রবিবার ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ইং

দ্য লাস্ট প্যারাডাইজ অন আর্থ।। ৯ম পর্ব: প্যাডাং প্যাডাং বিচ

ডিসেম্বর ৭, ২০১৯ | ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ

আফরোজা মামুদ

সার্ফিংয়ের জন্য বিখ্যাত বালির প্যাডাং প্যাডাং বিচ। এখানে নিয়মিত আন্তর্জাতিক সার্ফিং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বিশেষ করে ‘দ্যা রিপ কার্ল কাপ’ নামের ইভেন্ট বেশিরভাগ সময় এখানেই অনুষ্ঠিত হয়।

বিজ্ঞাপন

বিচটি খুব বেশি বড় নয়। মাত্র ২৩ কিলোমিটারের মতো। ২০১০ সাল থেকে এই বিচটিকে খাওয়া, প্রার্থনা ও প্রেমের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হলিউড অভিনেত্রী জুলিয়া রবার্টস ইট প্রে লাভ সিনেমার শ্যুটিংয়ের জন্য এখানে এসেছিলেন বলে কেউ কেউ একে জুলিয়া রবার্টস বিচও বলেন। তবে স্থানীয়ভাবে বিচটির নাম:পান্তাই লাবুয়ান সায়ত!

প্যাডাং প্যাডাংকে একটি হিডেন বিচ বলা যেতে পারে। কারণ বিশাল একটি পাথর কেটে সুড়ঙ্গ পথের মতো ধাপে ধাপে সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। সেই সিঁড়ি বেয়ে নেমে তারপর যেতে হয় সৈকতে। এই সৈকতে যাওয়ার জন্য টিকেট লাগে। প্রচুর অস্ট্রেলিয়ান এবং ইউরোপিয়ান পর্যটক চোখে পড়লো।

বিজ্ঞাপন

প্যাডাং প্যাডাং বিচ

সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের কাছে বিচটি মোটামুটি মানের মনে হয়েছে। কিছু বিরক্তিকর ব্যাপার ছিল, যেমন- সৈকতে গোড়ালি পর্যন্ত দেবে যাওয়া বালি। ছোট্ট একটু বিচে দেখার মতো আকর্ষণীয় তেমন কিছু চোখে পড়েনি। আবার পানিও অতটা নীল মনে হয় নি। এর উপর বাদরের বেশ উপদ্রব।  চশমা, মোবাইল, ক্যাপ ছোঁ মেরে নিয়ে যায় বাঁদরের দল। খাবার দিলে ফেরত দেয় তবে তা স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে।

সবচেয়ে বেশি পেইনফুল যেটি ছিল তা হলো- অর্ধশত উঁচু উঁচু সিঁড়ি ভাঙা। ওপরে ওঠার পর অন্যদের কথা কি বলব, আমার নিজেরই জিহ্বা বের হয়ে গেছিলো! পিপাসায় গলা শুকিয়ে যেন ফারাক্কার বাঁধ।

যাই হোক, প্যাডাং প্যাডাং থেকে বের হয়ে দ্রুত চললাম ওলুওয়াতু টেম্পলের দিকে । গাড়িতে করে যেতে ৫-১০ মিনিটের মতো সময় লাগল। সময় দুপুর গড়িয়ে বিকেল তখন।

ওলুওয়াতু টেম্পল
ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় (মালয়) ওলু মানে ‘টপ বা শীর্ষ’ এবং ওয়াতু মানে ‘রক বা পাথর’। ওলুওয়াতুর কাছাকাছি বাংলা অর্থ দাঁড়ায় 'পাথরের চূড়ার মন্দির'। বাস্তবিক অর্থেই মন্দিরটির অবস্থান পাথরের সর্বোচ্চ চূড়ায়।

বিভিন্ন সময় মন্দির থেকে পাওয়া কিছু প্রত্নতাত্বিক নিদর্শনের কার্বন ডেটিং করে দেখা গেছে যে মন্দিরটি দশম শতাব্দিতে তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হয়, মন্দিরটি শিবারুদ্রের উপাসনার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

মন্দিরে ঢোকার আগে দুপাশে বহুবর্ষজীবি মোটা মোটা গাছ চোখে পড়বে। আমার কাছে কিছু গাছকে বাবলা গাছের মতো মনে হলো। এছাড়া সৌন্দর্য বর্ধনকারী এবং নিজে থেকেই বেড়ে ওঠা স্থানীয় কিছু গাছ মিলে মন্দির এলাকাটিকে একটি ছোট অরণ্যে ঘেরা মন্দিরে রূপ দিয়েছে।

প্যাডাং প্যাডাং বিচের মতো এখানেও প্রচুর বানর চোখে পড়ে। গাছের ডালে ঝুলতে দেখা অসংখ্য বানরকে। খাবারের জন্য এরা ট্যুরিস্টদের জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। ট্যুরিস্টদের কাছে ব্যাপারটা যেমন বিরক্তিকর তেমনি ভয়ের।

প্যাডাং প্যাডাং বিচ

বালিতে বাস করা হিন্দুরা বিশ্বাস করে, যে কোন অশুভ শক্তির প্রকোপ থেকে এই বানররা মন্দিরটিকে রক্ষা করে। আর এই মন্দির রক্ষা করে পুরো বালি প্রদেশকে। এরা এও বিশ্বাস করে এটি ব্রম্মা, বিষ্ণু ও শিবার একীভূত হওয়ার স্থান। গাইড জানাল, ইন্ডিয়ান হিন্দুধর্ম এবং বালিনেজ হিন্দুধর্ম একরকম নয়।

এরপর মন্দিরের ভেতরে ঢোকার পালা। ট্যুরিস্টরা মন্দিরের একদম ভেতর পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি পায় না। আমার কাছে সব মন্দির একরকম লাগে তাই আমি যাই নি।  আমি বাদে আমাদের গ্রুপের সবাই গিয়েছে মন্দির দেখতে। তারা বলল- মন্দিরের চারপাশে ঘুরিয়ে নীচে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দ্য লাস্ট প্যারাডাইজ অন আর্থ।। ৮ম পর্ব: অন্ধকারে ভূতের ভয়ে!

টেম্পলে ঢুকতে হলে টিকিট লাগে। তবে এখানে ঢুকতে হলে আরও একটি কাজ করতে হয় তা হলো অবশ্যই অবশ্যই কমলা কাপড়ে নিজেকে মুড়িয়ে নিতে হবে। যাদের শরীরে পর্যাপ্ত কাপড় আছে তারা গামছার মতো কোমড়ে গিঁট দিয়ে নেয়। যাদের পরনে স্যুইম স্যুট তাদের বুক থেকে পা পর্যন্ত লুঙ্গির মতো পরে নিতে হয়।

মন্দিরের ভেতরে ঢুকতে না পারলেও বাইরে থেকে সমুদ্র-আকাশ ও দিগন্তের দিকে দেখলে মনে একটাই শব্দ আসে আর সেটা হল- ‘শ্বাসরুদ্ধকর!’  সত্যিই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় ওলুওয়াতুর অভূতপূর্ব সেই সৌন্দর্য দেখলে।

বিশাল বিশাল সমুদ্রের ঢেউ পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ে দুধ সাদা ফেনীল ঢেউয়ের সৃষ্টি করছে। পাহাড়ের অবস্থা যেন আঘাতে আঘাতে জর্জরিত। তার শরীরের ভাঙা অংশ টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে পাহাড়ের পাদদেশে। দুটো লাইন তৎক্ষণাৎ মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল-তুই ফেনীল ঢেউয়ের রূপ দেখিয়ে
আবেশই যদি ছড়াস,
নিত্য আমার পাঁজর ভেঙে
ব্যথা কেন বাড়াস?

আমার মনে হচ্ছিল যেন হাজার কষ্ট বুকে নিয়ে অটল পাহাড় নিষ্ঠুর সাগরকে ডেকে এ কথাগুলোই বলছে।

এ কি যে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তা বলে বোঝাতে পারবো না। চুম্বকের মতো দৃষ্টি আটকে রইল আমার দিগন্তের দিকে। উপরে নীল আকাশ।পানির রং কালচে নীল। সূর্য ডুবুডুবু করে সমুদ্রের গভীরে ডুবে যাওয়ার আয়োজন করছে। মৃদুমন্দ বাতাস সমুদ্রের জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে ফিসফিসিয়ে কানের কাছে যেন কিছু বলতে চায়। আমি সেই ভাষা বুঝি না। তবু আনন্দে আমার দু'চোখের কোণ ভিজে আসে। প্রথমবার এরকম দৃশ্য দেখছি বলেই হয়তো!

গ্রুপের বাকী সদস্যরা তখনও মন্দির ঘুরে আসে নি। আমি সিমেন্টের তৈরি রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর সৌন্দর্য আরও একটু ভালো করে দু'চোখ ভরে দেখে নেওয়ার চেষ্টা করছি।

পাহাড়ের এক প্রান্তে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬ টায় ট্র্যাডিশনাল বালিনেজ ডান্স হয়। অস্তগামী সূর্যকে ব্যাকগ্রাউন্ড  বানিয়ে এ নৃত্য পরিবেশন করা হয়। কোন মিউজিক থাকে না। নৃত্যশিল্পীরা মুখ দিয়ে এক ধরনের শব্দ করে সেটাই এ নাটকের মিউজিক। শব্দগুলো ক্যাক! ক্যাক! ক্যাক! আওয়াজোর মতো। তাই এ নৃত্যের নাম ‘কিক্যাক ডান্স’! হিন্দু ‘রামায়ণ’ এর গল্প পরিবেশিত হয় এ নৃত্যের তালে তালে।

সন্ধ্যার দিকে মন্দির থেকে বের হয়ে টের পেলাম ক্ষুধা এবং পিপাসা-দুটোই বেশ পেয়ে বসেছে আমাদের। তাই বাইরে আসলাম ডাব খেতে।বিশাল আকৃতির সব ডাব- কিছুটা লালচে রঙ। এতো বড় ডাবের পানি ও শাঁস একা খাওয়া অসম্ভব। আমি আর আমার হাজব্যান্ড মিলে খেয়েও একটা ডাব শেষ করতে পারিনি। ডাব ও চিপস খাওয়া পর্ব শেষ করে চলে আসলাম জিম্বারান বিচে। উদ্দেশ্য সি ফুডের স্বাদ নেওয়া আর সমুদ্রের বিশালতাকে দু'চোখ ভরে দেখা।

সারাবাংলা/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন