মঙ্গলবার ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

একলব্য সাকিব এবং ২২ গজের স্পোর্টস ক্যাপিটালিজম

অক্টোবর ২৯, ২০১৯ | ১০:৪৮ অপরাহ্ণ

রাজীব নন্দী

আমরা আমাদের সমাজের নায়কদের ‘শয়তান’ অথবা ‘ফেরেশতা’ এই দু'টির কোন একটিতে সবসময় দেখতে চাই। এই দৃষ্টিভঙ্গি খুব অদ্বান্দ্বিক। করপোরেট ক্রিকেটের জুয়া সাপের সর্বশেষ ছোবল পড়ল আমাদের জাতীয় নায়ক সাকিবের গায়ে! সাকিব এখন ‘ফেরেশতা’ না কি ‘শয়তান’? সাকিবকে এখন আমরা কোন পাল্লায় তুলবো সেটা নিয়েই তোলপাড় বাঙালির ক্রিকেটপাড়া।

বিজ্ঞাপন

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, সব ধরনের ক্রিকেট থেকে দুই বছরের জন্য সাকিব আল হাসানকে নিষিদ্ধ করেছে আইসিসি। তবে তার বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগ মেনে নেওয়ায় এক বছরের নিষেধাজ্ঞা কমানো হবে বলেও জানিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থাটি। সে অনুযায়ী ২০২০ এর ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সব ধরনের ক্রিকেটেই নিষিদ্ধ থাকবেন এই সময়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার (সূত্র: সাকিবের ক্রিকেটে ২ বছরের নিষেধাজ্ঞা আইসিসি’র; অক্টোবর ২৯, ২০১৯, ৬:৪০ অপরাহ্ণ)।

এদিকে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে সাকিব আল হাসান আইসিসিকে বলেন (সূত্র: পূর্বোক্ত), ‘আমার ভালোবাসার এই খেলা থেকে বিরত থাকতে হবে, এটি নিঃসন্দেহে চূড়ান্ত দুঃখজনক। তবে আমাকে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে আইসিসিকে না জানানোর কারণে আমি সম্পূর্ণভাবে এই নিষেধাজ্ঞা স্বীকার করে নিচ্ছি। আইসিসি’র দুর্নীতি তদন্ত কমিশন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে খেলোয়াড়দের ওপরই নির্ভর করে থাকে। এ ক্ষেত্রে আমি আমার দায়িত্বটি পালন করতে পারিনি।’

বাতাস যখন দারুণ প্রতিকূলে বহমান, তখন টের পাওয়া যায়, কাণ্ডারি কতটা হুঁশিয়ার। নিশ্চিতভাবেই সত্য, বাংলাদেশের ক্রিকেট সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি! হাইস্কুলে ইংরেজি পাঠ্যবইয়ে রবার্ট ব্রাউনিংয়ের একটি কবিতা পড়েছিলাম, নাম ছিল ‘দ্য প্যাট্রিয়ট’। কবিতাটি শুরু হয় এইভাবে ‘It was roses, roses, all the way...’ বীর দেশপ্রেমিক নেতা দেশে ফিরছেন, নেতার প্রবেশ পথজুড়ে ফুলে ফুলে ঢাকা। সহস্রপুরবাসী পরিবৃত্ত নেতা বিজয়ীবেশে ফিরছেন নগরে। লোকজন জড়ো হয়েছে, সোল্লাসে-করতালিতে মুখরিত জনতা। যদি এই বীর সূর্যও দাবি করে; তাও পুরবাসী তাঁকে এনে দেওয়ার চেষ্টা করবে- Had I said, “Good folk, mere noise repels---/But give me your sun from yonder skies!”/ They had answered, “And afterward, what else?”

বিজ্ঞাপন

কিন্তু হায়!

বছর ঘুরে ‘নতুন সময়’ সমাগত। কবিতায় এলো পরিবর্তন। এবার সেই বীরকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। তাঁকে ঝোলানো হবে ফাঁসির মঞ্চে। বীরের পড়নের কাপড় ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করা হলো, বীরের কপাল দিয়ে ঝড়ছে রক্ত- ‘I go in the rain and more than needs,/A rope cuts both my wrists behind;/ And I think, by the feel, my forehead bleeds...’ উত্তেজিত পুরবাসীর ছোড়া পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত বীর। ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই স্লোগানে পুরবাসী জড়ো হয়েছে বীরের ট্র্যাজিক প্রস্থানপথে। বীরের মৃত্যু হয়!

সাকিব কি সেই দেশপ্রেমিক নায়ক, যার ট্রাজিক প্রস্থানের জন্য জাতি উন্মুখ হয়ে উঠবে? এই চরম দুঃখের মধ্যে ব্রাউনিংয়ের কবিতার কথা মনে পড়ছে। ক্রিকেট খেলার সাথে ‘ছদ্ম জাতীয়তাবাদ’ মিশিয়ে বহু শরবত বাঙালি গিলেছে। খেলারও ‘শেষ খেলা’ আছে। ‘স্পোর্টস ক্যাপিটালিজম’ আমাদের দেশের ক্রিকেটারদের কেবল ‘শ্রমের বিনিময়ে মজুরির’ কথাই বলছে না। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে এই খেলাটিও সমাজের বাকি সব লেনদেনের মতো ভাবগত বিনিময়ের সম্পদ, পণ্য ও সেবার মূল্য নির্ধারণ করছে।
জন বুচানন-এর বিখ্যাত ‘দি ফিউচার অব দি ক্রিকেট’ বইয়ের একুশ পৃষ্ঠায় ‘হয়েন ওয়ার্ল্ডস কলিড’ চাপ্টারের লাইনে লাইনে লুকিয়ে আছে ক্রিকেট ও বিনোদন পুঁজির বিশ্বায়নের কথা। যেখানে বলা হচ্ছে, চিয়ার লিডার্স, ফায়ারওয়ার্ক্স ডান্সিংয়ের মাধ্যমে যে আইপিএলর উদ্বোধনী হয়, তা কেবলমাত্র বিনোদন নয়। সেখানে পৃথিবীর বুকে কয়েকটি যুদ্ধ বা সংঘাতেরও সৃষ্টি হয়।

হায় ক্রিকেট! এক সময় এই খেলা ছিল যুথবদ্ধ প্রচেষ্টা, আজ হলো করপোরেট ব্যবসা! ছিল নিখাদ দেশপ্রেম, হলো বিশ্রী দ্বেষপ্রেম। খেলার মাঠ হওয়ার কথা ঐক্যবদ্ধতার প্রতীক অথচ এখন জাতিগত ঘৃণা উৎপাদনের কারখানা। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ এই তিন জাতির ক্রিকেট খেলায় দর্শকরা আবেগ উজাড় করে বিষ ঢেলে দেয় পরস্পর পরস্পরের প্রতি। আগে যা ছিল ক্রিকেট, আজ তা পণ্য।

নির্মল বিনোদন নয়, ক্রিকেট এখন পুরোপুরি উগ্র জাতীয়তাবাদের অস্ত্র। জাতীয়তাবাদ এমন একটি আবেগে মোড়ানো ‘জাতীয় পরিচয়’ নিয়ে হাজির হয় এখানে যাকে উপেক্ষা করার সুযোগ খুব কম। যেভাবে ১৯৭২ সালে ববি ফিসার ও বরিস স্প্যাসকির বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ হয়ে উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যুদ্ধের সমতুল্য একটা কিছু। কিন্তু ক্রিকেট যেভাবে বিনোদনের ঊর্ধ্বে গিয়ে জাতীয় পরিচয়ের জিয়নকাঠি হয়ে উঠছে তাতে সমূহবিপদ ধাবমান।

একটি দল, একজন ক্যাপ্টেন, ১১ জন খেলোয়াড় যখন পুরো জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার মহান কর্তব্যের প্রতিভূ হয়ে দাঁড়ায় তখন ক্রিকেট ছাড়া বাকি সব ফালতু মনে হয়। জনতার আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলে সেই দল, ক্যাপ্টেন আর ১১ জন হয়ে উঠেন পূজনীয়, হেরে গেলে হয়ে যান ভিলেন। ক্রিকেট খেলার ভোক্তা-পাঠক-দর্শক-শ্রোতার গড় বয়স তারুণ্যের কোঠায়। বাংলাদেশে এখন কর্মক্ষম তারুণ্যের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। সেই তরুণরা যখনই কোনো কিছুতে হুজুগের মতো সামিল হয়, আমরা দেখি তাতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে মুনাফালোভীরা। এরা তারুণ্যের উদ্যোগ, শক্তি, পরিকল্পনাকে বিজ্ঞাপন, নাটক, সিনেমায় নানান ভাষায় বেচাবিক্রি করে।

বিশ্বকাপ এবং সাম্প্রতিক অনেক আন্তর্জাতিক ম্যাচকে ঘিরেই ভারতে নির্মিত টিভি বিজ্ঞাপনগুলো দেখলেই যার প্রমাণ মিলবে। এর নাম স্পোর্টস ক্যাপিটালিজম, যার কেন্দ্রভূমি হলো ক্রিকেটের প্রতি মানুষের জাতীয়তাবাদী আবেগ ও অনিঃশেষ ভালোবাসা। যার অমোঘ পরিণতির নাম- উন্মাদনা। একে পুঁজি করেই চলে চার-ছক্কার খেলা, ২২ গজের ব্যাট-বল ছাপিয়ে প্রতিপক্ষের ধর্ম-রাজনীতি-দেশপ্রেম-জাতীয়তাবাদ সবকিছুকে আমরা বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়ে দেই। বাংলাদেশের ক্রিকেটে জাতীয় পুরুষ দলের ক্যাপ্টেন মাশরাফি ঠিকই আমাদের চোখের সামনের পর্দা তুলে ধরে বলেছেন— ‘বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হয়েও বলছি, ক্রিকেট আমাদের দেশের জীবন-মরণ সমস্যা না। ক্রিকেট যদি কাল থেকে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কিছু মানুষ নিশ্চয় কষ্ট পাবেন, কেউ মারা যাবেন না। কিন্তু কৃষক যদি মাঠে না যায় আমি-আপনি মরে যাব। এটাই বাস্তবতা।’

যে ক্রিকেট আগে ছিল কেবল ইংরেজ জাতীয় সত্তার প্রতীক, সেটি হয়ে গেল উত্তর ঔপনিবেশিক স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর দ্বেষ-প্রেমের চূড়ান্ত প্রতীক। ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা আর দেশের প্রতি ভালোবাসা একই পাটাতনে তুল্যমূল্য হয়ে পড়ল! তাই এখনকার খেলায় দর্শক পাওয়া কঠিন। খেলার মাঠে দর্শকের শরীর খসে ভেসে ওঠে উগ্র জাতীয়তাবাদী কঙ্কাল। সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকে রাজতন্ত্র-সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে শিল্প বিপ্লবের ঝান্ডা নিয়ে পুঁজিবাদ হাজির হয়েছিল ত্রাতা হিসেবে। আজ সেই পুঁজিবাদ তার নিজের নিয়মেই বিনিয়োগ আর মুনাফার জন্য হাজির হয়ে গেল নির্মল বিনোদনের খেলার মাঠেও। মার্ক্স যা বলেছিলেন, চোখের সামনে তা-ই তো উন্মোচিত হতে দেখছি। বিশ্বায়নের যুগে এই ক্রিকেটিয়-দ্বেষপ্রেম আর ক্রীড়া-লগ্নিপুঁজির উলম্ফন স্বচক্ষে দেখলে মার্ক্স নিজেই খেলার মাঠের কোলাহল থেকে নিরাপদ দূরে দাঁড়িয়ে মৃদু হাসতেন। কারণ, আমরাই জেনে হোক আর না জেনে হোক— ‘খেলা’কে যুদ্ধ আর ‘যুদ্ধ’কে খেলায় পরিণত করছি।

আমরা আমজনতা যখন গ্রামের মাঠে ক্রিকেট খেলি, তখন সেটি ওয়েলফেয়ার ক্যাপিটালিজমের অনুসরণে হয়। শীতকালের গ্রামীন সমাজকল্যাণমুখী বিনোদন। আবার ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের ছকে যখন ক্রিকেট খেলা হয়, তখন সেটি অর্থনীতির ব্যবসায়িক সাফল্য নির্ভরতার মতো ব্যবসায়ী জনগোষ্ঠী ও সরকারি কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। যেমন: জাতীয় বা বিভাগীয় ক্রিকেট আসর। এরপর দেশের সীমানা পেরিয়ে ক্রিকেট যখন বৈশ্বিক বিনোদনে পরিণত হচ্ছে, তখন সেটা স্টেট ক্যাপিটালিজম বা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদকে প্রতিনিধিত্ব করছে। যেখানে খেলার দর্শক, খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, সরকার সবাই মিলে উৎপাদনের উপায় ও ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিতে সামিল হয়, একেবারে পুঁজিবাদী কায়দায়। বিশ্বায়নের সাম্রাজ্যবাদী প্রক্রিয়ায় পুঁজিবাদকে ব্যবহার করা হচ্ছে বিশ্বব্যপী। ক্রিকেটের চাইতে আরও বড় মুনাফার খেলা এই উপমহাদেশে না আসা পর্যন্ত ক্রিকেটই এই ভূমির ঈশ্বর। ক্রিকেটকে আবেগ দিয়ে নয়, ‘প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজের’ ফাঁদ হিসেবেও দেখার সুযোগ রয়েছে।

মহাকাব্য মহাভারতে অপরাধ না করেও শাস্তি পাওয়ার উদাহারণ রয়েছে। অপরাধ না থাকার পরও নিষ্পাপ একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে নেন রাজগুরু দ্রোণাচার্য। একনিষ্ট গুরুভক্ত একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুলি খসিয়ে অর্জুনের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছিলেন দ্রোণাচার্য। ফলে অর্জুনের দিগ্বিজয়ী রথের গতি অব্যাহত থাকল এবং শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হয়ে গেলেন এই ধরাধামে। আইসিসি আজ কি তবে কলিযুগের অহংকারী দ্রোণাচার্য? তাহলে সাকিব আমাদের বীর একলব্য? মানুষকে হয় ‘ফেরেশতা’ না হয় ‘শয়তানের’ কাতারে দেখতে চাওয়ার একটা প্রবণতা আমাদের আছে। প্রকৃত প্রস্তাবে মানুষকে দ্বান্দ্বিকতা নিয়ে বিশ্লেষণ করাটাই মনে হয় জরুরি। নিষাদপুত্র একলব্য সাকিব, ভালোবাসা জেনো।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
Advertisement
বিজ্ঞাপন

Tags: ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন