শনিবার ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৩ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ৯ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটে

নভেম্বর ২১, ২০১৯ | ১০:১৫ অপরাহ্ণ

উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: রাজধানীর টিকাটুলীর ‘নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটে’ আগুন নেভানোর কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। এমনকি একমাস আগে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে যে এক্সটিংগুইশারের সিলিন্ডার সরবরাহ করা হয়েছিল, সেগুলোতে এক্সটিংগুইশার ভরানোর কথা থাকলেও তা ভরানো হয়নি। এর ফলে ওই মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় আগুন লাগলে মার্কেটের ওই এক্সটিংগুইশার সিলিন্ডার কোনো কাজেই আসেনি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন- যে কারণে আগুন থেকে রক্ষা পেল রাজধানী সুপার মার্কেট

নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ীরা সারাবাংলাকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২১ নভেম্বর) দুপুরে ওই মার্কেটের আগুনে পোড়া দ্বিতীয় তলায় গেলে সেখানে দেখা পাওয়া যায় ব্যবসায়ীদের। দেড় ঘণ্টার ভয়াবহ আগুন তাদের সব সম্বল কেড়ে নিঃস্ব করে দিয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলেন, ফোমের দোকানে আগুন লাগার পর নেভাতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা দেখতে পান, এক্সটিংগুইশার সিলিন্ডারে কোনো গ্যাস ছিল না। যে কারণে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় একশটির মতো দোকান পুড়ে ছাই হয়।

বিজ্ঞাপন

ব্যবসায়ীরা জানান, মার্কেটের কোনো দোকানেই আগুন নেভানোর মতো যন্ত্রপাতি ছিল না। কেন্দ্রীয়ভাবেও তেমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তবে মাসখানেক আগে ফায়ার সার্ভিস মার্কেটটিতে ফায়ার ড্রিলের আয়োজন করে। ওইসময় কিছু এক্সটিংগুইশার সিলিন্ডার দেওয়া হয় মার্কেটের জন্য। ড্রিল শেষে সেগুলোতে গ্যাস ভরে রাখতে বলা হয় মার্কেট কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু সেই গ্যাস ভরার কাজটি শেষ পর্যন্ত করেনি মার্কেট কর্তৃপক্ষ।

ব্যবসায়ীরা আরও জানান, মার্কেটের সভাপতি ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জু। মার্কেটের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে তিনি দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপই নেননি। চাঁদাবাজির মামলায় র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার কাউন্সিলর মঞ্জু এখন কারাগারে।

ডিআর জুয়েলার্সের মালিক স্বপন কুমার ঘোষ সারাবাংলাকে বলেন, মার্কেটের আগের কমিটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন নতুন কমিটি আসবে। আসলে নতুন করে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জানা যায়, যে দোকানটি থেকে আগুনের সূত্রপাত, সেটি আসলে একটি ফোমের গুদাম হিসেবে ব্যবহার করত ইসলাম বেডিং। ইসলাম বেডিংয়ের দোকান একই মার্কেটের নিচ তলায়। মালিক নয়ন মিয়া। দুই তলার ওই দোকানটির একটি অংশ আনোয়ার নামে একজনকে অ্যামব্রয়ডারির দোকান হিসেবে সাবলেট ভাড়া দেন। আনোয়ার দোকানের শাটার খুলে কাজ করছিলেন। আর নয়নের ফোমের গুদাম তালাবদ্ধ ছিল। দুই তলার দুই নম্বর গলির ৪১ নম্বর দোকান ছিল ফোমের ওই দোকানটি। এর পশ্চিম পাশের ৪০ নম্বর দোকানটিতে ছিল থান কাপড় আর ছয়টি অ্যামব্রয়ডারি মেশিন।

৪০ নম্বর দোকানের মালিক বিল্লাল হোসেন। তিনি প্রথম ফোমের দোকানে আগুন দেখার পর দৌড়ে একটা এক্সটিংগুইশার নিয়ে আসেন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, আগুনে মারতে গিয়ে দেখি কাজ করছে না। পাশের হুমায়ুন ও বাবুলের হোটেল থেকে ময়লা ও ভালো পানি এনে ফোমে দেই। কাজ হয়নি। এরপর আগুন ছড়িয়ে পড়ে দোকানে। সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বিল্লাল জানান, তার দুইটি দোকানই ভস্মীভূত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে অন্তত ২০ লাখ টাকার।

কেবল বিল্লালের দোকান নয়, হুমায়ুন আর বাবুলের হোটেলও রক্ষা পায়নি। আগুনের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পায়নি খেলনা গাড়ি, কসমেটিকস, টেইলার্স ও ইলেক্ট্রনিক্সের দোকানগুলোও।

প্রথম গলির ১৯ দোকানটি ছিল রাফি টেলিকম নামে একটি মোবাইল ফোনের দোকান। হাবীবুর রহমান সরকার গত সপ্তাহেই দুই ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ২০ লাখ টাকার মোবাইল উঠিয়েছিলেন ওই দোকানে। আগুনে দোকানে থাকা মোবাইল ফোনগুলোও পুড়ে ছাই হয়েছে।

হাবীবুর রহমান বলেন, এখন কী হবে বুঝতে পারছি না। সব তো শেষ হয়ে গেছে। আগুন লাগার সময় আমি বাইরে ছিলাম। দুই জন কর্মচারী ছিল দোকানে। এসে দেখি আমার দোকান জ্বলছে। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম। আজও জীবিকার দোকানে বসে আছি। কিছু খেতে পারছি না।

আল মদিনা কসমেটিকসের অন্তত ৭০ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। ১৮ নম্বর পোড়া দোকানে বসে পাহারা দিচ্ছেন আর চিন্তা করছেন নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, কী হবে এসব জেনে। এখন পর্যন্ত কেউ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়নি। কিভাবে মার্কেট গড়ে উঠবে, কতদিন লাগবে— তাও জানি না। একরাতেই পথের ফকির হয়ে গেলাম।

৪৩ নম্বর দোকানটি ছিল খেলনা গাড়ির দোকান। সেই দোকানের কোনো খেলনাই আর আস্ত নেই। দোকানের মালিক ইউনুস মোল্লা দোকানে এসে বুক চাপড়াচ্ছিলেন। তিনি বলেন, খেলনা বাজার একনামে সবাই চেনে। দামি যত গাড়ি বিক্রি হয়, সব এই দোকান থেকেই। একেকটি গাড়ির দাম ৩০ হাজার ৪০ হাজার, কোনোটির দাম আরও বেশি। সব পুড়ে গলে গেছে।

এর আগে, বুধবার (২০ নভেম্বর) বিকেল সোয়া ৫টায় আগুন লাগে নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটের দোতলায়। ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিট দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বলা না হলেও মার্কেট ব্যবসায়ীদের দাবি, আগুনে মার্কেটের প্রায় ১০ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে।

এদিকে, ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন উপপরিচালক দেবাষীশ বর্ধন। কমিটি রিপোর্ট দিলে আগুন লাগার সঠিক কারণ জানা যাবে।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/ইউজে/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন