সোমবার ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১১ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ইমেজ সংকটে কমছে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক সংখ্যা

নভেম্বর ২০, ২০১৯ | ১:১২ অপরাহ্ণ

ওমর ফারুক হিমেল

বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া হবে দক্ষিণ কোরিয়ায়। এমন শিরোনামে পত্রিকায় প্রায়শই বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। এই কর্মী নেওয়ার বিজ্ঞাপনটি সবসময়ই বাংলাদেশি তরুণদের কাছে এক নব প্রেরণার আলো। বাংলাদেশে কর্মহীন, বেকার শিক্ষিত অনেক তরুণের স্বপ্নের দেশ কোরিয়া। শত কষ্ট, অসীম ধৈর্য ধরে ইপিএস সিস্টেমে কোরিয়ায় যেতে পারলে ভাগ্য বদলাবে, ঘুচবে বেকারত্ব, আসবে পরিবারে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা, ফিরবে প্রাণ এমনই মনে করে তারা।

বিজ্ঞাপন

যে পাঁচ বছর আগেও কোরিয়া ছিল বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মার্কেট। অথচ এখন বাজারটি ইমেজ সংকটের চেইনে আটকে আছে। ধীরে ধীরে সৌদি আরব, লিবিয়া, ইরাকের মতো ক্ষীণ হয়ে আসছে লোভনীয় হ্যান্ডসাম এই শ্রমবাজার। সম্ভাবনাময় এই কোরিয়ার শ্রমবাজার থেকে গতবছরেও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে বাংলাদেশ।

কোরিয়ার শ্রমবাজারকে চাঙা রাখতে হলে ইমেজ বৃদ্ধির দ্বিতীয় বিকল্প নেই। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বীতায় সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে কালোমেঘ বাড়ছে, অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ওখানকার শ্রমবাজারের হাল হকিকত। দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকরা কাজ করছেন ঠিকই কিন্তু নানা কারণে আবার শ্রমবাজার কমছেও। কিন্তু সব ছাপিয়ে বর্তমানে কূটনৈতিক দৌঁড়ঝাপ, সাংগঠনিক তৎপরতা বেড়েছে।

স্বল্প খরচে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর সরকারিভাবে কয়েক হাজার কর্মী দক্ষিণ কোরিয়ায় যান কাজ করতে। আগের মতো স্রোত না থাকলেও শ্লথ গতিতে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া অব্যাহত রয়েছে কোরিয়ায়। অনেকের মতে, এই শ্রমবাজার দিন দিন ক্ষীণ হচ্ছে। বেতন পান ১ লাখ বিশ হাজার থেকে দুই লাখ পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন

এই বাস্তবতা সম্পর্কে জানা যায়, অতীতে বাংলাদেশের চারটি জনশক্তি রপ্তানি কোম্পানির মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী নিয়োগ হলেও, ২০০০ সালে সেটি একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠান হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের (এইচআরডি) মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। পয়েন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ হয়। অর্থাৎ আবেদনকারীর কোরিয়ান ভাষা, কর্মদক্ষতা, শারীরিক যোগ্যতা, বৃত্তিমূলক কাজের যোগ্যতা, প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ ও চাকরির অভিজ্ঞতা ইত্যাদি বিষয় মূল্যায়নের ভিত্তিতে পয়েন্ট পান। সেসব পয়েন্টের ভিত্তিতে প্রথমদফা প্রার্থী বাছাই করা হয়।

এরপর কোরিয়ার কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে ইন্টারনেট ভিত্তিক দক্ষতা পরীক্ষার মাধ্যমে দ্বিতীয় দফার কর্মী বাছাই হয়। দুই রাউন্ড মিলিয়ে সর্বাধিক নম্বর পাওয়া ব্যক্তিদের চূড়ান্ত করা হয়। পরীক্ষা, যাচাই বাছাইয়ের পরে কর্মীদের এই তালিকা দেওয়া হয় দক্ষিণ কোরিয়ার নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। সেখান থেকে তারা তাদের চাহিদা মতো কর্মী বেছে নেন। বাছাইকৃত কর্মীদের মেয়াদ থাকে দুই বছর। এর মধ্যে কোরিয়ান কোম্পানি তাদের বেছে না নিলে পুনরায় পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হয়।

বাছাই হওয়ার পর বিমান ভাড়া, বোয়েসেলের ফিসহ সবমিলিয়ে একজন কর্মীর খরচ হয় ৮০ হাজার টাকা। বোয়েসেলের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে ২০১২ জন কর্মী দক্ষিণ কোরিয়ায় গেছেন। কিন্তু চলতি বছরে মাত্র তিন হাজার একশ কর্মীর চাহিদার কথা জানিয়েছে দেশটি। শেষ পর্যন্ত কোম্পানির চাহিদা অনুযায়ী দুই থেকে আড়াই হাজার ইপিএস কর্মী কোরিয়া যাবে।

জানা যায়, দূর্ভাগ্যজনকভাবে কোরিয়ান মালিকদের কাছে বাংলাদেশিদের চাহিদা কমতির দিকে। চলতি বছর এই পর্যন্ত মাত্র পাঁচ থেকে ছয়শ ইপিএস কর্মী কোরিয়ায় এসেছে। এটি অবশ্যই অশনি সংকেত।

কোরিয়ায় ইপিএস কর্মী কেন কমছে জানতে চাইলে, দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশ স্পোর্টস এন্ড কালচারাল এসোসিয়েশন এর সভাপতি কাজী শাহ আলম জানান, বাংলাদেশি কর্মী কমার কারণ হচ্ছে ঘন ঘন চাকরি পরিবর্তন করা, কোম্পানির ক্যান্টিনে খাবার না খাওয়া, অযাচিত কারণেই ভিসা শেষে জি-১ করে থাকার অপরিকল্পিত ইচ্ছা।

এই প্রসংগে জানতে ই পি এস স্পোর্টস এন্ড ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল মোগল জানান, ভিয়েতনাম সম্পর্কে কোরিয়ার মালিকদের ব্যাপক জানাশোনা, তাছাড়া ভিয়েতনামে রয়েছে কোরিয়ানদের প্রচুর বিনিয়োগ। অন্যান্য দেশের সাথে কোরিয়ান সংস্কৃতির মেলবন্ধন একটি ফ্যাক্টর। বাংলাদেশিরা কোম্পানিতে নিয়ম অনুসারে কাজ করে থাকে, এরপরও কোরিয়ান মালিকরা বাংলাদেশিদের প্রতি অনাগ্রহ।

ইপিএস বাংলা কোরিয়া কমিউনিটির সভাপতি ফজলুর রহমান মাসুম জানান, কোরিয়াতে বাংলাদেশি ইপিএস কর্মীর সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধানতম কারণ কোরিয়ায় সার্বিক কাজের অবস্থা কমে যাওয়া, অবৈধ ইপিএস কর্মীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, বাঙালি একজন আরেকজনকে দেখতে না পারা, এসব কারণে একই কোম্পানিতে বাঙ্গালি একজন আরেকজনকে নিতে চায় না। অনেক সময় দেখা যায় ওই কোম্পানিতে অন্য দেশের লোক ঠিকই কাজ করছে। অনেকেই আছে যারা কষ্টের কাজ করতে চায়না তারা হালকা কাজ খোঁজে। কাজ করার সময় সামান্য সমস্যা হলেই উত্তেজিত হয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে যা অন্য দেশের শ্রমিক করে না। কোরিয়ানরা এসব খুবই অপছন্দ করে। আমাদের কর্মীরা ভাল কাজ করে, কিছু বাংলাদেশি অর্থনৈতিক কারণে মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করে, এতেও মালিকরা অসন্তুষ্ট হন।

দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাসরত অভিবাসী বিশেষজ্ঞ কোরিয়ান বাংলাদেশি উইজুংবু ফরেন সাপোর্ট সেন্টারের, বাংলাদেশি কাউন্সেলর সেকশন চীফ, ইয়াং মোমেন জানান, বর্তমানে কোরিয়ার সাথে জাপানের সম্পর্ক ভাল না, একে অপরের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, একইসঙ্গে আমেরিকার নিরাপত্তা বিষয়ক খরচ বেড়েছে, তাছাড়া চীনের উপর আমেরিকার অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে, চীনের অর্থনীতি ভঙ্গুর হওয়ায়, কোরিয়ার ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিতে খারাপ অবস্থা চলছে। চীনের অর্থনীতির উপর নির্ভর করে কোরিয়ার অর্থনীতি।

কমিউনিটি ব্যক্তিত্ত্ব রবিউল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, একই সাথে কোরিয়ানদের মাঝে নেপাল, শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম প্রীতি লক্ষণীয়।

এসব নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম বলছেন, যেখানে অন্য দেশের কর্মী যাওয়ার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমেছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি ইমেজ সংকটকে দায়ী করেন। ঘন ঘন চাকরি পরিবর্তন, নিজেদের মধ্য অনৈক্য, ওভারটাইম করার জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদগার।

তবে আমি আশা করছি, সপ্তাহে বায়ান্ন ঘন্টা কর্মঘন্টা বাস্তবায়ন হলে আগামী বছর থেকে ইপিএস কর্মী বাড়বে। আমরা চেষ্টা করছি, বাংলাদেশি কর্মী সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারে সচেষ্ট হতে। গোটা বিশ্বের মতো কোরিয়াতেও বাংলাদেশিরা সুনামের সাথে কাজ করছে।

বাংলাদেশি কর্মীদের ব্যাপারে নিয়োগ দাতাদের অনীহা কেন এই প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, আমরা দূতাবাস থেকে কর্মীদের নানাভাবে মোটিভেট করছি, একই কোম্পানিতে থাকতে বারংবার বলছি, যাতে কোম্পানিগুলোতে বাংলাদেশের কর্মী সম্পর্কে ভাল ইমেজ তৈরি হয়। তবে কর্মী নেওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি মালিকের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে।

দূতাবাসের ভূমিকা সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত জানান, বাংলাদেশি ইপিএস কর্মীরা যাতে মালিকদের সাথে ভাল আচরণ করে, একইসাথে মনোযোগ দিয়ে কাজ করে সে চেষ্টা অব্যাহত রাখছি।

উল্লেখ্য, দূতাবাস কোরিয়ার নানা শহরে উদ্যোক্তা সেমিনারের আয়োজন করে সবাইকে উৎসাহমূলক ধারণা দিচ্ছে। পাশাপাশি কোরিয়ায় করণীয় বর্জনীয় সম্পর্কে ব্যাপক ধারণা দেওয়া হচ্ছে। আগের মতো অচিরেই কোরিয়ায় বাংলাদেশি ইপিএস কর্মীরা জনপ্রিয় হয়ে উঠে, বাংলাদেশের বিশাল লোভনীয় এই বাজারের ব্যাপকতা বাড়াবে।

লেখক: সাংবাদিক দক্ষিণ কোরিয়া। 

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/জেএএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন