বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৩ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

শিশুবান্ধব এক দেশের কথা

অক্টোবর ৩০, ২০১৯ | ১০:০০ পূর্বাহ্ণ

এই বছরের শুরুর দিকের কথা। আমার একমাত্র সন্তানের তখন সবে দুই বছরে পা দিয়েছে। লক্ষ্য করলাম, সে হঠাৎ হঠাৎ মাথার দুই পাশে হাত দিয়ে ব্যথার মতো ভঙ্গি করে। যেহেতু সে তখনও পরিষ্কার করে কথা বলতে শেখে নি তাই ব্যাথা শব্দটা বুঝিয়ে বলতে পারতো না। ওর এই আচরণ দেখে অভিভাবক হিসেবে আমরা ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। শুরু হলো হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে দৌড়ানো। এভাবেই মুখোমুখি হলাম অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতার।

বিজ্ঞাপন

চিকিৎসার এক পর্যায়ে আমাদের বলা হলো সিটিস্ক্যান করতে। তখন আমরা দেখাচ্ছিলাম ঢাকার নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটে। সেখানেই সিটিস্ক্যান করাতে হবে। বেশ লম্বা লাইনের পর আমাদের নম্বর এলো। ভেতরে যিনি ছিলেন তিনি বললেন বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে আনতে হবে।

এবার শুরু হলো আমাদের যুদ্ধ। এতোবড় হাসপাতালে বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানোর জায়গা নেই, কাউকে জিজ্ঞাসা করে কিছু না পেয়ে একটু নির্জন করিডোরে ওকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানোর মিশন শুরু করলাম আমি আর ওর বাবা। কিন্তু ছেলে কিছুতেই ঘুমাবে না। সে মানুষ দেখবে। সে নতুন জায়গা দেখবে। বহু কষ্টে ওকে ঘুম পাড়ানো হলো। এজন্য নষ্ট হলো প্রায় আড়াই ঘণ্টা।

প্রায় একই অবস্থার সম্মুখীন হয়েছি নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের পাশের চক্ষু হাসপাতালেও। যদিও সেখানে বাচ্চাদের বিশ্রামের ও বুকের দুধ পান করানোর জন্য একটা জায়গা আছে। কিন্তু সেখানে রোগীর তুলনায় জায়গা এতোই কম যে সেই ভীড়ের মধ্যে কোনো বাচ্চাকে অন্তত জোর করে ঘুম পাড়ানো সম্ভব না।

বিজ্ঞাপন

শিশুবান্ধব দেশ

ডেনমার্কের একটি বেবি লাউঞ্জে বাচ্চাদের স্ট্রলার

আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি ঢাকার বেশিরভাগ শপিং মল, বাস-ট্রেন কাউন্টার, কমিউনিটি সেন্টার বা হাসপাতালে বাচ্চাদের ডায়পার পরিবর্তন বা বুকের দুধ পান করানোর জায়গা নেই। ফলে বাচ্চা নিয়ে কোথাও গেলে কীভাবে আমরা তার ডায়াপার পরিবর্তন করি সে কথা লিখতে গেলে ছোটখাটো যুদ্ধের কথা লিখতে হবে।

গতমাসে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে এসেছি পারিবারিক কিছু কাজে। এখানে এসে যা দেখছি তাতেই মুগ্ধ হচ্ছি। তবে হাসপাতাল বা শপিং মলে এরা যেভাবে বাচ্চাদের ডায়াপার পরিবর্তন, বুকের দুধ পান করানো বা খেলার ব্যবস্থা রেখেছে, তা দেখে রীতিমতো কষ্ট হয়েছে আমার।

ছোট-বড় যে শপিং মলেই যাচ্ছি সেখানেই বাচ্চাদের ডায়াপার পরিবর্তনের জন্য আলাদা কক্ষ দেখেছি। কোথাও সেটি নারীদের জন্য নির্ধারিত টয়লেটের সঙ্গে লাগোয়া, আবার কোথাও একেবারেই আলাদা জায়গা। কোনো কোনো জায়গায় বাচ্চাদের জন্য আলাদা লাউঞ্জ রাখা হয়েছে। যেখানে একাধারে স্তন্যপান,  বাচ্চাদের খেলাধুলা এবং ডায়াপার পরিবর্তনের জায়গা রয়েছে।

শিশুবান্ধব দেশ

ছবিতে ডায়াপার বদলের আলাদা জায়গা  ও কলসহ বেসিন

এসব জায়গায় ডায়াপার পরিবর্তনের জন্য আরামদায়ক বিছানার পাশে থাকে কলসহ বেসিন, হ্যান্ডওয়াশ ও টিস্যু পেপার। পাশেই থাকে ডায়াপারসহ অন্যান্য জিনিস ফেলার নির্ধারিত ডাস্টবিন। যা দ্রুত পরিস্কার করে ফেলা হয়। অর্থাৎ আপনি কখনোই ওই সব ডাস্টবিন উপচে পড়তে দেখবেন না।

এছাড়া ডেনমার্কের নাগরিকরা যেহেতু ভীষণ নিয়মনীতি মেনে চলেন, তাই তারাই সবকিছু পরিচ্ছন্ন রাখেন। নিজের ব্যবহার করা জিনিসপত্র যথাযথ জায়গায় ফেলেন যাতে পরবর্তী ব্যবহারকারীর কোনো সমস্যা না হয়।

এই দেশে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় শিশুরা। একটা বাচ্চা শপিং মলের মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে কান্নাকাটি করলেও কেউ একবার বিরক্ত হয়ে তাকাবে না। কারও বাচ্চা চিৎকার করলে এরা বিরক্ত হয় না। স্ট্রলারে বাচ্চা নিয়ে দাঁড়ালে যে কাউকে লিফটে বা যে কোনো লাইনের আগে দিয়ে দেবে। বাচ্চার স্ট্রলার নিয়ে রাস্তা পার হতে দেখলে গাড়িগুলো আপনিই থেমে যাবে। হাসপাতালে বসে বাচ্চারা কান্নাকাটি করলে নার্সরা এসে ধমক দিয়ে বলবে না, ‘বাচ্চার কান্না থামাতে পারেন না?’

এরা বাচ্চাকে কথায় কথায় অ্যান্টিবায়োটিক দেয় না, ঠাণ্ডা-সর্দি হলে চিন্তা করে না। কারণ, এরা মনে করে জীবাণুর সঙ্গে লড়াই করে বাচ্চারা শক্তিশালী হবে। প্রাকৃতিকভাবেই শিখে নেবে টিকে থাকার উপায়।

একটি শিশু এই দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় গুরুত্বের বিষয়। তারা বিশ্বাস করে শিশুরাই দেশের ভবিষ্যত, তাই তাদের বেড়ে ওঠার জন্য সবচেয়ে ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করা উচিৎ।

শিশুবান্ধব দেশ

শিশুদের খেলাধুলার জায়গা

এমনকি কোনো বাচ্চা জন্মের পর যদি যথাযথভাবে ওজন না বাড়ে তাহলে উল্টো চিকিৎসকরা বেশি টেনশনে পড়ে যাবেন। হোম নার্স বা চিকিৎসক যদি মনে করেন যে কোনো মা-বাবা তাদের সন্তানকে যথাযথ যত্ন করতে পারছেন না বা তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ দিতে পারছেন না তাহলে সেই বাচ্চাকে নিয়ে এমন কোনো পরিবারে দিয়ে দিতেও দ্বিধা করবে না যেখানে শিশুটি উপযুক্ত পরিবেশ ও যত্ন পাবে।

এখানে দেখি, কোনোদিন যদি বাবা-মায়েরা কোনো কারণে বাচ্চাকে ডে কেয়ারে দিতে না পারেন তাহলে তাকে নিয়ে সোজা অফিসে চলে যান। অথবা অফিসে জানিয়ে দেন, আজ তিনি ‘ওর্য়াক ফ্রম হোম’ করবেন। কারণ বাচ্চাকে রেখে আসতে পারছেন না।

আমাদের দেশের কর্মজীবীরা, বিশেষ করে মায়েরা একবার ভাবুন তো! এমন করলে কত হাজার টিপ্পনি আশপাশ থেকে শুনতে পাবেন? (কিছু কর্মক্ষেত্র ব্যতিক্রম, তাই সেগুলোকে উদাহরণ হিসেবে না টানাই ভালো)।

কোপেনহেগেনে আমি যে বাসায় থাকি সেখান থেকে মূল সড়ক দেখা যায়। সবসময়ই দেখি বাবা কিংবা মা সাইকেলের পেছনে বাচ্চাকে বসিয়ে বা স্ট্রলার নিয়ে যে কোনো কাজে চলে যাচ্ছেন। প্রতিটা রাস্তা বা ফুটপাত এমনভাবে তৈরি যেন, যে কেউ স্ট্রলার নিয়ে চলাচল করতে পারে। বাচ্চাকে কোথায় রাখবেন সেটা ভেবে কারও ক্যারিয়ার নষ্ট করতে হয় না।

শিশুবান্ধব দেশ

আমি দেখি আর আশ্চর্য হই! বাংলাদেশে নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলাতে পারি না। মনে হয় এক স্বপ্নের দুনিয়ায় এসে পড়েছি! মনে হয় এমনও দুনিয়া হয়? এমনও মানুষ হয়?

আমাদের দেশে কোনোদিন এসব সুবিধা হবে সেকথা স্বপ্নেও ভাবি না। তবে যদি সত্যিই কোনোদিন হয় তখন আমার এই লেখা পড়ে সেই সময়ের বাবা-মায়েরা অবাক হবেন এটা নিশ্চিত।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এসএমএন/আরএফ

Advertisement
বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন