মঙ্গলবার ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘বিষমুক্ত’ চাষে ৩ ফলন, বছরজুড়ে ব্যস্ত সুবর্ণচরের কৃষকরা

অক্টোবর ২১, ২০১৯ | ৮:০০ পূর্বাহ্ণ

বিকাশ সরকার, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট

নোয়াখালী: কোনো ধরনের রাসায়নিক ও কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়াই সবজি উৎপাদন করছেন নোয়াখালীর সুবর্ণচরের কৃষকরা। শতভাগ জৈব পদ্ধতির চাষাবাদে ফলনও পাচ্ছেন ভালো। ‘বিষমুক্ত’ হিসেবে পরিচিত এসব সবজির দাম যেমন বেশি, তেমনি বাজারে রয়েছে ব্যাপক চাহিদাও। শুধু তাই নয়, জৈব পদ্ধতিতে তারা এক ফসলি জমিকে পরিণত করেছেন তিন ফসলি জমিতে। কেবল সবজি নয়, বাড়ির পাশের পুকুরটিতে মাছ আর হাঁসও পালন করছেন তারা। সমন্বিত এই চাষাবাদে সারাবছরই পরিচর্যা আর ফসল সংগ্রহ ও বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে এখানকার কৃষকদের।

বিজ্ঞাপন

বিষমুক্ত

কৃষকরা বলছেন, শুরুতে লাভের বদলে ক্ষতির মুখই দেখতে হয়েছিল তাদের। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আবাদে এখন বছরে তিনটি ফসল চাষ করতে পারেন তারা। ফলে জৈব পদ্ধতিতে চাষ করে তাদের অনেকেই এখন স্বাবলম্বী হয়েছেন। জৈব চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন অন্যরাও। তবে বাজারজাত ব্যবস্থা আধুনিক না হওয়ায় কৃষকদের তুলনায় মধ্যস্বত্বভোগীরাও লাভবান হচ্ছেন বেশি। সরকারিভাবে বাজারজাত ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ কৃষকদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করলে আরও বেশি কৃষক রাসায়নিক ও কীটনাশক ছাড়াই সবজি চাষে এগিয়ে আসতেন।

বিষমুক্ত

বিজ্ঞাপন

সুবর্ণচরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার চরক্লার্ক, মোহাম্মদপুর, চরবাটা, পূর্বচরবাটা, চরজব্বর, চরজুবলী ইউনিয়নের চার শতাধিক কৃষক প্রায় একশ হেক্টর জমিতে উৎপাদন করছেন নিরাপদ সবজি। প্রতিটি বাড়িই যেন এক একটি কৃষি খামার। মাচাংয়ে ঝুলছে ঝিঙা, চিচিঙ্গা, শশা, লাউ, মিষ্টিকুমড়ার মতো সবজি; এদিকে বাড়ির পাশেই পুকুরে মাছ আর হাঁস। উৎপাদন খরচ কম ও দাম বেশি পাওয়ায় এ ধরনের সমন্বিত সবজি চাষে স্বাবলম্বী হচ্ছেন চাষীরা। তাদের দেখাদেখি উৎসাহিত হচ্ছেন অন্য চাষীরাও।

বিষমুক্ত

মোহাম্মদপুরের একজন কৃষক জানালেন, তিনি একবিঘা জমিতে করলার চাষ করেছেন। এরই মধ্যে তিনি এক থেকে দেড় লাখ টাকার করলা বিক্রি করেছেন। এখনো জমিতে যে পরিমাণ করলা আছে, তা আরও ৫০ হাজার থেকে একলাখ টাকায় বিক্রি করতে পারবেন।

চরক্লার্কের এক নারী কৃষক বললেন, শসা ও চিচিঙ্গা চাষ করেন তিনি। গত বছর প্রায় এক লাখ টাকার ফসল বিক্রি করেছেন। এবারও একই পরিমাণ ফসল বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি।

বিষমুক্ত

চরজুবলী ইউনিয়নের কয়েকজন কৃষক বললেন, কেবল সবজি নয়, পাশাপাশি পুকুরে মাছ ও হাঁস চাষ করছেন তারা। এতে করে তাদের বাড়তি আয়ের সংস্থান হয়েছে।

কৃষকরা জানান, সুবর্ণচরের এসব গ্রামে উৎপাদিত বিষমুক্ত সবজি বিক্রিকে কেন্দ্র করে উপজেলার সোলেমান বাজার, কালাদূর বাজার, ভূমিহীন বাজার ও হাতিয়া বাজারসহ বেশকিছু স্থানীয় পাইকারি বাজার গড়ে উঠেছে। প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা ট্রাক বোঝাই করে সবজি কিনে নিয়ে যান। তবে বাজারজাত ব্যবস্থা খুব একটা আধুনিক না হওয়ায় চাষিরা তেমন মুনাফা করতে পারছেন না। এই সুযোগে আড়তদার ও বেপারিরা অনেক বেশি মুনাফা পকেটে ভরছেন।

বিষমুক্ত

কৃষকরা বলছেন, সবজি দ্রুতপচনশীল হওয়ায় বাজার মূল্য খারাপ হলেও তারা বিক্রি করতে বাধ্য হন। এসব বাজারে পাইকারি দর করলা প্রতি কেজি ৪০ টাকা; শসা, বরবটি, ঢেঁড়স, চিচিঙ্গা ও ঝিঙ্গা প্রতি কেজি ৩৫ টাকা; চালকুমড়া প্রতি পিস ২০ টাকা; গ্রীষ্মকালীন টমেটো প্রতি কেজি ৮০ টাক; সিম ৫০ টাকা; পেঁপে প্রতি কেজি ২০ টাকা ও মিষ্টিকুমড়া প্রতি পিস ১০ টাকা পাইকারি দরে বিক্রি হচ্ছে। সে তুলনায় জেলা শহর মাইজদীতে এসব সবজি নামতেই দাম হয়ে যাচ্ছে দ্বিগুণ।

স্থানীয়রা বলেন, সাত-আট বছর আগে এখানকার কৃষকরা রাসায়নিকমুক্ত নিরাপদ সবজির আবাদ করছেন। এরপর এখন পর্যন্ত তারা সরকারিভাবে কোনো ঋণ বা আর্থিক সহায়তা পাননি। যে কারণে শুরুতে লোকসানও গুণতে হয়েছে তাদের। তবে পরে সাগরিকা নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন সংস্থা সাগরিকা তাদের প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে সার্বিক বিষয়ে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। তাতে করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছে বলে জানান তারা।

সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার কৃষি কর্মকর্তা শিবব্রত ভৌমিক সারাবাংলাকে বলেন, সাগরিকার কৃষি ইউনিটের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদনে সমন্বিত শষ্য ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের মাঠ পর্যায়ে সহযোগিতা করছি আমরা। এর জন্য মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে সে অনুযায়ী উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা, জমিতে নিরাপদ বালাইনাশকের ব্যবহার আমরা নিশ্চিত করেছি। আমাদের লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের কাছে নিরাপদ রাসায়নিকমুক্ত ফসল পৌঁছে দেওয়া। এখানকার কৃষকদের উদ্যোগে আমাদের সেই লক্ষ্য অনেকটাই সফল হয়েছে।

বিষমুক্ত

জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনিস্টিটিউট, নোয়াখালীর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আমির ফয়সল সারাবাংলাকে বলেন, এখানকার কৃষকরা জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছেন। আমরাও কৃষকদের নিরাপদ ফসল উৎপাদনে কম্পোস্ট সার, ফেরোমন ফাঁদ, ব্যাগিং, নেটিং, ম্যাজিক পদ্ধতি ব্যবহারে আমরা উৎসাহিত করছি। এর ফলে শতকারা ৮০ ভাগ স্বাস্থ্যসম্মত সবজি উৎপাদন হচ্ছে। এ বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।

কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে রাসায়নিকমুক্ত ফসল উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ জয় করেছেন সুবর্ণচরের সবজি চাষিরা। জৈব পদ্ধতিতে নিরাপদ সবজি চাষের এই ধারাকে এগিয়ে নিতে হলে সরকারকে উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সেক্ষেত্রে কেবল সুবর্ণচর নয়, আশপাশের অঞ্চলগুলোতেও কৃষকরা এ পদ্ধতিতে সবজি চাষে উৎসাহিত হবেন।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন