মঙ্গলবার ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

সাকিব আল হাসানকে লেখা জ্যোতিষ মণ্ডলের খোলা চিঠির উত্তর

নভেম্বর ৮, ২০১৯ | ৯:৩০ পূর্বাহ্ণ

শিহাব শাকির

প্রিয় জ্যোতিষ মণ্ডল,

বিজ্ঞাপন

শুভেচ্ছা নেবেন। অনলাইন নিউজ পোর্টাল সারাবাংলা ডটনেট মারফত দেশের সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের কাছে লেখা আপনার খোলা চিঠিটি পড়লাম। পুরো চিঠিতে আপনি সাকিবের কাছে অনেকগুলো প্রশ্ন রেখেছেন। সেসব প্রশ্নের উত্তর সাকিব কী দেবেন, সেটা স্বাভাবিকভাবেই আমার জানা নেই। তবে সাকিব এবং দেশের ক্রিকেটের একজন ভক্ত হিসেবে আমি আপনার মতোই আপনাকে এবং আপনার মতো অন্যদেরও দুয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং কিছু কথা বলতে চাই।

সাকিবের মতো দীর্ঘ একবছরের ছুটিতে থাকার কথা নয় আপনার। বড় প্রতিষ্ঠানের বড় পদের কর্মী আপনি, সেই সুবাদে ব্যস্ততাও অনেক নিশ্চয়। তবু আশা করব— যে ধৈর্য নিয়ে আপনি দীর্ঘ চিঠি তাকে লিখেছেন, এই লেখাটিও তেমন ধৈর্য নিয়ে পড়বেন।

আপনার প্রথম প্রশ্নটি পড়েই খটকা লাগলো— হঠাৎ একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহ, মিরাজসহ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের মনে হলো, তারা সাংঘাতিক কম বেতন পান! আর তারপর অসামান্য দ্রুততার সঙ্গে প্রায় শ’খানেক ক্রিকেটার নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে রাতারাতি সব দাবি-দাওয়া চূড়ান্ত করে সংবাদ সম্মেলন ডেকে ফেললেন এবং ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়ে ফেললেন! আপনার কি সত্যিই মনে হয়, হঠাৎ সেদিন ঘুম থেকে উঠে তাদের মনে হয়েছে তাদের বেতন কম? এমন একটি দাবিতে কি একবেলার প্রস্তুতিতেই এক-দেড়শ ক্রিকেটারের একমত হয়ে আন্দোলনে নামা সম্ভব?

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন- সাকিব আল হাসানকে খোলা চিঠি, বিষয়: ক্রিকেট

এইখানে আপনার যাবতীয় প্রশ্ন ও আলোচনার বাইরের একটু কথা না বললেই নয় বলে মনে করছি। আপনি হয়তো ক্রিকেটারদের ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনে নামার যে ঘটনা, দুয়েকটি পত্রিকা বা টিভির স্ক্রলে শিরোনামটি দেখেছেন, পুরো ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন নিশ্চয় পড়েননি। নইলে ১১ দাবির মধ্যে কেবল একটি দাবিকেই এককভাবে সামনে আনার আর কী ব্যাখ্যা থাকতে পারে? তারা যে ঘরোয়া ক্রিকেটের অবকাঠামো উন্নয়নসহ ক্রিকেটের অপরিহার্য অংশ গ্রাউন্ডসম্যান, কোচ, আম্পায়ার, ফিজিও ও ট্রেনারদের বেতন বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন; বছরব্যাপী কোচ, ফিজিও, ট্রেনারের নিয়োগ চেয়েছেন; ঘরোয়া ক্রিকেটের মান বাড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডারসহ অন্য দাবি তুলেছেন— এর কোনোটিই কি আপনার চোখে পড়েনি? নাকি সাকিবকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই হবে বলে সেগুলো সযতনে এগিয়ে গিয়েছেন?

দুই, তিন ও চার নম্বর প্রশ্ন রাখতে গিয়ে উদাহরণের অবতারণা করেছেন। সেই উদাহরণের পরিপ্রেক্ষিতে যে প্রশ্ন রেখেছেন সাকিবের কাছে, তার জবাব সাকিবই দিতে পারবে। আমি নিজের জবাবটা জানাতে চাই। সামর্থ্য থাকলেও সন্তান এইচএসসি পরীক্ষা সামনে রেখে BMW X5 কেনার দাবি জানালে আমি আপনার মতো ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিতাম না। তার অর্থ এই না, তার দাবি মেনে নিয়ে BMW X5 কিনতে শোরুমে চলে যেতাম। নিজেকে এতটা অযোগ্য পিতা মনে করি না যে সন্তানের একটি অযৌক্তিক দাবির অসাড়তা তাকে বুঝিয়ে বলার সক্ষমতা রাখি না। আবার সন্তান অযৌক্তিক আচরণ করলেও তাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার মতো অমানবিক পিতাও হতে চাই না। সেক্ষেত্রে ছেলে নাছোড়বান্দা হলে তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে কিছু একটা করার মতো মানসিক স্থিতি রাখব, এই আত্মবিশ্বাসটুকুও ধারণ করি নিজের মধ্যে। আবার উদাহরণের দ্বিতীয় অংশে গিয়ে আপনি যেমন সন্তান অক্সফোর্ডে পড়বে বলেই BMW X5 চাওয়ায় সাবাশ দিয়েছেন, আমি কিন্তু সেটাও করতাম না। অক্সফোর্ডে তো সন্তান পড়তে যাবে, BMW X5 নিয়ে শো-অফ করার জন্য তো সন্তানকে পাঠাব না অক্সফোর্ডে!

ক্রিকেটারদের ধর্মঘটের আলোচনায় ফিরি। দেশের ক্রিকেটের খবরাখবর নিয়মিত অনুসরণ করলে আপনাকে ক্রিকেটারদের ধর্মঘটের খবরে আকাশ থেকে পড়তে হতো না। তারা যেসব দাবি-দাওয়া করছেন, সেগুলো একদিনের দাবি নয়। দেশের গণমাধ্যম তো বটেই, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যগুলোও এ নিয়ে বিস্তারিত খবর প্রকাশ করেছে। সেগুলোর কোনোটি পড়ে দেখেছেন কি? ক্রিকেটের খবরাখবরের অবিসংবাদিত সেরা ওয়েবসাইট সাকিবদের ধর্মঘট ডাকার পর একটি বিশ্লেষণধর্মী সংবাদ প্রকাশ করেছিল, যার শিরোনাম ‘A Bangladesh press conference two decades in the making’। ধর্মঘটের অন্যান্য খবরের সঙ্গে এই একটি শিরোনাম আপনার চোখে পড়লেও হয়তো আপনাকে বলতে হতো না, হঠাৎ এক সকালে তাদের মনে হয়েছে ধর্মঘটে যাওয়া প্রয়োজন। এতসব বিষয় উপেক্ষা করে কেবল বেতন বাড়ানোর দাবিকে সামনে রেখে দেশের ক্রিকেট অবকাঠামোর দাবিগুলো উপেক্ষা করার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ আছে কি?

এ সংক্রান্ত আপনার পরের প্রশ্নগুলোকে অবশ্য অবান্তর বলতে পারছি না। সংবাদ সম্মেলন করে দাবি জানিয়ে দাবি পূরণের সময় না দিয়েই রাতারাতি ধর্মঘটে যাওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা আমিও করব। কিন্তু এখানে মনে রাখতে হবে, ক্রিকেটাররা দীর্ঘদিন ধরে এসব দাবি-দাওয়া জানিয়ে আসছিলেন এবং বিসিবি কেবল আশ্বাস দিয়েই এসব দাবি-দাওয়া উপেক্ষা করে গেছে। অন্তত একটি দাবির কথা বলতে পারি, যেটি আজ থেকে সাত বছর আগে ‘মেনে নেওয়া হয়েছে’ বলে দাবি করেছেন বিসিবি সভাপতি। ওই ‘মেনে নেওয়া’ কিন্তু সাত বছরেও আলোর মুখ দেখেনি! আপনি সাকিবদের দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছেন, অত্যন্ত যৌক্তিক আহ্বান, দায়িত্বশীলতাই তাদের কাছে কাম্য। কিন্তু যারা ক্রিকেট খেলে দেশের জন্য সুনাম কুড়িয়ে আনছেন, তাদের দাবি-দাওয়া বছরের পর বছর ধরে উপেক্ষা করে যাওয়া বিসিবি কি দায়িত্বশীল অভিভাবকের মতো আচরণ করেছে? নাকি বিসিবি কর্তারা দায়িত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন বলে আপনার মনে হয় না?

এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গেরও অবতারণা করেছেন। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বিসিবিকে কি সত্যিই প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি করতে হয়? যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বলে সরকারের একটি মন্ত্রণালয় আছে, তার কাজ কী তাহলে? আপনি বলেছেন, আরও অনেকেই বলেছেন, বিসিবি সভাপতিও বলেছেন— প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দরজা ক্রিকেটারদের জন্য খোলা। তারা কেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেলেন না? আপনাকে টেনে একটি উদাহরণ দিয়ে তাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই। আপনি ট্রান্সকম গ্রুপের ট্রান্সকম বেভারেজে কর্মরত। আপনার বেভারেজের একজন কর্মীর সঙ্গে হয়তো ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের খুব ভালো সম্পর্ক। এখন ওই কর্মীর বেতন-ভাতা বাড়ানো কিংবা অফিসের কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য কি তিনি লতিফুর রহমানের দ্বারস্থ হবেন?

আপনার লেখা পড়ে মনে হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ক্রিকেটারদের আন্দোলনে মনঃক্ষুণ্ন হয়েছেন, দুঃখ পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী একজন ক্রিকেটপ্রেমী, এ কথা আমরা সবাই জানি। মাঠে বসে তিনি ক্রিকেটারদের খেলা উপভোগ করেন, একজন খুব সাধারণ দর্শকের মতোই লাল-সবুজের ক্রিকেটাররা চার-ছয় মারলে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন। হাজারো দর্শকের মতো লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন ভিআইপি গ্যালারিতে। ক্রিকেটারদেরও তিনি অত্যন্ত পছন্দ করেন, তার প্রমাণও আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময়। সেই ক্রিকেটারদের দাবি-দাওয়া বছরের পর বছর ধরে উপেক্ষা করে আসা বিসিবি’র আচরণ কি প্রধানমন্ত্রীকে মনঃক্ষুণ্ন করে? দুঃখ দেয়? বলতে পারবেন?

আপনি জানতে চেয়েছেন, ক্রিকেটারদের মধ্যে ক’জন গ্র্যাজুয়েট। আপনি স্বনামধন্য একটি কোম্পানির অত্যন্ত উঁচু একটি পদে আসীন। চাকরিতে নিয়োগে কোন ক্ষেত্রে একাডেমিক যোগ্যতা প্রয়োজন আর কোন ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল স্কিল প্রয়োজন, সে বিষয়ে নিশ্চয় স্বচ্ছ ধারণা আপনার আছে। স্নাতকের গণ্ডি পেরোননি কিন্তু পর্যাপ্ত টেকনিক্যাল স্কিল আছে, এমন কেউ অনেক উচ্চ বেতন বা পারিশ্রমিক পান— এমন কোনো উদাহরণ কি আপনার জানা আছে? যিনি একজন ক্রিকেটার, ক্রিকেট খেলাই তার যোগ্যতার পরিচায়ক নয় কি? যিনি বোলার, তিনি কতটা ভালো করতে পারছেন কিংবা যিনি ব্যাটসম্যান, তিনি কত রান করতে পারছেন— যোগ্যতা হিসেবে এটিই কি যথেষ্ট নয়? পেশাদার ক্রিকেট যারা খেলেন, তাদের ভালো খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য কতটা সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করতে হয়, সে বিষয়টি কি উপেক্ষা করার মতো? একাডেমিক পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে গিয়ে যদি একজন ক্রিকেটারের ফিটনেসসহ পারফরম্যান্সে ঘাটতি দেখা দেয়, তাকে একাডেমিক ডিগ্রির বদৌলতে দলে জায়গা দেবেন তো? আর ‘অর্ধ লক্ষ’ ডলারের যে হিসাব দেখিয়েছেন, সেটি ক’জন পান, বলতে পারেন? প্রথম শ্রেণির কতজন ক্রিকেটার বিসিবি’র সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ? চুক্তির বাইরে যারা আছেন, তারা কত বেতন পান? জহুরুল-রাকিবুল-নাঈমদের মতো যেসব ক্রিকেটারদের নামও অনেকেই জানেন না— মাশরাফি-সাকিবদের মতো সিনিয়র কয়েকজন ক্রিকেটারদের বেতন মাসে চার লাখ দেখে কি আমরা তাদেরও একই বেতনভুক্ত বলে মনে করছি? এ সংক্রান্ত প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশে রয়েছে তুলনামূলক বেতনের বিচার।

একজন ক্রিকেটারকে ক্রিকেটার হয়ে উঠতে হলে যে জীবনযাপন করতে হয়, সেটা কি আমাদের সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের মতোই? তার ফিটনেস ধরে রাখার জন্য যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেই প্রক্রিয়া কি আমার-আপনার জন্য প্রযোজ্য? আরও একটি প্রসঙ্গ টানতে চাই— একাডেমিক গণ্ডি পার না হওয়া একজন চিত্রনায়ক যখন কোনো চলচ্চিত্র করার জন্য লাখ লাখ টাকা পারিশ্রমিক নেন, আমরা কি তাকেও প্রশ্ন করব— ডিগ্রি নেই, এত টাকা পারিশ্রমিক কেন নেবেন?

বোর্ডের আয়ের টাকার ভাগ চাওয়ায় সম্ভবত ‘গোস্যা’ করেছেন বলে মনে হলো আপনার লেখা পড়ে। আপনার জানা আছে কি না, জানি না— ক্রিকেটখেলুড়ে প্রায় সব দেশেই বোর্ডের আয়ের একটি অংশ ক্রিকেটাররা পেয়ে থাকেন। সেটা আমাদের ক্রিকেটাররা চাইলে অন্যায্য কেন হবে? ক্রিকেটারদের পেছনে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের খাত দেখিয়েছেন। স্টেডিয়াম থেকে বিকেএসপির যেসব খরচের কথা বলেছেন, এগুলো রাষ্ট্র কেন করে? রাষ্ট্র খেলোয়াড় তৈরি করতে চাই বলেই তো করে, নাকি? রাষ্ট্র যদি মনে করে তার ফুটবলার-ক্রিকেটাররা বিশ্ব মাতাবে, তার জন্য রাষ্ট্র বিনিয়োগ করবে না? ফুটবলার-ক্রিকেটাররা কি নিজে নিজে তৈরি হবে? প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক স্কুল-কলেজ কিংবা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ালেখা করছে, তাদের ক্ষেত্রে হিসাবটা কী?

রাষ্ট্র স্টেডিয়াম বানিয়েছে জনগণের অর্জিত টাকায়, কথা সত্য। কিন্তু ক্রিকেটারদের কল্যাণে বিসিবি যে টাকা আয় করে, তার একটি অংশ সরকারকে ট্যাক্স দেওয়া হয়— এটাও তো সত্য। এ তো গেল টাকার হিসাব। ক্রিকেটাররা যখন কার্ডিফ-অ্যাডিলেডে চার-ছক্কায় ম্যাচ জেতায়, এই জাতি কি কিছুই ফেরত পায় না? তা নাই যদি পাবে, রাষ্ট্র কেন ক্রিকেটারদের পেলে-পুষে বড় করে? রাষ্ট্র যদি মনে করে, ক্রিকেটাররা শুধু নিয়েই যাচ্ছে নিয়েই যাচ্ছে, ক্রিকেট খেলা বন্ধ করে দিক না! বিশ্বের অনেক দেশই তো ক্রিকেট খেলে না। বাংলাদেশ না খেললে তাতে কী যায় আসে!

ক্রিকেটারদের আজকের দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে বিসিবি সত্যিই কিন্তু প্রমাণ করেছে, তাদের দাবিগুলো অন্যায্য, অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সেটা বোধহয় আপনার মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। না হলে একবছর পর ক্রিকেটাররা আবার কোন দাবিতে মাঠে নামবেন, এমন ইউটোপিয়া অবতারণার কারণ কী? ক্রিকেটারদের দাবি মেনে নেওয়ায় বিসিবিকেও আপনার নমনীয় প্রশাসক মনে হয়েছে। কিন্তু বিসিবি মেনে নিতে বাধ্য হলো কেন, সেটা কি ভেবেছেন? চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটককে উদ্ধৃত করতে ইচ্ছা হয়, ‘ভাবো ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো।’

প্রশ্ন রেখেছেন, ক্রিকেটারদের মাথাটা ‘খারাপ করে’ অন্য কেউ সুবিধা নিতে চায় কি না। এটা কি ক্রিকেটারদের আন্দোলনের ডাক দেওয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতির ‘ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ মেনেই কি এমন প্রশ্ন? আপনার মেনে নিতে কষ্ট হয়েছে, ক্রিকেটারদের দাবি যৌক্তিক ছিল। কিন্তু অধিনায়কের পদ থেকে সরানোর যে দাবির অবতারণা করেছেন, সেটি কি আদৌ যৌক্তিক? আর ক্রিকেটাররা কি অধিনায়ক সরানোর দাবি অধিনায়কের কাছেই করবে? আর এত অযৌক্তিক দাবি বিসিবি কেন মেনে নিল, সে প্রশ্নটি কি একবার বিসিবির কাছে করতে পারতেন?

পরের অংশে রাজনীতির যে প্রসঙ্গ টেনেছেন, রাজনীতি বুঝি না বলে সে অংশ নিয়ে কিছু বলতে চাই না। তবে সাকিবের জন্য আপনার যে প্রশ্ন, একই প্রশ্ন কি বাংলাদেশ ক্রিকেটের আরেক প্রাণভোমরা মাশরাফির জন্যও প্রযোজ্য?

নারীঘটিত, কাজের মেয়ে প্রহার, প্রেম— ইত্যাদি প্রসঙ্গ টেনে সাকিব আল হাসানকে প্রশ্ন করেছেন। ধরে নিলাম, ক্রিকেটারদের ‘প্রতিপত্তি’র কারণে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা যায়নি। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো পক্ষপাত দেখতে পান কি? তাদের কাছে কি ‘আইন সবার জন্য সমান নয় কেন— এ প্রশ্ন রাখতে পারেন?

দেশাত্মবোধের ঘাটতি আছে— এমন কেউ দেশের প্রতিনিধিত্ব করলে অনেক কিছুই যায় আসে, এটা নির্মম সত্য। কিন্তু এই এক আন্দোলনের কারণেই তাদের মধ্যে দেশাত্মবোধের ঘাটতি বেরিয়ে এলো? দেশের ক্রিকেটের কল্যাণে আন্দোলনে নেমে তারা দেশেরই ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করলেন? সাকিবের কাছে ক্রিকেটারদের নিয়ে প্রশ্ন করলেন তো করলেন, বোর্ডের কী হাল, সে প্রশ্নের জবাবও সাকিবকেই দিতে হবে? বোর্ড কর্তাদের কাউকে প্রশ্ন করা যাবে না, এটিই কি রীতি? আইসিসি কবে কোন সিদ্ধান্ত নেবে, সে প্রশ্নের উত্তরও সাকিবকেই দিতে হবে?

জুয়াড়ির প্রস্তাব নিয়ে সাকিবকে যে প্রশ্ন করেছেন, সে প্রশ্নের উত্তর অবশ্য আমিও চাই। আমিও জানতে চাই— তিন তিনবার যোগাযোগ হওয়ার পর কেন সাকিবের মনে হলো না, বিষয়টি জানানো দরকার আইসিসিকে? কখনো আপনি এ উত্তর পেলে আশা করি জানাবেন।

আপনার চিঠির মতো আমার চিঠি, বা বলা ভালো ক্রিকেটভক্তের পক্ষ থেকে উত্তরও দীর্ঘ হয়েছে। আশা করব, অত্যন্ত দায়িত্বশীল যে পদে আপনি আসীন, সেই পদের শত দায়িত্বের মাঝেও উত্তরটি পড়ার মতো সময় করে নিতে পারবেন। আরেকটু ছোট্ট প্রত্যাশাও আছে। যেহেতু গণমাধ্যমে লিখেছেন, সেহেতু সাকিব শুধু নয়, দেশের সব মানুষের জন্যই উন্মুক্ত আপনার চিঠি। তাদেরও ধৈর্য নিয়ে চিঠিটি পড়তে হয়েছে, যেমন আমাকেও পড়তে হয়েছে। তো এমন কিছু লেখার আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে খানিকটা তথ্য জেনে নেবেন। কারণ তথ্য নিজেই অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়। তখন আর সাকিব আল হাসানের কাছে জবাব চাইতে হয় না।

ইতি
সাকিবের গুণমুগ্ধ ও বাংলাদেশ ক্রিকেটের একজন ভক্ত

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন