মঙ্গলবার ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর: মৃত্যু হার মেনেছিলো যার সামনে

অক্টোবর ২৯, ২০১৯ | ২:৫১ অপরাহ্ণ

রহমান রা’আদ

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে হঠাৎ গর্জে উঠলো মেশিনগান, একের পর এক শেল পড়তে শুরু করলো চট্টগ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙ্গালী সৈনিকদের রিক্রুট সেন্টার ইবিআরসি'তে। সদ্যই ১৮ পেরোনো রিক্রুট সিপাহী হামিদুর রহমান ঘুম থেকে উঠে কেবল ধ্বংস, হত্যা আর আর্ত-চিৎকার ছাড়া আর কিছু দেখতে পেলেন না। কিন্তু তিনি ভয় পাননি।

বিজ্ঞাপন

তাৎক্ষণিকভাবে বাঙ্গালী অফিসার আর সিপাহীদের বাকি ইউনিটগুলোর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অস্ত্র হাতে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুললেন সিপাহী হামিদুর। এত ধ্বংস আর মৃত্যুর মাঝেও যে এভাবে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে, ২০ বেলুচ রেজিমেন্টের পাকিস্তানী সেনাদের সেটা কল্পনাতেও ছিল না। কিন্তু পৃথিবীর অন্যতম দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনীর অত্যাধুনিক মরণাস্ত্রের সামনে কয়েকটি এলএমজি আর থ্রি নট থ্রি দিয়ে কতক্ষণ যুদ্ধ করা যায়? ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অকুতোভয় যোদ্ধারা একে একে শহীদ হতে শুরু করলো।

১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তদানীন্তন যশোর জেলার (বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলা) মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া হামিদুরের বাবার নাম আব্বাস আলী মণ্ডল আর মা মোসাম্মাৎ কায়সুন্নেসা। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলেন হামিদুর। দরিদ্র বাবা পড়ালেখার খরচ দিতে পারতেন না। বহু কষ্টে প্রাইমারি শেষ করার পর বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে লেগে যেতে হয়েছিলো। কিন্তু পড়ালেখার আগ্রহ তার কখনই মরে যায়নি। তাই ক্লাস সিক্সে গ্রামের হাইস্কুলের নাইট শিফটে ভর্তি হয়েছিলেন। সারাদিন কৃষিকাজ করে রাতে পড়ালেখা করতেন। গায়ে-গতরে খুব শক্তিশালী ছিলেন দেখে সেনাবাহিনীতে চেষ্টা করা হলো।

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে হামিদুর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে উত্তীর্ণ হয়ে গেলেন। প্রথম পোস্টিং হলো চট্টগ্রামে। বাবা ছেলেকে নিয়ে গর্ব করতেন, "আমার হামিদুরের মত সৎ পোলা আর নাই, যেকোনো কাজে তার উপরে ভরসা করা যায়।” একটাই সমস্যা, হামিদুর একবার রেগে গেলে কেউ তাকে থামাতে পারত না। ২৫শে মার্চের সেই কালরাতে চট্টগ্রামের ইবিআরসিতে ২৫০০ বাঙ্গালীর লাশ দেখে হামিদুরের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলো। ১৮ বছরের হামিদুরের চোয়ালবদ্ধ শপথে মিশে থাকলো শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে না দেবার দৃপ্ত প্রতিজ্ঞা।

বিজ্ঞাপন

একাত্তরের অক্টোবরের শুরুর দিকে ইস্টবেঙ্গলের সি কোম্পানির ওপর দায়িত্ব পড়লো ধলই সীমান্তের ফাঁড়ি দখল করা। সিলেটের সীমান্ত এলাকা শ্রীমঙ্গল হতে দশ মাইল দক্ষিণে ধলই সীমান্ত ঘাঁটি। এরই মধ্যে চা বাগানের মাঝে আস্তানা গেড়েছে পাকিস্তানীরা। মাত্র চারশো গজ দূরে ভারতীয় সীমান্ত। চা বাগানেই বাঙ্কার করে এক শক্ত অবস্থান নিয়ে বসে আছে পাকিস্তানি হানাদাররা। ধলই চা বাগানের পূর্ব পাশে এই ঘাঁটিটি সিলেটে পাকিস্তানীদের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি। পাকিস্তানের দুর্ধর্ষ ৩০তম ফ্রন্টিয়ার রেজিমেন্ট পাহারা দিচ্ছে ঘাঁটিটি। ভোর চারটায় মুক্তিবাহিনী লক্ষ্যস্থলের কাছে পৌঁছে অবস্থান নেয়। চারদিকে সুনসান নীরবতা। সেখানে কেবল জেগে আছে মুক্তিবাহিনীর একটি ইউনিট।

এই ইউনিটটি পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে হটিয়ে ধলই সীমান্ত ঘাঁটি দখলে নেবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ভোর রাতেই আক্রমণ করা হবে ঘাঁটিটি। লেফটেন্যান্ট কাইয়ুম এ অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সারারাত চলেছে আক্রমণের প্রস্তুতি। রাতভর পথ চলে ভোরের দিকে ঘাঁটির কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে ইউনিটটি। সবকিছুই হচ্ছে নীরবে-নিভৃতে। পাকিস্তানীরা যেন কিছুতেই টের না পায়। মুক্তিবাহিনীর এই দলটি হানাদার বাহিনীর তুলনায় অনেক ছোট হলে কী হবে- সাহসে দেশপ্রেমে তারা অনেক বড়, অনেক অগ্রগামী। তাদের অস্ত্রশস্ত্রও হানাদার বাহিনীর অস্ত্রের তোলনায় মান্দাতার আমলের। এই দলেরই তরুণ যোদ্ধা হামিদুর রহমান। মাঝারি গড়নের সুঠাম দেহের অধিকারী এই তরুণের মনের জোর অসম্ভব শক্ত। আক্রমণের জন্য তৈরি ইউনিটটি। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা অংশ নিচ্ছে এই যুদ্ধে। সামনে দুই প্লাটুন এবং পিছেন এক প্লাটুন সৈন্য। প্রথম দুই প্লাটুন ডান ও বাম দিক থেকে ঘাঁটি আক্রমণ করবে। আর পেছনের প্লাটুনটি পেছন থেকে ঘাঁটিটি আক্রমণ করবে। সামনে দুই প্লাটুন ও পেছনে এক প্লাটুন সৈন্য অবস্থান নিয়েছে। তারা প্রস্তুত শত্রুর ওপর চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য!

২৮শে অক্টোবর ১৯৭১। ভোর রাত। ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা দলটা লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের নেতৃত্বে নিঃশব্দে এগিয়ে যাচ্ছে শ্রীমঙ্গলের ধলই বর্ডারের পাকি ঘাঁটির দিকে। যেভাবেই হোক আজ এই ঘাঁটি দখল করতে হবে। হঠাৎ করেই সামনে পায়ের তলায় একটা মাইন বিস্ফোরণ, শহীদ হলেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধা গুরুতর আহত হলেন। রক্তে লাল হয়ে গেল মাটি। কিন্তু এত মৃত্যুর পরও পেছনে হটার কোনো সুযোগ নেই। ঘাঁটি দখল করতেই হবে। এক পর্যায়ে হতাহতের সংখ্যা আরও বেড়ে গেল। মুক্তিযোদ্ধারা আরও অগ্রসর হলেন। মুক্তিবাহিনী সীমান্ত ফাঁড়ির খুব কাছে পৌঁছে গেলেও ফাঁড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্ত হতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলিবর্ষণের জন্য আর অগ্রসর হতে পারছিলো না। পাকিস্তানি গানাররা ঝাঁকে ঝাঁকে বুলেট ছুঁড়ছে। ঘন গাছগাছালির কারণে মুক্তিযোদ্ধারাও সঠিকভাবে তাদের মেশিনগান চালাতে পারছে না। সামনে এগোতে হলে অবশ্যই সেই এলএমজিটা থামিয়ে দিতে হবে। লে. কাইয়ুম সিদ্ধান্ত নিলেন, যেভাবেই হোক ওই এলএমজিটা থামাতেই হবে। কিন্তু এই অবিরাম গুলি-বৃষ্টির মধ্যে সামনে যাওয়ার অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে যাবে কে?

দলের কমান্ডার লেফট্যানেন্ট কাইয়ুমের পাশে এসে দাঁড়ালেন হামিদুর। 'স্যার, আমি যাই? দুইটা গ্রেনেড দিয়া এই পোস্ট উড়ায়া দিমু। বেশিক্ষণ লাগব না।' কাইয়ুম তার দিকে ভালোভাবে তাকালেন। চেহারা থেকে এখনো কৈশোরের ছাপ যায়নি, একেবারে বাচ্চা বয়স। কী সুন্দর হাসিমুখে বলছে, স্যার আমি যাই… হামিদুরের তাগাদা, ''যাই না স্যার…" অনুমতি দিলেন কাইয়ুম, অশ্রুসিক্ত নয়নে ভাবতে থাকলেন, এই জীবনে হয়তো এই হাসিখুশি সাহসী ছেলেটার সঙ্গে আর দেখা হবে না…

পাহাড়ি খালের ভেতর দিয়ে ক্রল করতে করতে প্রায় ১৮০ ফুট দূরত্ব পার হয়ে গেলেন হামিদুর, মাথার ওপর দিয়ে, শরীরের আশপাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে গুলি ছুটছে, একটা মুহূর্তের বিরাম নেই।

এই তো আরেকটু…তারপরেই ঘটলো এক বিচিত্র ঘটনা। মেশিনগান পোস্টের গানাররা মরার আগে জীবনের শেষ মুহুর্তে দেখলো একটা বিচিত্র দৃশ্য। একটা মানুষ মুহুর্মুহু গুলির মাঝখানে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, বাঘের মত গর্জনে 'জয় বাংলা' চিৎকার দিয়ে গ্রেনেড ছুঁড়ে মারলো পাকিস্তানি মেশিনগান পোস্টে। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে মেশিনগানটা অকেজো হয়ে গেলো, ছিটকে গেলো সব কিছু।

হামিদুর হঠাৎ টের পেলেন, তার শরীর দিয়ে রক্ত পড়ছে। এদিকে মেশিনগান বন্ধ হলেও মেশিনগান পোস্টের ভিতরে বেঁচে যাওয়া দুই পাকিস্তানি সৈন্য তাদের অস্ত্র দিয়ে আবার গুলিবর্ষণ শুরু করেছে। ওদের থামাতে না পারলে তো মুক্তিযোদ্ধারা এগোতে পারবে না। বাপে গর্ব করে বলতো, হামিদুররে যেকোনো কাজে ভরসা করা যায়, যেমনে হোক সে কাজটা শেষ করবেই। বাপকে হামিদুর সারাজীবন সঠিক প্রমাণ করে এসেছে, আজ তার ব্যতিক্রম হয় কী করে?

সঙ্গে থাকা ছুরি দুটো দু’হাতে নিয়ে শরীরের সবটুকু শক্তি এক করে হামিদুর ঝাঁপিয়ে পড়লেন মেশিনগান পোস্টের ভেতর। সঙ্গে সঙ্গে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করল এক সৈন্য,  আরেক সেনা বেয়নেটটা ঢুকিয়ে দিলো পেটের ভেতর। আর তারপরেই প্রবল জলোচ্ছ্বাসের মত মৃত্যুরা যেন ছুটে এলো ওদের দিকে, অকৃত্রিম বিস্ময় এসে জমা হলো ওই পাকিস্তানি সেনাদের চোখে। অজস্র গুলি খাওয়ার পরেও হামিদুর থামেননি, পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে বুকের হাড় উড়িয়ে দেওয়ার পরেও কিংবা এতো বড় একটা বেয়নেট ঢুকিয়ে দেওয়ার পরেও হামিদুর থামেননি, ঠিকই তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদের হৃদপিণ্ডে ছুরিটা ঢুকিয়ে দিলেন… কী অকুতোভয় সাহস, কী অসামান্য বীরত্ব!

কিছুক্ষণ পরের কথা। মেশিনগান স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রবল প্রতাপে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রচণ্ড যুদ্ধের পর ধলই ঘাঁটি দখল করেছে মুক্তিযোদ্ধারা। পূর্ব দিগন্তে ভোর হচ্ছে, একটা টকটকে লাল সূর্য উঠছে। গুলিতে আর বেয়নেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হামিদুরের মুখে ওই লাল সূর্যের সোনালি আভা এসে পড়ছে। স্বাধীনতার লাল সূর্যটা আনতে হাসিমুখে জীবন উৎসর্গ করা হামিদুরের চোখ দুটো তখনও খোলা। বারুদ মেশানো দুটি চোখ তখনও যেন চিৎকার করে বলছে— জ-য় বা-ঙ-লা…।

আশ্চর্য হলেও সত্য যে, এই অসামান্য বীর তার দেশের মাটিতে চিরশান্তিতে ঘুমাতে পারেননি। একাত্তরের সেই প্রবল যুদ্ধের সময় তার মৃতদেহ সীমান্তের অল্প দূরে ভারতীয় ভূখণ্ডে ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমের ছড়া গ্রামের স্থানীয় এক পরিবারের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়েছিলো। নিচু স্থানে অবস্থিত কবরটি এক সময় তলিয়ে যায় পানির নিচে। যে বীরের অভূতপূর্ব আত্মত্যাগে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিলো, তার দেহাবশেষটা অযত্নে অবহেলায় ডুবে গিয়েছিল ভিনদেশী ভূখণ্ডে। তারপর ২০০৭ সালের ২৭শে অক্টোবর বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। সে অনুযায়ী ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলসের একটি দল ত্রিপুরা সীমান্তে হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ গ্রহণ করে এবং যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে কুমিল্লার বিবিরহাট সীমান্ত দিয়ে শহীদের দেহাবশেষ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

হামিদুরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা! মাত্র দেড় মাসের ট্রেনিং নিয়ে এসেছিলেন বলে প্রথমে তাকে সম্মুখযুদ্ধে পাঠানো হয়নি। লাগানো হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করার কাজে। অথচ স্রেফ একটা সুযোগেই সেই হামিদুর দেশের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন প্রাণ। শহীদ হওয়ার সময় সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বীরশ্রেষ্ঠ পদকে ভূষিত হওয়া হামিদুরের বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর ৭ মাস! যে জন্মভূমির মাটিকে শত্রুমুক্ত করতে অকাতরে জীবনটা বিলিয়ে দিয়েছিলেন হামিদুর, সেই মাতৃভূমির মাটি তাকে পরম মমতায় আগলে রেখেছে বুকের ভেতর!

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/আইই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন