বিজ্ঞাপন

ওপেন একসেস: সমতার জন্য মুক্তজ্ঞান

October 21, 2019 | 4:12 pm

এম এম আসাদুল্লাহ ও কনক মনিরুল ইসলাম

ইংরেজি ‘ওপেন একসেস’ শব্দ দুটির পরিচিতি আমাদের দেশের শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে অনেকের কাছেই নতুন মনে হতে পারে। বর্তমানে উন্নত বিশ্বে এটি গবেষণা ও তথ্য ব্যবস্থাপনায় বহুল প্রচলিত নতুন ধারার এক আন্দোলনের নাম। বাংলায় শব্দ দুটির মানে ‘উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার’। তবে বাংলায় অনেক ইংরেজি শব্দকে হুবহু নিজের করে নেওয়ার নজির রয়েছে। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিন্নতা এবং কারিগরি দিক বিবেচনা করে একে ‘ওপেন একসেস’ নামেই বাংলা ভাষায় স্থান দিলে সুবিধা হবে।

বিজ্ঞাপন

২১ থেকে ২৭ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী ওপেন একসেস সপ্তাহ পালিত হচ্ছে। এ বছর ওপেন একসেস সপ্তাহ ১২তম বছরে পদার্পন করছে। মুক্ত গবেষণা, মুক্ত তথ্য ও মুক্ত শিক্ষার সুবিধাগুলো ভিন্ন ভিন্ন দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়কে জানানো এবং উদ্বুদ্ধ করার মহৎ চেষ্টা থেকেই ‘ওপেন একসেস’ সপ্তাহের এই অগ্রযাত্রা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ‘স্টুডেন্টস ফর ফ্রি কালচার’ এবং ‘অ্যালায়েন্স ফর ট্যাক্সপেয়ারস’ এর সহযোগিতায় ওপেন একসেস আন্দোলনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক Scholarly Publishing and Academic Resources Coalition (স্পার্ক) এর উদ্যোগে প্রথমবারের মতো ওপেন একসেস দিবস পালন করা হয়। শুরুতে এটি ছিল সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক একটি আয়োজন। ২০০৮ সালে তারিখটিকে ওপেন একসেস দিবস হিসেবে নামকরণ করা হয় এবং ধীরে ধীরে এই দিবসটি আনুষ্ঠানিক ও বৈশ্বিক হয়ে ওঠে। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠানটি সপ্তাহব্যাপী (১৯-২৩ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত হয়। ২০১০ সালে ওপেন একসেস অনুষ্ঠিত হয় ১৮ থেকে ২৪ অক্টোবর। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সাল থেকে এটি প্রতি বছর অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ জুড়ে পালিত হয়ে আসছে। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক এই সপ্তাহটির বাংলা প্রতিপাদ্য হলো ‘সমতার জন্য মুক্ত জ্ঞান’। এ বছর সপ্তাহটি উদযাপনে ওপেন একসেস বাংলাদেশের মিডিয়া পার্টনার হিসেবে রয়েছে জিটিভি এবং সারাবাংলা ডটনেট।

উল্লেখ্য, একটি গবেষণা বা সৃষ্টিশীল কাজের পুরোটা প্রান্তিক ব্যবহারকারী সম্পূর্ণ বিনামুল্যে পেলে অথবা কপিরাইট বাধা অতিক্রম করে অনলাইনে বিতরণযোগ্য হলেই কেবলমাত্র তাকে ওপেন একসেস বলা যায়। গবেষণা নিবন্ধ, রিপোর্ট, কনফারেন্স পেপার, মনোগ্রাফ, প্রি-প্রিন্ট, বই, অডিও, ভিডিও, সফটওয়্যার, মাল্টিমিডিয়াসহ যেকোনো মৌলিক কাজই ওপেন একসেসের আওতাভুক্ত। মূলত, গত শতাব্দীর নব্বুয়ের দশকে ইন্টারনেট যোগাযোগ সহজলভ্য হলে শিক্ষা, তথ্য ও গবেষণা পত্রের অনলাইন প্রকাশনা যখন একটি প্রথা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তখনই ‘ওপেন একসেস’ আন্দোলন ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পায়। ‘ওপেন একসেস’ আন্দোলন অনলাইনে বিনামূল্যে তথ্য, গবেষণাপত্রগুলো ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশের জন্য কাজ করে থাকে। এটি একই সাথে প্রাপ্ত তথ্য এবং গবেষণাপত্রগুলোকে ‘অবাধে ব্যবহারের অধিকার’ নিশ্চিত করতেও কাজ করে।

বিজ্ঞাপন

আমরা জানি, আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি হচ্ছে দক্ষ তথ্যব্যবস্থাপনা, শিক্ষা এবং গবেষণা। আবার একটি গবেষণার সাফল্য নির্ভর করে এর ফলাফলের সব তথ্য সবার কাছে ঠিকঠাকভাবে সময়মত পৌঁছানোর ওপর। উদাহরণ স্বরূপ ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন, নতুন ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা আবিষ্কার কিংবা উবার/অ্যামাজনের মতো ই-ব্যবসার ক্ষেত্রে নতুন নতুন পদ্ধতির প্রয়োগ যথাযথ ও দ্রুততার সাথে জনগণের কাছে পৌঁছানোর শর্তটিও প্রযোজ্য। আবার অন্যদিকে একটি দেশে নতুন নতুন আবিষ্কার ও গবেষণা কার্যক্রমের চালিকাশক্তি ও পূর্বশর্ত হলো- সর্বশেষ গবেষণার ফলাফল সম্পর্কে দেশের গবেষকদের জ্ঞান অর্জনের পর্যাপ্ত সুবিধা থাকা। কিন্ত প্রথম শ্রেণির গবেষণাপত্রগুলোর উচ্চমূল্য আমাদের দেশের মতো স্বল্পন্নোত বা মধ্যম আয়ের দেশগুলোর গবেষকদের গবেষণাপত্র সংগ্রহ এবং এ সম্পর্কিত সর্বশেষ জ্ঞান অর্জনের পথে বড় বাধা। এমনিতেই নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণে এখনও পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের মতো দেশে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ বা বরাদ্দ দেওয়া কঠিন। অপর দিকে আর্থিক সঙ্গতির অভাবে দেশের গ্রন্থাগার এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও প্রয়োজনীয় গবেষণাপত্র সংগ্রহ করতে পারে না। এরকম পরিস্থিতিতে ওপেন একসেস আন্দোলন বাংলাদেশ তথা স্বল্পন্নোত বা মধ্যম আয়ের দেশগুলোর গবেষণা উন্নয়নে আশীর্বাদ স্বরূপ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। কেননা এই প্রক্রিয়ায় একজন গবেষক বিনা খরচে ‘ওপেন একসেস‘র মাধ্যমে আগের গবেষণাপত্রগুলোতে প্রবেশ এবং ব্যবহারের অধিকার পান। ওপেন একসেসের কপিরাইট লাইসেন্স বা স্বত্ব সুরক্ষার আওতায় একজন লেখক, শিল্পী বা গবেষক তাঁর মৌলিক কাজটির ব্যবহারের সীমারেখা নির্ধারণ করে দিতে পারেন। সেটি হতে পারে ব্যবহারকারীদের বাধ্যতামুলক প্রাপ্তি-স্বীকার শর্ত, মৌলিক কাজটির যেকোনো রকম পরিবর্তনে নিষেধাজ্ঞা অথবা বাণিজ্যিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা প্রদানের মাধ্যমে।

এ প্রসঙ্গে আরও বলে রাখা ভালো- প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই গবেষণার সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক এবং অর্থদাতা। বছরে শত শত মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বিভিন্ন গবেষণার পেছনে বরাদ্দ থাকে এবং খরচ হয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে জনগণের মঙ্গলের উদ্দেশ্যে, জনগণেরই করের টাকায় এই গবেষণাগুলো করা হলেও শুধুমাত্র পদ্ধতিগত প্রকাশনার কারণে জনগণকে আবার এই গবেষণাপত্রগুলো পড়তে ও ব্যবহারে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। এর পরও প্রায় সবক্ষেত্রেই গবেষক এবং সম্পাদকেরা কাজ করেন প্রকাশিত গবেষণাপত্রের জন্য নামমাত্র পারিশ্রমিকে বা ক্ষেত্রবিশেষে পারিশ্রমিক ছাড়াই। এভাবে প্রচলিত শতাব্দী প্রাচীন গবেষণা/প্রকাশনা পদ্ধতি জনসম্পৃক্ততা থেকে মুক্তভাবে তথ্য আহরণ, শিক্ষা প্রদান/গ্রহণ এবং গবেষণার মতো উন্নয়নের পূর্বশর্ত কার্যক্রমগুলোকে আলাদা করে রেখেছে। গবেষণাকে আপামর জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে এটিকে ভীতিকর, জটিল ও দুঃসাধ্য কাজ হিসেবে সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মনের মাঝে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে।

বিজ্ঞাপন

আমরা জানি থিয়োরি অব রিলেটিভিটির মত জটিল এবং দুর্বোধ্য আবিষ্কার এসেছে পেটেন্ট অফিসের কেরানি আইনস্টাইনের কাছ থেকে। বৈদ্যুতিক বাল্ব কিংবা উড়োজাহাজের মত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার এসেছে একেবারে অপ্রচলিত গবেষক এডিসন কিংবা রাইট ব্রাদার্সের কাছ থেকে। একটি গবেষণার মূল সাফল্য আসে তার ব্যবহার উপযোগিতা এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে। জনসম্পৃক্ততার মতো গবেষণা কার্যক্রমের মৌলিক অপরিহার্যতা এখন ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রসারের মাধ্যমে সহজেই অর্জন করা সম্ভব। এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির হাত ধরে তথাকথিত কুলীন ভালো ছাত্র থেকে শুরু করে হরি-ধানের জনক হরিপদ কাপালীর মত প্রান্তিক জনগণেকেও গবেষণা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ও স্বীকৃতি প্রদান করা সম্ভব। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে মানবিক উন্নয়ন ও জ্ঞানের উৎকর্ষের জন্য জনগণের বিনিয়োগকৃত অর্থের সুফল দ্রুততার সাথে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ওপেন একসেস আন্দোলন কাজ করছে।

আন্তর্জাতিক ওপেন একসেস সপ্তাহ উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও ‘ওপেন একসেস, বাংলাদেশ’ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সংগঠনটি ২৬ অক্টোবর ঢাকার বাংলাদেশে জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। বর্ণাঢ্য র‍্যালির মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে ওপেন একসেস পদ্ধতি ছড়িয়ে দিতে ও সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দিবসটির শুরু হয়েছে। দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, সরকারি নীতি নির্ধারক, বিভিন্ন বিষয়ের গবেষক, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান পেশাজীবী এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ গবেষক শিক্ষার্থী এতে অংশ নেবেন। আন্তর্জাতিক এই সপ্তাহটি পালনে ‘সোসাইটি ফর লিডারশিপ স্কিলস ডেভেলপমেন্ট (এসএলএসডি)’ এবং ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদ’ ওপেন একসেস বাংলাদেশের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

লেখক: ওপেন একসেস বাংলাদেশের কর্মী

সারাবাংলা/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন