বিজ্ঞাপন

সজল হত্যায় বান্ধবীই জড়িত, সন্দেহ পরিবারের

October 30, 2019 | 10:50 pm

উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: মেয়ে বন্ধুকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় রাজধানীর হাজারীবাগে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাতে আরিফুল ইসলাম সজলকে (১৯) হত্যা করেছে বখাটেরা। সজল মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। পরিবারের দাবি, যে বান্ধবী ফোন করে সজলকে ডেকে নিয়ে যান, তিনি নিজেও এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পুলিশ মূল রহস্য বের করতে পারবে।

বিজ্ঞাপন

আর পুলিশের দাবি, নিহতের মেয়ে বন্ধুর দেওয়া তথ্যানুযায়ী বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। মেয়েটি সব দিক থেকে সহযোগিতা করছে। ওই মেয়েই সজলকে উদ্ধার করে প্রথমে শিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। প্রাথমিক তদন্তে মেয়েটি কোনোভাবেই জড়িত রয়েছেন— এমন প্রমাণ মেলেনি।

বিজ্ঞাপন

সজল তার পরিবারের সঙ্গে লালবাগ পশ্চিম ইসলামবাগ এলাকার ৭০/২২/এ ভবনের ষষ্ঠ তলায় থাকতেন। তারা তিন ভাই-বোন। সবার বড় ভাই মাকসুদুল আলম শান্ত অনার্সে ভর্তি হবেন। আর সবার ছোট বোন সূচনা প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। বাবা শহীদুল ইসলাম চুনু ইসলামবাগ এলাকায় প্লাস্টিক কাঁচামাল সামগ্রীর ব্যবসা করেন। আর মা শিল্পী বেগম গৃহিণী।

বুধবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, সজলের মা খাটের ওপর আহাজারি করছেন। তাকে ঘিরে আশেপাশের ও আত্মীয় নারীদের অনেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছেন। মায়ের কান্নার সঙ্গে তারাও সাথী হয়েছেন। মেধাবী ছেলেকে হারিয়ে সবাই যেন হতবাক।

বিজ্ঞাপন

শিল্পী বেগম সারাবাংলাকে বলেন, রাইফেলস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে গত বছর এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে পাস করে সজল। এরপর বন্ধুদের সঙ্গে মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজে ইন্টারমেডিয়েটে ভর্তি হয়। সে প্রতিদিন সকাল বেলা কলেজে যেত আর বিকেলে ফিরে বাসায় থাকত। বিকেলে প্রাইভেট টিউটর আসত, পড়ার পরও বাসাতেই থাকত। গতকাল সকাল ৭টার দিকে কলেজের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। ফেরে বিকেল ৪টায়। প্রাইভেট শিক্ষক এক ঘণ্টা পড়িয়ে চলে যায়। এরপর পাস্তা করে দিলে খেয়ে আমাকে বলে, মা আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসছি। এরপর রাত ৮টার দিকে এক মেয়ে ফোন করে বলে, সজলের অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে হবে। ঢামেকে গিয়ে জানতে পারি, সজল অনেক আগেই মারা গেছে।

সজল হত্যায় বান্ধবীই জড়িত, সন্দেহ পরিবারের

বিজ্ঞাপন

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা বলেন, সজল বলত, মা তুমি কোনো চিন্তা করো না। আমি ইঞ্জিনিয়ার হয়ে তোমাকে বাড়ি গাড়ি করে দেবো। তুমি আমার জন্য দোয়া করো। আমাকে ভালো ভালো করে একটু খাওয়াও।

তিনি আরও বলেন, ‘যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে তাদের আমি ফাঁসি চাই। আমার ছেলে কোনো অন্যায় করেনি। ও খুব ভালো ছেলে। জীবনে কারও সঙ্গে কোনো কিছু নিয়ে লাগেনি তার। সজল যে প্রেম করে, সেটাই আমরা কেউ জানি না। হয়তো কয়েক মাস হবে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠার।’

বিজ্ঞাপন

সজলের বাসার সামনের নরসুন্দর (সেলুন) রাসেল বলেন, ‘সজল খুব ভালো ছেলে ছিল। এলাকায় সবাই ওদের দুই ভাইয়ের প্রশংসা করে সবসময়। কেন তাকে মারা হলো, সেটা জানি না।’

সজলের মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে এসেছেন বান্ধবী তানহা মুনিয়া ও জেসমিন সিনথিয়া। সজলের বাসার সামনের সড়কে বসে আছেন। তানহা সারাবাংলাকে বলেন, ‘সজল এমনিতেই কথা কম বলত। কলেজে কোনো মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বলে জানি না। তবে তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে যতটুকু জেনেছি, একটি প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল সজলের। ওই মেয়ে একই বর্ষে পড়লেও কোন কলেজে পড়ে, তা জানি না।’

সজল হত্যায় বান্ধবীই জড়িত, সন্দেহ পরিবারের

বুধবার (৩০ অক্টোবর) আসর নামাজের পর পশ্চিম ইসলামবাগ ঈদগাহ মাঠে সজলের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। বিপুল সংখ্যক মানুষ জানাজায় অংশ নেন। এরপর তাকে রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

আজিমপুর কবরস্থানে কথা হয় সজলের বাবা শহীদুল ইসলাম চুনুর সঙ্গে। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘যে মেয়েটি সজলকে ফোন করে ডেকে নিয়ে গেছে। ওই মেয়েও এই হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই মূল রহস্য বের হয়ে আসবে। এছাড়া ওই মেয়ে তাদের চেনে, যারা সজলকে হত্যা করেছে। আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই আমি। আমার ছেলেকে কোনো দিন একটা থাপ্পরও মারিনি আমি। একপর্যায়ে বাবা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।’

আজ রাতেই পরিবারের পক্ষ থেকে হাজারীবাগ থানায় মামলা করা হবে বলে জানান সজলের ছোটভাই শান্ত।

দাফন শেষে সজলের সহপাঠী নজরুল, সানি, রবিউল ও আরাফাত সজোরে কান্না করতে থাকেন। এক ফাঁকে সানি সারাবাংলাকে বলেন, ‘সজলকে যারা হত্যা করেছে তাদের শাস্তির দাবিতে আগামীকাল আমরা কলেজের সামনে মানববন্ধন করব।’ বখাটেদের গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান তিনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপির ধানমন্ডি জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) আব্দুল্লাহেল কাফি সারাবাংলাকে বলেন, সজল হত্যায় তথ্য সংগ্রহের জন্য আমরা কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে এসেছি। মেয়েটিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। সে জানিয়েছে, সজলের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তারা বিয়ে করবেও বলে ঠিক করেছিল। একটা চাকরি পেয়েছে, সেটা জানাতেই সাক্ষাৎ করতে এসেছিল বলে মেয়েটি জানিয়েছে। মেয়ের ভাষ্যমতে বখাটেরা উত্ত্যক্ত করেছিল। সজল প্রথমে ধরে ওদের একজনকে চর মেরেছে। পরে তারা আরও ছেলেপেলে ডেকে এনে সজলকে মারধর করে। একপর্যায়ে ধারাল কিছু দিয়ে কোপায়।

তিনি আরও বলেন, পুলিশ দুই দিক দিয়েই তদন্ত করছে। বরগুনার মিন্নির মতো ঘটনা কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরিবার এখনো মামলা করেনি। তারা মেয়েকে অভিযুক্ত করলে আমরা তাকেও গ্রেফতার করব। তবে এখন পর্যন্ত মেয়ের সম্পৃক্ত পাওয়ার মতো কোনো ঘটনা পাওয়া যায়নি। কারা এ হত্যার সাথে জড়িত তা চিহ্নিত করতে পেরেছি। অল্প সময়ের মধ্যেই ভালো খবর জানাতে পারব বলে দাবি করেন তিনি।

সারাবাংলা/ইউজে/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন