সোমবার ২৭ জানুয়ারি, ২০২০ ইং

‘শরীর পোড়া গেলেও মানুষটা তো আছেন, এটাই সান্ত্বনা’

ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | ২:১৫ পূর্বাহ্ণ

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ‘সান্ত্বনা এখন একটাই। উনি বেঁচে আছেন। আমার আর কিছু চাই না। আগুনে শরীর পোড়া গেলেও আল্লাহর কাছে এখন একটাই চাওয়া উনি পঙ্গু হয়েও যাতে বেঁচে থাকেন। অন্তত আমার সামনে তো দেখতে পারব। শরীর পোড়া গেলেও মানুষটা তো আছেন, এটাই সান্ত্বনা। মেয়েটাকেও অন্তত এতিম হতে হবে না।’

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) বার্ন ইন্সটিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে কান্না করতে করতে এভাবেই কথা বলছিলেন অগ্নিদগ্ধ হয়ে আহত রাজ্জাকের (৪৫) স্ত্রী গুলশান আরা। কেরাণীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় একই অগ্নিকাণ্ডে রাজ্জাকের ভাই আলম মারা গেছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন রাজ্জাকের শারীরিক অবস্থাও গুরুতর।

গুলশান আরা বলেন, এর আগেও সেই প্লাস্টিক কারখানায় বেশ কয়েকবার আগুন লেগেছিল। আমার স্বামী রাজ্জাক ও উনার আরেক ভাই আলম সেই ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। বাড়ির পাশে থাকায় উনারা সেখানেই কাজ নিয়েছিলেন। আগে আগুন লাগার পরে আমরা উনাদের মানা করতাম। কিন্তু শুনে নাই। ফ্যাক্টরির মালিক তাদের চাকরি ছাড়তে দেয় নাই। বলছে বেতন বাড়ায়ে দিবে। এখন আর সেই বেতন দিয়ে কি হবে?

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, আমার মেয়ে এবার ক্লাস এইটে উঠবে। নাম আয়শা আক্তার টুম্পা। ওর বাবা বলতো মেয়ে পড়াশোনা করবে, মেট্রিক পাশ করবে, ইন্টার পাশ করবে এরপর ডাক্তার হবে। মেয়েও বাবার কাছেই করতো সব আবদার। বাবাও সেগুলো পূরণ করতো। কাল রাত থেকে আমার মেয়ে কান্না করছে। তারে আমি কী বলে সান্ত্বনা দেব?

রাজ্জাকের ভাই জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় উনারা চার ভাই, তিন বোন। রাজ্জাক ছিলেন সবার বড়। মৃত আলম তাদের মেজো ভাই। ছোট ভাইয়ের নাম জাকির।

জাহাঙ্গীর বলেন, আমি কাকরাইলে ব্যবসা করি। ভাইদের মানা করতাম ওইখানে কাজ করতে যেতে। কিন্তু শুনে নাই। বলল মালিকে বেতন বাড়ায়ে দিবে বলেছে। গতকাল যখন আগুন লাগে তখন আমি কাকরাইলে। খবর পেয়ে হাসপাতালে এসে দেখি আমার দুই ভাই এখানে। আলম ভাইয়ের সঙ্গে কথাও বলেছি। ডাক্তাররাও বললেন উনার অবস্থা রাজ্জাক ভাইয়ের চাইতে ভালো। রাতেও উনার সঙ্গে কথা বলেছি। উনি বলছিলেন, কিভাবে আগুন লেগেছিল। বড় ভাইয়ের জন্য দোয়া পড়তে বলছিলেন। সকালে দেখি উনি কথা বলতে পারছেন না। এরপরে তো আমার ভাই আর রইল না দুনিয়াতে।

প্লাস্টিক ফ্যাক্টরির মালিকের উপর ক্ষোভ জানিয়ে রাজ্জাকের ভাগিনা জাফর বলেন, এই ফ্যাক্টরিতে আগেও যতবার আগুন লাগছে মালিক চাইলেই পারতো ব্যবস্থা নিতে। এখন আমার দুই মামাসহ আরও অনেকের স্বজন হাসপাতালে। এইটা সম্পূর্ণ হয়েছে মালিকের অবহেলার কারণে।

উল্লেখ্য, বুধবার (১১ ডিসেম্বর) বিকেল সাড়ে চারটার দিকে কেরাণীগঞ্জের চুনকুঠিয়ায় প্রাইম প্যাক্ট নামের একটি প্লাস্টিক কারখানায় আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট প্রায় সোয়া একঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। আর ঘটনাস্থলেই মারা যান আরও একজন। এছাড়া ঢামেক হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটের দগ্ধ অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৪ জন।

আরও পড়ুন:- কেরাণীগঞ্জে প্লাস্টিক কারখানায় আগুন: ঢামেকে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩

‘আমি না বাঁচলে আপার বিয়ে দিব ক্যামনে’

কারখানায় আগুন: ঢামেক হাসপাতালে মারা যাওয়া ১০ জনকে হস্তান্তর

সারাবাংলা/এসবি/এনএইচ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন