বিজ্ঞাপন

‘সেলিম শরীরে আগুন নিয়ে কমলাপুরের দিক থেকে দৌড়ে আসছিল’

ডিসেম্বর ২৪, ২০১৯ | ১০:০২ পূর্বাহ্ণ

উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ‘ফকিরাপুল মোড়ে সেলিমের গায়ে কেউ আগুন দেয়নি। সে অন্য জায়গা থেকে আগুন নিয়েই এখানে এসেছে, এটা নিশ্চিত। অনেকে ফকিরাপুলের কথা বললেও তা সঠিক নয়। সে শরীরে আগুন নিয়ে কমলাপুরের দিক থেকে উল্টো পথে দৌড়ে আসছিল। আগুন কেউ দিয়েছে নাকি লেগেছে, তা জানি না।’— কথাগুলো বলছিলেন ১৬ ডিসেম্বর আগুন লাগা অবস্থায় শিশু সেলিমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া ট্রাফিক পুলিশের কনস্টেবল সুভাস চন্দ্র।

বিজ্ঞাপন

শনিবার (২১ ডিসেম্বর) দৈনিক বাংলা মোড়ে সুভাস চন্দ্রের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এ সময় তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘ওইদিন বিকেল তিনটার দিকে দেখি, টিঅ্যান্ডটি কলোনির সীমানা প্রাচীরের কর্নারে ৮ থেকে ১০ বছর বয়সী এক ছেলে শিশু লাফাচ্ছে আর কাঁদছে। শিশুটির লাফানো দেখে এগিয়ে গিয়ে দেখি, ওর শরীরের পেছনের অংশ আগুন জ্বলছে। শরীরের ওপরের দিকে পুড়ে গেছে। পরে কোনোরকম আগুন নিভিয়ে আরেকজনের সহায়তায় তাকে পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে যাই।’

এদিকে রাজধানীর ফকিরাপুল এলাকায় পথশিশুর গায়ে আগুন দেওয়ার ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশে মামলা হলেও পুলিশ এখনও কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। তবে তাদের দাবি, আগুন দেওয়ার ঘটনায় জড়িতকে শনাক্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার পর হাইকোর্টের নির্দেশে মামলার তদারক করছিলেন মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জালাল উদ্দিন। শনিবার (২১ ডিসেম্বর) সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘সেলিম বা শাহীনের গায়ে আগুন দেওয়ার ঘটনায় এখনও কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শী কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে উদ্ধারকারী একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যকে পাওয়া গেছে। তার বক্তব্য আমরা নিয়েছি। ফকিরাপুল মোড়ে টিঅ্যান্ডটি কলোনির দেয়াল ঘেষা ফুটপাতে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে ওই ট্রাফিক পুলিশ সদস্য। ফকিরাপুল এলাকায় অনেক সিসি ক্যামেরা রয়েছে। ক্যামরাগুলোর ফুটেজ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। ফুটেজ পেলে ঘটনা বিশ্লেষণ করা যাবে।’

মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াসীর আরাফাত সারাবাংলাকে বলেন, ‘কমলাপুর ও ফকিরাপুল এলাকার পথশিশু ও ভাসমান লোকগুলোর সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে। সেলিম বা শাহীনের ছবি তাদের দেখানো হচ্ছে। তাকে কেউ চেনেন কিনা, অথবা তার গায়ে কারা আগুন দিয়ে থাকতে পারে সে ব্যাপারেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত সেলিমকে কেউ চেনেন বা তার শরীরে আগুন দেওয়ার বিষয়টি বিষয়টি কেউ বলতে পারেননি।

পুলিশের কথা মতো শনিবার (২১ ডিসেম্বর) সকাল ১০টার দিকে ফকিরাপুল মোড়ে যাওয়া হয়। সেখানে দেখা যায়, ফকিরাপুল মোড় থেকে রাজারবাগের দিকে যেতে সড়কের ওপরে একটিমাত্র সিসি ক্যামেরা রয়েছে। রাজারবাগ থেকে ফকিরাপুল মোড়ে আসতে সড়কে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। আর এর সামনেই টিঅ্যান্ডটি কলোনির সীমানা ওয়াল বরাবর কর্নার থেকে পথশিশু সেলিমকে আগুন দেওয়া অবস্থায় উদ্ধার করে ট্রাফিক পুলিশের কনস্টেবল সুভাস চন্দ্র। ঘটনার দিন সুভাস চন্দ্র ফকিরাপুল মোড়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

ফকিরাপুল মোড়ে (আরামবাগ থেকে ফকিরাপুল মোড় সড়কের দিকে) ডাব বিক্রি করেন রিপন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর ঘটনার দিন তিনি ডাব বিক্রি করেননি। পরের দিন ডাব বিক্রি করলেও পথশিশুর গায়ে আগুন দেওয়ার বিষয়টি শোনেননি। তবে পত্রিকার মাধ্যমে শিশুর গায়ে আগুন দেওয়ার বিষয়টি শুনেছেন। এছাড়া গত কয়েকদিনে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য এবং পুলিশ আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে চেয়েছেন।’

একই জায়গায় পান বিক্রি করেন এসমত উল্লাহ। তিনি জানান, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় তিনি এরকম একটি ঘটনা শুনেছেন। তবে ছেলেটিকে কোথায় কে নিয়ে গেছে তা তিনি জানেন না।

ওই এলাকার চা বিক্রেতা শহীদ উদ্দিন জানান, ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে পুলিশের একজন সদস্যকে একটি ছেলেকে পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখেছেন। ওই সময় ছেলেটির প্যান্টে আগুন জ্বলতে দেখেছেন। তবে কারা কি কারণে আগুন দিয়েছিল তা জানতে পারেননি।

ফকিরাপুল মোড়ে প্যান্টের বেল্ট বিক্রি করেন নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘একটি ছেলেকে গায়ে আগুন দেওয়ার কথা শুনেছি। তবে কে বা কারা আগুন দিয়েছে তা জানি না।’

শনিবার (২১ ডিসেম্বর) ফকিরাপুল এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন ট্রাফিক কনস্টেবল হালিম শরীফ। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর আমি গুলিস্তানে দায়িত্ব পালন করছিলাম। সুভাস চন্দ্র ব্যাচমেট হওয়ায় বিষটি আমি শুনেছি। ফুটপাতে যেসব শিশুরা ড্যান্ডি (এক ধরনের আঠা) খায়, তাদের একজনের গায়ে আগুন লাগা অবস্থায় সুভাস উদ্ধার করে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সম্ভবত, নিজেদের মধ্যে গণ্ডগোলে একে অপরের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।’

প্রসঙ্গত, গত ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সেলিম নামে এক শিশুকে কে বা কারা গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে শিশুটিকে উদ্ধার করে ট্রাফিক পুলিশের কনস্টেবল সুভাস চন্দ্র রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসে এক ভিক্ষুক দম্পত্তি; যাদের কাছে শিশু সেলিম সপ্তাহ খানেক ছিল বলে জানা গেছে।

এদিকে বার্ন ইউনিটের ভর্তির পর সেলিম জানায়, তার গায়ে এক রিকশাওয়ালা ম্যাচ ঠুকে আগুন ধরিয়ে দেয়। তার অপরাধ ছিল, সামনে থেকে ওই রিকশাওয়ালাকে সরতে বলেছিল। ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর ১৮ ডিসেম্বর একজন আইনজীবী হাইকোর্টের নজরে আনে। পরে হাইকোর্টের দুই বিচারপতি বিষয়টি আমলে নিয়ে পুলিশকে মামলা দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে মতিঝিল থানায় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা রিকশাচালককে আসামি করে মামলা করেন। সেই মামলায় পুলিশ এখনও কাউকে গ্রেফতার এমনকি শনাক্ত করতে পারেনি।

সারাবাংলা/ইউজে/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন