রবিবার ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১০ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

গ্রেফতারের তোড়জোড়ের মধ্যে নিখোঁজ ‘হিযবুত সংগঠক’

ডিসেম্বর ২, ২০১৯ | ৪:২৪ অপরাহ্ণ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম নগরীতে কোচিং সেন্টারের উদ্দেশে বাসা থেকে বেরিয়ে তিনদিন ধরে নিখোঁজ আছেন রিদওয়ান আহমেদ সিয়াম নামে এক কলেজ ছাত্র। তার নিখোঁজের বিষয় তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে, সিয়াম নিষিদ্ধ ঘোষিত হিযবুত তাহরীরের সংগঠক। সম্প্রতি চট্টগ্রামে হিযবুত তাহরীরের ১৫ জনকে গ্রেফতারের ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় দায়ের হওয়া মামলার আসামির তালিকায় সিয়ামের নামও আছে। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টার মধ্যেই নিখোঁজের বিষয়ে নানা তথ্য এসেছে।

বিজ্ঞাপন

রিদওয়ান আহমেদ সিয়াম (১৭) চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার চররামপুর গ্রামের নওজোয়ান সরদার বাড়ির তোফায়েল আহমেদের ছেলে। তাদের বাসা নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার পাশে। সিয়াম নগরীর সরকারী হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র।

নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসান সারাবাংলাকে বলেন, ‘মহসিন কলেজের ছাত্র রিদওয়ান আহমেদ সিয়াম নিখোঁজ হয়েছেন মর্মে গত ৩০ নভেম্বর চকবাজার থানায় একটি জিডি হয়েছে। এরপর থেকে আমরা তার সন্ধান পাবার চেষ্টা করছি। এর মধ্যে আমরা জানতে পেরেছি, নিখোঁজ সিয়াম হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে জড়িত। আমাদের একটি মামলার সে পলাতক আসামি। তার গতিবিধি পুলিশের নজরদারিতে ছিল। মামলার আসামি হওয়ায় আইন অনুযায়ী তাকে গ্রেফতারও করা হত। এর মধ্যেই তার হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।’

সিয়ামের বাবা তোফায়েল আহমেদ সারাবাংলাকে জানান, গত ৩০ নভেম্বর বিকেলে সিয়াম নগরীর নাসিরাবাদে ওমেগা সাইয়েন্স পয়েন্ট কোচিং সেন্টারে পড়তে যান। দুজন শিক্ষকের কাছে আলাদাভাবে একঘন্টা করে পড়া শেষ হওয়ার পর সিয়ামসহ তিন বন্ধু কথা বলতে বলতে বেরিয়ে আসে। সিয়ামের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দুই বন্ধুর একজন হালিশহর বড়পোল এবং আরেকজন ঈদগা কাঁচা রাস্তা এলাকায় তাদের বাসার উদ্দেশে রওনা দেয়। কিন্তু সিয়াম বাসায় ফেরেনি। সে কোথায় গেছে, তার ওই দুই বন্ধুও বলতে পারছে না। রাতেও ফিরে না আসায় তিনি স্থানীয় চকবাজার থানায় একটি জিডি (নম্বর- ১৬৬৬) করেন।

বিজ্ঞাপন

গত ২২ নভেম্বর (শুক্রবার) ‍দুপুরে নগরীর কোতোয়ালী থানার আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে লিফলেট বিলির সময় হিযবুত তাহরীরের ওয়ালিদ ইবনে নাজিম (১৮) ও ইমতিয়াজ ইসমাইলকে (২৫) গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর চান্দগাঁও ও বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় টানা অভিযান চালিয়ে হিযবুত তাহরীরের চট্টগ্রাম মহানগরের প্রধান (আঞ্চলিক কমান্ডার) আবুল মোহাম্মদ এরশাদুল আলমসহ (৩৯) আরও ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া তাদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, মোবাইল, জিহাদি বই ও লিফলেট উদ্ধার করা হয়।

গ্রেফতার বাকি ১২ জন হলেন- আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ (৩০), নাসিরুদ্দিন চৌধুরী (২৯), নাজমুল হুদা (২৭), লোকমান গণি (২৯), মোহাম্মাদ করিম (২৭), আব্দুল্লাহ আল মুনিম (২২), কামরুল হাসান রানা (২০), আরিফুল ইসলাম (২০), আজিমুদ্দিন (৩১), মো. আজিমুল হুদা (২৪), ফারহান বিন ফরিদ(২৩)এবং মো. সম্রাট (২২)।

সেই অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি-দক্ষিণ) শাহ মো. আব্দুর রউফ সারাবাংলাকে বলেন, ‘গ্রেফতার হওয়া হিযবুত তাহরীরের সংগঠকদের জিজ্ঞাসাবাদে আমরা ২৫ জন পলাতক আসামির নাম পাই। তাদেরকেও মামলার এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মামলার ১৮ নম্বর আসামি হচ্ছে এই সিয়াম। নাসিরাবাদ সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সে ২০১৯ সালে এসএসসি পাস করে। এরপর সরকারী মহসীন কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয় সে। হিযবুত তাহরীরের নতুন সদস্য হিসেবে যাদের রিক্রুট করা হত, সিয়াম তাদের সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ ক্লাস নিত বলে গ্রেফতারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।’

কোতোয়ালী থানায় দায়ের হওয়া মামলাটি তদন্ত করছে সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। সংস্থার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রাছিব খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘মামলার তদন্তভার গ্রহণের পর আমরা পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা করছি। রিদওয়ান আহমেদ সিয়ামও যেহেতু পলাতক আসামি, আমরা তাকেও গ্রেফতারের চেষ্টা করছি। কিন্তু সিয়াম নিখোঁজ বলে থানায় একটি জিডি হওয়ার কথা শুনেছি।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, পুলিশ সিয়ামের বিষয়ে জানতে পেরেছে, সে নাসিরাবাদ স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এর আগে সে চট্টগ্রাম ডিজিটাল স্কুলে পড়ালেখা করত। ওই স্কুলের পরিচালক তাহামীদ সুফিয়ানও হিযবুত তাহরীরের চট্টগ্রামের একজন সামনের সারির সংগঠক। হিযবুত তাহরীরের চট্টগ্রাম মহানগরের অন্যতম প্রধান আবুল মোহাম্মদ এরশাদুল আলমের অধীনে তিনটি সাংগঠনিক উইং আছে। তিন উইংয়ের দায়িত্বে আছেন তিনজন। এরা হলেন- আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ, তাহামীদ সুফিয়ান ও আফজাল হোসেন আতিক। এদের মধ্যে মাহফুজ গ্রেফতার হলেও বাকি দুজন পলাতক। মূলত ডিজিটাল স্কুলে পড়ার সময় তাহামীদ সুফিয়ানের সংস্পর্শে এসে হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সিয়াম। সাংগঠনিকভাবে সিয়াম তাহামীদের অধীনে মাঠ পর্যায়ে কাজ করত সিয়াম।

তবে সিয়াম চট্টগ্রাম ডিজিটাল স্কুলে কখনো পড়ালেখা করেনি বলে দাবি করেছেন তার বাবা তোফায়েল আহমেদ। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘সিয়াম প্রথমে হিলভিউ আবাসিক এলাকায় সারমন কিন্ডারগার্টেন নামে একটা স্কুলে পড়ত। এরপর তো সে নাসিরাবাদ স্কুলে ভর্তি হল। সেখান থেকে এসএসসি পাস করার পর মহসীন কলেজে চান্স পেল।’

নিষিদ্ধ সংগঠনে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে তোফায়েল বলেন, ‘আমরা তো কখনোই এই বিষয়টা জানি না। এখন শুনছি। সে খুব মেধাবী ছাত্র। কারও সঙ্গে তেমন মেশে না। কথাবার্তা খুব কম বলে। জোর করেও এক ওয়াক্ত নামাজ পড়াতে পারি না। শুধু শুক্রবার মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজ পড়ত।’

এডিসি শাহ মো. আব্দুর রউফ সারাবাংলাকে বলেন, ‘হিযবুত তাহরীরের টার্গেট হচ্ছে মেধাবী ছাত্র এবং অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের ছেলেরা। আমরা বারবার বলছি, ছাত্রদের টার্গেট করে হিযবুত তাহরীর যেভাবে এগুচ্ছে, এটা অ্যালার্মিং। এজন্য পরিবারের অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদেরও সতর্ক হতে হবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহসীন কলেজে এইচএসসি প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা চলছিল। ৩০ নভেম্বর ছিল প্রাণীবিদ্যা বিষয়ের পরীক্ষা। ওই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল সিয়াম। সোমবার (২ ডিসেম্বর) পদার্থবিদ্যা পরীক্ষা ছিল।

পুলিশের ধারণা, মামলার আসামি হওয়ার বিষয়টি অবগত ছিল সিয়াম। পরীক্ষা শেষ হলে গ্রেফতার হতে পারে, এই আশঙ্কায় সে পালিয়ে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগর পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, ‘সিয়ামের নিখোঁজের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। আমরা এটা নিশ্চিত হয়েছি যে, পুলিশের কোনো ইউনিট তাকে আটক-গ্রেফতার করেনি। তার সন্ধান পাবার চেষ্টা আমরা করছি।’

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/আরডি/জেএএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন