মঙ্গলবার ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ত্রিভুজ

অক্টোবর ২০, ২০১৯ | ৫:০৮ অপরাহ্ণ

মালেকা পারভীন

দুপুরের দিকে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। কাজ করছিলাম কম্পিউটারে। টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলের পর্দায় দেখি মুরাদের নাম। বেশি চিন্তা না করে ধরলাম। বেশির ভাগ সময় না ধরে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।
মুরাদ আমার স্কুলের সহপাঠী। কলেজেও এক সাথে পড়েছি। ইন্টারমিডিয়েটে। স্কুলে পড়ার সময় খুব একটা কথা হতো না। শুধু মুরাদ নয়, ক্লাসের কারো সাথেই ঘনিষ্ঠতা তেমন ছিলনা। একেবারে দরকার না পড়লে কথা-বার্তা হতো অল্পই। ভালো ছাত্রী ছিলাম। অন্যরা ভাবতো অহঙ্কার। আমি জানতাম বা এখনো জানি এটি আমার মানসিক গঠন। এ কারণে কারো সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হয়নি আমার। আর হবার সম্ভাবনাও নেই। এখন নির্দ্বিধায় বলতে পারি, আমার কোন বন্ধু নেই। এই বলার মধ্যে কেউ কেউ উন্নাসিকতা খুঁজে পেলেও আমি জানি এটি একটি সরল স্বীকারোক্তি মাত্র।

বিজ্ঞাপন

কলেজে পড়বার সময় কয়েকজনের সাথে পরিচয় হলো। যার প্রেমে পড়লাম সেই কয়েকজন তার বন্ধু ছিল বলে ভালো না লাগলেও দেখা হলে তাদের সাথে কথা বলতেই হতো। প্রথমদিকে আমাদের প্রেম নিয়ে কিছুটা লুকোচুরি করতে হয়েছিল। কারণ, তারিক, মানে আমার প্রেমিক বেশ ভীতু স্বভাবের ছিল। তার মনে আশঙ্কা ছিল, অন্য বন্ধুরা আমাদের সম্পর্কের কথা জেনে গেলে ঝামেলা করবে। আমিও ওর কথা মেনে নিয়ে চুপচাপ ছিলাম।
কিন্তু প্রেমের মতো একটা বিষয় কদিন আর রেখে ঢেকে রাখা যায়। তারিক আর আমি মুখোমুখি হলেই আমাদের শারীরিক ভাষার প্রকাশ বদলে যেতো। তার চোখে খেলে যেতো প্রেমিকের উজ্জ্বল আর্তি। আমার চোখে-মুখে অলৌকিক আনন্দের উচ্ছ্বাস। অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তার বন্ধুদের সামনে আমরা কাছাকাছি বা পাশাপাশি বসতে বা হাঁটতে পারতাম না। এমনও হয়েছে, তারিক উপস্থিত থাকার পরও ওর আরেক বন্ধুর সাথে আমাকে রিকশায় উঠতে হয়েছে। শুধু কেউ যেন কোনভাবেই আমাদের বিষয়টা বুঝতে না পেরে সেজন্য।
একদিন সবাই মিলে দুপুরের শোতে কী একটা ছবি দেখতে যাবার কথা হলো। কলেজের কাছে রাজলক্ষী হলে। জুন মাসের বৃষ্টি নেমেছিল ঝুপ করে। কিছু না বলে-কয়ে। কলেজের ভেতর থেকে ছবি হল পর্যন্ত যেতে হলে রিকশা নিতে হবে। কিন্তু কলেজ ক্যাম্পাসে ওই সময় কোন রিকশা নেই। আমরা সবাই দল বেঁধে বিজ্ঞান ভবনের নিচ তলায় দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ একটা খালি রিকশা কলেজের গেট দিয়ে ঢুকতেই আমাদের ভেতর থেকে দুয়েকজন চিৎকার করে রিকশাওয়ালাকে ডাক দিলো। সিদ্ধান্ত হলো, আমার সাথে রাজীব উঠবে। বাকিরা বৃষ্টি মাথায় নিয়েই হল পর্যন্ত যাবে। খুব করুণ দৃষ্টি বিনিময় হলো আমার আর তারিকের মধ্যে। রাজীবের সাথেই আমি রিকশায় উঠে ছবি হলে গেলাম। তারপরও মুখ চেপে আমরা অভিনয় করে গেলাম।

অবশ্য বেশি দিন যেতে হয়নি। সিনেমা দেখে আসার কদিনের মধ্যেই ঘটনা ফাঁস হয়ে গেলো। সম্ভবত আমাদের চোরা আচরন তারিকের বন্ধুরা সন্দেহ করতে শুরু করেছিল। তক্কে তক্কে ছিল কীভাবে আমাদের ধরা যায়। একদিন সে সুযোগ আমি বা আমরাই করে দিলাম। নিজেদের অজান্তে। কোন একটা বিষয়ে নোট দেওয়ার কথা বলে তারিককে একটি খাতা দিয়েছিলাম। সবার সামনে একদিনের আড্ডায়। খাতার ভেতর নোট-ফোট কিছু না, ছিল ভালোবাসার অঞ্জলিভরা চিঠি।
এটা সেই স্বর্ণালী সময়ের কথা যখন মানুষের মনে আবেগ বলে সত্যিকারের কিছু একটা ছিল। যখন সবাই চিঠি লিখতে ভালবাসতো। কারো কারো কাছে নিরেট বিনোদনের বিষয় হলেও প্রেমিক যুগলের জন্য এটি ছিল বাঁচা-মরার দলিল। কেউ প্রেম করছে অথচ ভালোবাসার মানুষের কাছে হৃদয় উজাড় করে চিঠি লিখেনি ব্যাপারটা ছিল খুবই অসম্ভব কিছু। এখন যেমন চিঠি লেখার ধারণাটাই কল্পকথার অংশ অনেকটা তেমন।
খাতার ভেতর চিঠি দিয়েছিলাম তারিককে, কিন্তু কেউ সেটা বুঝবেনা এটা ভাবার মতো বোকা শুধু আমরা দুজনই ছিলাম। অন্যদের বুঝতে একটুও দেরি হয়নি। প্রেমে পড়লে মানুষের বুদ্ধি লোপ পায়। আমাদেরও তাই হয়েছিল। চিঠিটা আমি পরে সুযোগ বুঝে কোন এক ফাঁকে দিলেও পারতাম। কিন্তু ওই মুহূর্তে তারিকের কাছ থেকে আরেকটি চিঠি, আমারটার জবাব, পাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিলাম।
ছেলেটা মুখে যত অল্প কথা বলতো, চিঠিতে ঠিক উল্টো। আর যে রোমান্সের কারিশমা সে তার ভাষায় প্রকাশ করতো তা বর্ণনা করবার মতো উপযুক্ত শব্দ সেসময় আমার কাছে ছিল না। আজও নেই। অনেক কিছুই ভুলে গেছি। যতটুকু মনের খাতায় লিপিবদ্ধ করে রেখেছি তা ভাবলে এই এখনও সেই দিনগুলোর মতো আবেশে আপ্লুত হই। আর গোটা গোটা ঝকঝকে অক্ষরে অসাধারণ সুন্দর ছিল ওর হাতের লেখা। ওরকম চিঠি এরপর আমাকে আর কেউ লেখেনি।
ঠিক আগের চিঠিতেই সে আমাকে সোনা-বৌ বলে সম্বোধন করেছিল। চিঠিটা হাতে পাবার পর পড়বার জন্য উন্মুক্ত হয়ে উঠেছিলাম।। সেদিন বাংলা ক্লাসে রুমা আমার পাশে বসেছিল। অর্ধেক ভাঁজ করে বেঞ্চের নিচে রেখে চিঠিটা যখন পড়তে শুরু করলাম, প্রথমেই ওই সোনা-বৌ দেখে একদম নতুন বৌ এর মতো লজ্জায় আমার চোখ-মুখ রক্তিম হয়ে উঠলো। রুমা কী বুঝলো কে জানে। আমার ওরকম চেহারা দেখে সে আস্তে করে বললো, “খালি চিঠি পড়েই এই অবস্থা? বাসরঘরে কী করবি!” রুমার মুখ এমনিতেই আলগা। সে এরকম আরো কিছু বলার আগেই চিঠিটা বন্ধ করে ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলি।

তারিকের বন্ধুরা শ্যেন দৃষ্টিতে আমাদের গতিবিধি লক্ষ্য করে যাচ্ছিল। অনেক রকম সাবধানতা অবলম্বন করেও যখন ধরা পড়ে গেলাম, তখন তারিক খুব বীর পুরুষের মতো আমাকে ওই বিখ্যাত হিন্দি গানটার এক কলি বারবার গেয়ে শোনালো। মুঘল-ই-আজম ছবিতে মধুবালা যেটা গেয়েছিল। মন খারাপের মধ্যেও তারিকের মুখে যাব পিয়ার কিয়া তো ডরনা কিয়া শুনে আমার খুব হাসি পেয়েছিল। হাসির কারণ ছিল সে আমার মুখের সামনে মধুবালার মতো হাত নেড়ে নেড়ে ওই একটা কলি বারবার গাওয়ার চেষ্টা করছিল। ওর গলায় সুর ছিলনা একদম। দিন রাত ইংরেজি গান নিয়ে পড়ে থাকতো।
তো প্রেমের ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়াতে আমাদের দুজনের উপকারই হলো বলা যায়। বন্ধুদের সাথে ঘোরা বা আড্ডা দেবার সময় সারাক্ষণ তটস্থ থাকার বিষয়টি আর থাকলো না। তবে সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। তারিক ওর বন্ধুদের ঈর্ষার শিকার হলো। দুয়েকজন ছাড়া কেউই আমাদের সম্পর্কটি সহজে মেনে নিতে পারছিল না।

বিজ্ঞাপন

তার একটা কারণ ছিল অবশ্য। আমার সাথে সম্পর্ক হবার আগে তারিক আরেক জায়গায় জড়িত ছিল। সেখানে ঘনিষ্ঠতার মাত্রা ছিল মোটামুটি বল্গাহীন। তারিক পুরাই দিওয়ানা ছিল তার প্রতিবেশি সেই সুন্দরীর প্রেমে। কিন্তু সুন্দরীদের তো অনেকরকম প্রণয়-প্রত্যাশী থাকে। প্রেম নিবেদনের সাথে থাকে উচ্চাভিলাষী জীবন যাপনের লোভ। সুস্মিতা, তারিকের প্রথম প্রেমিকা, তাদের চার বছরের উদ্দাম প্রেম অস্বীকার করে এক ধনীর দুলালের বুকে মুখ গুঁজে দিলো। বেচারা তারিক বেশ কিছুদিন মাদকের মধ্যে ডুবে থেকে প্রেমিকা ভোলার চেষ্টা করলো। খুব বেশি লাভ না হলেও এর মধ্যে আমি এসে হাজির। আমার দিক থেকে ভালো লাগাটা সক্রিয় থাকায় সম্পর্ক গড়ে উঠতে বেশি দিন লাগেনি।
এই বিষয়টাই তারিকের বন্ধুদের পছন্দ হলো না। পরে শুনেছি, তাদের কারো কারো আমার প্রতি দৃষ্টি ছিল। কিন্তু মাঝখানে তারিক ঢুকে পড়াতে হিসাবটা অন্যরকম হয়ে গেলো। বন্ধুরা জেনে যাবার পর আমাদের দুজনার সাথে ওদের একটা দূরত্ব তৈরি হয়। যে দুয়েকজনের সাথে কথা হতো তারা জানালো, অন্যদের মতামত হলো, আমরা বিষয়টা এভাবে কেন চেপে গেলাম। শুরুতেই তাদের জানাতে সমস্যা কোথায় ছিল। এরকম রাখ-ঢাকের তো কোন প্রয়োজন ছিলনা। ইত্যাদি। তাদের কথার যুক্তি উড়িয়ে দেবার মতো নয়। আসল ঘটনা ছিল, তারিক তখনো তার প্রথম প্রেমিকার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র নিতে পারেনি। মনে মনে ক্ষীণ আশা জিইয়ে রেখেছিল, হয়তো সে ফিরে আসবে। আর এজন্য সে সময় নিচ্ছিল। পাশাপাশি আমার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা পোক্ত করে নিতে চাইছিল। ঘটনা এটাই।
কিন্তু বন্ধুদের বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেলো বলে বন্ধুত্বে ভাটা পড়লো। শেষে তারিক আর আমার সাথে মুরাদ আর হাসান থেকে গেলো। মুরাদ স্কুলেও আমার সাথে পড়েছে। সেই মুরাদের ফোন পেয়ে এতোগুলো কথা আমার এক লহমায় মনে পড়ে গেলো।

আগেই বলেছি, স্কুলে পড়ার সময় মুরাদের সাথে একেবারেই সখ্যতা ছিলনা। ছেলেটা লাজুক ছিল। ক্লাসের ভেতরে-বাইরে দৃষ্টি বিনিময় হলে চোখ নামিয়ে ফেলতো। শুধু স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া আর সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার সময় এসে জানতে চাইতো সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। ভোলান্টারি টিমের ক্যাপ্টেন ছিল। লম্বা লম্বা পা ফেলে স্কুল মাঠের এ মাথা ও মাথা দাপিয়ে বেড়াতো। সেসময় ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি সে আমার দিকে অন্যভাবে তাকিয়েছে কিনা।
এসএসসিতে বোর্ডে স্ট্যান্ড করে শহরের সেরা কলেজে যেদিন ভর্তি হলাম, দেখি পেছনে মুরাদ দাঁড়িয়ে। মিষ্টি একটা হাসি মুখে। অনেকদিন পর দেখা। সে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছে। আমি মানবিকে। পরে যখন তারিকের প্রেমে পড়লাম, একদিন মুরাদকে দেখলাম ওদের বন্ধুদের দলে। তারিক আর মুরাদ ছোটবেলায় এক পাড়ায় থাকার সুবাদে বন্ধু ছিল। পরে বাসা বদলের কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এখন আমার সাথে তারিকের সম্পর্কের কথা জেনে মুরাদ নতুনরূপে আবির্ভূত হলো।
প্রথমে সে ভালোরকম অবাক হয়েছিল। আমি যে কারো সাথে প্রেম করতে পারি এটা নাকি তার বিশ্বাসই হতে চায়নি। “পড়ালেখা ছাড়া ওর মাথায় আর কিছু ঢোকে বলে তো জানতাম না। অবাকই হচ্ছি। আগে জানা থাকলে সুযোগটা আমাদের কেউ একজন নিতে পারতো।” তারিককে বলেছিল মুরাদ। আমি শুনে চুপচাপ ছিলাম। কেউ একজন বলতে সে আসলে নিজেকে বুঝিয়েছিল। অবশ্য এটা বুঝে উঠতে আমার আরও বেশ কিছু সময় লেগেছিল।

এর কিছুদিন আগে মুরাদ আমাকে আলাদা করে ডেকে নেয় কলা ভবনের দোতালায়। অর্থনীতির ক্লাস ছিল। বের হয়ে এসে দেখি, লম্বা পাজোড়া দুদিকে ক্রস করে রেলিং এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার জন্যই অপেক্ষা করছে এটা বুঝে উঠবার আগেই ‘এই নাসরিন’ বলে সে আমাকে ডেকে উঠলো। আমি অবশ্য ভেবেছিলাম তারিক পাঠিয়েছে আমাকে ডেকে নিয়ে যাবার জন্য। সেদিন আমাদের দেখা করবার কথা ছিল। কিন্তু মুরাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে ভুল ভাঙ্গলো।
“কী ব্যাপার, তুমি এখানে?”
“হুঁ, আসলাম, আর কী। তোমার এখন কোন ক্লাস আছে? না থাকলে, চলো, একটু ওদিকে যাই। কিছু কথা আছে।”
মুরাদের কণ্ঠস্বরে আত্ম-প্রত্যয়ী সুর। এই বিষয়টা আমার কাছে নতুন। স্কুলে তো সে আমার দিকে তাকাতেই লজ্জায় মরে যেতো।
“কিন্তু, তারিক আসার কথা। একটু অপেক্ষা করি। ও আসলে একবারে যাই।” আমি থেমে থেমে বলি।
“তারিক মনে হয় আজকে আর আসতে পারবেনা। ওর বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে গেছে। চাচার কালকে রাত থেকে শরীর খারাপ। মনে হয় প্রেশার বেড়েছে। চাচা তো ব্লাড প্রেশারের রুগি।”
মুরাদের কথা শুনে বেশ অবাক হলাম। ও এতো কিছু জানে ভেবে। তাছাড়া, তারিক যে আসতে পারবে না সেটা তো আমাকেও জানায়নি কোনভাবে। নাকি, এখন মুরাদকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছে। এসব যখন ভাবছি, মুরাদ আমার মন পড়ে ফেললো।
“কলেজে আসার আগে আমি তারিকের ওখানে গিয়েছিলাম। ওই আমাকে বললো, তোমাকে যেন জানাই।”
ততক্ষণে আমরা দোতালা থেকে নিচে নেমে এসেছি। হাঁটতে হাঁটতে কলেজের মাঠ পেরিয়ে অফিস ভবনের পাশে এসে দাঁড়ালাম। বিশাল জারুল গাছটার মায়া-মায়া ছায়ার নীচে। শরৎকালের সাদা-নীল মেঘ মধ্যাহ্নের সারা আকাশ জুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। একটা স্বর্গীয় বাতাস কোথা থেকে উড়ে এসে আমাদের সারা শরীর ছুঁয়ে গেলো। চপলা মেঘেদের মনে যেন বাঁধভাঙা আনন্দ। আমার মনে কোন আনন্দ নেই। তারিক আসবেনা জানার পর থেকেই মুখ শুকিয়ে চিমসা। মুরাদ সেটা বুঝতে পারলো।
“মন খারাপ হয়ে গেলো, না?”
“হ্যাঁ, একটু তো হয়েছে। সেটা থাক। এখন তুমি কী বলতে চাও, বলো। বাসায় চলে যাবো। আজকে আর ক্লাস নাই।”
শুষ্ক মুখে আমার যা বলার বলে সামনে তাকিয়ে থাকলাম। ছেলে-মেয়েরা ব্যস্ত অথবা অলস ভঙ্গিতে কথা বলতে বলতে যে যার গন্তব্যের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। কারো কারো চোখে-মুখে প্রেমের আলো ঝকমকিয়ে উঠছে। আজ তারিকের সাথে দেখা হলে আমার চেহারাতেও অমন রোশনাই খেলে যেতো। মুরাদ বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমাকে দেখছিল। মনে হলো, সিরিয়াস কিছু বলতে চায়। মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছে। এখন তো আর প্রেমের প্রস্তাব দেবার সুযোগ নেই।
“আসলে, কীভাবে বলবো সেটাই বুঝতে পারছিনা। তুমিই বা বিষয়টা কোন চোখে দেখবে?” মুরাদ ইতস্তত করতে থাকে।
“যা বলবে বলে এখানে নিয়ে এলে, বলে ফেলো। সব কথা শোনার জন্য তৈরি আছি। বুঝতে পারছি তারিককে নিয়েই কিছু বলবে।”
“হ্যাঁ, নাসরিন। তুমি বুদ্ধিমতি মেয়ে। অনেকদিন ধরে তোমাকে চিনি। তারিকের সাথেও আরো আগে থেকে পরিচয়। তোমাদের দুজনেরই ভালো চাই আমি। কিন্তু...” মুরাদ ভ্রু কুঁচকে ঠোঁট কামড়ে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়।
“কিন্তু কী বলো। থামলে কেন?”
“তুমি যদি অন্যভাবে না নাও তাহলে বলতে পারি।”
“বললাম তো, বলো। অন্যভাবে নিবো না।”
“তারিকের সাথে সম্পর্কটা নিয়ে আরো একবার ভাবো। ও কিন্তু এখনো সামিয়ার জন্য অপেক্ষা করে আছে।”
সামিয়া তারিকের প্রথম প্রেমিকা। সেদিন মুরাদের সাথে আবার আর খুব বেশি কথা হয়নি। সে কিছুটা ভয় পাচ্ছিল যে এসব বলার জন্য আমি আবার তার ওপর ক্ষেপে যাই কিনা। তেমন কিছু করিনি। ওকে আশ্বস্ত করেছিলাম এই বলে যে, সে আমার ভালো চায় বলেই এমনটা করেছে। আমি এর মধ্যে অন্য কোন উদ্দেশ্য দেখতে পাইনি।

মুরাদের সেই পরামর্শের পরও আমি আর তারিক আগের মতোই ঘোরাঘুরি করেছি। কখনো কখনো মুরাদ আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। চাইনিজ রেস্টুরেন্টের লাঞ্চে অথবা নৌ-ভ্রমণে। তারপর যেটা হবার সেটাই হয়েছে। একদিন, প্রায় আড়াই মাস পথ চেয়ে থাকার পর, বুঝতে বা জানতে পারলাম তারিক আর কোনদিন আমার কাছে ফিরে আসবে না।
সামিয়ার সাথে তার সম্পর্ক ছিল বরাবর। কোন একটা জেদের বশে সামিয়া তাকে ছেড়ে আরেকজনের কাছে গিয়েছিল। ফিরেও এসেছিল। ফিরে আসার পরপরই তারিক আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তবে সামিয়া ফিরে এসেছিল আরো একবার চলে যাবার জন্যই। এবং সেটি পাততাড়ি গুটিয়ে। সেই ধনীর দুলালের সাথে যেদিন তার বিয়ের সানাই বেজে উঠলো, ওই রাতেই তারিক সিলিং ফ্যানের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে জীবনের সাথে তার যাবতীয় লেনদেন মিটিয়ে ফেলে। তারিক আমার কাছে ফিরে আসার কথা একবারের জন্যও মনে করেনি। ফিরে এলে হয়তো ওকে আমি গ্রহণ করতাম।
ওকে গ্রহণ করবো বলে এই জীবনে আর কারো কথাই ভাবতে পারলাম না। মুরাদ আজও আমার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে। আমাদের দুজনের বয়স মধ্য চল্লিশ পেরিয়ে গেছে। নিয়ম করে ফোন দিয়ে সে আমার খোঁজ নেবার চেষ্টা করে। যদিও আমিও চেষ্টা করি ফোনটা না ধরে ওকে এড়িয়ে যেতে। সবসময় পারিনা। জানিনা, এভাবে কতদিন আর এড়িয়ে যেতে পারবো।
মাঝেমাঝে ভীষণই একা লাগে নিজের ভেতর। শূন্যতার একটা ভারী গোলক আমার গোটা অস্তিত্বটা যখন পিষ্ট করে ফেলতে চায়, তখন, সেই অসম্ভব অসহনীয় মুহূর্তে মুরাদের মুখটাই কেবল আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন