শুক্রবার ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২২ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ৮ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনে চিকিৎসক-রোগী কেউই নিরাপদ নন’

নভেম্বর ২০, ২০১৯ | ৫:৩০ পূর্বাহ্ণ

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: প্রস্তাবিত 'স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন-২০১৮' চিকিৎসক ও রোগী কারো জন্যই নিরাপদ নয় জানিয়ে আইনটিকে অযৌক্তিক বলে দাবি করেছেন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি অ্যান্ড রাইটসের (এফডিএসআর) নেতারা। আইন সংশোধনে যদি প্রয়োজন হয় তবে আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার কথাও বলে সংগঠনটি।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এফডিএসআর আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ সব কথা বলেন।

‘প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য সেবা ও সুরক্ষা আইন-২০১৮ নিরাপত্তা রোগের চিকিৎসক: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন এফডিএসআর-এর উপদেষ্টা ডা. আব্দুন নূর তুষার।

তিনি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সকল স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবার সর্বোচ্চ স্থানে কর্মরত চিকিৎসকদের পেশাগত সামগ্রিক সুরক্ষার দাবি জানান। একইসঙ্গে তিনি চিকিৎসকদের শারীরিক, মানসিক, আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো আইন প্রণয়নের দাবি জানান।

বিজ্ঞাপন

প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন ২০১৮ কে সংশোধন করে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক ব্যবসা পরিচালনার জন্য আলাদা আইন এবং চিকিৎসক ও রোগীর সুরক্ষার জন্য আলাদা আইন করার দাবি জানান ডা. আব্দুন নূর তুষার।

তিনি বলেন, ডাক্তারের নিরাপত্তা বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে যেন তিনি কোনো ধরনের হামলার শিকার না হন। এ ছাড়া আর অন্য কোনো কিছুরই উল্লেখ নেই। সাধারণত হামলার শিকার হলে ফৌজদারি মামলা করলে বিচার পাবে। এ জন্য আলাদা আইনের দরকার ছিল না।

তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত আইনে যে কোনো বিচার চাইতে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) বাদে আদালত পর্যন্ত চিকিৎসক এবং রোগী কেউ পৌঁছাতে পারবে না, এমন অযৌক্তিক ধারাসহ আরও অনেক ধারা রয়েছে। এছাড়াও প্রস্তাবিত এই আইনে চিকিৎসকদের জন্য কোনো ব্যবস্থার কথা বলেনি। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এ আইন শুধুমাত্র বেসরকারি ক্লিনিকের চিকিৎসকদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যেখানে রোগীদেরকেও মূল্যায়ন করা হয়নি।

বৈঠকে অংশ নিয়ে সারাবাংলা ডটনেট ও গাজী টিভির এডিটর ইন চিফ সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যখাতে আমরা যে সুশাসনটা চাই সেটির প্রেক্ষাপটে আমরা নতুন প্রস্তাবিত এই আইনকে দেখতে চাই। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), স্বাচিপ, ড্যাবের পক্ষ থেকে এই আইন বিষয়ে কাউকে কথা বলতে দেখছি না। তাদের কণ্ঠ অনেক ক্ষীণ চিকিৎসকদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে। এফডিএসআর তরুণ চিকিৎসকদের একটি সংগঠন। দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে তাদের আরও বেশি সোচ্চার হতে হবে। এফডিএসআরকে ধন্যবাদ এই বিষয়ে কথা বলার জন্য।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে এই আইনটি এমন একটি আইন যা ১৭ কোটি মানুষের জন্য তৈরি করা হয়েছে। কিছু বিশেষায়িত আইন হয়ে থাকে যেমন কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করার আইন হলো কৃষি আইন। ঠিক এই ভাবেই অন্যান্য ক্ষেত্রেও আমরা এমন আইন দেখি। কিন্তু ১৭ কোটি মানুষকে যে আইন স্পর্শ করে তা হলো স্বাস্থ্যখাতের জন্য তৈরি করা আইন। সামগ্রিকভাবে আমরা একটি সুশাসনের অভাব দেখছি স্বাস্থ্যখাতে অনেক দিন থেকে। আগে আমরা বলতাম ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’, এখন কিন্তু স্লোগানটা বদলে গেছে। এখন বলা হয় ‘সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্য’। মানসম্মত স্বাস্থ্য চাইতে গেলে দরকার মানসম্মত চিকিৎসক। মানসম্মত চিকিৎসক চাইলে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে আর সেই জায়গা থেকেই চিকিৎসকদের সুরক্ষা চাওয়া হচ্ছে।

ইশতিয়াক রেজা আরও বলেন, এই প্রসঙ্গে কিছু মৌলিক সংস্কারের বিষয়ও আসে। ঢাকা শহরের স্বাস্থ্য অবকাঠামো এতটাই দুর্বল হতে যাচ্ছে প্রাইমারি চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থা না থাকার কারণে। এ কারণে রোগীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে আসেন। শুধুমাত্র একটি হাসপাতালেই কেন চিকিৎসা নিতে যাবে রোগীরা চিকিৎসকদের সে বিষয়েও কথা বলা দরকার। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম স্বাস্থ্য অবকাঠামো আমাদের দেশে কিন্তু সেখানে যদি সিস্টেম না থাকে বা সুশাসনের অভাব থাকে সেক্ষেত্রে যতই আইন করি না কেনো খুব একটা বেশি উপকার আসবে না।

তিনি আরও বলেন, সার্বিক ভাবে আমাদের স্বাস্থ্য সেবা অনেক বেশি আমলাতান্ত্রিক যাঁতাকলে পড়েছে। স্বাস্থ্য সেবা একটা বিষয়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা আরেকটি বিষয়। আর এই ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আমাদের সকলকে সোচ্চার হতে হবে।

অনুষ্ঠানে কমিউনিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাসনিম বলেন, চিকিৎসাসেবা নিতে এসে রোগীর প্রশ্ন হতে পারে যে, চিকিৎসা ঠিকমতো হচ্ছে কিনা। কিন্তু জানার পরেও কোনো জটিলতা সৃষ্টি হলে তখন তারা সবকিছু অস্বীকার করে ডাক্তারদের দোষারোপ করে। তারা বলে আমরা জানি না বা বুঝি না।

প্রস্তাবিত আইনে চিকিৎসা ক্ষেত্রে কী তথ্য সংরক্ষণ করতে পারবে, সেই ব্যাপারেও কিছু বলা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোগী বা রোগীর স্বজনদের অনুমতি না পেলে গর্ভাবস্থায় সিজার করা যায় না বা আমরা করতে পারি না। সিজারের পর কোনো জটিলতা সৃষ্টি হলে তখন রোগীর স্বজনরা আমাদেরকেই দোষারোপ করে। এরকম একটি জটিল বিষয় কিংবা চিকিৎসকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সেরকম কিছুই বলা হয়নি।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, কিছু অজ্ঞ লোক মিলে বিশেষজ্ঞ আইন তৈরি করেছে। এটিকে ডাক্তার-রোগী নির্মূল আইন বলা যেতে পারে।

তিনি বলেন, দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ডাক্তার থাকে না, সেখানে হেলথ প্রোভাইডার থাকেন। তারা বেআইনিভাবে প্রেসক্রিপশন করে। এসব বিষয় নজরে আনা দরকার ছিল আইনে। এছাড়াও আমাদের দেশের জনগণের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা একেবারেই কমেনি। সবকিছু ঠিকঠাক করতে হলে সাধারণ জনগণকে অনেক সচেতন হতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিএমডিসি’র রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. লিয়াকত বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিএমডিসির অনেক বড় অবদান থাকার কথা ছিল। নিবন্ধন ছাড়াও এই প্রতিষ্ঠানটির আরও অনেক কাজ রয়েছে। বিএমডিসি এখন পর্যন্ত কোনো মানে আসেনি বা তাদের এখানে রাখা হয়নি। অথচ এক্ষেত্রে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য একটি বিশেষ সেল গঠন করা আছে। প্রয়োজনে অনৈতিক আচরণের জন্য চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।

বৈঠকে সাপ্তাহিক সাংবাদিক গোলাম মর্তুজা বলেন, ডাক্তার ও সাধারণ মানুষ প্রতিপক্ষ হয়ে গেছে বলে মনে হয়। যে কোনো আইন করার সময় রাজনৈতিক স্বার্থের দিকে নজর রেখে আইন করে ফেলা হয়।

এ সময় তিনি চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারা জোর দাবি তুলে ধরেন এ আইন বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়ন করার জন্য। যেখানে আপনাদের উপস্থিতি থাকবে। কেননা এটা করতে গেলে ৫৭ ধারার মতো সাংবাদিক দমন আইনের ন্যায় ডাক্তার দমনের একটি আইন প্রণীত হবে।

বিএসএমএমইউ’র অধ্যাপক ডা. মোশরারফ হোসেন বলেন, লাইসেন্স ছাড়া পৃথিবীর কোন দেশেই অন্য দেশের চিকিৎসকেরা রোগী দেখতে পারেন না। তাহলে বিদেশি চিকিৎসকদের জন্য কেনো উদারভূমি হবে বাংলাদেশ? তাদের জন্য কেনো কোনো বিধিনিষেধ করা হচ্ছে না?

গণস্বাস্থ্য ডায়ালাইসিস সেন্টারের চিকিৎসক ডা. শামীম দেশের মধ্যে খুলনা ও চট্টগ্রামে কীভাবে বিদেশি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয় প্রশ্ন করে বলেন, ভারতের চিকিৎসকরা কীভাবে বাংলাদেশে এসে চিকিৎসা প্রদান করে? আবার সরাসরি অ্যাম্বুলেন্সে করে দেশের বাইরে রোগী কোন নিয়ম অনুসারে যায়? এমন জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই প্রস্তাবিত এই আইনে।

বৈঠকে অভিনেতা আরেফিন শুভ বলেন, দেশে ৫৮ শতাংশ মানুষ যদি ভুয়া চিকিৎসকদের কাছ থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকে অথবা এত বেশিসংখ্যক যদি ভুয়া ডাক্তার থেকে থাকে, তাহলে আমিও নিজেকে ডাক্তার বলে দাবি করতে পারি। যেহেতু সেটার কোনো বিচার হবে না।

গোলটেবিল বৈঠকে বলা হয়, প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা আইন ২০১৮ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলাপ করেছে এফডিএসআর। মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, ‘আইন প্রণয়ন করার সময় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনসহ (বিএমএ) স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তবে এ বিষয়ে তখন তারা কোনো মন্তব্য করেননি। তাদের মতে এ আইন ঠিকঠাক মতোই প্রস্তুত করা হয়েছে।’

কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ের চিকিৎসকদের সঙ্গে এসব বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করা হয়নি। ফলে চিকিৎসকদের জন্য উপকারী কোনো আইন প্রণীত হয়নি বলে জানান বক্তারা।

গোলটেবিল অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন এফডিএসআরের মহাসচিব ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন।এতে অস্ট্রেলিয়া থেকে ভিডিও-কলে এফডিএসআর-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন সংযুক্ত হন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. জাহিদুর রহমান, মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিকেশন্স বিষয়ক সম্পাদক ডা. শাহেদ ইমরান, কোষাধ্যক্ষ ডা. ফরহাদ মঞ্জুর, আইন বিষয়ক সম্পাদক ডা. নোমান চৌধুরীসহ অন্যান্যরা।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এসবি/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন