শুক্রবার ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২২ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ৮ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

রাজনীতির ইয়াবা, ফ্যান্সি ভাষা

নভেম্বর ১২, ২০১৯ | ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

দায়টা নূর হোসেনের পরিবারেরই। শহিদ নূর হোসেনের মা আর ভাইকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এসে বসতে হয়েছে, বলতে হয়েছে। যুবলীগ ঢাকায় আর রংপুরে বিক্ষোভ করেছে, কিন্তু সেটা কেবলই মনে হয়েছে একটা দৃশ্যমান প্রতিবাদ মাত্র।

বিজ্ঞাপন

বলছিলাম জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাঁর ইয়াবা তত্ত্ব প্রসঙ্গে। পতিত স্বৈরাচারের জাতীয় পার্টির এই নেতা, গণতন্ত্রের জন্য আত্মোৎসর্গকারী শহিদ নূর হোসেনকে ‘ইয়াবাখোর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। গত রোববার বনানীতে জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে এক আলোচনা সভায় রাঙ্গাঁ বলেন, ‘নূর হোসেন কে? একটা অ্যাডিকটেড ছেলে। একটা ইয়াবাখোর, ফেন্সিডিলখোর।’ রাঙ্গা এখানেই থামেননি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে তিনি স্বৈরাচারও বলছেন।

এমন অশ্লীল, এমন ঔদ্ধত্যের যে জবাব, যে প্রতিক্রিয়া হতে পারত বড় রাজনৈতিক দলগুলো থেকে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ থেকে তা হয়নি। নূর হোসেন ছিল যুবলীগকর্মী, সেই বিবেচনায় ক্ষমতাসীন দলসহ অন্যান্য প্রায় সব দলের কাছ থেকে জোরালো প্রতিবাদ আসেনি বলেই শহীদের মাকে এই বৃদ্ধ বয়সে পথে নেমে আসতে হয়েছে।

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর বুকে ও পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগান লিখে রাস্তায় নেমেছিলেন নূর হোসেন। এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। ওই দিন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন নূর হোসেন। মিছিলটি ‘জিরো পয়েন্ট’ এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ও গুলি ছোড়ে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান নূর হোসেন। মূলত এই ঘটনার পর এরশাদবিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে এবং ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন স্বৈরাচার এরশাদ। পরিতাপের বিষয়, সেই নূর হোসেনকেই গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করা দলগুলো ভুলেছে ক্ষমতার লড়াই করতে গিয়ে।

বিজ্ঞাপন

আমাদের রাজনীতিতে নোংরা ভাষার ভাষার প্রতাপ কতটা, সেটা আবার বুঝিয়ে দিলেন মশিউর রহমান রাঙ্গাঁ। সেই তীব্রতায় পুড়ছে শহিদ নূর হোসেনের পরিবার, পুড়ছে আরও শত শত পরিবার, যাদের স্বজনরা জীবন দিয়েছেন গণতন্ত্রের জন্য। অথচ আমাদের মূল রাজনীতি কেমন যেন নির্বিকার! যেন অনেকটাই অসহায়। রাজনীতির এমন কদর্য চেহারা দেখেই বড় হবে তাহলে আমাদের প্রজন্ম? রাজনৈতিক নেতারা প্রমিত ভাষায় বক্তৃতা দেবেন, সেটা বলছি না। কিন্তু মাঝে মাঝেই রাজনীতির যে কদর্য চেহারাটি আমরা দেখি, তা ভয়ংকর। রাজনৈতিক দলগুলোর ‘রাঙ্গাঁ মার্কা’ নেতাদের মুখের যে ভাষা আমরা শুনছি এবং দেখছি, তা যেকোনো কদর্যতাকে হার মানায়।

অনেক আগে থেকেই রাজনীতিতে চলছে এক ধরনের কটূভাষার ব্যবহার। কিন্তু রাঙ্গাঁ যে নোংরা ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা হতে পারে নোংরা রাজনীতির টেক্সটবুক দৃষ্টান্ত। কিভাবে নিচে নেমে যাচ্ছি আমরা! কিভাবে ভাষার কদর্যতায় এগিয়ে যাচ্ছি আর আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অজান্তেই শিখিয়ে দিচ্ছি সেসব! আজ টিভিতে, ফেসবুকে, ইউটিউবে যখন এই ভাষা ভেসে উঠছে, তখন অসহায় লাগে নিজেদের। আসলে এগুলো আমাদের রাজনীতির দৈন্য। রাজনীতির বিষয় এখন আর তুলে আনতে না পেরে রাঙ্গাঁর মতো নেতা নিজেই যেন নেশাখোরের মতো মদ্যপ বক্তৃতা দিলেন। এরা আসলে নেতা হওয়ার যোগ্যই নন। তাদের বোধ ও কথা বলার ভঙ্গিমাও নিম্নমানের।

কিন্তু রাঙ্গা শুধু নোংরামি করেছেন— এটা বললে কম বলা হবে। স্বৈরাচারের দোসর পুরো জাতিকে অসম্মান করেছেন। কারণ গণতন্ত্রের জন্য শহিদকে এমন মিথ্যা নোংরা ভাষায় আক্রমণ করার অর্থ হলো— সব শহিদকেই ইয়াবাখোর বলা।

প্রতিবছর ১০ নভেম্বর এলে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বাণী দেন। তবে কি তারা এতদিন একজন ইয়াবাখোর, ফেন্সিডিলখোরের জন্য বাণী দিয়ে এসেছেন? জাতির সামনে আজ সেই প্রশ্ন। গত ৩৩ বছর ধরে নূর হোসেনকে সম্মান দিয়ে আসছে জাতি। তবে কি সেই সম্মান আজ কেড়ে নিতে চায় পতিত স্বৈরাচারের লোকেরা?

মানুষের মাঝে আজকাল এমনিতেই রাজনৈতিক নেতাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তার মধ্যে ‘গণতন্ত্রের প্রতীক’কে এমন কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে আক্রমণ করার পর নতুন ভাবনা আসবেই নব প্রজন্মের মনোজগতে। গণতন্ত্রের জামানায় স্বৈরাচার ও তার দোসরদের থাকার কথা ছিল কারাগারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও নূর হোসেনদের জীবনের ভাগ্য না বদলালেও স্বৈরাচার নিজে আমৃত্যু রাজকীয় জীবন কাটিয়েছেন, আর সাঙ্গপাঙ্গরা আরও বেশি সম্পদ গড়েছেন, পদ-পদবীতে উচ্চাসনে গিয়েছেন। এ সবই হয়েছে ক্ষমতার রাজনীতি জনগণের ত্যাগকে মূল্যায়ন না করায়।

মূল্যায়ন আর হবে না— এটা জানা হয়েছে মানুষের। শহিদ নূর হোসেনের মা আর ভাই রাজপথে নেমে এসেছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জীবন দেওয়া আরও শত শহিদ পরিবারের সদস্যরা হয়তো রাঙ্গাঁর বিচারের দাবি নিয়ে পথে নামবেন না, হয়তো অনুশোচনায় তাদের নিরব অশ্রুবারি চলবে অনন্তকাল ধরে।

লেখক: এডিটর ইন চিফ সারাবাংলা ও জিটিভি

আরও পড়ুন-

নূর হোসেনকে কটাক্ষ: আইনি নোটিশ পাচ্ছেন রাঙ্গাঁ

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন