর্তারা ‘লুট’ করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে ৯০ দশকের পর থেকে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে জৌলুস হারাতে থাকে। এখন এটি একটি রুগ্ন শিল্প হিসাবে কর্তৃপক্ষের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্তৃপক্ষ একটু সুদৃষ্টি দিলেই প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক খাতে পরিণতসহ বছরে ৫ কোটি টাকার বেশি আয় করতে পারবে।

করপোরেশনের বর্তমান ম্যানেজার নাঈম আহমেদ রিয়াদ জানান, ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি তিনি এখানে বদলি হয়ে আসেন। এখন অনেক অব্যবস্থাপনা দূর হয়েছে। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানটি লাভে রয়েছে। গড়ে বছরে প্রায় ১ কোটি টাকা আয় হলেও করপোরেশনের ভবন, রাস্তা সংস্কার ও পুকুরে মাছ অবমুক্ত, কর্মচারীদের বেতনসহ সব খরচ মিটিয়ে গত অর্থ বছরে ৪৬ লাখ টাকা মুনাফা রয়েছে।

অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার বিষয় প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার বলেন, ‘এসব আগে হয়েছে। আমি আসার পর সংশোধনীসহ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পের অভ্যন্তরে নিয়ম ভঙ্গ করে থাকা বহিরাগতদের উচ্ছেদ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এখন মোংলা সমুদ্রবন্দর কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেছে। তাই এ প্রকল্পের উন্নয়নে পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।’ আর এ পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি শিপইয়ার্ড করার জন্য গত দু’মাস আগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরে ৭৩ কোটি টাকার একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন