শুক্রবার ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২২ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ৮ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

নিজের হাতেই বিসর্জনে শাহাদাত

নভেম্বর ১৯, ২০১৯ | ৪:৪২ অপরাহ্ণ

মহিবুর রহমান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ক্যারিয়ারের সূর্য তার প্রায় পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। বয়স মাশরাফি বিন মুর্ত্তোজার কাছাকাছি, তাই জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনা ছিল না বললেই চলে। ফলে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের যবনিকা টানতে একমাত্র মঞ্চ ছিল ঘরোয়া ক্রিকেট। একটু শৃঙ্খল হলে অন্য আট দশজন ক্রিকেটারের মত এখান থেকেই নিষ্কলুষ থেকে বাদ বাকি সময়টা পার করে ক্রিকেটকে বিদায় জানাতে পারতেন। কিন্তু বরাবরই উশৃঙ্খল জীবন যাপনে স্বাচ্ছন্দ্য শাহাদাত সেটা পারেননি! বেলা থাকতেই ক্যারিয়ারের সূর্যাস্ত দেখে ফেললেন! জাতীয় ক্রিকেট লিগের ম্যাচ চলাকালীন মাঠে সতীর্থের গায়ে হাত তুলে ৫ বছর নিষিদ্ধ হয়ে নিজ হাতে গলা টিপে ক্যারিয়ারের এপিটাফ লিখে দিলেন!

বিজ্ঞাপন

তার উশৃংঙ্খলতার প্রথম ঘটনা গোটা ক্রিকেট বিশ্বে আলোড়ন তোলে। সেটা অবশ্য মাঠের বাইরে। ২০১৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে তার ও স্ত্রী জেসমিন জাহানের বিরুদ্ধে। ওই দিন মিরপুর মডেল থানায় শিশু নির্যাতনের মামলা হয় দুজনের বিরুদ্ধেই। মামলা হলে আত্মগোপনে চলে যান এই দম্পতি। বিসিবিও তাঁকে ক্রিকেট থেকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে।

প্রায় এক মাস আত্মগোপনে থাকার পর ওই বছরের ৪ঠা অক্টোবর স্ত্রী জেসমিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শাহাদাত গ্রেপ্তার হন তার পরদিনই। আদালতে নিয়ে যাওয়া হলে আত্মসমর্পণ করে জামিন চান। আদালত তখন তাকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। তদন্ত শেষে ২৯শে ডিসেম্বর পুলিশ অভিযোগপত্র দেয়। ডিসেম্বর মাসেই জামিনে মুক্তি পান শাহাদাত হোসেন দম্পতি।

বিজ্ঞাপন

পরের বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান বাংলাদেশের পেস বোলার শাহাদাত হোসেন। মে মাসে বিসিবি ঘরোয়া ক্রিকেটে শাহাদাত হোসেনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে সাময়িক ক্ষমা ঘোষণা করে।

দুই বছর না যেতেই আবার সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হন এই টাইগার ‘ব্যাড বয়’। অবশ্যই কুকর্ম করে। ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে রাজধানীর আসাদগেটে তার ব্যক্তিগত গাড়ির সঙ্গে একটি সিএনজির ধাক্কা লাগলে গাড়ি থেকে নেমে সিএনজি চালকের শার্টের কলার চেপে ধরেন। এক পর্যায়ে সিএনজি চালকের গায়েও হাত তোলেন!

সবশেষ ঘটনাটি ঘটিয়েছেন গত রোববার (১৭ নভেম্বর) খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের স্বাগতিক খুলনা বিভাগের বিপক্ষে ম্যাচ চলাকালীন বোলিংয়ের সময় আরাফাত সানি জুনিয়রকে বলের এক পাশ ঘসে দিতে বলেন ঢাকা বিভাগের এই পেসার। আরাফাত সানি তাতে গরিমসি দেখালে ক্ষিপ্ত হয়ে মাঠের মধ্যেই তাকে কয়েক দফা চড় থাপ্পড় মারেন শাহাদাত। উপস্থিত দুই দলের অন্যান্যরা তাকে থামাতে গিয়েও প্রথমে ব্যর্থ হন। পরে তাকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।

ম্যাচ রেফারি আখতার আহমেদ ওই দিন ঘটে যাওয়া অপ্রত্যাশিত এই ঘটনার প্রতিবেদন পাঠান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের টেকনিক্যাল কমিটির প্রধানের কাছে। প্রতিবেদন পেয়ে পরদিন নান্নু জানান ‘ম্যাচ রেফারির প্রতিবেদন অনুযায়ী কোড অব কন্ডাক্টের লেভেল ৪ ভেঙেছে শাহাদাত। যার শাস্তি ১ বছর থেকে আজীবন নিষেধাজ্ঞা। দেখি আমরা কাল টেকনিক্যাল কমিটির মিটিংয়ে বসব। এরপর সিদ্ধান্ত জানাতে পারব।’

ঠিক তার পরদিনই টেকনিক্যাল কমিটির সভা শেষে তিনি জানিয়ে দেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি শাহাদাত ৫ বছরের জন্য নিষিদ্ধ। এর মধ্যে দুই বছর স্থগিত নিষেধাজ্ঞা। আর তিন লাখ টাকা জরিমানা। ও যদি আবেদন করতে চায় করবে ২৬ তারিখের মধ্যে করতে হবে। ২৭ তারিখ থেকে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ হবে।’

অথচ এক সময় বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম পেস বোলিং কান্ডারি হিসেবেই তাকে বিবেচনা করা হত। তার পেছনে কারণও আছে। তিনিই বাংলাদেশের প্রথম বোলার ওয়ানডে ক্রিকেটে যিনি প্রথম প্রথম হ্যাট্টিকটি করেন। সেটা ছিল ২০০৬ সালে। প্রতিপক্ষ ছিল জিম্বাবুয়ে।

চার বছর পর অর্থাৎ ২০১০ সালের ২৮ মে টেস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ উইকেট নিয়ে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে লর্ডসের অনার্স বোর্ডে নিজের নাম লিখিয়েছিলেন শাহাদাত হোসেন রাজীব। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশি পেসারদের মধ্যে উইকেট শিকারির তালিকায় মাশরাফির পরেই তিনি! ৩৬ ম্যাচে ৭৮ উইকেট মাশরাফির আর ৩৮ ম্যাচ থেকে তার শিকার ৭২টি।

কত সম্ভাবনাময়ই না তিনি ছিলেন। একটু শৃঙ্খল জীবন তাকে নিয়ে যেতে পারত সাফল্যের চূড়ায়। কিন্তু উশৃঙ্খল জীবন যাপন তার সেই পথে কাটা হয়ে রইল।

বাংলাদেশের হয়ে ৩৮ টেস্ট, ৫১ ওয়ানডে ও ৬টি টি-টোয়েন্টি খেলেছেন শাহাদাত। সবশেষ ম্যাচটি খেলেছেন ২০১৫ সালের মে মাসে। ওয়ানডেতে তার উইকেট সংখ্যা ৪৭টি, টেস্টে ৭২টি ও টি-টোয়েন্টিতে ৪টি।

শাহাদাতের এই ঘটনায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড যে সিদ্ধান্ত শুনিয়েছে যা নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী। আজ যারা তরুণ নিঃসন্দেহে এখান থেকে শিক্ষা নেবেন এবং উশৃঙ্খল জীবন যাপন পরিহার করে মাঠে ও মাঠের মাঠের বাইরে সুশৃঙ্খল জীবনে তৎপর হবেন।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এমআরএফ/এনএ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন