শুক্রবার ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২২ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ৮ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না মুক্তিযোদ্ধা ছাত্তার

নভেম্বর ১৯, ২০১৯ | ১০:৫৭ অপরাহ্ণ

এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ‘চার বার হার্ট অ্যাটাক করেছি। দু’টো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। ভাতা হিসেবে পাই ১২ হাজার টাকা, তাতে কিছুই হয় না। ওষুধের দোকানদারদের জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে অঙ্গার করে ফেলেছি। বহু টাকার ওষুধ লাগে। একটা ইনজেকশনের দাম ৮ হাজার টাকা। মাসে প্রায় ৬০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। ধার-দেনা করে চলতে হচ্ছে। ছেলে-মেয়ে, বন্ধু-বান্ধব সবার কাছ থেকে, মানে একরকম হাত পেতে চলার মতো অবস্থায় আছি। আর ডাক্তাররা বলেছেন, সবমিলিয়ে ট্রিটমেন্ট করাতে অন্তত ৪০ লাখ টাকা লাগবে।’

বিজ্ঞাপন

কথাগুলো বলছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ছাত্তার। নোয়াখালীর করিমপুরের এই বীর সন্তান বর্তমানে রাজধানীর কেরানীগঞ্জের খোলামোড়া এলাকায় গফুর মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকছেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানের এই জনকের জীবন কাটছে একাকীত্বে। একাই থাকছেন কেরানীগঞ্জের ওই বাড়িতে।

সারাবাংলা কার্যালয়ে বসে কথা হয় আব্দুল ছাত্তারের সঙ্গে। জানালেন, যুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়েও আব্দুল ছাত্তার থাকতেন ঢাকায়। পুরান ঢাকার নীমতলীতে কাজ করতেন রাজমিস্ত্রি হিসেবে। দেশে তখন স্বাধীনতার দামামা বাজছে। তরুণ ছাত্তার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিভিন্ন সভায় যোগ দিতেন। মিছিলেও অংশ নিতেন। যুদ্ধ শুরু হলে নিজেই সিদ্ধান্ত নেন, দেশমাতৃকার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বেন ময়দানে। হেঁটে সীমান্ত পাড়ি দেন, প্রশিক্ষণ নেন ভারতের লোহারবন ও আমটিলায়। সেক্টর কমান্ডার সিআর দত্তের অধীনে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। প্রশিক্ষণের বিভিন্ন ধাপে উত্তীর্ণ হওয়ায় কমান্ডার নির্বাচিত হন। সিলেটের বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ ও সুন্দিআইলে কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

সম্মুখ সমরের বর্ণনা দিতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ছাত্তার বলেন, ‘সুন্দিআইলের চর্তুদিকে ধানক্ষেত। মাঝখানে একটি টিলা, একটি পাহাড়। যুদ্ধের সময়টি ছিল রমজান। তখন ছিল বর্ষাকাল। আমরা ছিলাম টিলার ওপরে। আমাদের যে কয়কটি গুলি, সবকটিতেই কাজ হয়েছে। কেউ ইনজুরি হয়েছে, কেউ মারা গেছে। আমাদের একটি গুলিও ব্যর্থ যায়নি। কারণ আমরা টিলার উওপরে ছিলাম, ওরা ছিল টিলার নিচে।’

এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘ওরা কয়েক হাজার রাউন্ড গুলি করে থামলে আমরা কয়েক রাউন্ড গুলি করি। আবার যখন থামে, তখন আমরা দুই-তিনটা গুলি করি।  আমাদের কথাই ছিল— ওরা ফায়ার করে শেষ করলে তোমরা জবাব দেবে। যতগুলো গুলি করবে, একটি গুলিও যেন বিফলে না যায়। কারণ গুলি শেষ হয়ে গেলে আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না। যে কথা, সেই কাজ। ওরা গুলি শুরু করল। গাছের পাতা পর্যন্ত ঝরে পড়ছে। ওরা শেষ করার সঙ্গেই সঙ্গেই আমরা দুয়েক রাউন্ড করে গুলি করতে শুরু করি। এভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত গোলাগুলি চলে। ওদের অনেকেই মরাত্মক জখম হয়। এই যুদ্ধে ২০ থেকে ২৫ পাক সেনা মারা যায়।’

আব্দুল ছাত্তার বলেন, ‘সন্ধ্যার দিকে ওদের গুলি বন্ধ হয়ে গেল। তখনো আমরা দুই-তিনটা করে গুলি করছি। কিন্তু তারা কোনো আওয়াজ দিচ্ছে না। অনেকক্ষণ পর বুঝতে পারলাম, সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় ওরা পালিয়ে গেছে। কী করা যায়, এখন তো আর ভারত যাওয়া সম্ভব না। তখন নৌকা দিয়ে কুশিয়ারা নদী পার হলাম। এখন তো আশ্রয় নিতে হবে।’

একটানা বলতে থাকেন আব্দুল ছাত্তার, ‘খুঁজতে খুঁজতে এক বড়লোকের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। ওটা ছিল চেয়ারম্যান বাড়ি। তারা স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল। রমজান মাস ছিল। সেহেরি খেতে বসেছি, আমাদের পোশাক দেখে ওই বাড়ির সবাই চিৎকার করে ওঠে। আমরা তখন সেই বাসা থেকে চলে গেলাম। পরে আরেক বাড়িতে আশ্রয় নিই। যে বাড়িতে আশ্রয় নিলাম, ওই লোকের ছোট ভাই আবার রাজাকার। সেটা আমাদের ওইদিন বলেনি। একদিন পরে বলেছেন। একদিন পর ওই রাজাকার এসে বলে, আর্মিদের ধারণা, এই মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশেই আছে। এরা পালিয়ে যেতে পারেনি। বাড়ি বাড়ি ঘরে ঘরে তল্লাশি করছে। আপনারা এখান থেকে চলে যান। সেদিন দিনের বেলায় পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে, একটা ঝুঁড়ি কাঁধে নিয়ে বের হয়ে গেলাম। সন্ধ্যার পর মুসাফির হিসেবে এক জায়গায় আশ্রয় নিলাম। অস্ত্রপাতি বাঁধা ছিল। এর কয়েকদিন পরেই দেশ স্বাধীন হয়ে গেল।’

সুন্দিআইলের ওই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্তারসহ ৩৬ জন অংশ নেন। এর মধ্যে ৯ জন বাদে বাকি সবাই শহীদ হন।

ভারতে যখন প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন, তখনো সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এসে যুদ্ধে অংশ নিতেন আব্দুল ছাত্তার। তিনি বলেন, ফজরের আগে বাংলাদেশ ঢুকতাম। আবার ফর্সা হওয়ার আগে আগে ভারতে চলে যেতাম। একদম সাফা করে ফেলতাম। সেগুলো ছিল আকস্মিক আক্রমণ। আমরা গ্রেনেড ছুঁড়ে মারতাম। ওরা সীমান্তের কাছাকাছি ক্যম্পে থাকতেও ভয় পেত। দুই-তিন জন থাকত। গ্রেনেডে তারাই মারা পরত।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস ছাত্তারের একটি ছবি পোস্ট করেন সুশোভন অর্ক নামের একজন গণমাধ্যমকর্মী। চিকিৎসার জন্য রাস্তায় নেমেছেন আব্দুস ছাত্তার— এমন ছবিতে এই মুক্তিযোদ্ধাকে অর্থ সাহায্যের জন্য সমাজের হৃদয়বান ও বিত্তশালীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। চিকিৎসার অর্থের জন্য এই মুক্তিযোদ্ধার রাস্তায় নামার ছবিটি ফেসবুকে দ্রুতই ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিষয়টি সারাবাংলার নজরেও আসে। পরে এই মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তার দুরবস্থার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।

মুক্তিযোদ্ধা ছাত্তার কেরানীগঞ্জের খোলামোড়ায় গফুর মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকেন। জানতে চাইলে গফুর মিয়া সারাবাংলাকে বলেন, দুই-তিন বছর ধরে তিনি ভাড়া থাকেন ওই বাসায়। কিছুদিন আগে স্ত্রী মারা গেছেন। এখন একাই থাকছেন। খুব কষ্টে দিন কাটছে তার।

ওই এলাকার এক বাসিন্দা ফিরোজ সারাবাংলাকে বলেন, ‘তিন বছর ধরে উনাকে চিনি। উনাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই জানি, সব কাগজপত্রও উনার কাছে আছে। বর্তমানে উনি খুব কষ্টে আছেন। স্ত্রী নেই, খুব বিপদেই আছেন।’

স্থানীয় একজন ফটোকপির দোকানদার কাঞ্চন বলেন, ‘একদিন ফটোকপি করতে এসেছিলেন আমার দোকানে। দেখি, সব মুক্তিযোদ্ধার কাগজপত্র আর হাসপাতালের রিপোর্ট। কিডনি ও হার্টের সমস্যা রয়েছে উনার। ছেলে-মেয়েরা তেমনভাবে দেখভাল করছে না বলে জানি।’

ওই এলাকার মুক্তিযোদ্ধা ছালেহ আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘উনি একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার। তার দু’টি কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। চার বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। উনি সত্যিকার অর্থেই খুব কষ্টে আছেন।’

অর্থিক সাহায্য চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও কয়েকবার আবেদন করেছেন মুক্তিযোদ্ধা ছাত্তার। তবে তাতে সাড়া মেলেনি। এই মুক্তিযোদ্ধা এখনো প্রত্যাশা করেন, তার দুরবস্থার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে এলে চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে।

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ছাত্তারের মুক্তিবার্তা নম্বর (লাল বই): ০২০৯০১০৮৩০, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সনদ নম্বর: ম-৯৫২৮১, গেজেট নম্বর ৪২২। অর্থ সাহায্য পাঠাতে সোনালী ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর: ৩৪০৩২৯৩৪, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম শাখা।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/ইএইচটি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন