মঙ্গলবার ১২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৮ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৪ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘চিকিৎসক সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নের দাবি এফডিএসআর’র

নভেম্বর ৯, ২০১৯ | ১০:০৯ অপরাহ্ণ

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: প্রস্তাবিত `স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন-২০১৮' বাস্তবায়িত হলে চিকিৎসকরা নিগৃহীত হবে দাবি করে এই আইনের কয়েকটি ধারা পরিবর্তন, সংযোজন, বিয়োজন করে অবিলম্বে `চিকিৎসক সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি অ্যান্ড রাইটস (এফডিএসআর)।

বিজ্ঞাপন

শনিবার (৯ নভেম্বর) বেলা ১১ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয় সংগঠনটির পক্ষ থেকে। এ সময় প্রস্তাবিত ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন-২০১৮’ বাস্তবায়িত হলে চিকিৎসকদের সুরক্ষার পরিবর্তে উল্টো তারা নিগৃহীত হবেন বলে দাবি করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন এফডিএসআর'র মহাসচিব ডা. শেখ আবদুল্লাহ আল মামুন এবং লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের উপদেষ্টা ডা. আব্দুন নূর তুষার।

ডা. আব্দুন নূর তুষার লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইনের শুরুতে যে কয়েকটি বিষয় সংজ্ঞায়িত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি ধারা আমাদের কাছে বিভ্রান্তিকর বা অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে। যেমন- ২(৮) চেম্বার, ২(৯) তথ্য, ২(১১) নমুনা, ২(১৭) হাসপাতাল, ২(২৭) স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি, ২(২৮) ক্ষতি ইত্যাদি। ফলে পরবর্তী সময়ে এই আইনের ব্যাখ্যা প্রদান এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছি।’

তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত আইনের ১০(১) ধারাটি আমাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। কারণ, সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবী চিকিৎসকদের জন্য অফিস চলাকালীন সময় অথবা পালাক্রমিক দাফতরিক দায়িত্ব পালনের সময় অন্য কোনো বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা প্রদান করা প্রচলিত চাকুরি বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সুতরাং এ বিষয়ে আলাদা কোনো আইনের প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রস্তাবিত আইনের ১০(২) ধারায় ছুটির দিনে স্ব-স্ব কর্মস্থলের জেলার বাইরে বেসরকারি হাসপাতাল বা ব্যক্তিগত চেম্বারে ফি গ্রহণপূর্বক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমরা মনে করি, প্রতিটি জেলায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন নিশ্চিত না করে এই ধারা প্রয়োগ করলে জেলার রোগীরা বিশেষায়িত সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।’

প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন-২০১৮’র ধারা ১১ নিয়ে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘প্রস্তাবিত আইনের ধারা ১২(১) এবং ১২(২) আমাদের কাছে চিকিৎসকদের জন্য হয়রানিমূলক মনে হয়েছে। সারাদেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের চেম্বারের সামনে রোগীর অতিরিক্ত চাপ থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একজন রোগীর সাথে একাধিক আত্মীয় থাকে, তারাও চেয়ার ব্যবহার করেন। তাছাড়া অনেক নবীন চিকিৎসকই নানা ওষুধের দোকানে চেম্বার করেন, যেখানে সেবা গ্রহীতার বসার জায়গা সীমিত অথবা নেই বললেই চলে। সুতরাং চেম্বারের সামনে গ্রহীতার বসার ব্যবস্থা না থাকলে চিকিৎসককে জরিমানা করার দণ্ডটি আমাদের কাছে অযৌক্তিক এবং অমানবিক মনে হয়েছে।’

ডা. তুষার আরও বলেন, ‘প্রস্তাবিত আইনের ধারা ১৪(১) আমাদের কাছে বাস্তবসম্মত মনে হয়নি। যেখানে দেশের বিভিন্ন বিশেষায়িত এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে এখন পর্যন্ত জরুরি সেবা দেওয়ার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি, সেখানে মফস্বলের ছোট ছোট বেসকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নূন্যতম জরুরি সেবা প্রদান নিশ্চিত প্রায় অসম্ভব।’

লিখিত বক্তব্য পাঠ শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এফডিএসআর এর মহাসচিব ডা. শেখ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বিএমডিসি’র একটি দুষ্টু চক্র থেকে ভুয়া সনদ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। তারাই ভুয়া চিকিৎসক বানাচ্ছেন যার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আমরা পেয়েছি।’

এ বিষয়ে ডা. আবদুন নূর তুষার বলেন, ‘ভুয়া চিকিৎসক শনাক্তের পদ্ধতি, তার শাস্তি কী হবে, সে সম্পর্কে আইনের খসড়ায় কী কিছু বলা হয়নি। অথচ সারাদেশে লাখ লাখ ভুয়া ডাক্তার অপচিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত জনসাধারণের সাথে প্রতারণা করে চলছে। তাহলে এটা কীভাবে ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা’ নিশ্চিত করবে?

প্রস্তাবিত ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন-২০১৮’ বাস্তবায়ন হলে চিকিৎসক ও রোগী- কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না বলেও জানান ডা. আবদুন নূর তুষার।

অনুষ্ঠানে সারাবাংলা ডটনেট ও গাজী টিভির এডিটর ইন চিফ সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতিবছর নানা ক্ষেত্রে নতুন নতুন আইন হয়। এছাড়া হাজার হাজার আইন রয়েছে। কিছু আইন আছে ক্যাটাগরাইজড, যেমন: প্রকৌশলীদের কিছু আইন আছে কিংবা কৃষিবিদদের জন্য আইন। কিন্তু চিকিৎসা সংক্রান্ত আইনটি সকলের। কারণ ১৭ কোটি মানুষ যারা ডাক্তারদের কাছে যায়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তাররাও যায় কাছে। এই বাস্তবতায় আমরা আশা করেছিলাম এমন একটা আইন হবে।’

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ চিকিৎসা নিতে যায় সরকারি হাসপাতালে এবং সেখানেই সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার হয়। এই ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত আইনে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোকে কিছুটা দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।’ সরকারি হাসপাতালগুলো বিশেষ করে মেডিকেল কলেজগুলোতে যারা পরিচালক পর্যায়ে আছেন তারা কি সকলে ডাক্তার? এছাড়াও দেখা যায় রোগী মারা গেলে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে ভাঙচুরসহ চিকিৎসকদের ওপরে আক্রমণ করা হয়। এই জায়গাগুলো থেকে বের হয়ে আসার জন্য চিকিৎসকদের সুরক্ষা নিয়েও ভাবতে হবে। এছাড়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর রিপোর্ট মানসম্মত কী না সে বিষয়ে প্রস্তাবিত আইনে রোগীর স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে বলে মনে করি।’

অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির কোষাধ্যক্ষ ডা. ফরহাদ মঞ্জুর, সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. জাহিদুর রহমান, আইনবিষয়ক সম্পাদক ডা. নোমান চৌধুরী, মিডিয়া এবং পাবলিকেশন বিষয়ক সম্পাদক ডা. শাহেদ ইমরান।

উল্লেখ্য, ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন-২০১৯’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। এতে সরকারি চাকরিতে কর্মরত কোনো চিকিৎসক অফিস সময়ে ব্যক্তিগত কোনো চেম্বার করতে পারবে না, ছুটির দিনে চিকিৎসকদের নিজ নিজ কর্মস্থলের জেলার বাইরে জেলার বাইরে টাকার বিনিময়ে সেবা দিতে সরকারের অনুমতি লাগবে, চিকিৎসাসেবা বাবদ আদায়কৃত চার্জ বা মূল্য বা ফি রসিদের মাধ্যমে আদায় করতে হবে -এমন সব বিধান রেখে প্রস্তাবিত আইনটির মতামতের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। আইনটি অনুমোদনের জন্য শিগগিরই মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এসবি/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন