শুক্রবার ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২২ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ৮ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

চুক্তির ২২ বছরেও ‘শান্তি ফেরেনি’ পাহাড়ে

ডিসেম্বর ২, ২০১৯ | ২:১৫ অপরাহ্ণ

প্রান্ত রনি, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট

রাঙ্গামাটি: আজ ২ ডিসেম্বর। দীর্ঘ দুই দশক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ১৯৯৭ সালের এদিনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর হয়, যা পরবর্তীতে ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’ নামে পরিচিতি পায়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার সঙ্গে এই চুক্তি সই হয়। সেই সময় ‘শান্তি বাহিনী’ তথা গেরিলা বাহিনীর নেতারা তাদের সব অস্ত্র সরকারের কাছে জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠার চুক্তির ২ দশক পার হলেও পাহাড়ে শান্ত হয়নি। খুন-খারাবি, অপহরণের পর হত্যা, আধিপত্য বিস্তার, এলাকা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দিনদিনই পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। সর্বশেষ গতকালও (রোববার, ১ ডিসেম্বর) রাঙ্গামাটি সদরের মগবান ইউনিয়নে এক নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ভাষ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ে বিভিন্ন শ্রেণি একে পুঁজি করে পায়দা লুটছে। এর ফল হিসেবে দুই দশকে তৈরি হয়েছে আরও তিনটি আঞ্চলিক দল। যে কারণে এখনো সংঘাত।

জেএসএস ভেঙে ৪ সংগঠন
১৯৯৭ সালে চুক্তি করার সময়েই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরোধিতা করেন তৎকালীন জেএসএসের ছাত্র সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সভাপতি প্রসিত খীসাসহ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। পরবর্তীতে এই চুক্তি বিরোধিতা করে সন্তু লারমার সংগঠন থেকে বের হয়ে ১৯৯৮ সালে ২৬ জুন ঢাকায় এক কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) আত্মপ্রকাশ করে। ২০০১ সালে রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলা থেকে তিন বিদেশি নাগরিককে অপহরণের মাধ্যমে ইউপিডিএফ তাদের সংগঠনের জানান দেয়। সেই থেকে শুরু পাহাড়ে, এলাকা নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার ও অপহরণের রাজনীতি। ক্রমেই সবুজ পাহাড় হয়ে ওঠে অশান্ত। ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে প্রাণ হারায় কয়েক হাজার মানুষ।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে ২০০৭ সালে ফের সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমতি (জেএসএস) মধ্যে অন্তঃকোন্দল দেখা দেয়। জেএসএস প্রভাবশালী নেতা সুধাসিন্দু খীসা, তাতিন্দ্র লাল চাকমা পেলেসহ একটি বিশাল গ্রুপ ২০০৭ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত জেএসএসের কর্মকাণ্ড বিরোধী বিভিন্ন প্রচারণা চালায়। ২০১০ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে সুধাসিন্দু খীসা ও তাতিন্দ্র লাল চাকমা পেলের নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ভেঙে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা) নামে নতুন আরেকটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের ১৩ বছরে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি ভেঙে তিনটি সংগঠন সৃষ্টি হয়।

সর্বশেষ ২০১৭ সালে নভেম্বরে খাগড়াছড়ি জেলায় সাংবাদিক সম্মেলন করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ভেঙে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামের নতুন সংগঠন আত্মপ্রকাশ। সর্বশেষ এই সংগঠন প্রসিত থীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, অন্তঃকোন্দল ও নিজ দলের কর্মী হত্যার অভিযোগ তুলে ইউপিডিএফের সাবেক সশস্ত্র শাখার প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা ও বর্মাকে আহ্বায়ক করে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) গঠিত হয়। এ নিয়ে পাহাড়ে শান্তি চুক্তির স্বাক্ষরের দুই দশকে জেএসএস ভেঙে চার আঞ্চলিক দল গঠিত হয়।

তবে এখন এক সময় খাগড়াছড়ি শহর দাপিয়ে বেড়ানো সংগঠন ইউপিডিএফের নেতাকর্মীরা রাজনৈতিকভাবে কোনঠাসা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও গ্রেফতার আতংকে আত্মগোপনে রয়েছেন। অন্যদিকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) নেতাদের অনেকেই আত্মগোপনে।

দুই জোটে বিভক্ত ৪ দল
বর্তমানে তিন পার্বত্য জেলায় চারটি আঞ্চলিক দলের আধিপত্য বিস্তার রয়েছে। কথিত আছে, চারটি আঞ্চলিক দল ২ জোটে বিভক্ত রয়েছে। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (শান্তি চুক্তি) সম্পাদনকারী সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ অলিখিত সমঝোতা করেছে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও প্রসিত খীসার ইউপিডিএফের সঙ্গে সমঝোতা হয়। যা একাদশ জাতীয় নির্বাচনে এক দলের হয়ে অন্য দলের নেতাকর্মীরা প্রচার-প্রচারণা দেখেই প্রমাণ মিলেছে। এতে করে এই দুইটি সংগঠন একে-অপরের সাথে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত, হানাহানি বন্ধ রয়েছে।

অন্যদিকে, সুধাসিন্ধু খীসার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) এবং নবগঠিত শ্যামল কান্তি চাকমার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দলের সমঝোতা রয়েছে। যার প্রভাবও পড়েছে একাদশ জাতীয় নির্বাচন ও পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে। এছাড়া দুই দলের কর্মসূচিতে দুই দলেরই শীর্ষ নেতারা অতিথি হিসেবেও উপস্থিত থাকছেন।

সংঘাত বন্ধের আহ্বান জনসংহতি-ইউপিডিএফের
চলতি বছরের ১০ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার (এমএনলারমা) ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়ে জনসংহতি সমিতির দুই পক্ষই। এদিন সকালে রাঙামাটিতে আলোচিত স্মরণ সভায় সংঘাত বন্ধ করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সহ-সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার। একইদিন খাগড়াছড়িতে এনএম লারমার মৃত্যুবার্ষিকীতে আয়োজিত স্মরণ সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) সাধারণ সম্পাদক তাতিন্দ্র লাল চাকমা ওরফে পেলেও ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানান।

এর পরদিন ১১ নভেম্বর গণমাধ্যমে প্রেরিত এক সংবাদ বিবৃতিতে দুই জনসংহতি সমিতির সংঘাত বন্ধের আহ্বান স্বাগত জানিয়েছে পাহাড়ে পূর্ণসায়ত্বশাসনের দাবিতে আন্দোলনরত প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। বিবৃতিতে ইউপিডিএফ জানায়, “অতীতের সংঘাতের সব তিক্ত অভিজ্ঞতার বোঝা পেছনে ঝেড়ে ফেলে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ‘ক্ষমা করা ভুলে যাওয়া’ নীতির ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে ঐক্যের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে প্রস্তুত।”

কী বলছেন চুক্তির পক্ষে-বিপক্ষের নেতারা
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিবিরোধী সংগঠন ইউপিডিএফ মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, ‘শাসক গোষ্ঠীর কারণে পাহাড়ে সংঘাত বন্ধ হচ্ছে না। আমরা পাহাড়ে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত ভুলে ঐক্যবদ্ধ পার্বত্য চট্টগ্রাম চাই।’

ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দলের সভাপতি শ্যামল কান্তি চাকমা বলেন, ‘প্রসিত খীসার ইউপিডিএফের জন্যই আজ পাহাড়ে এতে সংঘাত, হানাহানি। তারা তৎকালীন সময়ে শান্তি চুক্তির বিরোধিতা না করলে হয়তো পাহাড়ে আজ আরও তিনটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠা হতো না। ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) সব সময় চায় পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধ হোক। কিন্তু সন্তু লারমার জেএসএস ও প্রসিত খীসার ইউপিডিএফের কারণেই সংঘাত বন্ধ হচ্ছে না।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, ‘পাহাড়ে কোনো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেই আমাদের দল জড়িত ছিলো না। শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আমরা গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে যাচ্ছি। চুক্তি বাস্তবায়ন হলে যাদের বেশি ক্ষতি হবে, তারাই চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করছে। আমরা চাই পাহাড়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজমান থাকুক। সবাই নিরাপদে শান্তিতে বসবাস করুক।’

এসব বিষয়ে গত ২৬ নভেম্বর রাঙামাটি পর্যটন কমপ্লেক্সে আয়োজিত এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা বলেছেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার রক্ষায় আমরা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। কিন্তু এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের জনজীবনে একটা অশান্ত, অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, নিরাপত্তাহীন বাস্তবতা বিরাজ করছে। চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে না।’

এছাড়া গত ২৪ নভেম্বর খাগড়াছড়িতে জেলা আওয়ামীলীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে যোগ এসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্ত পরিবেশকে শান্ত করতেই ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি করেছিলেন শেখ হাসিনা। ৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছিলো তারাই পাহাড়কে অশান্ত করেছিলো। সেই অশান্তির কারণে পাহাড়ে যে বিভাজন ছিলো দূর করার জন্য শেখ হাসিনা উদ্যোগ নিয়েছিলেন।’ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অনেকগুলো ধারা বাস্তবায়ন হয়েছে, চুক্তির অবশিষ্ট ধারা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান ক্ষমতাসীন দলের এই নেতা।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন