বিজ্ঞাপন

‘জুঁই ছিল আমার জীবন, আল্লাহ আমার জীবনটা কেড়ে নিলো’

December 2, 2019 | 8:35 pm

সোহেল রানা, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ‘জুঁই খুব কষ্ট করত। ফার্মগেটে একটি কোচিং সেন্টারে পার্টটাইম চাকরি করত। ভোরে বাসা থেকে বেরিয়ে যেত কোচিংয়ে। সেখান থেকে কলেজে যেত। নিজে পল্টনের একটি কোচিংয়ে পড়ত। বাসায় ফিরত রাতে। মাঝে মাঝে না খেয়েও বের হতো। তখন একটি বাটিতে করে খাবার দিয়ে দিতাম। আমার মেয়েটার কোনো লোভ ছিল না। কারও কোনো ক্ষতি করত না। মেয়েটা ছিল আমার জীবন। আল্লাহ আমার সেই জীবনটাই কেড়ে নিলো।’

বিজ্ঞাপন

কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন রোকেয়া আক্তার সুমি। রাজধানীর বিজয় সরণিতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো আকলিমা আক্তার জুঁইয়ের (২৫) মা তিনি। মেয়েকে হারিয়ে তিনি এখন পাগলপ্রায়।

গত শনিবার (৩০ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বিজয় সরণিতে মোটরসাইকেলের পেছন থেকে পড়ে আহত হয়েছিলেন ইডেন মহিলা কলেজের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী জুঁই। সোমবার (২ ডিসেম্বর) ভোর ৬টার দিকে ঢামেক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন- উবারের মোটরসাইকেল থেকে পড়ে ইডেন ছাত্রীর মৃত্যু

ঢামেক মর্গের সামনে মেয়ের মরদেহ নিতে এসেছিলেন রোকেয়া আক্তার সুমি। জানালেন, জুঁইয়ের বাবা আবুল কালাম একজন মুক্তিযোদ্ধা। সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। এখন অবসরে আছেন। জুঁইয়ের বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। জুঁইকে নিয়ে তাদের বসবাস মিরপুর কাজী পাড়ার বাসায়। জুঁই পড়ালেখা করতেন ইডেন মহিলা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রোকেয়া বলেন, জুঁই আহত হয়েছে শুনে হাসপাতালে ছুটে এসেছিলাম। কিন্তু ওর সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। মেয়েটা খুব আদরের ছিল। সবসময় চাইত পড়ালেখা শেষ করে ভালো একটা চাকরি করবে। টেলিভিশনে খবর পড়ার খুব ইচ্ছা ছিল। দুর্ঘটনার পর ওকে দেখতে পেলাম ঠিকই, কিন্তু একটি কথাও শুনতে পারলাম না ওর মুখ থেকে।

জুইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু রিতু আক্তার। রোকেয়া আক্তারের সঙ্গে ঢামেকে উপস্থিত ছিলেন তিনিও। রিতু বলেন, আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। আমি কলেজের একটি হোস্টেলে থাকি। তবে ওদের মিরপুরের বাসায় অনেক দিন থেকেছি। ওকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। কোনো লোভ ছিল না ওর। খুব চাইত, পড়ালেখা শেষ করে ভালো একটা চাকরি করবে। আর দুইটি ইচ্ছা ওর মধ্যে প্রবল ছিল— আইন বিষয়ে পড়ালেখা করা আর টেলিভিশনে খবর পড়া।

রিতু বলেন, জুঁই মাঝে মাঝে খাবার না খেয়েই বাসা থেকে বের হয়ে আসত। তখন ওর মা বাটিতে করে খাবার দিয়ে দিতেন। আমরা কলেজে বসে একসঙ্গে খেতাম। এমনিতে আলাদা করে কোনো খাবারের প্রতি আগ্রহ ছিল না। তবে ফ্রাইড রাইস খেতে পছন্দ করত খুব। জুঁইকে হারিয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো বন্ধুকে হারালাম। জানি না, জীবনে এমন কোনো বন্ধু আর পাব কি না।

জুঁইয়ের মেজ বোন তানজিনা আক্তার, ভগ্নিপতি মো. মাসুদও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মেডিকেলে। মাসুদ বলেন, ইডেন কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে পড়ত জুঁই। ফার্মগেটে একটি কোচিং সেন্টারে পার্টটাইম চাকরিও করত। শনিবার সকালে মিরপুরের বাসা থেকে উবার মোটরসাইকেলে করে ফার্মগেট যাচ্ছিল। বিজয় সরণির মোড়ে পৌঁছালে মোটরসাইকেলের পেছন থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পায়। উবার চালকই তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসেন।

জুঁইয়ের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ইডেন কলেজ থেকে তার সহপাঠীরা সবাই ছুটে আসেন ঢাকা মেডিকেলে। বন্ধু-সহপাঠীকে হারানোর বেদনায় কান্নার রোল পড়ে যায় সেখানে। শামীমা ফেরদৌস লিনা বলেন, জুঁই ভালো ছাত্রী ছিল। সবসময় হাসিখুশি থাকত। আমরা আমাদের খুব ভালো একজন সহপাঠীকে হারালাম।

জুঁইয়ের ভগ্নিপতি মাসুদ জানালেন, জুঁইদের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার সুন্দরপুর গ্রামে। গ্রামের বাড়িতেই দাফন করা হবে তার মরদেহ।

সারাবাংলা/এসএসআর/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন