রবিবার ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১০ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া স্বামীর বিরুদ্ধে লড়ছেন প্রতিবন্ধী স্ত্রী!

ডিসেম্বর ৩, ২০১৯ | ৮:০১ পূর্বাহ্ণ

আরিফুল ইসলাম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: অসচ্ছল পরিবারে জন্ম হয়েছিল আয়েশার (৪০)। পাঁচ বছর বয়সে আক্রান্ত হয়েছিলেন দুরারোগ্য ব্যধিতে। চিকিৎসা না করাতে পেরে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় সেই ছোটবেলাতেই। পরিবারের কাছেই হয়ে পড়েন অচ্ছুত। পরিণতিতে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিতে হয়। তবে জীবনের প্রতি আশা হারাননি আয়েশা। আশা ছিল, টাকা জমিয়ে গ্রামে চলে যাবেন। জমি কিনে চাষবাস করবেন। খেয়ে না খেয়ে তাই টাকা জমাতেন। প্রায় ১৪ লাখ টাকা জমিয়েওছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ এক ঝড় ফের এলোমেলো করে দেয় আয়েশার জীবন।

বিজ্ঞাপন

ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেওয়া পঙ্গু আয়েশার জীবনে আগমন ঘটে এক পুরুষের। নাম জসিম (৪৫)। তার প্রেমে পড়েন আয়েশা। পাঁচ বছর প্রেমের পর বিয়ে করেন তাকে। বছর ঘুরলে ফুটফুটে এক মেয়েও আসে তার জীবনে। আয়েশা জানতেন না, ভালোবেসে যে পুরুষকে তিনি জীবনে জড়িয়েছেন, ভালোবাসার ছলে তার উদ্দেশ্য শুধুই প্রতারণা। আয়েশা তখনই বিষয়টি বুঝতে পারলেন, যখন যখন তিল তিল করে জমানো সব টাকা হাতিয়ে নিয়ে তাকে ফেলে রেখে যান জসিম।

সারাজীবনের সঞ্চয় হারালেও জীবনযুদ্ধে হারতে রাজি নন আয়েশা। তাই স্বামীর বেশে যে প্রতারক, তার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নেমেছেন তিনি। দুই বছর ধরে ঘুরছেন আদালতের বারান্দায়। আইনজীবীদের কেউ কেউও তার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তবে হাল ছাড়েননি আয়েশা। প্রতারণার শেষটা দেখার জন্য তিনি বদ্ধপরিকর।

ঢাকার নিম্ন আদালত চত্বরে নিয়মিতই দেখা যায় আয়েশাকে। হাঁটু আর হাতের ওপর ভর করে আদালতে আসেন। চলাফেরা করতে অনেক কষ্ট হয়। তবু বিচারের আশায় সেই কষ্টটুকুও মেনে নেন। ভিক্ষাও করেন আদালত চত্বরে। তেমনই একসময় সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের কথা হয় আয়েশার সঙ্গে। জিজ্ঞাসা করতেই আয়েশা খুলে বলেন তার প্রতারিত হওয়ার ইতিবৃত্ত আর লড়াইয়ের সবটা গল্প।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবন্ধী আয়েশা (৪০) সারাবাংলাকে বলেন, কয়েক বছরের পরিচয় জসিমের সঙ্গে। বিভিন্ন প্রলোভন দেখাত। ২০১৪ সালের দিকে বিয়ে করি আমরা। একটা মেয়ে হয় আমাদের। সব মিলে সুখেই ছিলাম। মেয়ে হওয়ার পর জসিম বলে, ব্যবসা করবে। টাকা লাগবে। আমি ভাবি, ব্যবসা করলে সংসারটা আরও ভালোভাবে চলবে। সারাজীবন ধরে আমার জমানো প্রায় ১৪ লাখ টাকা তুলে দেই জসিমের হাতে। কে জানত, আমার টাকা নিয়ে আমাকে আর নিজের মেয়েকেও ছুঁড়ে ফেলবে জসিম! টাকা পেয়েই আমাকে নির্যাতন করতে শুরু করে। অনেক বর্বর আচরণ করেছে আমার সঙ্গে।

আয়েশা বলেন, ২০১৭ সালে ভরণপোষণ ও দেনমোহর না দেওয়ার অভিযোগে জমিসের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করি। ওই মামলায় আদালত এককালীন ২ লাখ আর মাসে ৬ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য আদেশ দেয় জসিমকে। কিন্তু তখন জসিম আমার ওপর যৌতুকের জন্য নির্যাতন করতে শুরু করে। সহ্য করতে না পেরে কিছুদিন আগে আমি তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করি। সেটাতে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। কিন্তু জসিমকে ধরতে টালবাহানা শুরু করে পুলিশ। থানায় গিয়ে দিনের পর দিন ধরনা দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। আইনজীবীরাও সহায়তা করেননি আমাকে।

ওই সময় নিম্ন আদালত প্রাঙ্গণেই ভিক্ষা করতেন আয়েশা। এর মধ্যেই একসময় তার পরিচয় হয় অ্যাডভোকেট মো. জাহিদুর রহমান মিয়ার সঙ্গে। তিনি আয়েশার কাছে সব কথা জানতে চান। আয়েশাও খুলে বলেন সব কথা। পঙ্গু এই নারীর জীবন সংগ্রাম নাড়িয়ে দেয় আইনজীবী জাহিদকেও। বিনামূল্যে আয়েশার পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

আয়েশা জানান, অ্যাডভোকেট জাহিদুরের পরামর্শে এ বছরের ১ অক্টোবর আদালতে যৌতুক নিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেন জমিসের বিরুদ্ধে। আদালত সেদিনই জসিমের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। পরে গত ৬ নভেম্বর জসিমকে রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তখন থেকেই তিনি কারাগারে রয়েছেন। এর মধ্যে আসামিপক্ষ থেকে কয়েকবার জামিনের আবেদন করলেও তা বরাবরই নামঞ্জুর করেছেন আদালত।

আইনজীবী জাহিদুর রহমানের সঙ্গেও কথা হয় সারাবাংলার। তিনি বলেন, ঘটনাচক্রে আয়েশার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। তার কাছে জানতে পারি, বিয়ের নামে এক ভয়াবহ প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন তিনি। লিগ্যাল এইডের আইনজীবীরা এর আগে তার পক্ষে মামলা করেছেন। কিন্তু তারা কেউ আয়েশার পক্ষে ততটা আন্তরিক ছিলেন না। একজন আইনজীবীও কিছু টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন আয়েশার কাছ থেকে। সব কথা শুনে আমার মনে হয়েছে, তার পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।

জাহিদুর আরও বলেন, আমি শুধু মানবিক দিক বিবেচনা করেই আয়েশার পক্ষে মামলা চালিয়ে যাচ্ছি। এই মামলা থেকে আমার কোনো টাকা-পয়সার প্রয়োজন নেই। আয়েশা যদি তার প্রাপ্য বুঝে পান, তাহলেই তার পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়াকে সার্থক মনে করব।

আইনি লড়াইয়ে জিতে টাকা ফেরত পেলে কী করবেন— জানতে চাই আয়েশার কাছে। উত্তরে বলেন, ভিক্ষাটা ছেড়ে দেবো। গ্রামের বাড়ি চলে যাব। জমি কিনে ক্ষেতে ফসলের কাজ করব। মেয়েকে নিয়ে একটু ভালো থাকতে পারলেই হবে। আর মেয়েকে পড়ালেখা করাতে চাই। ও যতদূর পর্যন্ত পড়তে চাই, যতই কষ্ট হোক, ততদূর পর্যন্তই পড়াতে চাই।

বিকল্প ভাবনাও আছে আয়েশার। তিনি বলেন, আমার টাকা আমাকে ফেরত দিতে হবে। অথবা আমাকে স্ত্রী হিসেবে প্রাপ্য মর্যাদা সঠিকভাবে দিতে হবে। জীবনের তাগিদেই ভিক্ষা করে হলেও টাকা জমিয়েছিলাম। প্রতিবন্ধী হওয়ায় কখনো বিয়েও করতে চাইনি। কিন্তু সংসারের সুখের লোভ দেখিয়ে সে আমার সবকিছু হাতিয়ে নিয়েছে। অনেক নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি আমি হয়েছি। আমার সন্তানকেও তেমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হোক, তা চাই না। তাই লড়ে যাচ্ছি। হয় আমাকে আর আমার সন্তানকে সঠিক মর্যাদায় রাখতে হবে, নইলে সব ফেরত দিয়ে তাকে প্রতারণার শাস্তি পেতে হবে জসিমকে।

আদালতের বারান্দায় কখনো কখনো একেকটি মামলার জন্য বছরের পর বছর ঘুরতে হয় বাদী-বিবাদীদের। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে জীবনের সঙ্গে যে সংগ্রাম করে আসছেন, আদালতের বারান্দায় তাকে তত দীর্ঘ প্রতীক্ষা করতে হবে না— এমনটিই প্রত্যাশা প্রতিবন্ধী আয়েশার।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এআই/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন