রবিবার ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ইং

সৌদি আরব থেকে ফিরতে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চান সেলিনা

ডিসেম্বর ৯, ২০১৯ | ৭:৩৯ অপরাহ্ণ

এমএকে জিলানী, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: সৌদি আরবে নির্যাতিত নারী শ্রমিক সেলিনা আক্তার দেশে ফেরার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চেয়ে আকুতি প্রকাশ করেছেন। এক ভিডিও বার্তায় সেলিনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ সহযোগিতা চেয়েছেন। ভিডিও বার্তাটি সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ভিডিও বার্তায় সেলিনা আক্তার বলেন, ‘হাজার হাজার মেয়েরা সৌদি আরবে নির্যাতিত হচ্ছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন নারী। তিনি সরকারে আছেন। কেন আমাদের সাহয্য করছেন না? কেন আমাদের ধুকে ধুকে মরতে হচ্ছে? তাঁর কাছে আমার একটাই অনুরোধ- আমাকে আমার স্বামী-সন্তানের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। আমি আমার স্বামী-সন্তানের কাছে যেতে চাই।’

ভিডিও বার্তা:

বিজ্ঞাপন

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার সেলিনা আক্তার দীর্ঘদিন ধরে দেশে ফেরার আকুতি জানালেও তাকে এখনও দেশে ফেরাতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। সেলিনাকে সৌদি আরবে পাঠানো মেসার্স মিলেনিয়াম ওভারসিজ লিমিটেড কর্তৃপক্ষের কাছে দীর্ঘদিন ধর্না দিয়ে স্ত্রীকে ফেরাতে না পাওয়ায় গত নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) বরাবর আবেদন করেন সেলিনার স্বামী মো. উজ্জল। এরপর গত ২৪ নভেম্বর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ওয়েজ আর্নার্স ওলেফেয়ার বোর্ডেও আবেদন করেন উজ্জল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সেলিনা আক্তারকে উদ্ধার করে দেশে পাঠানোর জন্য বিএমইটি এবং ওয়েজ আর্নার্স ওয়েল ফেয়ার বোর্ড থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংয়ে চিঠি লেখা হয়। কিন্তু এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (সোমবার, ৯ ডিসেম্বর) চিঠির কোনো জবাব দেয়নি দূতাবাসে। দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএমইটির সহকারী পরিচালক (কর্মসংস্থান) প্রবীর দত্ত সেলিনার স্বামীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিকে ২৮ নভেম্বরের মধ্যে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চিঠি দেন বলে জানা গেছে।

প্রবীর দত্ত জানান, সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি সেলিনাকে দেশে ফেরত আনা তো দূরের কথা চিঠিরও জবাব দেয়নি। অন্যদিকে, রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংকে চিঠি দিলেও তার কোনো জবাব আসেনি।

এ বিষয়ে ওয়েজ আর্নার্স ওলেফেয়ার বোর্ডের উপ-পরিচালক জাহিদ আনোয়ার বলেন, ‘আমরা চিঠি লিখেছি। এখন তারা বিষয়টি দেখছে। দূতাবাস থেকে এখনও আমাদের কিছু জানানো হয়নি।’

জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার কদমতলী থানার পূর্ব জুরাইনের মো. উজ্জলের স্ত্রী সেলিনা আক্তার (বিএক্স-০৭১৩৯১৭) গত ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর মেসার্স মিলেনিয়াম ওভারসিজ লিমিটেডের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান। উজ্জল ও সেলিনা এক কন্যা সন্তানের জনক-জননী। সেলিনা তার স্বামী এবং স্বজনদের কাছে এক ভিডিও বার্তা পাঠিয়ে নিয়োগকর্তা ও তার স্বজনদের শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন। গত এক সপ্তাহ ধরে এই প্রতিবেদকের সাথে সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ হয় সেলিনা আক্তারের। নেটওয়ার্ক দুর্বল হওয়ায় তিনি প্রায় প্রতিদিনই ভিডিও বার্তায় তার ওপর শারীরিক, মানসিকসহ নানা নির্যাতনের কথা জানিয়ে আসছিলেন।

সর্বশেষ তার সাথে কথা হয় গত রোববার বিকেলে। তখন তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ভাই আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। আমি আর পারছি না। মনে হয় মরেই যাব। প্লিজ আমাকে উদ্ধার করে স্বামী-সন্তানের কাছে নেওযার ব্যবস্থা করেন।’ এরপর থেকে তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

সেলিনার স্বামী মো. উজ্জল সোমবার (৯ ডিসেম্বর) এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ভাই তাকে (স্ত্রী) তো আর ফোনে পাচ্ছি না। তার কি হলো বুঝতে পারছি না। গতকাল (রোববার) রাতে কথা বলা অবস্থায় ওই পাশ থেকে এক পুরুষের কণ্ঠ শুনতে পাই। সম্ভবত তার (সেলিনা) মালিক। তাদের কথা বলার এক পর্যায়ে ফোন বন্ধ হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত তাকে পাইনি। তার জন্য আমরা সবাই দুশ্চিন্তায় আছি।’

এর আগে সেলিনা আক্তার একাধিক ভিডিওতে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানান। তিনি বলেন, ‘বিনা কারণেই আমাকে প্রায় প্রতিদিনই মারধর করে নিয়োগকর্তা ও তার স্বজনরা। গরম ইস্ত্রি দিয়ে ছ্যাকা দিতে আসে, চুল কেটে দিতে আসে। আমার পুরো শরীরে মারের (নির্যাতন) দাগ। পিঠে মারে, বুকে-মাথায় মারে। এসব জায়গা তো আর দেখানো যায়? আমি বার বার বলছি, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যান। কেন নিচ্ছেন না?’

সেলিনা আক্তার আরও বলেন, ‘প্রথম দুই তিন মাস ভালোই ছিলাম। তারপর থেকে বেতন নিয়ে সমস্যা করছে। বেতনের কথাও বলতে পারি না। কথায় কথায় মারধর করে। বেশকিছু দিন ধরে আমি অসুস্থ। আমাকে চিকিৎসা করায় না। আর পারছি না। প্লিজ আমাকে বাঁচান। আমার স্বামী সন্তানের কাছে ফিরিয়ে দিন।’

এদিকে রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলর মো. মেহেদী হাসানকে গত ৪ ডিসেম্বর থেকে বার বার চেষ্টা করেও ফোনে পাওয়া যায়নি। নিজের পরিচয় দিয়ে এসএমএস দিলেও কোনো সাড়া দেননি। ফার্স্ট সেক্রেটারি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানকে কয়েকবার ফোন দেওয়ার পরও তিনি রিসিভ করেননি। তবে নিজের পরিচয় দিয়ে এবং কারণ জানিয়ে এসএমএস দেওয়ার পর তিনি পাল্টা এসএমএস দিয়ে জানান, সেলিনা আক্তারের বিষয়টি রাফি নামে (তার পদবী জানা যায়নি) একজন দেখছেন। এজন্য তিনি একটি নম্বরও দেন। ওই নম্বরে দুদিন অসংখ্যবার কল দিলেও কেউ ফোন রিসিভ করেননি।

সারাবাংলা/জেআইএল/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন