মঙ্গলবার ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

সাকিব আল হাসানকে খোলা চিঠি, বিষয়: ক্রিকেট

অক্টোবর ৩১, ২০১৯ | ৬:৩৫ অপরাহ্ণ

জ্যোতিষ মন্ডল

প্রিয় সাকিব সমীপেষু,

বিজ্ঞাপন

শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানবেন। ভালো আছেন আশা করি। আপনারা অনেক ব্যস্ত থাকেন, পরিশ্রম করেন, জাতির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন— সে অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি অবনত মস্তকে। সামনে আপনার একবছর দীর্ঘ ছুটি, তাই আশাবাদী যে এই দীর্ঘ চিঠি পড়ার মতো সময় হয়তো আপনার হবে।

আমি আপনাকে এবং আপনার মাধ্যমে অন্যদেরও দুয়েকটি কথা বলতে চাই।

প্রথমেই আমি জানতে চাই, হঠাৎ সেদিন ঘুম থেকে উঠে কেন আপনাদের মনে হলো যে আপনারা সাংঘাতিক রকমের কম বেতন পান? এবং সেটা এত কম যে কাল থেকে খেলা বন্ধ না করলেই নয়? আগে কেন কখনোই এরকম মনে হয়নি? পুরো জাতিকে হঠাৎ কেন অন্ধকার গহ্বরে নিয়ে গেলেন, যখন সামনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ?

বিজ্ঞাপন

আপনি এখন একজন কোটিপতি পিতা। এক নয়, আপনি এখন কয়েক কোটি টাকার মালিক অবশ্যই। ধরুন তিন দিন পরে আপনার সন্তানের HSC পরীক্ষা, আর আপনার ছেলে BMW X5 কেনার দাবি জানিয়ে বলল, বাবা কাল থেকে লেখাপড়া বন্ধ! যতদিন BMW X5 কিনে না দেবেন, ততদিন আর পড়ালেখা করব না; যদিও আপনার ছেলের একটা ভালো কন্ডিশনের পুরাতন Toyota Axio আছে!

আপনি পিতা হয়ে সন্তানের এমন দাবির জন্য কী করবেন, সেটা আপনিই ভালো জানেন। তবে আমি হলে আমার বিবেকহীন সন্তানকে ঘাড় ধরে ঘর থেকে বের করে দিতাম। তবে সন্তান যদি বলত— বাবা, এবার আমি যদি দেশসেরা রেজাল্ট করতে পারি, তাহলে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাব, আর সেখানে  ক্লাসে যাওয়ার জন্য নতুন দামি BMW X5 গাড়ি উপহার চাই; আমার সন্তান এমন প্রস্তাব দিলে সাধ্য থাকলে আমি ছেলের পিঠ চাপড়ে বলতাম, সাবাস! এগিয়ে যাও। আপনি  কী বলতেন, জানার আগ্রহ রইল?

মনে রাখা প্রয়োজন, দ্বায়িত্বপূর্ণ পদে বসলে দ্বায়িত্বশীল আচরণ করতে হয়। নইলে সে দায়িত্ব বা ক্ষমতা হাতে থাকে না। দায়িত্ব চিরকালই দায়িত্বশীল মানুষের কাছে থাকতে পছন্দ করে। দায়িত্ব দায়িত্বহীনদের ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। এরই মধ্যে এই চির সত্য কথাটি আপনি উপলব্ধি করেছেন আশা করি। আপনি একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, সেটা আপনি বুঝেন কি না, জানি না। ঘোষণা দিলেন, আর পরদিন সব শ্রেণির খেলা বন্ধ করে দিলেন! এমন বাচ্চামি আঠারোর্ধ্ব মানুষের শোভা পায় কি? লিখিত দাবি পেশ করে দুয়েকমাস সময় দিলে কি আপনাদের বিশেষ ক্ষতি হতো? আপনারা কি দেশের ভাবমূর্তির কথা ভেবেছেন একবারও? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি আপনাদের সন্তানদের দাওয়াত করে তার নাতি-নাতনীদের মতো কোলে করে গণভবনে ঘুরে বেড়ান, চকলেট দেন, সরকারপ্রধান হিসাবে তিনি কি মনোক্ষুন্ন হলেন না? দুঃখ পেলেন না? কারণ বোর্ড কর্তারা তো তাকেই রিপোর্ট করে!

আমার জানার আগ্রহ, আপনাদের মধ্যে ক’জন গ্রাজুয়েট আছেন? ব্যাট দিয়ে বল পেটানো আর বল নিক্ষেপ করার চেয়ে ভালো আর কী কী যোগ্যতা আছে আপনাদের? বোর্ড চাকরি না দিলে এর চেয়ে ভালো আর কী কী কাজ করতে পারতেন? কত আয় করতে পারতেন? দু’হাজার ডলারের কম মাথাপিছু আয়ের দেশে একজন নন-গ্র্যাজুয়েট যদি অর্ধ লক্ষ ডলারের বেশি বেতন পান, সেটা কি খুব কম?

আপনারা বেতন বাড়ানোসহ অন্যান্য দাবির মধ্যে বিসিবির আয়ের ভাগও দাবি করেছেন। এ দাবিটি কী বুঝে করেছেন? নাকি না বুঝে করেছেন? হিসাব-নিকাশের পূর্ণ জ্ঞান থাকলে হয়তো এ দাবিটি করতেন না। আপনারা আজ খেলছেন, তাই বিসিবির টাকা আসছে— এই হয়তো আপনাদের যুক্তি। আমিও মানি। আপনি জানেন কি, আপনাদের গড়তে এ দেশের কত টাকা খরচ হয়েছে? শুনেছি, আপনারা আনেকেই বিকেএসপিতে বড় হয়েছেন। ওখানের মাঠ, দালানকোঠা, শিক্ষকদের পেছনে সরকারের কত খরচ হয়, জানেন? আর সরকার আপনাদের কাছ থেকে কত বেতন নিত তখন? ঘাটতির টাকা কে দিত? বড় বড় স্টেডিয়ামে আপনারা প্র্যাকটিস করেন, ওগুলো বানাতে আর রক্ষণাবেক্ষণে কত খরচ হয়, জানেন কি? কাল থেকে স্টেডিয়াম বানানোর খরচ কি আপনারা দেবেন? কারণ বিসিবির প্রফিটের টাকা আপনারা নিয়ে গেলে ওগুলো কিভাবে তৈরি হবে? স্টেডিয়াম বানাবে জনগণ আর এর আয় গুটিকয়েক মানুষ নেবে, সেটা হয় কি? আপনাদের অবগতির জন্য বলি, এই গরিব জাতির ঘামে অর্জিত আয়কর ও ভ্যাটের টাকায় বানানো ওই স্টেডিয়াম, যেখানে আপনারা খেলার সুযোগ পান। আর আপনাদের আত্মীয়-স্বজনরাও ভিআইপি গ্যালারিতে খেলা দেখার সুযোগ পায়।

আপনারা হারলেও বেতন পান, জিতলেও পান। আপনারা যখন হেরে যান, তখন ১৬ কোটি মানুষের চোখের জলের দাম কে দেয়? নাকি চিরকাল অপোরিশোধিতই থেকে যায়?

আমাদের বোর্ড কেন আপনাদের দাবি-দাওয়া এত পরে মেনে নিল, জানি না। ওনারা কি খোঁজ-খবর রাখেন না কিছুর? কারণ মেনে যখন নিয়েছে, তখন স্বীকার করতেই হবে যে দাবি বৈধ ছিল। তাদের কাছে প্রশ্ন, একবছর পরে আবার আপনারা এরকম দাবি করলে ওনারা কি সে বৈধ দাবিও পূরণ করবেন? কারণ আজকের দাবি বৈধ হলে কালকের দাবি অবৈধ হবে কেন? প্রশাসনের চেয়ারে বসলে শক্ত হাতেই দায়িত্ব সামলাতে হয়। না পারলে চেয়ার ছেড়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। চেয়ারে বসে অনেক বিচারক নিজের সন্তানকেও ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন— এমন ইতিহাসও বোধহয় খুব কম নেই।

আমার প্রশ্ন, আপনাদের মাথাটা কারা নষ্ট করলো? আপনারা তো প্রধানমন্ত্রীর কাছেও যান, সমস্যা থাকলে তাকেও তো জানাতে পারতেন? আপনাদের দাবি ওনাকে কেন জানালেন না? শুনেছি, উনিও রাত জেগে খেলা দেখে, উনি কি আপনাদের দাবি শুনতেন না? নির্বাচনে নমিনেশন চাইতে তো প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে পারলেন, সবার বেতন বাড়ানোর দাবি নিয়ে কেন গেলেন না?

আপনাদের মাথাটা খারাপ করে এর বিনিময়ে অন্য কেউ সুবিধা নিতে চায় কি না, ভেবে দেখেছেন কি? অধীনস্থরা তাদের বস চেঞ্জ করে ফেলবে, এমন পরিবেশ বা কালচার আপনি পছন্দ করেন কি? কাল আপনার দলের কেউ আপনাকে অধিনায়কের পদ থেকে সরানোর দাবি করলে আপনি কী করবেন? সঙ্গে সঙ্গে সরে যাবেন?

সাফল্য যখন আসে, তখনও মানুষের পা পাটিতেই রাখতে হয়। জ্ঞানীরা সেটাই করেন।  আপনি একটি জাতীয় দলের ক্রিকেটার, অথচ ক’দিন আগেও একটি রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচনের জোর চেষ্টাও করেছেন, প্রধানমন্ত্রী সেটা থামিয়েছেন। কতখানি যৌক্তিক কাজ ছিল সেটা? রিটায়ার্ড করার পরে করলে কি দেরি হতে যেত? আপনারা হয়তো বলবেন, কী ভুল ছিল তাতে? আপনি রাষ্ট্রের কর্মচারী হয়ে যদি নির্বাচন করতে পারেন, তাহলে অন্য সরকারি কর্মচারী কেন সেটা পারবে না? খেলা ফেলে হঠাৎ রাজনীতির ঝোঁক কেন হলো, ওখানের আয় কি আরও বেশি?

আপনি বড় দামি মানুষ, অবশ্যই সেটা মানি এবং সম্মানও করি। তবে কতক্ষণ আপনারা বড়? যতক্ষণ দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন, ততক্ষণ। জিম্বাবুয়ে দেশটাও খুব ভালো ক্রিকেট খেলত যখন অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার দেশের হয়ে খেলত। কে মনে করে ওদের এখন? বিনা বেতনে বা পারিশ্রমিকে ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছেন এ দেশের স্বাধীকারের জন্য, সেবার জন্য, বেতনের বিনিময়ে নয়। আপনারা জাতীয় দলে খেলাকে কি কর্ম বা কাজ মনে করেন নাকি দেশের প্রতি সেবা মনে করেন— সেটা জানতে চাই। কর্ম মনে করলে আপনাদের মতো তারকাদের চার লাখ বেতন কম হতেই পারে, তবে সেবা হলে চার লাখ কম কি? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কত বেতন নেন, চার লাখের কম, নাকি বেশি? জাতীয় দলে খেলার জন্য আমি দেশ সেবক চাই, বেতনভুক্ত কর্মচারী নয়।

আপনাদের অনেক বাচ্চাই আনুসরণ বা অনুকরণ করে। আমি জানতে চাই, আপনার দলের ক’জনের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত নারীঘটিত বা বাসার কাজের মেয়ে প্রহার করার মামলা হয়েছে? আচ্ছা, ওই যে একটি মেয়ের সঙ্গে আপানদের কার যেন প্রেম ছিল? মেয়েটি বিয়ের দাবি জানালে তার চরিত্রের মেডিকেল টেস্ট দিতে হলো! কিন্তু ওই ক্রিকেটারের চরিত্রের মেডিকেল টেস্ট কেন হলো না?

একটি ম্যাচ হারলে বা জিতলে একটি জাতির কিছুই আসে যায় না। তবে দেশাত্মবোধের ঘাটতি আছে, এমন লোক বড় চেয়ারে বসলে বা দেশের প্রতিনিধিত্ব করলে অনেক কিছুই যায়-আসে। কারণ ৩০ লাখ শহিদের রক্তে কেনা দেশ অপাত্রের হাতে ছেড়ে দিতে পারি না আমরা। যোগ্য আর দেশপ্রেমিক মানুষের সংখ্যায় এ দেশে কোনো ঘাটতি আছে কি? সেটা তো ‘৭১ সালেই প্রমাণিত।

আচ্ছা, আপনার কি মনে আছে যে শচিন টেন্ডুলকারে বাবা মারা গিয়েছিলেন একটি বড় সিরিজের মাঝে? তিনি বাবার শেষকৃত্যের সব কাজ শেষ না করেই ফিরে এসে খেলায় যোগ দিয়েছিলেন, যাতে দল আর দেশ হেরে না যায়। খেলার প্রতি তার এই দায়বদ্ধতা আর দেশপ্রেমের কারণ কী হতে পারে? ব্রাজিলের বেবেতো বাড়িতে  সন্তানসম্ভাবা স্ত্রী রেখে খেলতে এসে বিশ্বকাপে গোল করে সে কী উদযাপন! আজও চোখে ভাসে। কিন্তু আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়েরা বউয়ের সন্তান হবে বলেই গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ ত্যাগ করে ঘরে বসে থাকে কেন? পারলে জানাবেন।

আপনি কি বলতে পারবেন, কবে খেলাধুলার প্রশাসন রাজনৈতিক নেতার হাত ফসকে খাঁটি খেলোয়াড়দের হাতে যাবে? আমাদের ক্রিকেট বোর্ডে সর্বশেষ কবে পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন হয়েছে? আমি জানি না। আপনি জানেন কি? পারলে জানাবেন।

দক্ষ ক্রিকেটার ছিল, আবার ভালো ক্রীড়া সংগঠকও— এমন মানুষের খুব কি অভাব এই দেশে যে ক্রিকেটের বিশুদ্ধ জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা  নেই, এমন লোকেদের দক্ষ ক্রিকেটারদের চালানোর জন্য বসাতে হয়? যেকোনো জ্ঞানই অধীনস্থের চাইতে বসের বেশি থাকা বাঞ্চনীয়। আচ্ছা বলুন তো, বোর্ড আর ক্রিকেটারদের সম্পর্ক কি অফিসার আর শ্রমিকের মতো নাকি বন্ধুসুলভ? আচ্ছা, বোর্ডের সঙ্গে আপনাদের একজনেরও কি ব্যাক্তিগত পর্যায়ে সম্পর্ক নেই, যারা আগে ভাগেই আপনাদের অসন্ন খেলা বয়কটের বার্তা বোর্ডকে দিয়ে দিয়েছিল? আপনার বিপক্ষে আইসিসি’র রায়টি আরও আগে বা পরে হলো না কেন? ঠিক এ সময়ে কেন? আর আপনিই বা এত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে এতদিন চেপে বসে ছিলেন কেন? একবার, দু’বার, তিন বারেও কেন চেপে গেলেন? আপনি কেন ভাবেননি যে আইসিসি বা বিসিবিও আপনাকে চেক করার জন্যও তো জুয়ায় প্রস্তাব দিতে পারে? তবে আপনাকে সহস্র ধন্যবাদ, আপনি আশরাফুলের মতো ফুলের তালিকায় নাম ওঠাননি।

দীর্ঘ চিঠির জন্য দুঃখিত। দীর্ঘ অবসরে সময় নিয়ে পড়ার জন্য ধন্যবাদ। আপনার আগামী একবছর ভালো কাটুক, এই শুভকামনা রইল। এতদিন হয়তো পরিবারকে যথেষ্ট সময় দিতে পারেননি আমাদেরকে আনন্দ দিতে গিয়ে, তাই এই সময়টুকু পরিবারের সঙ্গে উপভোগ করুন। দয়া করে মনোবল হারাবেন না। আবার যখন খেলায় ফিরবেন, দ্বিগুণ উদ্যমে আরও অনেক ভালো ক্রিকেট খেলবেন। এই একবছরের না খেলা ম্যাচগুলোর রান তখন পুষিয়ে নেবেন— সেই শুভকামনা রইল।

ইতি

ভালো ও সচ্ছ ক্রিকেটারের গুণমুগ্ধ, হতভাগা দর্শক

লেখক: সাহিত্যিক ও গীতিকার, জেনারেল ম্যানেজার (ফাইন্যান্স), ট্রান্সকম বেভারেজেস লিমিটেড। ইমেইল: bangla.joti@icloud.com

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন