বিজ্ঞাপন

দ্য লাস্ট প্যারাডাইজ অন আর্থ।। ১০ম পর্ব: তানজুং বেনুয়া

December 22, 2019 | 10:30 am

আফরোজা মামুদ

বাচ্চাদের আনন্দের বিষয়টা মাথায় রেখে বালির চতুর্থ দিনের পরিকল্পনা সাজিয়েছিলাম আমরা। সকাল সকাল কুতা এলাকা থেকে গেলাম তানজুং বেনুয়ায় অবস্থিত বিএমআর ডাইভ এন্ড ওয়াটার স্পোর্টস (BMR dive and water sports)।

বিজ্ঞাপন

কুতা থেকে নুসা দুয়া বিচের কাছে অবস্থিত এই জায়গায় যেতে ঘন্টাখানেকেরও কম সময় লাগে। এটি মূলত ‘আউটডোর ওয়াটার অ্যাকটিভিটিজের’ জন্য বিখ্যাত। এই মেরিন রিক্রিয়েশনে সাধারণত সমুদ্রের ওপরে বিভিন্ন অ্যাকটিভিটিজ করা হয়।

সমুদ্রে বাঁধ দেওয়া, একদমই ঢেউ নেই। অনেকটা নদীর মতো শান্ত। আমাদের প্যাকেজে ছিল, টার্টল আইল্যান্ড ভ্রমণ, গ্লাস বটম বোটে চড়া এবং বানানা বোট রাইড। কিন্তু এখানে আসার পরে দেখলাম আরও অনেক রোমাঞ্চকর রাইড আছে যা কিছুটা ব্যয়বহুল। যেমন: প্যারাসেইলিং, ওশান ওয়াক, জেট ওয়াটার বোর্ড, স্কুবা ডাইভিং, ফ্লাই ফিস, ওয়াটার স্কি সিট, ইভো প্রো-২ ইত্যাদি। এজেন্ট আমাদের প্যাকেজে এসব রাখেনি।

তানজুং বেনুয়া

বিজ্ঞাপন

টার্টল আইল্যান্ড
গ্লাস বটম বোটে করে টার্টল আইল্যান্ডে নামলাম। গ্লাস বটম বোট আসলে স্পিড বোট! শুধুমাত্র বোটের মাঝখানে আয়তাকারভাবে ছোট কিছু অংশে ম্যাগনিফাইং গ্লাস। এই গ্লাস দিয়ে পানির মধ্যে ছোট মাছেদের সাঁতার কাটতে দেখা যায়। তবে আমরা যে বোটে উঠেছিলাম সেটির গ্লাস বেশ ঘোলা ছিল তাই মাছ তেমন দেখতে পাইনি। আমরা বরং বোটের বাইরে কিছু মাছের দেখা পেলাম। কী যে সুন্দর! ঢেউয়ের তালে তাকে মাছগুলোও যেন মজা করে দোল খাচ্ছে।

দ্বীপটি মূলত কচ্ছপের প্রজনন ও সংরক্ষণ কেন্দ্র। নাম, ‘তাম্বাক সারি, টার্টলল্যান্ড এন্ড মিনি জু।’ আকারে খুবই ছোট তাই ঘুরতে বেশি সময় লাগে না। এখানে ছোট্ট চিড়িয়াখানায় শত বছরের পুরোনো কচ্ছপ, সাপ, গিরগিটি, পেঁচা এবং কিছু বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী রয়েছে।

তানজুং বেনুয়া

বিজ্ঞাপন

কেউ চাইলে এসব প্রাণী হাতে নিয়ে ছুঁয়ে দেখতে পারেন, খাঁচায় ঢুকে ওদের সঙ্গে ছবিও তুলতে পারেন। তবে গলায় অজগর পেঁচিয়ে ছবি তুলতে ইচ্ছা করলে, বুকে যথেষ্ট সাহস থাকতে হবে বৈকি।

স্যুভেনিরের দাম এখানে অনেক বেশি। তাই না কেনাই ভালো। যে কোন স্যুভেনির আপনি সস্তায় পাবেন বালির ‘ক্যারি ফোর’ চেইন শপে।

টার্টল আইল্যান্ড থেকে ফিরে আমরা বানানা বোটে চড়লাম। এতে উত্তেজনা কম। তাই বাচ্চাদের মন ভরল না। তারা ফ্লাই ফিশে ওঠার বায়না ধরলো। আর আমি জেদ ধরলাম প্যারাসেইলিংয়ের।

বিজ্ঞাপন

ইদানিং বয়স যত বাড়ছে, কেমন যেন একটা আতংক পেয়ে বসছে। মনে হচ্ছে রোমাঞ্চকর কিছু করার বয়স বুঝি পেরিয়ে যাচ্ছে। তাই, আগে কখনো করিনি এমন যত সাহসী কাজ আছে তা করতে ইচ্ছে করে।

দার্জিলিং ট্যুরের শেষদিকে প্যারাগ্লাইডিং করার ইচ্ছা ছিল ভীষণ। কিন্তু দেরী করে স্পটে যাওয়ায় সেটা সম্ভব হয়নি। তবে মনের ভেতরে ইচ্ছা রয়েই গেছে। তাছাড়া অজ্ঞ আমি ভেবেছিলাম প্যারাগ্লাইডিং আর প্যারাসেইলিং বুঝি একই জিনিস। আসলে প্যারাগ্লাইডিংয়ে কোন বাঁধন ছাড়া মুক্তভাবে ওড়া যায় আর প্যারাসেইলিংয়ে স্পিড বোটের সঙ্গে বাঁধা থাকে। প্যারাশ্যুটের দড়ি শক্তভাবে আঁকড়ে রাখতে হয়। দুই ধরণের রাইডই মূলত হাতের সাহায্যে করতে হয়।

আমি ডিকোয়ারভেন্স ডিজিজে (বৃদ্ধাংগুলের গোড়ায় ব্যথা) ভুগছি অনেক দিন ধরে। তাই আমার স্থিরস্বভাব স্বামী অস্থির হয়ে রেগে বললেন- ‘ব্যথা আরও বাড়াবে নাকি’? তার রাগান্বিত কণ্ঠস্বর শুনে চোখে চোখ রেখে আমি আরও গোঁ ধরে বললাম- ‘যাবোই যাবো!’

বিজ্ঞাপন

ছেলেমেয়েরা জেদ করে আমার সঙ্গে আর আমি করি ওদের বাবার সঙ্গে! নিমরাজি হলেও আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন তিনি। আমি তাকালাম আরও কঠোরভাবে! গাইড বুঝতে পেরে হেসে ফেললো। পরে তিনি ‘ওশান ওয়াকে’ যাওয়ার প্রস্তাব দেন।

আমি রাজি হলাম। কিন্তু এবার বাঁধ সাধল আমার ‘অ্যাজমা’! শ্বাসকষ্টের ভয়ে আমি সমুদ্রের নীচে হাঁটার ইচ্ছা থেকে সরে দাঁড়ালাম। টিমের কনিষ্ঠ সদস্য নূরাজও (সাব্বির-রচনা দম্পতির ছেলে) ওশান ওয়াক থেকে বাদ পড়ল, বয়স দশের নীচে বলে। অগত্যা আমরা দুজন গেলাম প্যারাসেইলিংয়ে।

তানজুং বেনুয়া

বাকী সদস্যরা গেল ওশান ওয়াকে। প্যারাসেইলিং থেকে ফিরে ওশান ওয়াক সম্পর্কে রচনার মুখ থেকে যা শুনলাম তা হলো- সবাইকে প্রথমে একটা কাগজে স্বাক্ষর করতে দেওয়া হয়েছিল। উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট আরও কিছু অসুখ থাকলে প্যারাসেইলিংয়ে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। দু’মিনিটের ট্রেনিং করানো হয়। নি:শ্বাসে সমস্যা হলে বা অন্য যে কোন ধরনের সমস্যা হলে কী করতে হবে এই ব্যাপারে। আলাদা পোশাক পরতে দেওয়া হয়েছিল। এতো বিধি নিষেধের ধাক্কায় তারা সবাই ভীষণ ঘাবড়ে যায়। পরে বোটে করে সমুদ্রের এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। মাথায় ৮/৯ কেজি ওজনের এক বিশাল কাঁচের ক্যাপ পরিয়ে দেওয়া হয়। প্রথমে ভীষণ অস্বস্তি লাগায় ও উঠে চলে আসে। পরে সাহস করে আবার যায়। ওরা প্রায় পনেরো মিনিটের মত পানির নীচে ছিল। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পানি।

শুনলাম যে ওশান ওয়াকে দুর্দান্ত উত্তেজনা না থাকলেও খারাপ লাগেনি। তবে পুরো ব্যাপারটায় কিছুটা ফাঁক আছে। রেলিং দিয়ে ঘেরা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় হাঁটানো হয়। ঐ জায়গাটায় কিছু প্রবাল আর ছোট রঙিন মাছ।

দ্য লাস্ট প্যারাডাইজ অন আর্থ।। ৯ম পর্ব: প্যাডাং প্যাডাং বিচ

আমার স্বামীসহ বাকি সদস্যদের কাছেও তেমন ভালো লাগেনি। তাছাড়া এত ভারী হেলমেট পরার জন্য তিনি বেশ কিছুদিন ঘাড়ের ব্যথায় ভুগেছেন। পরানোর সময় নাকি ওরা খুব জোরে ঘাড়ের উপর ফেলেছিল।

এদিকে আমাদের প্যারাসেইলিংয়ের অভিজ্ঞতাও খুব একটা সুখকর ছিল না। প্যারাসেইলিং হলো মূলত প্যারাশ্যুটে করে নদী বা সমুদ্রের উপরে ঘুরে বেড়ানো। প্যারাশ্যুটের দড়ি বাঁধা থাকে  জাহাজের চেয়ে ছোট আর স্পিডবোটের চেয়ে বড় বোটের সঙ্গে। সেই বোট প্যারাশ্যুটে বাঁধা আমাদের নিয়ে কিছুক্ষণ এলোমেলো চক্কর মেরে নামিয়ে দিল। ওপরে ৫ মিনিটের মতো সময় ছিলাম আমরা। উত্তেজনা বলতে কিছু নেই। ওপর থেকে নীচের দৃশ্যও আহামরি কিছু নয়। নীচের পরিবেশ কেমন বাজারের মতো মনে হয়। এতো এতো রাবার বোট, স্পিডবোটের কারণে সমুদ্র তার নিজস্ব সৌন্দর্য হারিয়েছে বলা যায়।

ফ্লাই ফিসে ওড়ার জন্য প্রস্তুত আমরা। আমাদের কারও কাছেই এই স্পট ভালো লাগেনি। দিনের পুরো সময় এখানে নষ্ট হয়েছে বলা যায়। সবচেয়ে বেশি কষ্ট লেগেছে সময়ের অভাবে ‘নুসা পেনিদা’ দেখা হয়নি বলে। এতো কাছে এসেও এই বিচ দেখতে পারিনি বলে আমার ভীষণ দু:খ লেগেছে। যারা আগে বালি ঘুরে গেছেন তারা সবাই বলেছেন নুসা পেনিদা দ্বীপটি চোখ ধাঁধানো সুন্দর। অথচ আমরা দেখতে পারলাম না! আমাদের এই দু:খ রাখার জায়গা নেই।

প্রতিটি অ্যাকটিভিটিতে এখানে প্রচুর সময় ব্যয় করতে হয়। সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় হচ্ছে দরদাম। অর্থাৎ এখানে রাইডের খরচ নির্দিষ্ট করা নেই। দরদাম করে নিতে হয়। যার কাছ থেকে যা নিতে পারে এমন অবস্থা! তার ওপর আবার এরা ইংরেজি জানেনা। স্টাফদের ব্যবহারও তেমন সুবিধার না। অল্পতেই বিরক্ত হয়ে যায়। আমাদের গাইড দোভাষী হিসেবে কথা চালিয়েছে বলে রক্ষা!

তানজুং বেনুয়া

একেকটা রাইডে চড়ার জন্য ওরা এতো বেশি দাম হাঁকে যা শুনলে একবার আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা। যেমন: ওশান ওয়াক বা প্যারাসেইলিংয়ের জন্য ওরা আমাদের কাছে চেয়েছে জনপ্রতি ১১ লাখ করে। সে হিসেবে আমাদের ৮ জনের হওয়ার কথা ছিল ৮৮ লাখ ইন্দোনেশিয়ান রুপী। বাংলাদেশী টাকায় যা ৫৩ হাজারেরও কিছু বেশি। অথচ লম্বা সময় ব্যয় করে দরদাম শেষে সেটা আমরা নিয়েছি ২৫ লাখে। ৮ জনের পঁচিশ লাখ! চিন্তা করা যায় ৮৮ লাখ থেকে নেমে ২৫ লাখ?

এখানে এসে যারা দরদাম করবেন না, তাদের পকেটের গলা মনে করেন, কলা গাছের মতো ঘ্যাঁচাং করে কাটা যাবে! অথবা বাংলা সিনেমার ভাষায় ‘একেবারে সাফা কিরকিরা’ বলা যেতে পারে।

একটা কথা এখানে না বললেই নয়! অস্বীকার করারও উপায় নেই। রচনার স্বামী সাব্বির ভাইয়ের যে এতো ভালো দরদামের প্রতিভা আছে তা এখানে না আসলে জানতেই পারতাম না। দরকষাকষিতে তিনি দারুণ।

এ জায়গা সম্পর্কে এরকম ‘ব্যাড রিভিউ’ দেওয়ার পরেও যারা এখানে আসতে চান তারা অবশ্যই অতিরিক্ত কাপড়, টাওয়েল এবং ভেজা কাপড় রাখার জন্য পলিব্যাগ সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন।

তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে চললাম দুপুরের খাবার খেতে। ম্যাকডোনাল্ড ছাড়া আর কোথাও দুপুরের খাবার খাওয়া হয়নি আগেই বলেছি।

ম্যাকডোনাল্ডসে দ্রুত খাওয়া সেরে চললাম মাংকি ফরেস্ট দেখতে। প্রচণ্ড ট্র্যাফিক পেরিয়ে প্রায় আড়াই ঘন্টার বেশি সময় ধরে জ্যামে বসে থেকে পৌঁছলাম মাংকি ফরেস্টে।

আজকের দিনটি যে এভাবে মাটি হবে সকালে ঘুম থেকে উঠে একটুও ভাবিনি।

সারাবাংলা/টিসি/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন