সোমবার ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

বাবা আম আনবে, ৪ মাস ধরে অপেক্ষায় সন্তান

নভেম্বর ১, ২০১৯ | ৩:৪৫ অপরাহ্ণ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: গাবতলী লালকুঠি প্রথম কলোনির বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বাতেন পেশায় ব্যবসায়ী। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার উদ্দেশে গত ১৯ জুন বের হন বাসা থেকে। চার বছর বয়সী ছেলে ইনামকে বলে যান, আম নিয়ে আসবেন তার জন্য। সেই থেকে অপেক্ষায় ছেলে। সাড়ে চার মাস পেরিয়ে গেলেও বাবার জন্য অপেক্ষা শেষ হয়নি ইনামের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো সন্ধান মেলেনি তার।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার (১ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন বাতেনের পরিবারের সদস্যরা। আশঙ্কা আর দুশ্চিন্তার যে কালো মেঘ ঘিরে রয়েছে তাদের, তার অবসানের জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা। তাদের দাবি একটাই, বাতেনের সন্ধান যেন বের করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পাশাপাশি বাতেন অপহৃত হয়ে থাকলে এর সঙ্গে জড়িতদেরও যেন খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হয়।

মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন ইসমাইল হোসেন বাতেনের স্ত্রী নাসরিন জাহান স্মৃতি। তার সঙ্গে ছিল ছেলে ইনাম ও মেয়ে ইনশাক (১৪)। নাসরিন জাহান বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে দিনের পর দিন ধরনা দিয়েও স্বামীর কোনো খোঁজ পাননি প্রায় পাঁচ মাসেও।

নাসরিন সারাবাংলাকে বলেন, বাতেন যেদিন নিখোঁজ হয়, ছোট ছেলেকে বলে গিয়েছিল— বাবা, তোমার জন্য আম আনব। সেই যে গেল, আর ফিরে আসেনি। দুপুরে নাকি ওর অফিস থেকে খাবার খাওয়ার জন্য বের হয়েছিল। কিন্তু বাসায় তো আর আসেনি।

বিজ্ঞাপন

নাসরিন বলেন, ছেলে সেদিন রাত ২টা পর্যন্ত জেগেছিল বাবার জন্য। বলে, বাবা আম নিয়ে আসলে তারপর ঘুমাবে। এখনো বাবার জন্য অপেক্ষা করে থাকে ছেলেটা। সারাদিন দরজার সামনে ঘুরঘুর করে, কখন বাবা আসবে সেই অপেক্ষায়। শুধু বাবার কাছে যেতে চায়। বলে, বাবা না আসলে ঘুমাবে না, খাবে না, কিচ্ছু করবে না। এইভাবেই তো পাঁচ মাস চলে গেল। ছেলের বাবা আর আসেনি।

বাতেন-নাসরিন দম্পতির বিয়ের ২২ বছর পর জন্ম নেয় তাদের প্রথম সন্তান মেয়ে ইনশাক। আরও প্রায় আট বছর পর ইনামের জন্ম। দুই সন্তানকেই খুব স্নেহ করতেন বাতেন। নাসরিন বলেন, ছেলে-মেয়েও বাবা অন্তঃপ্রাণ। তাদের কোনোভাবেই বোঝানো যায় না, বাবা কেন নেই। ছেলেটা তো ছোট, এখনো সবকিছু বোঝে না। ওকে তাও সামলানো যায়। কিন্তু মেয়েটার সামনে দাঁড়াতে পারি না। প্রতিদিন রাতে বাবা বাবা বলে কান্না করে। পড়ালেখাও প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। শুধু বাবার কথাই ভাবে সারাদিন। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

বাতেনের স্ত্রী বলেন, ছেলে-মেয়েকে নিয়ে সব জায়গায় ঘুরেছি। কত জায়গাতেই না চিঠি দিয়েছি স্বামীর খোঁজ পেতে। কিন্তু এখনো কেউ কোনো খবর দিতে পারেনি। লোকটা বেঁচে আছে না মরেই গেছে, সে কথাও তো জানি না!

বাতেন যেদিন থেকে নিখোঁজ, সেদিনের কথা এখনো স্পষ্ট মনে আছে নাসরিনের। সে কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের বাসা লালকুঠি প্রথম কলোনিতে। বাতেনের অফিস মিরপুরে। সকালে বের হয়ে যায় বাসা থেকে। প্রতিদিন দুপুরে খেতে আসত বাসায়। সেদিন দুপুর পেরিয়ে গেলেও বাতেনের দেখা নেই। মোবাইলে কল যায় না। অফিসে ফোন করি, বলে, বাসায় যাওয়ার কথা বলে বেরিয়ে গেছে। এরপর আর বাসা, অফিস— কোথাও ফেরেনি বাতেন।

স্বামী না থাকায় দুই সন্তানকে নিয়ে আর্থিকভাবেও কষ্টে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে নাসরিনকে। তিনি বলেন, ও নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই হাতের অবস্থা খুব খারাপ। টিউশনি করে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছি।

নাসরিন ধারণা করছেন, পুরনো শত্রুতার জের ধরে কেউ হয়তো অপহরণ করে থাকতে পারে বাতেনকে। তিনি বলেন, আমাদের বিয়েরও অনেক আগে বাতেনদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের কুকরারাই গ্রামে মিন্টু মিয়া নামে একজন খুন হন। ওই মামলায় বাতেনকে আসামি করা হয়েছিল। কিন্তু খুনের সঙ্গে জড়িত না থাকায় বেসকুর খালাস পায় বাতেন। কিন্তু মিন্টু মিয়ার সন্তানেরা বাতেনকেই খুনি মনে করে।

নাসরিন বলেন, বছর চারেক আগে (২০১৫ সালের ১৮ মার্চ) সন্ত্রাসী বাহিনী বাতেনের ওপর হামলা করেছিল। মিন্টুর ছেলেরাই এই হামলা করিয়েছিল। নিখোঁজ হওয়ার চার-পাঁচ দিন আগে বাতেন বলছিল, ওকে নাকি আবার মিন্টু মিয়ার ছেলেরা হুমকি দিয়েছে। ওরা নাকি বলেছে, প্রতিশোধ নেবে। আমার ভেবেছিলাম এই হুমকির জন্য জিডি করব। কিন্তু সেই জিডিও করা হলো না, তার আগেই মানুষটা নিখোঁজ হয়ে গেল।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এআই/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন