বুধবার ২২ জানুয়ারি, ২০২০ ইং

নুরু নাপিত

ডিসেম্বর ১৬, ২০১৯ | ১২:০১ অপরাহ্ণ

দীপু মাহমুদ

অগ্রহায়ণ মাস। জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। অতিরিক্ত শীত পড়ার কারণ আচমকা বৃষ্টি। এখন বৃষ্টি হওয়ার কথা না। এ বছর সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। চৈত্র মাসের খাঁ খাঁ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঘুমন্ত মানুষের ওপর কাপুরুষের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নৃশংসভাবে হত্যা করেছে এ দেশের মানুষদের। বাংলাদেশের মানুষ সেই নৃশংসতা মুখ বুজে সহ্য করেনি। তারা পাল্টা আক্রমণ করেছে। শুরু হয়েছে লড়াই। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ।

বিজ্ঞাপন

আব্দুল হান্নান বসে আছে জলডুবি বাজারে হায়াত মুহম্মদের সেলুনের একপাশে পেতে রাখা কাঠের সরু বেঞ্চের ওপর। সেলুন মানে মাথার ওপরে টিনের একচালা। চারপাশে কয়েকটা লম্বা কাঠের তক্তা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। একপাশের তক্তার সঙ্গে পাশাপাশি দুটো আয়না ঝুলছে, তার সামনে দুটো চেয়ার। যদিও সেলুনে নাপিত বলতে হায়াত মুহম্মদ একা। জলডুবি বাজারে আরও তিনজন নাপিত ছিল- জয়ন্ত, নারায়ণ আর ভবেশ। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা বাড়ি ছেড়ে ভারতে চলে গেছে। হায়াত এখন জলডুবি বাজারে একা চুল-দাড়ি কাটে।

হান্নানের মুখে কালো কুচকুচে চাপদাড়ি। মাথার উশকোখুশকো চুল দুপাশে কান ছাড়িয়েছে। সে সেলুনে চুল কিংবা দাড়ি কাটাতে আসেনি। সে এসেছে হায়াতের কাছে খবর নিতে। হায়াতের কাছে গোপন খবর থাকে। নানাভাবে খবর জোগাড় করে রাখে। হান্নান বা কোনো মুক্তিযোদ্ধা এলে তাদের গোপন খবর জানিয়ে দেয়।
হান্নান এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার। ভারত থেকে যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে এসেছে। গ্রামে এসে আগ্রহী ছেলেমেয়েদের নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা দল বানিয়েছে। সেই দলে এখন ১৫ জন ছেলে আর ৬ জন মেয়ে আছে। কমান্ডার হান্নান তাদের যুদ্ধের ট্রেনিং দিয়েছে ।

বিজ্ঞাপন

পুরো জলডুবি গ্রাম থমথম করছে। মানুষজনের চলাচল কম। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জলডুবি প্রাইমারি স্কুলে ক্যাম্প করেছিল। গত পরশুদিন সকাল থেকে শুরু হয়েছে মুষলধারে বৃষ্টি। বৃষ্টির ভেতর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণ করল। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ছিল জলডুবি গ্রামের মানুষ। তাদের কাছে তির, ধনুক, বর্শা আর বল্লম। তারা সবাই ‘জয় বাংলা’ বলে এগিয়ে গেছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা বৃষ্টি ভয় পায়। তারওপর একসঙ্গে এত মানুষ দেখে তারা ঘাবড়ে গেল। তাদের অবস্থা হয়ে গেল দিশেহারা। প্রাণ বাঁচাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়েছে।
তারপর থেকে গ্রাম থমথম করছে। মানুষজন বলাবলি করছে পাকিস্তানি সৈন্যরা আবার আসবে। হায়াতের সেলুনে নানা রকমের মানুষ আসে। তাদের ভেতর এমন মানুষও আছে যারা দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সাহায্য করে যাচ্ছে। তারা রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস আর শান্তিবাহিনী বানিয়েছে। তারাও মাঝেমধ্যে চুলদাড়ি কাটাতে আসে। তখন হায়াত তাদের সঙ্গে গল্প করতে করতে গোপন তথ্য বের করার চেষ্টা করে। হায়াতের পরনে লুঙ্গি, গায়ে পাঞ্জাবি, মাথায় সাদা টুপি। চোখে সুরমা। গোঁফ নেই, গাল ভরতি দাড়ি। সে সুন্দর করে দাড়ি ছেটে রাখে। তাকে দেখলে মনে হয় মসজিদের মোয়াজ্জিন।

জলডুবি গ্রামের একজন রাজাকারের নাম হচ্ছে কাদের। সবাই তাকে ঠ্যাটা কাদের বলে ডাকে। সে সবসময় সবার সঙ্গে ঝামেলা বাঁধিয়ে রাখে। এখন অবশ্য তার সামনে কেউ তাকে ঠ্যাটা কাদের বলতে পারে না। ঠ্যাটা কাদেরের কাছে অস্ত্র থাকে। যখন-তখন যাকে-তাকে গুলি করে মেরে ফেলে। তাই আড়ালে বলে।
ঠ্যাটা কাদের এসে বলল, কী হায়াত মুহম্মদ আছ কেমন?
হায়াত কেমন উদাস গলায় বলল, ভালো থাকি কীভাবে? মুক্তিযোদ্ধারা যা শুরু করেছে তাতে মনে হচ্ছে আমাকেও ইন্ডিয়ায় চলে যেতে হবে।
কাদের হাসতে হাসতে বলল, তুমি ইন্ডিয়ায় যাবা কেন? তুমি তো হিন্দু না, তুমি সাচ্চা মুসলমান।
হায়াত অভিমানভরা গলায় বলল, মুসলমান হলে কী হবে কাদের ভাই, নাপিত তো! এখন জলডুবি গ্রাম মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে। তারা এসে বলবে, নাপিত আবার মুসলমান হয় নাকি? তুই ভেজাল মুসলমান। তুই ফুটুস। গুলি করে দিলেই আমি শেষ। পাকিস্তানি মিলিটারি তাদের ভয়ে পালিয়েছে আর আমি লুঙ্গিছেঁড়া গরিব নাপিত।
কাদের হা হা করে হাসছে। তার হাসির শব্দ শুনে মনে হচ্ছে গভীর রাতে ভয় পেয়ে শেয়াল ডাকছে। কাদেরের হাসিতে খটখট শব্দ হচ্ছে। সে খটখটাখট শব্দের হাসি থামিয়ে বলল, পাকিস্তানি আর্মিরে ভীতু মনে করবা না, হায়াত মুহম্মদ। তাদের সাহস অপরিসীম। তারা ফিরে আসবে জলডুবিতে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাধের জলডুবিকে তছনছ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে।
খুশি হওয়ার ভান করে হায়াত বলল, দিলে বড়ো শান্তি পাচ্ছি কাদের ভাই। পাকিস্তানি আর্মিরা কবে আসবে?
কাদের বলল, পাকা খবর। জেলা সদর থেকে পাক মিলিটারি রওনা হয়ে গেছে। আজ রাতে এসে পৌঁছাবে জলডুবি গ্রামে। তারপর ঠ্যা ঠ্যা ঠ্যা ঠ্যা ক্যা কু কু। সব ফিনিস। সোনার জলডুবি গ্রাম হয়ে যাবে মহাশশ্মান। নাহ্ শশ্মান হচ্ছে হিন্দুদের। জলডুবি হবে গোরস্তান। খবর গোপন রাখবা।
বলে গলার ভেতর থেকে আওয়াজ করে বেশ গম্ভীরভাবে বলল, তোম এধার আও।
হায়াত বলল, কী বললেন কাদের ভাই?
কাদের বলল, উর্দু বাত। মানে উর্দু কথা। পাকিস্তানি ভাষা। বড়ো পবিত্র। তুমিও শিখবা। এখন আমার গোঁফটা একটু চিকন করে দাও। পাকিস্তানি মেজরের সাথে অদ্য রজনীতে মোলাকাত করতে হবে।

হায়াত একজনের চুল কাটছে। তার চুল কাটা শেষ হলে হান্নানকে খবরটা জানাবে- আজ রাতে পাকিস্তানি মিলিটারি ঢুকবে জলডুবি গ্রামে। চুলকাটা প্রায় শেষ হয়ে গেছে। তখন জমসেদ মাস্টার ঢুকলেন সেলুনে। ঢুকেই বললেন, নুরু নাপিত, তুমি স্কুল যাওয়া বন্ধ করেছ! অতি খারাপ অভ্যাস। নিয়মিত স্কুলে যাবে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ছেলেমেয়ে স্কুলে আসে না বললেই চলে। কিন্তু শিক্ষা হচ্ছে জাতির মেরুদণ্ড। তোমরা স্কুলে না গেলে শিক্ষা ব্যাহত হবে। দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে।
বলতে বলতে তিনি সেলুনে রাখা ফাঁকা চেয়ারে বসে পড়লেন। নিজের গালে খোঁচাখোঁচা দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, হায়াত, কুটুমবাড়ি যেতে হবে। সে অনেকদূর। তাড়াতাড়ি দাড়ি কামিয়ে দাও। কুটুমবাড়ি এমন বিচ্ছিরি দাড়িমুখে যাওয়া শোভন দেখায় না।
জমসেদ মাস্টার জলডুবি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে যাননি। তবে তিনি যে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেন তা নয়। নিজের মতো থাকেন। স্কুলে যান। যে কয়জন ছেলেমেয়ে স্কুলে আসে তাদের পড়ান। তার মন কৌতুহলে ভরা। নতুন কোনো খবর শুনতে পেলেই আগ্রহ নিয়ে পুরোটা শোনেন। জনেজনে সেই খবর জানিয়ে বেড়ান। তাই তার সামনে কেউ কখনো গোপন কথা আলোচনা করে না।
হায়াত বলল, নুরু, স্যারের মুখে সাবান ঘষতে থাক। আমি দাড়ি কামিয়ে দিচ্ছি।
নুরু হচ্ছে হায়াত মুহম্মদের ছেলে। তার নাম নূর মুহম্মদ। ডাক নাম নুরু। বয়স ১২ বছর। সে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ছিপছিপে একহারা চেহারা। গায়ের রং মিশমিশে কালো। বুদ্ধিদীপ্ত চোখজোড়া। তাকালে মনে হয় চোখ থেকে আলো ঠিকরে বেরুচ্ছে। সে বাবার সঙ্গে সেলুনে থাকে। তাই সবাই তাকে নুরু নাপিত বলে ডাকে।

জমসেদ মাস্টার চোখ বন্ধ করে আছেন। তার বুকের ওপর গামছা দেওয়া হয়েছে। নুরু একমনে জমসেদ মাস্টারের মুখে ব্রাশ দিয়ে সাবান ডলছে। সাবানে বেশ ফেনা হয়েছে। জমসেদ মাস্টারের মুখ সাবানের ফেনায় ভরে গেছে। তার ঘুম পাচ্ছে। মুখে শীতল ভাব।
হান্নান বুঝতে পেরেছে হায়াতের সঙ্গে কথা বলতে সময় লাগবে। সে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। হঠাৎ তার চোখ পড়ল সামনে আয়নার দিকে। আয়নার ভেতর দেখা যাচ্ছে হলুদ কাগজে কালো কালি দিয়ে মোটা অক্ষরে লেখা “বাঁচতে হলে লড়তে হবে”। হান্নান চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে মাথা তুলে ওপরে তাকাল। মাথার ওপরে কাঠের সঙ্গে হলুদ কাগজে কালো কালিতে সেই কথা উলটো করে লেখা আছে।
হান্নান বলল, এটা কে লিখেছে?
নুরু বলল, আমি লিখেছি।
চমৎকৃত হয়েছে হান্নান। সে বলল, তুমি অতি বুদ্ধিমান ছেলে। তোমার মাথায় অসাধারন বুদ্ধি।
নুরু বলল, চুলদাড়ি কাটতে এসে মানুষ আয়নার দিকে তাকায়। পেছনে ক্যালেন্ডার ঝোলে। ক্যালেন্ডারের লেখা আয়নায় দেখা যায় উলটো। তাই আমি আমার কথা সেখানে উলটো করে লিখে রেখেছি। লেখা আয়নায় দেখা যাচ্ছে সোজা।
জমসেদ মাস্টারের ঘুমঘুম ভাব চলে এসেছিল। নুরুর কথা শুনে ঘুমঘুম ভাব ছুটে গেল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে তাকালেন। ঘটনা দেখার জন্য আয়নার ভেতর তাকিয়েই পেছনে তাকালেন। গম্ভীর মুখে বললেন, বড়ো সত্য কথা লিখেছিস নুরু। নাপিত বলে তোকে অবজ্ঞা করা সমীচীন নয়। কোনো মানুষ অবজ্ঞার পাত্র হতে পারে না। তোর বুদ্ধির তারিফ না করে পারছি না। শুধু অস্ত্র হাতে লড়াই করাটাই লড়াই না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে টিকে থাকার জন্য যে পরিশ্রম, সেটাও লড়াই। তুই লড়াই করছিস, আমি লড়াই করছি, কৃষক লড়াই করছে, মজুর লড়ছে। আমরা সবাই কেবল বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে যাচ্ছি।
জমসেদ মাস্টারের শেষের কথাগুলো কেমন আস্তে এবং জড়ানো শোনা গেল। তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে আলতোভাবে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। তার নিশ্বাস গাঢ় হয়ে এসেছে।

হায়াতের চুল কাটা শেষ হয়েছে। যে চুল কাটাচ্ছিল সে মাথা ঝুঁকিয়ে আয়নায় নিজের চেহারা দেখল। চিরুনি দিয়ে হালকাভাবে মাথার চুল ঠিক করে নিলো। হায়াতের হাতে চুল কাটানোর পয়সা দিয়ে চলে গেল।
নুরু বলল, ইচ্ছে ছিল “জয় বাংলা” লিখে রাখি। রাজাকার এসে দোকান পুড়িয়ে দেবে ভেবে লিখিনি। তবে এ কথা লিখেছি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। যাতে তাঁরা মনে সাহস পায়। দেশ স্বাধীন করার জন্য লড়াই করতে থাকে।
হায়াত ভেবেছিল নুরুর কথা শুনে জমসেদ মাস্টার আবার জেগে উঠবেন। জমসেদ মাস্টার জাগলেন না। চেয়ারে মাথা ঠেকিয়ে তিনি গভীরভাবে ঘুমাচ্ছেন। তার নাক ডাকার গুড়গুড় শব্দ শোনা যাচ্ছে।
নুরু বলল, আমার ইচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে যাই। আপনি কি আমাকে সঙ্গে নেবেন?
হান্নান কিছু বলার আগেই হায়াত তাকে সঙ্গে নিয়ে দোকানের পেছনে চলে গেল। দোকানের পেছনে আমগাছ। তার নিচে লম্বা খাল। গত পরশুর বৃষ্টিতে খালের নিচে কাদা হয়ে আছে। খালে পানি নেই। হায়াত আর হান্নান খালের ভেতর নিচের দিকে খানিকটা নেমে গিয়ে দাঁড়াল।
হায়াত বলল, পাকিস্তানি মিলিটারি আসছে জলডুবি গ্রামে আজ রাতে। ঠ্যাটা কাদের এসেছিল সকালে। সে বলে গেল।
হান্নান কিছু বলল না। চিন্তিত মুখে খালের নিচ থেকে ওপরে উঠে এলো। তাকে দেখে দৌড়ে এসেছে নুরু। সে হান্নানের হাত ধরে বলল, আমাকে আপনার সাথে নিয়ে চলেন।
হান্নান শীতল গলায় বলল, তোমার বয়স অল্প। ছোটো ছেলেমেয়েদের যুদ্ধে যেতে নেই।
নুরু বলল, আপনি যদি আমাকে না নিয়ে যান তাহলে আজ রাতে আমি বাড়ি ছাড়ব। যেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে পাব সেখানে চলে যাব।
হান্নান অসহায় চোখে তাকাল হায়াতের দিকে। হায়াত বলল, সে যখন যেতে চাইছে নিয়ে যান। না নিয়ে গেলে সত্যি হয়তো বাড়ি থেকে পালাবে। কোথায় যাবে কে জানে। আপনার কাছে থাকলে তাও খোঁজ পাব।
হান্নান রাজি হলো। নুরু লাফাতে লাফাতে হান্নানের সঙ্গে যুদ্ধে চলে গেল।

শীতের রাত। শিশিরে ভিজে আছে রাস্তা। জমাট কুয়াশায় ঢেকে আছে চারপাশ। একহাত দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না। গ্রামের এ রাস্তা নুরুর চেনা। সে বহুবার এই রাস্তা দিয়ে বাবার সঙ্গে বাজারে গেছে।
মুক্তিযোদ্ধা দল এগিয়ে আসছে। কমান্ডার হান্নান আছে তাদের সঙ্গে। নুরু প্রথমে গ্রামে ঢুকেছে। সে গেছে রেকি করতে। মানে গ্রামের অবস্থা দেখতে। মুক্তিযোদ্ধারা গ্রামে ঢুকে অ্যামবুশ করবে। তারা ওত পেতে থাকবে আড়ালে। পাকিস্তানি মিলিটারি গ্রামে ঢুকলে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের আক্রমণ করবে।
আশপাশ ভালো করে দেখে নুরু ফিরে এলো।
হান্নান বলল, কী খবর গ্রামের?
নুরু বলল, সব ঠিক আছে। এখন গ্রামে ঢোকা যায়।
মুক্তিযোদ্ধা দল জলডুবি গ্রামে ঢুকে পড়ল।
তারা বেশ কিছুদূর এগিয়ে গেল গ্রামের ভেতর। যেতে যেতে আচমকা নুরু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
হান্নান বলল, কী হলো, থামলে কেন?
নুরু বলল, একটু দাঁড়ান। ঘটনা বুঝে নিই।
রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। নুরুর ওপর তাদের আস্থা আছে।
গ্রামের কুকুরগুলো ভীষণ জোরে চিৎকার করছে। কুকুরের ডাক নুরু বুঝতে পারে। সে গ্রামের ছেলে। ভিন্নভিন্ন পরিস্থিতিতে কুকুর ভিন্নভাবে ডাকে। শেয়াল দেখলে এক রকমের ডাক, গ্রামের পরিচিত মানুষ দেখলে আরেক রকমের ডাক আবার অপরিচিত মানুষ দেখলে অন্য রকমের ডাক।
নুরু দ্বিধায় পড়ে গেল। কুকুরগুলো একসঙ্গে চিৎকার করছে। জলডুবি গ্রামের কুকুরের ডাক শুনে পাশের গ্রামের কুকুর ডাকতে শুরু করেছে। কুকুরগুলো গ্রামের মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার মতো করে ডাকছে। গ্রামে ডাকাত পড়লে কুকুর এরকম করে ডাকে।
নুরু নিশ্চিত হয়ে গেছে গ্রামে একদল অপরিচিত মানুষ এসেছে। সে অনুমান করল তারা পাকিস্তানি সেনা।
নুরু বলল, আপনারা এখানে থাকেন। আমি সামনে থেকে ঘুরে আসছি।
হান্নান বলল, সাবধানে যাবে। কুকুরগুলো এমন ভয়ংকরভাবে ডাকছে কেন?
নুরু বলল, সেটাই দেখতে যাচ্ছি।
নুরু এগিয়ে গেল। সামনে গিয়ে দেখে তার অনুমান সত্য। পাকিস্তানি সৈন্য এসে গ্রাম ভরে গেছে।
শব্দ না করে দৌড়ে ফিরে এলো নুরু। মুক্তিযোদ্ধা দলকে ঘটনা জানাল। আরেকদল মুক্তিযোদ্ধা আছে পাশের গ্রামে। খবর পেলে তারাও আসবে। হান্নান অয়্যারলেসে তাদের কাছে পাকিস্তানি সৈন্যের খবর পৌঁছে দিলো। খবর পেয়ে তারা দ্রুত পজিশনে চলে গেছে।

মিনিট দশেক সময় পার হয়েছে। পাকিস্তানি সেনাদের দেখা গেল রাস্তায়। তারা মার্চ করে আসছে। কুকুরের ডাকের ভেতর দিয়ে জলডুবি গ্রাম দখল করতে এগিয়ে আসছে পাকিস্তানি সৈন্য।
হান্নান বলল, ফায়ার।
অমনি পাকিস্তানি সৈন্যদের দিকে রাইফেল তাক করে গুলি করল মুক্তিযোদ্ধারা। দুজন গ্রেনেডের পিন খুলে গ্রেনেড ছুঁড়ে দিয়েছে।
পাকিস্তানি সৈন্যরা নিজেদের প্রস্তুত করার সময় পেল না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকজন গুলি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল রাস্তার ওপর। পড়ে গিয়ে মরে গেল। আচমকা আক্রমণের মুখে পড়ে তারা হতভম্ব হয়ে গেছে। ভয় পেয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা পেছন ফিরে দৌড়ানো শুরু করল। তারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ততক্ষণে পাশের গ্রাম থেকে ঢুকে পড়েছে আরেকদল মুক্তিযোদ্ধা। তারাও গুলি করতে করতে এগিয়ে আসছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা ঘেরাওয়ের ভেতর পড়ে গেল। পালানোর পথ না পেয়ে তারা দ্রুত পজিশনে চলে গেল। পজিশনে গিয়ে পালটা গুলি ছুঁড়তে লাগল। শুরু হলো মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের যুদ্ধ।
দু’পক্ষই গুলি চালিয়ে যাচ্ছে। আকস্মিক গোলাগুলিতে গ্রামের কুকুরগুলো মনে হচ্ছে হকচকিয়ে গেছে। তারা কিছুক্ষণ তারস্বরে চিৎকার করে চুপ করে গেল। এখন আর কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে না।
ঘণ্টা দুয়েক চলল প্রচণ্ড গোলাগুলি। তারপর ধীরে ধীরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দিক থেকে গুলি করার গতি কমে এলো। তাদের গুলি ফুরিয়ে এসেছে। বেশ কয়েকজন সৈন্য মারা গেছে।
একসময় আর যুদ্ধে টিকে থাকতে পারল না পাকিস্তানি সেনারা। যে কয়েকজন বেঁচে আছে তারা গুলি করতে করতে পেছাতে থাকল। পেছাতে পেছাতে পেছন ফিরে জলডুবি গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেল।
তখন সেই কনকনে শীতের রাতের অন্ধকারে একদল বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠে শোনা গেল সাহসী শ্লোগান, জয় বাংলা।
মুক্তিযোদ্ধা দল যুদ্ধ জয় করে সামনে এগিয়ে চলল। তাদের সঙ্গে চলল কিশোর মুক্তিযোদ্ধা নূর মুহম্মদ।

[*সত্য ঘটনা অবলম্বনে গল্পটি লেখা হয়েছে- লেখক।]

সারাবাংলা/পিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন