রবিবার ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১০ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

এইডস আক্রান্ত অম্বার সঙ্গে কথোপকথন: সঙ্গম সুখ বড় নয়, জীবনটাই বড়

ডিসেম্বর ১, ২০১৯ | ১২:০৫ অপরাহ্ণ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

দেশে প্রথম এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। এরপর থেকে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে শনাক্ত হওয়া এইডস সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৪৫৫ জন। এটি সরকারি হিসাব। বেসরকারি তথ্যগুলো বলছে, সংখ্যাটি হয়তো ১২ থেকে ১৪ হাজার হবে। এইডসে আক্রান্ত রোগীদের এখনও একঘরে করে রাখা হয় বাংলাদেশে। সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। চিকিৎসা নেই বললেই চলে। যাও আছে তা নিতে গিয়েও বৈষম্যের শিকার হতে হয় এই ঘাতক ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষকে। কেমন হয় সে জীবন? পেশায় যৌনকর্মী অম্বা (ছদ্মনাম) সারবাংলাকে বলেছেন তার এইচআইভি সংক্রমিত জীবনের পূর্বাপর ঘটনাবলি…

বিজ্ঞাপন

এইডস ধরা পড়ার পর আপনার কি মনে হয়েছিল প্রথমে?

২০১৮ সালে আমার শরীরে যখন এইডস ধরা পড়ে আমি তখন মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়ি। এরপর আমি আমার স্বামীরও এইডস পরীক্ষা করাই এবং তার শরীরেও রোগটার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এটা জানার পর আমি নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। টানা কয়েকদিন কান্না থামাতে পারিনি। পরে মনে হলো পরীক্ষায় ভুলও হতে পারে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও একটি হাসপাতালে এইচআইভি পরীক্ষা করাই। সেখানেও একই ফল আসে।

টানা কয়েকদিন আমি নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিই। একদম লাগাতার বিছানায় পড়ে যাই। কাশি, জ্বর আর পেটের অসুখে আমার শরীর ভেঙে পড়ে। কোথায় চিকিৎসা করাব? কতো টাকা খরচ যাবে সেই সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নেই তখন। এই সময়টায় আমার স্বামী আমাকে মানসিকভাবে বেশ সহযোগিতা করে। সে আমারে বলে, ‘টেনশন কইরো না, আল্লাহ্ রোগ দেয়, তার ওপর বিশ্বাস রাখো।’ পরে একটা এনজিও প্রতিষ্ঠানের খবর পাই। এরা বিনামূল্যে রোগের চিকিৎসা দেয়। এখন এই প্রতিষ্ঠান থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছি।

বিজ্ঞাপন

শরীরে রোগটার অস্তিত্ব টের পান?

এখন আমার শরীরে কোনো সমস্যা নাই। আমি নিয়মিত চেকআপ করিয়ে রাখি, ওষুধ খাই। মানে জীবনটাকে একটা রুটিনে নিয়ে আসছি। শরীরে যে রোগ আছে তা এখন আর টের পাই না। তবে আমার স্বাস্থ্য এখন আর আগের মতো নাই। মাঝখানে আমার খাওয়ার রুচি ছিল না, মাথার চুলগুলোও পড়ে গেছে। ওজন কমতে কমতে অনেক রোগা হয়ে গেছি।

রোগটা হলো কীভাবে সেটা ধারণা করতে পারেন…?

রোগটা কেন হয়েছে, কীভাবে হয়েছে সেটি নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি কিন্তু কোনো কারণ খুঁজে পাইনি। আমি দেহ ব্যবসা করি কিন্তু যার তার সঙ্গে করি না। ক্লায়েন্ট পছন্দ না হলে যাই না। নিজের কিংবা ক্লায়েন্টের বাসায় যেখানেই হোক প্রটেকশন (কনডম) ব্যবহার করি। ফলে আমার জানা মতে, এইডস হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই আমার। তারপরও কীভাবে হলো সেটি আমি জানি না, ধারণাও করতে পারি না। তাছাড়া আমি মাদক নেই না, সুই-সিরিঞ্জ ব্যবহার করি না। তাহলে আমার এইডস হবে কেন?

আপনার স্বামীর থেকে কি…?

না না… আমার স্বামীর যে এইডস হয়েছে সেটা আমার থেকে হয়েছে, এটি আমি শতভাগ নিশ্চিত। তার কোনো অপরাধ নেই। তার কোনো বাজে নেশা নেই। আমি ছাড়া অন্য কোনো সঙ্গীও নেই। রোগটা আমার শরীর থেকে ওর শরীরে গেছে। সে আমাকে সবদিক থেকেই সহযোগিতা করছে। এমনিতে কাজকর্ম কিছু করে না, আমার আয়ে চলে। তবে সে আমার খেয়াল রাখে।

সামাজিকভাবে কি কোনো আক্রমণের শিকার হয়েছেন?

আমার চাকরিটা চলে যেতে পারত। এটা জানাজানি হওয়ার পর আমাকে চাকরি ছেড়ে দিতে বলা হয়েছিল। তখন আমি খুব অসুস্থ, গ্রামের বাড়িতে গিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছি না। দুই মাসের মতো অফিস করতে পারিনি, এ কারণে অফিসের লোকজন চাকরি ছেড়ে দিতে বলেছিল। কিন্তু চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমি কি করব? সহযোগিতা করার জন্য অফিস কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করলাম। তারা আমাকে সহযোগিতা করল, চাকরিটা ছাড়তে হলো না।

আর অফিসে আগে কলিগদের সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। সবাই আমার সঙ্গে বসত, মিশে চলত, আমার সঙ্গে ভাগাভাগি করে খাবার খেত। কিন্তু এইডসের ঘটনাটি জানার পর আগের ওই সম্পর্কটা শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকে আমার সঙ্গে আগের মতো কেউ আর মেশে না। খাবারের প্লেট নিয়েও একবার একজন আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে। এরা ভাবে রোগটা ছোঁয়াছে, এই কারণে ভয় পায়। এই সব নিয়ে আমার খুব মন খারাপ হয়।

আপনি কি এখনো ‘সেক্স ওয়ার্কার’ হিসেবে কাজ করেন?

হ্যাঁ। এখনও কাজ করি।

আপনি কি আপনার ক্লায়েন্টদের জানান যে আপনি এইচআইভি পজেটিভ?

না। সেটি বলি না। বললে তো ওরা আমার সঙ্গে কাজ করবে না। তবে আমি প্রোটেকশন ব্যবহার করি যাতে করে রোগটা না ছড়ায়। কাজটা করার সময় আমি পুরোপুরি সতর্ক থাকি। কনডম যেন ফেঁটে না যায় এজন্য দামী ব্র্যান্ডের কনডম ব্যবহার করি। কেউ যদি প্রোটেকশন ছাড়া কাজ করতে চায় তাহলে আমি ফিরিয়ে দেই। অনেকে জোরজবরদস্তি করে, গায়েও হাত তোলে কিন্তু এরপরও আমি তাদের সঙ্গে কাজ করি না। অত্যন্ত সচেতনভাবে আমি চাই, আমার কারণে আর কারও জীবন যেন সংশয়ে না পড়ে। অনেকে খুব সন্দেহপ্রবণ, তারা ধারণা করে আমার হয়ত কোনো সমস্যা আছে। তখন তারা জিজ্ঞেস করে, আমার কোনো সমস্যা আছে কি না? তখন আমি বলি, ‘না আমার কোনো সমস্যা নেই।’

আপনি নিজের ক্ষেত্রেও একসময় সতর্ক ছিলেন, কিন্তু এইচআইভিতে ঠিকই আক্রান্ত হয়েছেন। আপনার ক্লায়েন্টদের ক্ষেত্রেও তো এমনটা হতে পারে…

তাদেরও হতে পারে। সম্ভাবনা তো থাকেই। কিন্তু আমি এখন যতোটা সতর্ক থাকি, নিজের বেলায় ততটা সতর্ক আমি ছিলাম না। আর ক্লায়েন্টদেরকে আমি শারীরিক সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এখন কাউন্সেলিংও করি। এ ব্যাপারে একটা এনজিও থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছি আমি। তাদেরকে বলি, সঙ্গম সুখ বড় নয়, জীবনটা বড়। সুতরাং সঙ্গম যেন নিরাপদ হয়, নিরাপদ মানুষের সঙ্গে হয়। তারা বলে, আমরা নিরাপদ আছি, তোমার কোনো সমস্যা হবে না। তারা অনেকেই অনিরাপদভাবে কাজটা করতে চায়। আবার অনেকে মেনেও নেয়।

এইডস ধরা পড়ার পর কখনো কারো সঙ্গে কি অনিরাপদ সঙ্গম করতে হয়েছে?

হ্যাঁ, একবার করতে হয়েছে। আমি করি নাই আসলে, সে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে প্রোটেকশন ছাড়া সঙ্গম করছে। ঘটনাটা খুলে বলি, আমার একটা ফ্রেন্ড ছিল! আমার স্বামীও ওকে চিনত। তো আমার বন্ধুটা আমাকে খুব সহযোগিতা করত। টাকা-পয়সার ক্রাইসিস হলে ধার দিত। ওর সঙ্গে আমি অনেক ক্লোজড। আমার স্বামীও সেটি জানে, তবে ওর সঙ্গে আমার শারীরিক সম্পর্ক আছে তা জানে না। তো একবার ও আমাকে ব্ল্যাকমেইল প্রোটেকশন ছাড়া কাজ করে। আমার বাধা দেওয়ার মতো কোনো সুযোগ সেদিন ছিল না। তখন আমি তাকে বলি যে, আমার এইডস আছে। পরে আমার বন্ধুকেও আমি এইডসের পরীক্ষা করাই। কিন্তু ভাগ্য ভালো যে ওর এইডস ধরা পরে না। এরপর অবশ্য ওর সঙ্গে আমার আর কোনো যোগাযোগ নেই। সে আর কোনোদিন আমার খোঁজও নেয়নি।

আপনি যৌন ব্যবসায় এসেছিলেন কেন?

আমি এই পেশায় এসেছি টাকার অভাবে। আমার স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে দুই বছরের মতো আমি ঘরের বাইরে ছিলাম। তার অনেক কথা আমার ভালো লাগত না। ওই দুই বছরে নিজের মতো করে বেঁচে থাকার জন্য আমাকে অনেক কিছু করতে হয়েছে। মার্কেটিংয়ের চাকরি থেকে শুরু করে গার্মেন্টেসেও ভালো একটা চাকরি করেছি আমি। তবে একটা সময় একেবারে বেকার হয়ে যাই আমি। তখন প্রতিবেশী এক আপু আমাকে একটা ফোন নম্বর দিয়ে একজনের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, কোনো বিপদ হবে না। তাছাড়া এখানে মোটা অংকের টাকা পাওয়া যাবে। আমি যাই এবং কাজটা আমাকে টানে। মানে বিষয়টার প্রতি একটা আকর্ষণ কাজ করে। তারপর আমি আর নিজেকে ফেরাতে পারিনি।

স্বামীর কাছ থেকে আলাদা থাকার সময়ে কর্মস্থলে কখনো যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছেন?

না, এমনটা কখনো হয় নাই। চাকরিতে আমি সবসময় সহযোগিতা পেয়েছি। তবে চাকরি ছেড়ে এই পেশায় আসাটা আমার ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।

কী রকম?

এখানে না এলে আমার এই রোগটা হতো না। জীবনটা এমন জটিল হয়ে যেত না। এখন আমি নিজেকে নিজে ঘেন্না করি। নিজেকে পাপী মনে হয়। এ জন্য যারা এই পেশায় আসতে চায় তাদেরকে আমি সাবধান করে দেই। কারণ এই পেশায় থেকে আপনি চাইলেও আপনার জীবনকে স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত করতে পারবেন না। এখানে আসার আগে অনেকে হয়ত, অনেক কিছু ভাবে, কিন্তু আসার পর বুঝতে পারে জায়গাটা কত খারাপ।

আপনার যদি সুযোগ থাকত, যদি অসুস্থ না হতেন তাহলে কি এ পেশা থেকে সরে যেতেন?

অবশ্যই ছেড়ে দিতাম। আমি এটি এখনও ভাবতেছি কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না। আগে যাদের সঙ্গে কাজ করেছি তারা ফোন দেয়, কাজ করতে চায়। তাছাড়া আমার ফোন নাম্বারটাও অনেকের কাছে চলে গেছে। অনেকক্ষেত্রে টাকার জন্যও করতে হয়। কিন্তু কাজ আমি অনেক কমিয়ে দিয়েছি। তাদেরকে বলি যে আমি গ্রামের বাড়ি চলে গেছি বা ঢাকায় নাই। অনেকে মানতে চায় না। তাদের আমাকেই চাই!

আর কিছু বলবেন?

আমার মনে হয় কোথাও যদি আমার রোগটার স্থায়ী চিকিৎসা পাওয়া যেত তাহলে আমি সেখানে চলে যেতাম। যত টাকা লাগে সেটি দিয়ে আগে রোগটা থেকে বাঁচতাম। রোগ থেকে বাঁচলে এরপর আর এ পেশায় থাকতাম না। কিন্তু এমনটা সম্ভবত হওয়ার না। এখন সময় শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতেছি।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/টিএস/এমএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন