সোমবার ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১১ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ইডেনে খেলার চেয়ে ধূলা উড়লো বেশি

নভেম্বর ২৫, ২০১৯ | ৪:৩৪ অপরাহ্ণ

প্রভাষ আমিন

ইডেনের পিঙ্ক টেস্ট নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের উচ্ছ্বাসটা টের পেয়েছি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই। টেস্টের আগেরদিন বিমানবন্দরে গিয়ে মনে হলো সবাই বুঝি কলকাতায় যাচ্ছেন খেলা দেখতে। সাংবাদিক আছেন, সাধারণ মানুষ আছেন, আছেন তারকারাও। প্রথমেই দেখা হলো যার ক্রিকেট কূটনীতিতে বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছে, সেই সৈয়দ আশরাফুল হকের সাথে। কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লার সাথেও দেখা হলো, তিনি যাচ্ছিলেন আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গাইতে। আরেক জনপ্রিয় শিল্পী তপন চৌধুরীর সাথেও দেখা হলো। আমাদের ফ্লাইটেই ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক দুই অধিনায়ক গাজী আশরাফ লিপু এবং খালেদ মাহমুদ সুজন। লিপু ভাই আবার যাচ্ছিলেন সপরিবারে। রিজেন্ট এয়ারের ফ্লাইটে কোনো সিট ফাঁকা ছিল না। পিঙ্ক টেস্ট নিয়ে উন্মাদনাটা টের পেলাম কলকাতায় নামার পরও। পার্ক স্ট্রিটে গিয়ে কোনো হোটেল পেলাম না। নিউমার্কেটের আশেপাশের কোনো হোটেলেই জায়গা মিললো না। পরে বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশনের কর্মকর্তা সদা সাহায্যকারী ড. মোফাকখারুল ইকবালের সহায়তায় পার্ক সার্কাসে হোটেল মিললো। পরে জেনেছি পিঙ্ক টেস্টকে সামনে রেখে এ ক’দিনে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন ১১ হাজার ভিসা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে উত্তেজনাটা শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা কলকাতা যেন গোলাপি উৎসবের সাজে সেজেছে। রাস্তায় রাস্তায় গোলাপি আভার বিচ্ছুরণ। ইডেন তো যেন পুরোটাই গোলাপি হয়ে গেছে। সব জায়গায় অতিথিদের লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ইডেনে গালিচাও গোলাপি হয়ে গেছে। গোলাপি উচ্ছ্বাস ছুঁয়ে গিয়েছিল আমাদেরও। যাওয়ার আগেরদিন আমি এবং তাপসদা (কবি কবির হোসেন তাপস) বসুন্ধরা সিটি ঘুরে পিঙ্ক টি শার্ট কিনেছি, পিঙ্ক পোশাক নিয়েছিল মুন্নীও। ঢাকা থেকে নিয়ে গিয়েছিলাম জাতীয় পতাকাও। টেস্টের প্রথম দিন সকালে ইডেনের পাশের ফুটপাতে বসে চা খাচ্ছিলাম। বাংলাদেশ থেকে আসা এক তরুণ আমার গায়ে জাতীয় পতাকা দেখে জানতে চাইলেন, কোত্থেকে কিনেছি। জানালেন, পুরো স্টেডিয়াম চক্কর দিয়েও বাংলাদেশের পতাকা পাননি। পরে আমাদের কাছে থাকা একটি বাড়তি পতাকা তাকে দিয়ে দিলাম। তাতেই তার মুখে বিশ্বজয়ের আনন্দ।

কিন্তু এই ছেলেটির মতো কোটি বাংলাদেশীর আনন্দটা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেননি বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। গোলাপি টি শার্ট আর বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় জড়ানো আমাদের দেখে স্থানীয় টিভি সাংবাদিকরা মজা পেলেন মনে হয়। গোটা পাঁচেক ইন্টারভিউ দিতে হলো।

কলকাতার সর্বত্র পিঙ্ক টেস্ট নিয়ে আলোচনা, টিকেটের জন্য হাহাকার। ইডেনের ধারণক্ষমতা ৬৮ হাজার। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো কারণে ধারণক্ষমতা ডাবল করা গেলেও টিকেট নিয়ে হাহাকারটা থাকতো। পিঙ্ক টেস্ট অনেক কষ্টে তৃতীয় দিনে গেছে। কিন্তু তৃতীয় দিনে যে খুব বেশি খেলা হবে না, সেটা সবাই জানতো। তারপরও তৃতীয় দিন সকালে ইডেনের সামনে লাইন দেখে চমকে গেলাম। আগে যারা টিকেট কেটেছে, তারা না হয় আসছে; কিন্তু তৃতীয় দিন সকালেও কালোবাজারে টিকেট কিনতে দেখে অবাক হতেই হলো। কারণ তৃতীয় দিনে খেলা হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৪ বল। লম্বা লাইন পেড়িয়ে অনেকে মাঠে ঢোকার আগেই খেলা শেষ।

বিজ্ঞাপন

ইডেন টেস্টের যত দর্শক, সবাই টেস্ট ম্যাচের দর্শক? এই প্রশ্নের উত্তর যদি হ্যাঁ হতো, তাহলে সেটা অনেক আনন্দের হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেটা সত্যি নয়। ইডেনে মানুষ ক্রিকেট দেখতে আসেনি, উৎসব দেখতে এসেছে। গ্রেট ইভেন্ট ম্যানেজার সৌরভ গাঙ্গুলী কৌশলে মানুষকে গোলাপি মায়ায় জড়াতে পেরেছিলেন। সবাই পাগলের মত ইডেনে এসেছে ইতিহাসের সাক্ষী হতে। ইডেন টেস্ট নিয়ে আলোচনা যতটা ক্রিকেটিয়, তারচেয়ে বেশি উৎসবীয়। ইডেনের ক্লাব হাউজের লাউঞ্জে অনেককে দেখেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিচ্ছেন, খাচ্ছেন। সেই আড্ডায় রাজনীতি, অর্থনীতি, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নানা কিছু ছিল; ক্রিকেট ছিল সবচেয়ে কম। এমনও হয়েছে, ইডেনের লাউঞ্জে বসে স্কোর জানার জন্য এক বন্ধুকে ইনবক্স করেছিলাম। সে অবাক হয়েছে, ভেবেছে বাংলাদেশের বিপর্যয় দেখে আমি মজা করছি। তাই জবাবও দেয়নি।

ইডেনের গোলাপি টেস্টে ক্রিকেটটা যে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, সেটা বোধহয় বুঝে গিয়েছিলেন মুমিনুলরা। তাই তো তারা তৃতীয় দিনের শুরুতেই খেলা শেষ করে দিয়েছে। উৎসবের জন্য যতটুকু ক্রিকেট দরকার, তা তো হয়েছেই, আর সময় নষ্ট করে লাভ কি। ইডেনে খেলার চেয়ে ধূলা উড়লো বেশি। আলোচনা যেমন কম হয়েছে, মাঠে খেলাও হয়েছে কম। পাঁচদিনের টেস্টে খেলা হলো মাত্র ১৬১ ওভার ২ বল। ইডেন পিঙ্ক টেস্টের অলিখিত স্লোগান যেন- জয়-পরাজয় যার যার, উৎসব সবার।

প্রভাষ আমিন: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/পিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন