মঙ্গলবার ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

অচিনপুরকে চিনে নিতে সময় লাগবে না

নভেম্বর ৭, ২০১৯ | ১:২৭ অপরাহ্ণ

মাহমুদ মেনন

ঢাকা: অনুষ্ঠানটি যেভাবে শেষ হলো সেভাবেই হয়তো এর শুরুটা হতে পারতো.... আর যেভাবে শুরু হয়েছিলো সেভাবেও শেষ হতে পারতো। অনুষ্ঠানটি ছিলো গানের... আর প্রায় দুই ঘণ্টার গোটা অনুষ্ঠানকেও বলা চলে একটি গান। এর সাবলীল এগিয়ে চলায় আয়োজকদের মুন্সিয়ানা যেমন ছিলো, তেমনি আন্তরিকতার সামান্য ঘাটতিও যে ছিলো না তা অনুষ্ঠানের পরতে পরতে প্রকাশ্য হয়ে উঠছিলো। বুধবার (৬ নভেম্বর) বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রর ইসফেনদিয়ার জাহিদ হাসান মিলনায়তনে সন্ধ্যাটি ছিলো জমজমাট।

বিজ্ঞাপন

না অনুষ্ঠানের গুণকীর্তন করতে নয়, এ লেখা মূল অনুষ্ঠানটিকে নিয়েই। এটি ছিলো একটি গানের সিডির মোড়ক উন্মোচন। কেতাবি নামটি এড়িয়ে আয়োজকরা নাম দিয়েছেন প্রকাশনা উৎসব। গানের সিডি কিংবা গানের অ্যালবাম শুনে যারা ইউটিউবের যুগে গানের সিডি কে দেখে? কিংবা কে শোনে? এসব নিয়ে যারা ভাবছেন, তাদের জন্য তথ্য হচ্ছে এটি একযোগে ইউটিউব চ্যানেলেও প্রকাশিত হয়েছে ওই সন্ধ্যায়। নাম অচিনপুরের গান।

কী আছে এই অ্যালবামে? কিংবা কারা গেয়েছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর একটু পরে দেই। শুরুতে জানিয়ে রাখি অ্যালবামটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এতে নাগরিক ও গ্রাম্য সাদামাটা জীবন ভাবনার এক দারুণ সংমিশ্রণ ঘটেছে। সে কথাই জানাচ্ছিলেন উপস্থাপক সাহস মোস্তাফিজ। বলছিলেন- এই ধরুন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, তো এই বৃষ্টির ক্ষণে একজন শহুরে প্রেমিক কিংবা প্রেমিকা কী ভাবছেন? কোন ভাবনা তার মনটাকে তোলপাড় করে তুলছে? তা এই অ্যালবামে উঠে এসেছে, একই সঙ্গে বৃষ্টিমুখর গ্রামে একজন তরুণ কিংবা তরুণীর মনটাকে ঘিরে ধরেছে কোন ভাবনা সেটিও স্থান পেয়েছে এর গানে।

বিজ্ঞাপন

তো বলাই চলে- গান লিখলাম গাইলাম, অ্যালবাম বানালাম, প্রকাশনা উৎসব করলাম এমনটি ঘটেনি এই অচিনপুরের গান-এ। হ্যাঁ এটাই অ্যালবামটির শিরোনাম- অচিনপুরের গান। এখানে ভাবনা ছিলো, পরিকল্পনা ছিলো, ছিলো দার্শনিকতা। ফলে প্রতিটি গান এর হয়ে উঠেছে একেকটি পরিপূর্ণ দর্শন। যাতে সময় লেগেছে।

ঠিক সে কথাই বলছিলেন, অ্যালবামের গীতিকবি শেখ রানা। শশ্রুমণ্ডিত মুখে হাত বুলিয়ে বললেন, কাজ যখন শুরু করি তখন দাঁড়িগুলো কালো ছিলো এখন যখন শেষ হলো তখন ওগুলোর কিছু কিছু অংশে পাক ধরেছে। হাসির রোল উঠলো বটে দর্শক সারিতে। তবে এই এক কথায় শেখ রানা বুঝিয়ে দিলেন, গুন-মানের দিকে কতটা নজর দিয়ে তারা কাজটি করেছেন।

অ্যালবামের অপর গীতিকবি সাবরিনা সুলতানা চৌধুরী। তিনি জানাচ্ছিলেন, কাজটিতে তারা এতটুকুও ছাড় দেননি এতটুকুও অমনোযোগী হননি।
বেশ লম্বা সময় ধরে হৃদয়ের ভেতরে জমা অনুভূতিগুলোকে কালির আঁচড়ে একটা ছন্দে সাজানো হয়েছে। সেই গান বাঁধা পড়েছে সুরে। অচিনপুরের গান অ্যালবাম সেই শুদ্ধ অনুভূতিরই ফসল, বলছিলেন এই গীতিকবি।

সাবরিনা সুলতানা চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আর শেখ রানা প্রবাস যাপন করছেন যুক্তরাজ্যে। কিন্তু ভৌগলিক দূরত্বে থেকেও মনে অনেক কাছাকাছি থাকা এই দুই কবি লিখেছেন অ্যালবামের গানগুলো। তবে দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছিলেন তারা। শেখ রানা লিখেছেন নাগরিক ঘরানার গানগুলো। আর সাবরিনা লিখেছেন লোকজ ঘরানার গান। একটি কবিতাও পড়া হয়েছে এই অ্যালবামে। সেটিও সাবরিনা সুলতানার লেখা।

শেখ রানার নাগরিক ঘরানার গানগুলোয় সুরারোপ করেছেন বাপ্পা মজুমদার। তিনি নিজে ছাড়াও এই আঙ্গিকের তিনটি গানের অপর দুটি গেয়েছেন পার্থ বড়ুয়া ও হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল। আর সাবরিনার লেখা গান তিনটি গেয়েছেন পিন্টু ঘোষ, হাসান লাবিব ও গানকবি। আর লোক আঙ্গিকে কবিতা আবৃত্তি করেছে ত্রপা মজুমদার।

এরই মধ্যে দুটি গানের ভিজ্যুয়ালাইজেশন শেষ হয়েছে। এর একটি বাপ্পা মজুমদারের গাওয়া। এটি নাগরিক আঙ্গিকের। অপরটি গেয়েছে গান কবি। এটি লোকগান।

গানের কথা, সুর ও চিত্রায়ন এসব নিয়ে না লিখে এর ইউটিউব লিংক এখানে তুলে ধরা হলো।

 

আবার অনুষ্ঠানে ফিরে যাই। সেখানে এই সব গান, গীতিকার, গায়কদের কথা জানানো হলো। তাদের সম্মাননা স্মারক দেওয়া হলো, পরিয়ে দেওয়া হলো উত্তরীয়। আর গায়করা কথাও বললেন। নামকরা এই গায়কদের মুখে প্রশংসার ফুলঝুরি ছুটলো দুই গীতিকবিকে নিয়ে। তারা জানালেন, এমন গানের কথা তার খুব কম গানেই পেয়েছেন।

দর্শক সারিতে এসে বসেছিলেন দেশের নামকরা সুরকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গি। তিনি মঞ্চে উঠে বললেন, অচিনপুরের গান তাকে মুগ্ধ করেছে। শেখ রানা আগে থেকেই তার দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন, কিন্তু সাবরিনা সুলতানা চৌধুরীর লেখনি তাকে বাংলা গান নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। অচিনপুরকে চিনে নিতে সময় লাগবে না, বললেন তিনি।

লোকগানের অন্যতম শিল্পী ভাওয়াইয়া সঙ্গীতজ্ঞ একেএম মোস্তাফিজুর রহমান বলছিলেন, জীবনে আড়াই হাজার গান গেয়েছি, বেঁধেছি গান অজস্র। কিন্তু সাবরিনার লেখা গানগুলোর কাছে নিজেরগুলো ম্লান লাগছে।

প্রখ্যাত এই ভাওয়াইয়া শিল্পীর সে বক্তব্য হয়তো উদারতারই প্রকাশ। তবে লোক গান রচনায় সাবরিনা সুলতানার মাঝে একটি দারুণ ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছিলেন এই অনুষ্ঠানের সকলেই।

গান বাঁধতে দরদ লাগে... এই কথা দিয়েই তার লেখা একটি গান এই অ্যালবামে গেয়েছে গানকবি। সাহস মোস্তাফিজের নেতৃত্বে গানকবি দেশে এখন সুপরিচিত। তবে তাদের তৈরি মিউজিক ভিডিওটি যেকোনও দর্শককে দেবে দলটিকে নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ।

দলটির অপর সদস্য সুদীপ্ত যখন তার অনুভূতি ব্যক্ত করছিলেন এই প্রকাশনা উৎসব আয়োজনে, তখন অচিনপুরের গান অ্যালবামটির একটি কপি দু’হাতে চেপে ধরে বলছিলেন- এমন একটি সিডি যখন হাতে পাই আর তাতে যখন দেখি বাপ্পা মজুমদার, পার্থ বড়ুয়া, হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল কিংবা পিন্টু ঘোষের নামের সঙ্গে গানকবি নামটিও রয়েছে, তখন আমরা ভীষণভাবে বর্তে যাই, ভীষণ উদ্দীপ্ত হই এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণায়।

একই কথা ছিলো সাহস মোস্তাফিজেরও। গোটা অনুষ্ঠানটিকে একটি চলমান গাড়ি করে সেটি চালিয়ে নিতে নিতে বারবারই জানাচ্ছিলেন সেই প্রেরণার কথা।

অ্যালবামটি তৈরিতে গানকবির সদস্যরা নেপথ্যে মুখ্য-ভূমিকা পালন করেছে, আর তাদের সঙ্গে ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কালচারাল সোসাইটির সদস্যরা।এদের অক্লান্ত খাটুনিতে অ্যালবামটি যেমন প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি সম্ভব হয়েছে এর প্রকাশনা উৎসবও।

আয়োজনের শেষভাগের দৃশ্যটি এমন একদিকে গিটারে সুর তুলছেন পার্থ বড়ুয়া, অন্যপাশে গিটারে ঝংকার বাপ্পা মজুমদারের। মাঝখানে পিণ্টু ঘোষ বাজাচ্ছেন কাঠের ড্রাম। শুরু হয়ে গেলো গানের আয়োজন- গঞ্জে নয়, গ্রামে নয় নয়তো স্বপ্ন ঘুমে... তোমার সঙ্গে দেখা হবে তাপানুকুল রুমে।

ছবি: আব্দুল্লাহ আল মামুন এরিন

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এমএম/আইই

Advertisement
বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন