মঙ্গলবার ২৮ জানুয়ারি, ২০২০ ইং

ভারতীয় হাইব্রিড ভুট্টার বীজে ‘প্রতারিত’ কৃষক

নভেম্বর ১, ২০১৯ | ৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ

রিফাত রহমান, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট

চুয়াডাঙ্গা: ভারতীয় বিভিন্ন কোম্পানির বাহারি মোড়কে হাইব্রিড ভুট্টার বীজে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে চুয়াডাঙ্গার বাজার। বীজ বিক্রি করতে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো জেলা-উপজেলা পর্যায়ে নিয়োগ দিয়েছে অবৈধ ডিলার। সরকারি অনুমোদন না থাকলেও বিভিন্ন দোকানির চাহিদা মোতাবেক ডিলাররা পৌঁছে দিচ্ছে ভুট্টা বীজ। আর এ সুযোগে পেট্রোকেম কোম্পানির ডিলাররাও পোকাধরা পাইওনিয়ার পি-৩৩৫৫ জাতের বীজ বাজারে ছেড়েছে। যা কিনে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা।

বিজ্ঞাপন

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভুট্টা বীজ আমদানিকারক কোম্পানির বীজের গুণাগুণ তুলে ধরে ডিলাররা দিন-রাত গ্রামাঞ্চলে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদা মোতাবেক দেশে ভুট্টার বীজ উৎপাদন না হওয়ায় বীজের বাজার দখল করে নিয়েছে ভারতীয় বিভিন্ন কোম্পানি।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, গত ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ১৪ হাজার ৯০০, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ১২ হাজার, দামুড়হুদা উপজেলায় ১৫ হাজার ও জীবননগর উপজেলায় ৪ হাজার ২২১ হেক্টার জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছিলো। জেলায় মোট ৪৬ হাজার ১২১ হেক্টর জমিতে কৃষকরা ভুট্টার আবাদ করেছিলো।

বিজ্ঞাপন

চলতি মৌসুমে ৫০ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে ভুট্টার আবাদ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গেল বছর কৃষকেরা ধানের মূল্য না পাওয়ায় তারা ব্যাপক হারে ভুট্টার আবাদের দিকে ঝুঁকেছে বলেও জানান অধিদফতরের কর্মকর্তারা।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, সারাদেশে ভুট্টা কেনা ও বীজ উৎপাদের কয়েকটি সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা তাদের সুবিধামত ভুট্টা কেনা এবং বীজ বিক্রি করে থাকে। কারণ ভুট্টার বীজ সংরক্ষণ বা উৎপাদন করার মতো প্রযুক্তি কৃষকদের নেই। তাই বাধ্য হয়ে কোম্পানির আমদানি করা বা উৎপাদিত ভুট্টার বীজ কিনতে হয় কৃষকদের।

সূত্র আরও জানায়, এই সুযোগটা কাজে লাগাতে কৃষকদের কাছে বিক্রির জন্য ভুট্টার বীজ নিয়ে হাজির হয় কোম্পানির প্রতিনিধিরা। তারা মেয়াদোত্তীর্ণ ও পোকা ধরা বীজ গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের কাছে বিক্রি করে থাকে। জনবলের কারণে জেলা বীজ বিপণন বিভাগ এগুলো দেখভাল করতে না পারায় কৃষকরা প্রতারিত হচ্ছেন।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর গ্রামের কৃষক অনিল কুমার, বরকত, আত্তাব, আব্দুল, বিপুল, ফরজ, সাধন, উত্তম, সিরাজ, আরিফ, মন্টুসহ অনেকেই জানান, এক বিঘা জমিতে ভুট্টা আবাদের জন্য বীজ লাগে ৩ কেজি। এ বছর তারা পাইওনিয়ার কোম্পানির পি ৩৩৫৫ জাতের ভুট্টার বীজ কিনেছিলেন। প্যাকেট খুলে দেখা গেছে বীজে পোকা, বীজের মাথা পোকায় খেয়ে ছিদ্র করে ফেলেছে। গেল বছর পাইওনিয়ার বীজে ফলন ভালো হওয়ায় এ বছরও কৃষকরা এ কোম্পানির বীজ কিনেছিলেন।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ডিলার উজ্জল হোসেন, সরোজগঞ্জ বাজারের ডিলার কামাল হোসেন বলেন, ‘পাইওনিয়ার কোম্পানির এক কেজি বীজ ৬৩০ থেকে সাড়ে ৬০০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। প্যাকেট প্রতি ১০০ থেকে ৫০ গ্রাম বীজ পোকা থাকতে পারে। ফলন যেহেতু ভালো তাই কৃষকদের লোকসান হবে না। এ বীজ কিনে অনেক কৃষক ভুট্টা লাগিয়েছে। চারাও গজিয়েছে।’

বীজ ডিলার কামাল উদ্দিন সান্টু বলেন, ‘বীজে পোকা দেখা গেছে- দোকানি এবং কৃষকরা আমাকে বিষয়টি জানিয়েছে। তবে পোকা লাগার পরিমাণ খুবই কম। এতে কৃষকদের লোকসান হবে না। তারপরও বীজ কেনার পর পোকা থাকলে কৃষকরা ফেরত দিলে তা নেওয়া হবে।’

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জুলমত আলী ও আবু সালেহ বলেন, ‘বিষয়টি কৃষকরা আমাদের জানিয়েছে। আমরা দোকানীদের ওই বীজ বিক্রি না করার ব্যাপারে সতর্ক করেছি। কারণ কৃষকদের সঙ্গে প্রতারণা কোনভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। বীজ কোম্পানিরা এখানে ব্যবসা করতে এসেছে। কোম্পানী কৃষকদের ঠকিয়ে ব্যবসা করুক এটা হতে দেবো না।’

চুয়াডাঙ্গার দোস্ত ও বেগমপুর ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অভিযোগ পেয়ে পোকা ধরা বীজের ব্যাপারে সরেজমিনে কৃষকদের কাছ থেকে প্রমাণসহ তথ্য সংগ্রহ করে তা কর্তৃপক্ষের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে।’

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘পোকা ধরা বীজ বাজারজাত করা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি আমাদের কানে এসেছে। আমরা ওই বীজের ডিলারদের বলে দিয়েছি বাজার থেকে বীজ তুলে নেওয়ার জন্য। তারপরও যদি কেউ ওই বীজ বিক্রি করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

চুয়াডাঙ্গা বীজ বিপননের উপ-পরিচালক এ কে এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘চাহিদা মোতাবেক দেশে ভুট্টা বীজ উৎপাদন হয় না। তাই বিভিন্ন কোম্পানি দেশের বাইরে থেকে বীজ আমদানি করে। তারা কি ধরনের বীজ কৃষকদের কাছে বিক্রি করে তা দেখার জন্য লোকবল প্রয়োজন। লোকবল সংকটের কারণে সব কিছু দেখা সম্ভব হচ্ছে না। জেলায় বিএডিসির অনুমোদিত বীজ ডিলার আছে ৯২ জন। এ বছর বিএডিসি বারি-৯ ভুট্টাবীজ বাজারজাত করতে যাচ্ছে। কিন্তু এখনো বিএডিসির ভুট্টা বীজ বাজারজাত করা শুরু হয়নি। পোকা আক্রান্ত বীজ কোনভাবেই বাজারজাত করা যাবে না। যদি কেউ করে থাকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে এটি দেখার দায়িত্ব হয় জেলা বীজ প্রত্যায়ন বিভাগের।’

জেলা বীজ প্রত্যায়ন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সব ব্যবসার লাইসেন্স দেওয়া হয় জেলা থেকে, অথচ বীজ বিক্রির লাইসেন্স দেওয়া হয় মন্ত্রাণালয়ের বীজ অনুবিভাগ থেকে। যার কারণে মন্ত্রাণালয় থেকে কোনো তথ্য আমাদের কাছে দেওয়া হয় না। আমাদের কাছে উৎপাদনকারিদের তথ্য আছে। ধান, পাট ও গম ও আখ এবং ভুট্টা নিয়ন্ত্রিত ফসল। এগুলো দেখার ব্যাপারে যেমন দায়বদ্ধতা আছে ভুট্টা বীজের ক্ষেত্রে তেমন আছে। বীজ সংশ্লিষ্ট ব্যাপার খতিয়ে দেখা হবে। তবে বিষয়টি দেখার দায়িত্ব কৃষি বিভাগের। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আলী হাসান বলেন, ‘ভুট্টা একটি নিয়ন্ত্রিত ফসল। ধান, পাট ও গম বীজ মার্কেটিংয়ের ব্যাপারে আইনটি শক্তিশালী। ভুট্টার বীজ মার্কেটিং, আমদানি, বিপণন করার ব্যাপারে কিছু করার আছে, যেটা আগে ছিল না। তবে বীজ কিনে কেউ যদি প্রতারিত হয় এবং কোনো কৃষক যদি অভিযোগ করে তাহলে ওই অভিযুক্ত বীজ কোম্পানির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। গত বুধবার (২৩ অক্টোবর) এ জেলায় পেট্রোকম ভুট্টা বীজ কোম্পানির প্রতিনিধিদের ডেকে এনে পাওনিয়ার পি-৩৩৫৫ জাতের পোকা ধরা ভুট্টা বীজ বাজার থেকে উঠিয়ে নিতে বলা হয়েছে।’

এদিকে, বীজ বিষয়ক আইন ও বিধি ১৯৯৭ সালে বীজ আইন (সংশোধিত) প্রণীত হয়। বীজ বিপণনের ক্ষেত্রে এ আইন কার্যকর রয়েছে। আইন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত ফসলের বীজ বিক্রির জন্য, জাতের নিবন্ধন এবং বীজ ডিলারের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। এ আইনে প্যাকেটজাত করে বীজ বিক্রি এবং প্যাকেটে লেভেল লাগানোও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সারাবাংলা/এসবি/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন