বৃহস্পতিবার ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ ইং

বেগম রোকেয়া: নারীকে মানুষ ভেবেছিলেন যিনি

ডিসেম্বর ৯, ২০১৯ | ৪:১৪ অপরাহ্ণ

রাজনীন ফারজানা

আজ থেকে ১১৪ বছর আগে ১৯০৫ সালে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ লেখার মাধ্যমে উপমহাদেশে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তিনি। এর এক বছর আগে মতিচূর নামক প্রবন্ধগ্রন্থে নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের মাধ্যমে সম-অধিকার প্রাপ্তির আহ্বান জানিয়েছিলে। আর উপমহাদেশে নারীদের পশ্চাৎপদতার কারণ হিসেবে নারী শিক্ষার অভাবকে দায়ি করেছিলেন। তিনি আর কেউ নন, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। এই উপমাহাদেশে নারীকে পুরুষের সমকক্ষ অর্থাৎ মানুষ হিসেবে দেখেছিলেন তিনি। তার বিভিন্ন রচনায় সেকথাই উঠে এসেছে বিভিন্নভাবে, নানা মাধ্যমে।

বিজ্ঞাপন

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্ম ১৮৮০ সালে আর মৃত্যু ১৯৩২ সালে। তিনি একাধারে একজন লেখক, চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, সংগঠক ও সমাজ সংস্কারক। তাকে বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং প্রথম বাঙালি নারীবাদী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ জরিপে সারা বিশ্বের বাঙালিরা তাকে ষষ্ঠ হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন।

উনিশ শতকের শেষের দিকে জন্মগ্রহণ করেও চিন্তা আর চেতনায় সময়ের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন তিনি। তার সমসাময়িক নারী তো দূরের কথা, আলোকিত চিন্তায় অনেক পুরুষের চেয়েও এগিয়ে ছিলেন তিনি। এমনকি আজকের দিনেও তার বক্তব্য সমান গুরুত্ববহন করে। আজ থেকে ১১৫ বছর আগেও নারীকে ধর্ম ও সামাজিকতার দোহাই দিয়ে ঘরে আবদ্ধ রাখতে চেয়েছে পুরুষ, আজ এই একবিংশ শতাব্দীতেও নারীর এগিয়ে চলার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় পুরুষতান্ত্রিকতা। সেই ১৯০৪ সালে মতিচূর প্রবন্ধগ্রন্থে বেগম রোকেয়া লিখেছিলেন-
‘কোনো ভগ্নী মস্তক উত্তোলন করিয়াছেন, অমনি ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচন-রূপ অস্ত্রাঘাতে তাঁহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। ... আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্যে পুরুষগণ এই ধর্মগ্রন্থগুলি ইশ্বরের আদেশ বলিয়া প্রচার করিয়াছেন। ... এই ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষরচিত বিধিব্যবস্থা ভিন্ন কিছুই নহে। মুনিদের বিধানে যে কথা শুনিতে পান, কোনো স্ত্রী-মুনির বিধানে হয়ত তাঁহার বিপরীত নিয়ম দেখিতে পাইতেন। ... ধর্ম আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে; ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমণীর উপর প্রভুত্ব করিতেছেন।’

বিজ্ঞাপন

অত্যন্ত সুলেখিকা বেগম রোকেয়া সাহিত্যের নানা অঙ্গনে স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছেন। একাধারে ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ও শ্লেষাত্মক রচনা উপহার দিয়েছেন তিনি। তার লেখায় একইসঙ্গে উদ্ভাবনা যেমন ছিল, তেমনি ছিলো যুক্তিবাদিতা ও কৌতুকের সাহায্যে কঠিন বিষয়ের উপস্থাপন। প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন, শিক্ষা আর পছন্দানুযায়ী পেশা নির্বাচনের সুযোগ ছাড়া নারী মুক্তি আসবে না। নারীর সম অধিকার অর্জনের পথে নারীর নিজেকে অধস্তন ভাবার মানসিকতা ও পুরুষতান্ত্রিকতার বাঁধার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘আমরা বহুকাল হইতে দাসীপনা করিতে করিতে দাসীত্বে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি। ক্রমে পুরুষরা আমাদের মনকে পর্য্যন্ত দাস করিয়া ফেলিয়াছে।... তাহারা ভূস্বামী, গৃহস্বামী প্রভৃতি হইতে হইতে আমাদের "স্বামী" হইয়া উঠিয়াছেন।’

হাস্যরস আর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সাহায্যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসম অবস্থান ফুটিয়ে তুলেছেন। বিংশ শতাব্দীতেই তিনি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, ধর্মের নামে নারীর প্রতি অবিচার রোধ করতে চেয়েছেন।  ১৯০৫ সালে সুলতানার স্বপ্ন (১৯০৫) নারীবাদী ইউটোপিয়ান সাহিত্যের ক্লাসিক নিদর্শন বলে বিবেচিত। অন্যদিকে অবরোধ-বাসিনীতে (১৯৩১) তিনি অবরোধপ্রথাকে বিদ্রূপবাণে জর্জরিত করেছেন।

বেগম রোকেয়া অলঙ্কারকে দাসত্বের প্রতীক বিবেচনা করেছেন এবং নারীদের অলঙ্কার ত্যাগ করে আত্মসম্মানবোধে উজ্জীবিত হয়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন-
‘আর এই যে আমাদের অলঙ্কারগুলি– এগুলি দাসত্বের নিদর্শন। ... কারাগারে বন্দিগণ লৌহনির্ম্মিত বেড়ী পরে, আমরা স্বর্ণ রৌপ্যের বেড়ী পরিয়া বলি "মল পরিয়াছি। উহাদের হাতকড়ী লৌহনির্ম্মিত, আমাদের হাতকড়ি স্বর্ণ বা রৌপ্যনির্ম্মিত "চুড়ি!"... অশ্ব হস্তী প্রভৃতি পশু লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে, সেইরূপ আমরা স্বর্ণশৃঙ্খলে কণ্ঠ শোভিত করিয়া বলি "হার পরিয়াছি!" গো-স্বামী বলদের নাসিকা বিদ্ধ করিয়া "নাকে দড়ী" পরায়, আমাদের স্বামী আমাদের নাকে "নোলক" পরাইয়াছেন। অতএব দেখিলে ভগিনি, আমাদের ঐ বহুমূল্য অলঙ্কারগুলি দাসত্বের নিদর্শন ব্যতীত আর কিছুই নহে! ... অভ্যাসের কি অপার মহিমা! দাসত্বে অভ্যাস হইয়াছে বলিয়া দাসত্বসূচক গহনাও ভালো লাগে। অহিফেন তিক্ত হইলেও আফিংচির অতি প্রিয় সামগ্রী। মাদক দ্রব্যে যতই সর্বনাশ হউক না কেন, মাতাল তাহা ছাড়িতে চাহে না। সেইরূপ আমরা অঙ্গে দাসত্বের নিদর্শন ধারণ করিয়াও আপনাকে গৌরবান্বিতা মনে করি। ... হিন্দুমতে সধবা স্ত্রীলোকের কেশকর্ত্তন নিষিদ্ধ কেন? সধবানারীর স্বামী ক্রুদ্ধ হইলে স্ত্রীর সুদীর্ঘ কুম্ভলদাম হস্তে জড়াইয়া ধরিয়া উত্তম মধ্যম দিতে পারিবে।... ধিক আমাদিগকে! আমরা আশৈশব এই চুলের কত যত্ন করি! কি চমৎকার সৌন্দর্য্যজ্ঞান!’

সেসময় তো বটেই এখনও অনেক নারী উচ্চ শিক্ষিত হয়েও নিজেদের পরিচয় সৃষ্টির চেষ্টা না করে কারও না কারও উপর নির্ভরশীল জীবন কাটাতে চান। বেগম রোকেয়া শত বছর আগেই নারীর উচ্চশিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি নারীকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় আসার স্বপ্ন দেখিয়েছেন।

১৯০৪ সালে মতিচূরে তিনি লিখেছেন, পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব। যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জ্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে আমরা লেডীকেরাণী হইতে আরম্ভ করিয়া লেডীমাজিস্ট্রেট, লেডীব্যারিস্টার, লেডীজজ — সবই হইব!... উপার্জ্জন করিব না কেন?... যে পরিশ্রম আমরা "স্বামী"র গৃহকার্য্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না?... আমরা বুদ্ধিবৃত্তির অনুশীলন করি না বলিয়া তাহা হীনতেজ হইয়াছে। এখন অনুশীলন দ্বারা বুদ্ধিবৃত্তিকে সতেজ করিব। যে বাহুলতা পরিশ্রম না করায় হীনবল হইয়াছে, তাহাকে খাটাইয়া সবল করিলে হয় না?’

আজ সোমবার (৯ ডিসেম্বর) বেগম রোকেয়া দিবস। প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর তার জন্ম ও মৃত্যুদিনে বেগম রোকেয়ার কর্ম ও আদর্শ উদযাপনের লক্ষে বাংলাদেশে সরকারিভাবে দিবসটি উদযাপন করা হয়। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ১৩৯তম জন্ম এবং ৮৭তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ সারাদেশে বেগম রোকেয়া দিবস পালিত হচ্ছে।

দিবস উপলক্ষে প্রতিবছর নারী ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা বিশিষ্ট নারীদের অনন্য অর্জনের জন্য ‘বেগম রোকেয়া পদক’ প্রদান করা হয়। এবছর যে পাঁচজন নারী রোকেয়া পদক পেয়েছেন তারা হলেন- বেগম সেলিনা খালেক, অধ্যক্ষ শামসুন নাহার, ড. নূরুন নাহার ফয়জুন্নেছা (মরণোত্তর), মিস পাপড়ি বসু এবং বেগম আখতার জাহান।

আজ সোমবার (৯ ডিসেম্বর) ‘বেগম রোকেয়া দিবস’ উপলক্ষে রাজধানীতে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে রোকেয়া পদক-২০১৯ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘কেবল আমাদের দেশে নয়, আমরা উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও দেখেছি যে, শিশু ও নারীদের ওপর নির্যাতন মানসিক রোগের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। তাই নারী-পুরুষ প্রত্যেককেই সচেতন থাকতে হবে, যাতে কোন শিশু ও নারী নির্যাতিত না হয়।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মূলত পুরুষরাই নারীদের ওপর নির্যাতন চালায়। তাই তাদের চিন্তা করা উচিত যে, তাদেরও মেয়ে শিশু রয়েছে এবং তাদের সন্তান যদি অন্য কারো দ্বারা নির্যাতিত হয় তাহলে তারা কী করবে। সে কারণেই এ ব্যাপারে সচেতনতা খুবই জরুরি।’

সারাবাংলা/আরএফ/পিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন